Search
Generic filters
Search
Generic filters

ছোটগল্প: বিদেশি চুইংগাম

‘মামা, বাদাম লইবেন?’

শুকনো পাতার ঘূর্ণি নৃত্যটা থেমে গেল। মোরসালিন প্রথম কতকটা ভাবলেশহীন তাকিয়ে রইল, পরে ‘না’ শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে খেয়াল করল, ছেলেটা সচরাচর যেমন দেখা যায়, শিশুশ্রমিক, তাদের থেকেও ছোট। আর সে অর্থে ঠিক শ্রমিকও নয়, একজন খুদে স্বাধীন ব্যবসায়ী। তবে কোনও দোকান-পাট-গুদাম নেই তার, পুঁজি বলতে শুধু দুটো ১০ ইঞ্চি করে পা— লিকলিকে ও কর্দমাক্ত। আর একটি বাঁধের রাস্তা।

এদিকে মেয়েটি অনেকখানি সামনে চলে গিয়েছিল, আপনমনে বিচরণ করছিল পাড় ভেঙে ভেঙে, হঠাৎ দর্শকদের সাথে একটা দূরত্ব অনুভব করে সে, তাদের মনোযোগ অন্যত্র ধাবিত কিনা বুঝে নিতে পেছন ফিরে তাকায়। গাড়ি থেকে নেমে যখন সে কাঁচারাস্তার ওয়াকওয়ে ধরে পা ফেলতে শুরু করেছিল, অবিকল বিদেশি মেমদের মত লাগছিল মোরসালিনের! নদীর পাড়ে বইছিল জোর বাতাস, মাঝে মাঝেই ধুলো উড়ছিল, আর কাছেই পারাপারের নৌকাগুলো হেলে পড়ছিল বারবার! উন্মাতাল হাওয়ার এই উৎসবে যোগ দিতে পাতারাও বেরিয়ে পড়েছিল গাছেদের থেকে, ঢেকে দিচ্ছিল মোরসালিনদের চোখ-মুখ, কেড়ে নিচ্ছিল সামনের চলমান জগৎ-সংসারকে একে একে!

‘খোলা থাইকা তুইলা আনছি… গরম গরম… একটা খাইয়া দেহেন, মামা।’

এবার আরও ভাল করে লক্ষ্য করল মোরসালিন, দেখল, একটা প্লাস্টিকের গামলা গোটা পঞ্চাশেক ঠোঙা ধরে রেখেছে, আর ছেলেটি ধরে রেখেছে তার দেহাকৃতির সাথে সংঘর্ষরত গামলাটিকে, পেটের ঠিক ওপরে… সে তাকিয়ে রয়েছে অর্ধনিমীলিত চোখে… উপরের অপসৃয়মান সূর্যের আলো তার মুখে আলো-আঁধারের ঢেউ তুলে যাচ্ছিল…

‘আচ্ছা দে, চার ঠোঙ্গা।’ মোরসালিনরা বিকেলবেলাটা কাটাতে এসেছিল পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সেতুর গোড়ায়, সঙ্গে একজন লোকাল কাজিন, একজন বন্ধু, আর সেই বন্ধুর বোন। সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিকে অনেক দিন ধরে আসতে বলছিল; নিজের এলাকার, তাদের বাড়ির এত কাছের এই মহাকীর্তি বন্ধুকে দেখাবেই। তো সেই বন্ধুর সাথে একটি কাট কাট তরুণী দেখে মোরসালিন প্রথমটা তো ‘অন্য কিছু’-ই ভেবে নিয়েছিল! পরে অবশ্য তাকে জানানো হয়েছিল, সম্পর্কটা চাচাতো বোনের। দূরের না কাছের— যদিও তা উহ্য থেকে গিয়েছিল। বোনটি নাকি সাথে আসার জন্য খুব বায়না ধরেছিল।

‘বাড়ি কি এখানেই?’ টাকাটা বের করতে করতে জিজ্ঞাসা করে মোরসালিন, কিন্তু বিশ টাকার নোটটা হাতেই ধরা থাকে, ওপাশের হাত কিছুতেই সাড়া দেয় না, এমনকি বাড়ি কোথায় সে উত্তরও নেই।

‘এক ঠোঙ্গা দশ টাকা কইরা, মামা।’ এক সময় নিরাসক্ত গলায় বলে পুঁচকে বণিক।

‘আগে কস্‌ নাই, ক্যান? এই বয়সেই ধান্দাবাজি শিইখা গেছস্‌?’ খ্যাঁকারি দিয়ে ওঠে লোকাল কাজিন। মোরসালিন ইশারায় তাকে থামার আহ্বান করে ফের পকেটে হাত দেয়, কিন্তু চল্লিশ টাকার খুচরো খুঁজে পায় না… পাঁচশো টাকার একটি নোট হাতে নিয়ে ভাংতি আছে কিনা জিজ্ঞাসা করতে যেয়েও থেমে যায়। অদূরেই গাড়ি পার্ক করা ছিল, ড্রাইভারকে ফোন করে মোরসালিন, জানে, ওর কাছে খুচরোর এক বড় মজুত রয়েছে, অনেকবার বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে।

‘কী বললি না, বাড়ি কোথায়?’

ছেলেটা এতক্ষণ মাথা নীচু করে পায়ের নীচের মাটি তার দুর্বল পা দিয়ে খুঁটছিল… আঙুলগুলো মাটিতে পুরো ঢেকে যাওয়ার আগে মোরসালিনের প্রশ্নে তার হুঁশ ফেরে। মুখটা উপরে তুলে তাকায়, তাকিয়েই থাকে একনাগাড়ে, অনেকটা সময় কোনও কথা বের হয় না মুখ থেকে, চোখজোড়া হারিয়ে যেতে থাকে সামনের অনন্ত আকাশপানে।

ব্রিজটা এখনও খুলে দেয়া হয়নি, শেষমুহূর্তের ধোয়া-মোছা-মহড়া চলছে। তাই ব্রিজে ওঠার রাস্তায় প্রবেশাধিকার নেই কারও… তবে তাতে হতোদ্যম হয় না দর্শনার্থীরা, বাইপাস রাস্তা ধরে ব্রিজের ডানে-বাঁয়ে নদীর ধার-ঘেঁষে বহুদূর বিস্তৃত যে রাস্তা তাতে তাদের ঢল নামে… সমুদ্রপারে সূর্যের থালা পানিতে নেমে যেতে দেখতে যেভাবে ভিড় জমায় দূর-দূরান্তের পর্যটক, এখানেও তেমনই মনোরম বিচ— বসন্তের রচনা হয়েছে ব্রিজকে ঘিরে।

‘ওই যে ধলা দালানডা দেখতাছেন, তার পিছে ওই যে নাম্বা খাজুরগাছটা, তার পিছে ওই যে… পিছে… ওই…।’ ভাংতির বিরতিতে এক সময় ছেলেটা নিজে থেকেই বাড়ি দেখায়। দিনের আলো ফুরোতে ফুরোতে যেন ওই খেজুর ঝোপের ওপর ধপ করে নিভে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও ঘরের ছবিটা দেখতে পায় না মোরসালিন।

‘বাবা কী করে তোর?’ বাচ্চাটির গায়ের গেঞ্চির স্পাইডারম্যানটা দেখতে দেখতে জিজ্ঞাসা করে।

‘ওই যে বিল্ডিংডার কথা কইলাম, ওইহানে খাতিনদারি করে, আগে খেতি করত… আমাগো বাড়িও ওইহানেও আছিল!’ বলেই সামনে তাকায়, একজন কেউ ডাকছে তাকে নীচে থেকে; প্রমত্তা নদীর তীরে শক্তিশালী বাঁধ গড়ে তোলা হয়েছে, ব্লকগুলি মাটির অনেক গভীরে কামড় বসিয়ে ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে গড়িয়ে গেছে নীচের দিকে, যেখানে পানির স্রোত উছলে উছলে পড়ছে। শহর থেকে আসা অনেক তরুণ-তরুণী সেই কলকল ধ্বনিতে বুঁদ হতে তীরের ব্লকগুলিতে পা দুলিয়ে বসেছে, নদীর পাগল করা হাওয়া তাদের রেশমমসৃণ চুল আর মিহি সুতোয় বোনা নরম মেদহীন জামাকাপড়ে ঝাপ্টা দিয়ে যাচ্ছে, তাদের উচ্চ পারফিউমের মনমাতানো মহুয়া বাতাসে ভর করে এই এতদূরের নাকগুলিকেও হানা দিয়ে যাচ্ছে।

আওয়াজকে অনুসন্ধান করতে মোরসালিনের দিকে প্রশ্নাতুর চোখে তাকায় ছেলেটি। এক সময় সেখানে ফুটে ওঠা আশ্বাসের ওপর ভর রেখে ছুটতে শুরু করে… ব্লকের ঢালে গড়িয়ে যেতে যেতে সে পতঙ্গে মিলিয়ে যেতে থাকে। মোরসালিনের চোখ যতই খুদে বণিকটির পিছু ধাওয়া করতে থাকে, ততই যেন ব্রিজটি সামনে এগিয়ে আসতে থাকে। ছেলেটা যত নীচু হতে থাকে, ব্রিজটা ততই উঁচু হতে থাকে তার দৃষ্টিসীমাকে অদ্ভুত সব কৌণিক উপহার দিয়ে।

মাস তিনেকের মধ্যেই উদ্বোধন হচ্ছে ব্রিজটা, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্রিজগুলোর একটি সে, তাই চারদিকে সাজ সাজ রব, শত শত মানুষ খেটে মরছে দিনরাত, এই এত বড় ব্রিজটার প্রতিটা লোহালক্কড় তন্নতন্ন করে ঠুকে দেখা হচ্ছে, যেন কোথাও না থাকে চুল পরিমাণ ফাঁক। স্বপ্নের ব্রিজের উদ্বোধনটাও স্বপ্নের মত করেই উপহার দিতে চায় তারা জাতিকে। উদ্বোধন যতই এগিয়ে আসছে ততই অস্থিরতা বাড়ছে মানুষগুলোর মধ্যে, ব্রিজ ও তার সংলগ্ন রাস্তার অনেকটা পর্যন্ত কাউকে সহ্য করছে না তারা, যা পাচ্ছে তাই ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছে। যেমন, তখন মাত্র ২০০ গজ দূরে ছিল মোরসালিনরা। সিকিউরিটি পোশাক পরা লোকটা যদিও মোলায়েম করে ফেলেছিল গলার স্বর, তার চোখে-মুখে কৌতুক, আফসোস ও বিরক্তি একে একে ক্রীড়া করে যাচ্ছিল— আর মানুষ হইল না, এই সময়ে এত কাছাকাছি আসার কথা ভাবতে পারে কেউ, স্টুপিড পাব্লিক! মোরসালিন অবশ্য গাড়ি থেকে নেমে এসেছিল, সে বারবার বলার চেষ্টা করছিল সে এই এলাকারই ছেলে, এই মাটিতেই তার জন্ম। অফিসারটার সেসবে কানে নেয়ার ফুরসত ছিল না, বরং একটি উচ্চপদস্থ গাড়ির শব্দকে চিতার মত ছুটে আসতে দেখে সে প্রায় কুত্তা খেদাও করেছিল মোরসালিনদের, ‘আর এক সেকেন্ডও না, মামলা খাইতে না চাইলে…।’

ড্রাইভার খুচরো নিয়ে এসেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু পার ধরে ধরে পতঙ্গের ছুটে চলা যেন শেষ হয় না, মনে হয় বেজায় ব্যবসা হচ্ছে। ব্লকের পরে যে নদী, তাকে একফালি কেকের মত দেখায়, তার ওপারেই গড়ে উঠেছে চরের মত দ্বীপ। ওইখানে আস্তে আস্তে সবুজ হয়ে উঠেছে, আরও দূরে চোখে মেললে এমন ফালি ফালি করে কাটা কেক ও তার পারেই মনোহর সবুজ দ্বীপ আরও অনেক চোখে পড়ে। মোরসালিনের কাজিন বেশ জানাশোনা লোক, তার সাথে কিছুটা সময় থাকলে জানা যায়, এ তল্লাটের হেন কোনও গুরুত্বপূর্ণ কেউ নেই যার সাথে তার কানেকশন নেই। সেই আশার বাণী শুনাল, ব্রিজ উদ্বোধন হওয়ার সাথে সাথে এই ওয়াকওয়েরও উদ্বোধন হয়ে যাবে, টেন্ডার হয়ে কাজও শুরু হয়ে গেছে, তখন আর এই এবড়োথেবড়ো ধুলো রাস্তার হ্যাপা নিতে হবে না, টেমস নদীর ওয়াকওয়েকেও হার মানাবে। গ্রাম আর গ্রাম থাকবে না তখন, পাতায়া বিচ থেকে বেশি লোক টানবে। চিকচিক করতে থাকে মোরসালিনসহ অন্য শ্রোতাদের চোখ। এমনকি হাতে ধরা আয়না সামনে রেখে লিপস্টিক বুলাতে থাকা বিদেশি মেমদের মত দেখতে তাদের মেয়ে সঙ্গীটিও চোখ তুলে তাকায়। মাটির রাস্তায় ধুলো, সেই ধুলোর বাতাসে তামাটে নোনা নেশাটে গন্ধ, পর্যটকদের নাসারন্ধ্র মাতাল করে দিতে থাকে।

শিশুবিক্রেতা ফিরে আসে, কিন্তু যেমনটা ভেবেছিল মোরসালিন, তেমন ঘটেনি… সেই গামলা, যেটা তার পেটের ওপর ধরে রেখেছিল সে, খুব কম ওজনই খোয়াতে পেরেছিল। রীতিমত ঘামছিল সে, শীতের এই পড়ন্ত বিকেলেও। মোরসালিন যখন পঞ্চাশ টাকার নোটটা দেয়ার জন্য হাত বাড়ায়, খুশিতে মুখের চামড়াটা অনেকটাই খুলে যায় না তার। সে কায়দা করে তার খুদে পকেটের পুরোটা দখল করা মানিব্যাগ বের করে, সেখান থেকে একটা দশ টাকার নোট কায়দা করে ওঠায় সে। তারপর নতুন টাকাটা অবশিষ্ট টাকাগুলোও গোনে কায়দা করে, সব শেষে, সেগুলোকে গুঁজে দেয় তার জিন্সের ফুল প্যান্টের পকেটে যেটি সুন্দর করে সেট হয়ে গিয়েছিল পেটের সাথে… তারপর হাঁটা দেয় সেই এবড়েথেবড়ো ব্লক রাস্তায়।

‘জানিস, এখানে দুবাইয়ের মত করে নদীর মাঝখানে দ্বীপ হবে, পানির নীচ দিয়ে টানেলের মত করে রাস্তা বানানো হবে।’ মোরসালিন লোকাল কাজিনের রূপকথা শুনছিল ওয়াকওয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে, হঠাৎ বন্ধুটির দিকে তাকাতেই দেখতে পেল সে আবার চোখ বুজে ফেলেছে, আর তার সাথে আসা মেয়েটি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজের পোট্রেট নিতে।

‘এই শোন’… মোরসালিনের ডাকটা শুনে কয়েক গজ এগিয়ে যাওয়া শিশুবণিকটি পিছন ফিরে দেখতে পেল একটা নীলমত কী যেন পকেট থেকে বার করা হচ্ছে। বাসা থেকে বেরুনোর সময় চার প্যাকেট চুইংগাম পকেটে পুরে নিয়েছিল মোরসালিন। কিন্তু সাথে আসা বন্ধুর বোনটি তাকে অবাক করে চুইংগাম চিবুতে অস্বীকৃতি জানাল। সে এই বিকেলে এই অনিন্দ্যসুন্দর পদ্মাপারে ছবি তোলায় এত বিভোর ছিল যে, এমনকি চুইংগামের মৃদু ডিস্টার্বও অ্যালাউ করছিল না।

‘এইডা কী?’ ছেলেটি চিনতে পারে না, চুইংগাম যে এই থ্রি-ফোর-ফাইভ জি’র যুগে দেখেনি, তা নয়; কিন্তু মোরসালিনের কাছে থাকা চুইংগামগুলো ছিল স্পেশাল, বিদেশ থেকে আনা হয়েছিল, এগুলো শুধু দামিই ছিল না, দেখতে অন্যরকম ছিল।

‘এটা একটা খাওয়ার জিনিস, চকলেটের মত, চাবাইতে থাক, কিন্তু গিলবি না।’

লোকগুলি যেমন, এই প্যাকেটটাও তেমন অচেনা ঠেকে ছেলেটির, হাবভাব কিছুই বুঝতে পারে না, হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে। পরে খোসাটা খুলতে চেষ্টা করে, কিন্তু বিদেশি এই চুইংগামের প্যাকেজিং সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। মোরসালিন ওর হাতে থেকে প্যাকেটটি নিয়ে এক মোচড়ে খুলে ফেলে, পাঁচটা ছিল, প্রতিটাতে তাই থাকে।

দেখতে তার পিস্তলটার গুলির মত মনে হচ্ছিল। সে মুখে পুরতে যেয়েও পোরে না, মা বারবার বলে দিয়েছে, বিদেশি লোকজনের কাছ থেকে কোনও জিনিস না নিতে। সে জিনিসটা ফেলে দেয়ার কথাও ভাবে একবার। কিন্তু এ লোকগুলোর সামনে কাজটি করতে সাহস হয় না তার। সে মোরসালিনদের কোনও ধন্যবাদ না দিয়ে হাঁটা দেয় সেই দিকটিতে, যেখানে তার বাড়ি বলে জানিয়েছিল।

অনেকটা পথ এসে, অন্তত মোরসালিনদের চোখের আড়ালে তো বটেই, সে একবার পেছনে তাকিয়ে নেয়, তারপর পকেটের মধ্যে আঙুলগুলো নিয়ে বেশ কসরত করে— তার জিন্সের লম্বা পকেটের অনেক নীচে পড়ে গিয়েছিল প্যাকেটটা। হাতে আটকানোর পর একঝটকায় তুলে ফেলে পাশের খাদে ফেলে দিতে যেয়ে হঠাৎ থমকে যায়। নাহ্‌, রেখে দেবে সে, বন্ধুদের দেখাতে হবে জিনিসটা, সবাই কী হিংসে করবে তাকে! মা জানতেই পারবে না, সে তার জুতোর বাক্সটার মধ্যে লুকিয়ে রেখে দেবে জিনিসটা। বন্ধুরা অবশ্য শুধূ দূর থেকেই দেখতে পাবে, তাদের কখনও ধরতে দেবে না সে। সে আবার ঢুকিয়ে রাখে প্যাকেটটা তার পেটের সাথে ফিট করা জিন্সের পকেটে। তারপর মাথা নীচু করে ফের হাঁটতে শুরু করে।

সাঁঝ হয়ে এসেছে, দূরের সেতুর বাতিগুলো জ্বেলে দেয়া হয়েছে, এখন চলছে ট্রায়াল কাল, তাই সব কিছুই চলে একমাত্র জ্যাম ছাড়া। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই যখন চালু করে দেয়া হবে, সে দু’পারের ব্যবধান কমিয়ে দেবে যোজন যোজন। পুরো সেতু জুড়ে নানা রংয়ের পসরা, একটা স্বপ্নপুরীর মত লাগছে তাকে এখন। সেই স্বপ্নপুরীর ঠিক প্রবেশমুখে শিশুবণিক আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকে… তার বাড়ির খাদে।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

2 Responses

    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ, দাদা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × four =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »