Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

একটা বাজে লোকের পাল্লায়

লোকটা এদিক-ওদিক চাইছিল। নন্দবাবু মাঠের দিকে চেয়ে ছিলেন। মনে হবে খেলা দেখছেন আসলে অনেকক্ষণ এমনি বসে আছেন। কিছুই দেখছেন না, নিজের রাগ কমাচ্ছেন। জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছেন। এটা উনি মাঝে মাঝেই করেন। রাগ কমে এলে বাড়ির পথে যান। বিকেল বা সকাল হলে মানিয়ে যায় কিন্তু ভরদুপুরে হলে লোকে দেখে মাথার দোষ হয়তো ভাবে। তাতে ওনার কিছু এসে যায় না। এখন বিকেল বেলা। সামনের মাঠে ফুটবল খেলা চলছে। গুটিকয়েক ছেলেপুলে মাঠের ধরেই বসে উৎসাহ দিচ্ছে। লোকটি নন্দবাবুর দিকে চেয়ে বললে, ‘খুব চিন্তায় আছেন?’

পাশের লোকটিকে উনি চেনেন না তবু আলপটকা বেরিয়ে গেল, ‘হুঁ’, তারপরই মুখ দিয়ে বেরুল, ‘আপনি?’

লোকটি মৃদু হাসলে। ‘আমি ব্রজ।’

‘ভ্যাঙাচ্ছেন?’

‘মানে?’

‘খুব সহজ। আপনি ব্রজ আমি নন্দ।’

‘যাহ? কী যে বলেন।’

‘যা সত্যি তাই বলছি। বলছি রেগে যাবেন না। আপনি আর কী করবেন? আপনার হাতে কি সব আছে?’

‘আরে এই বয়সে এসে কার সঙ্গে কী ব্যবহার করব তাও শিখতে হচ্ছে।’ বলে মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে টানতে থাকেন।

‘উঁহু, অমন করবেন না। চুল যেটুকু মাথায় ছুঁয়ে আছে সব ঝুরঝুর করে পড়ে যাবে। তখন টানার আর কিছু পাবেন না। ঠান্ডা, কুল কুল হয়ে ভাবুন গলদটা কোথায়?’

‘গলদ বলে গলদ? আমি একটা আস্ত বলদ। ব্যবহার এই বয়সে শিখব?’

‘খুলে না বললে কেমন করে বুঝব?’

‘নকল করছেন নাকি?’

‘মাথাখারাপের আর কি বাকি?’

‘কোথা থেকে শুরু করব জানি না। এই ধরুন আমার শালির কথাই বলি। উনি দিব্বি ছিলেন বিয়ে করে আনন্দে। ধুমধাম করে বিয়ে হল। ক’দিন কব্জি ডুবিয়ে খেলাম।’ চাহনি দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘না, মানে, বিয়ের সময়। নতুন বিয়ের পর সকাল রাত যখন তখন তার দিদির কাছে বরকে নিয়ে চলে আসত। দিদি বলতে অজ্ঞান। ছেলেটি বেশ শান্তশিষ্ট।

‘ছেলে? আগের পক্ষের?’

‘আরে না। বরের নাম দীপক। বাড়ির সবাই মানে বউ দীপু বলে, তাই আমিও ওই নামেই ডাকতাম। একই পথের পথিক তো। নির্ভেজাল ভদ্রলোক।’

মাথা ঝাঁকিয়ে বললে, ‘আগে, আগে।’

‘অ্যাঁ? কিছু বললেন? নানা মশাই গে নয়।’

‘আরে এগোন, তারপর কী হল?’

‘‘শালির সঙ্গে কি একটা কারণে মনোমালিন্য চলছে, শালি শ্বশুরবাড়িতে রয়েছে কিছুদিন। এরমধ্যে দীপুর সঙ্গে মশাই কলেজ স্ট্রিটে দেখা। আমাকে দেখে বেমালুম মুখ ব্যাজার করে মাথা নামিয়ে চলে যাচ্ছিল। মানেটা কী? খপাৎ করে ধরলাম। ‘কী হল ভায়া? আমাকে দেখতে পাওনি?’ গা বাঁচানোর মত বলল, ‘না ওই আর কী? তাড়া আছে অফিসে।’ বলছে কিছু, কিন্তু মুখে সেই উষ্ণতা নেই। চোখ সরিয়ে রেখেছে। ‘কিছু হয়েছে?’ ‘না।’ বিষাদগ্রস্ত মুখে বললে, ‘না। তেমন কিছু না।’ বললাম, ‘অনেকদিন আসো না। এসো একদিন।’ ‘হুঁ, হ্যাঁ’, এইসব বলে পাশ কাটাল। দাঁড়িয়ে ভাবলাম লোকটার হল কী? বাড়ি এসে গিন্নিকে বলতেই দপ করে যেন লেগে গেল দক্ষযজ্ঞ। প্রথম হাহুতাশটা হল নিজের মা-বাবার প্রতি। ওনারা কেমন ভাসিয়ে দিয়েছে যার তার সঙ্গে, বিয়ের নামে। তারপর যেটি পড়ে রইল সেটা সম্পূর্ণ আমার জন্যে। এই মধ্যবয়েস রোজকার মত জানলাম আমি কিছুই পারি না। কোথায় কী বলতে হয় জানি না। এরমধ্যে দোষের মধ্যে বলে ফেলেছি, ‘ওকে আসতে বলেছি।’ মুহূর্তে মিসাইল ছুটে এল, ‘কে বলেছে? কেন বলেছ? কে তোমাকে বলেছে বলতে? একদম ওয়ার্থলেস। কী একটা বাজে লোকের পাল্লায় পড়েছি।’ বললাম, ‘কে?’ ‘তুমি, তুমি।’ চিৎকার করে উঠল। ‘ও একটা শয়তান, আমার বোনকে টর্চার করেছে। ওকে আমি ছাড়ব না। ওকে হাজতবাস করিয়েই ছাড়ব।’ বোঝো ঠ্যালা। আমাকেই হাজতে রাখে প্রায়। বললে, গ দিয়ে বিচ্ছিরি একটা গালি দিয়ে বললে, ‘তুমি জানো না! ছবির সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না? এর মধ্যে তুমি ডাকলে? এত গায়ে পড়ার কী আছে? কোনও বুদ্ধি কি ঠাকুর দেননি তোমাকে?’ প্রচুর বকাঝকা খেলাম কিন্তু মনে হল তাহলে কি আমাদের সব সম্পর্কগুলো এই রকমই? যতদিন শালির সঙ্গে ভাব তখন সব গলে গলে পড়ছে। আর মূল যোগাযোগের মানুষটা মুখ ফিরিয়ে নিলে কি আমরাও মুখ ফিরিয়ে নেব? এটা কেমন সম্পর্ক?’’

‘আর কিছু?’

‘‘দুবছর আগে ফ্যামিলি পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে বারুইপুরের বাগানবাড়িতে। ভাইপো এসে বললে, ‘কাকা আমার একজন বন্ধুকে কি আমি আনতে পারি?’ পিসতুতো মাসতুতো ভাই বোন কাকা জ্যাঠা মিলে হচ্ছে, তারমধ্যে ভাইপোর বন্ধু কেমন বেমানান। গিন্নি বললে, ‘ওর যার সঙ্গে ভাব-ভালবাসা আছে, সেই মেয়েটিকে আনতে চাইছে। তুমি আর না করো না।’ মেয়েটি এল। সবার সঙ্গে পরিচিত হল। মেয়েটি দেখতে সুন্দরী, ফর্সা, নরম স্বভাব। নাম স্বাগতা। কথায় কথায় আলাপ গড়াতে বুঝলাম সে আমার কলেজের এক বন্ধুর মেয়ে। তার নাম ছিল স্বাগতম, তার মেয়ে স্বাগতা। সেই বন্ধু একদিন ডাকলে তার বাড়ি। ভাইপোকে নিয়ে গেলাম। অনেক গল্প হল। খাওয়াদাওয়া হল। ওরাও একদিন এল।’’

‘তারপর? প্রবলেম কী?’

‘‘হঠাৎ একদিন শুনি, গিন্নি বলছে, ‘শুনেছ, স্বাগতার সঙ্গে ব্রেকআপ হয়ে গেছে তোমার নয়নের ভাইপো রাজার।’ ‘সে কি? ব্রেকআপ বললেই কি করা যায়? ও তো এখন আমাদের আত্মীয়স্বজন সবারই চেনা। সবাই ওকে মেনে নিয়েছে রাজার অনুরোধেই।’ আমার রাগ হল। ‘মামদোবাজি নাকি? রাজা এটা করতে পারে না।’ গিন্নি হাত ধরে থামালে। ‘ওরা যদি একসাথে থাকতে না চায় তখন তো ভালই আগেই ব্রেকআপ হয়ে গেছে। পরে তো আরও লোক হাসানো হত।’ বললাম, ‘আমি কথা বলব রাজার সাথে।’ গিন্নি এবার শক্ত হয়ে গেল, ‘না তুমি বলবে না। তোমার কথায় ও সব ঝামেলা মিটিয়ে নেবে না। তুমি মাঝখান থেকে অপ্রস্তুত হবে।’ সেই প্রশ্নটা আবার তুললাম, ‘তাহলে কি আমাদের সম্পর্কগুলো নদীর শাখাপ্রশাখার মত বেঁচে থাকে? নদী যদি শুকিয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে শাখাও বুজে যাবে। আমি এখন থেকে স্বাগতার সঙ্গে দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে চলে যাব? এইটাই কি মানুষের মানুষে সম্পর্কের ভিত?’ এতগুলো কথা বলে একটু দম নিলেন, ‘হ্যাঁ যেটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। আপনি থাকেন কোথায়?’’

ব্রজ বলে, ‘আপনাদের পাড়ার গলির শেষের বাড়িটা আমার। যদিও আমি সব সময় ওখানে থাকি না।’

‘আপনার বাড়ি কিন্তু আপনি থাকেন না? তাহলে কে কে থাকে?’

ব্রজ মুখটা সামনে এনে চারিদিক তাকিয়ে বললে, ‘আমাকে আপনি ভীষণ বদমাইশ লোক বলতে পারেন। আপনার মত আমারও অবস্থা ছিল এক সময়। কিন্তু এখন আমি দিব্বি আছি। আমি ভাল থাকার একটা দারুণ উপায় বার করেছি। তবে এখানে অন্য সবাই মানে বউ, ছেলে, নাতিনাতনি সবাই থাকে আর আমি মাঝে মাঝে থাকি বৃদ্ধাশ্রমে।’

নন্দর চোখ চকচক করে ওঠে, ‘বৃদ্ধাশ্রমে? বলেন কি মশাই? এ তো অভিনব। তারপর? তারপর? কী করে ম্যানেজ করেন সবটা? কেউ কিছু ভেটো দেয়নি? ছেড়ে দিল আপনাকে?’

‘কাউকে বলবেন না। কিছুই ছিল না নিজের জীবনে। রিটায়ার করার পর শুধু চাকরির মত সকাল বিকেল বাজার করা, নাতিকে স্কুলে দিয়ে আসা নিতে আসা, আর উঠতে বসতে বউয়ের মুখঝামটা, ভুলে যাওয়ার জন্যে, কথার মাঝে কথা বলার জন্যে, ভুল শোনার জন্যে, আরও কত কী। আমার রাজনীতি নেই, ধর্ম নেই, রোয়াকের আড্ডাও নেই। মাঝে মাঝেই ভাবতাম এর থেকে মুক্তির উপায় কী? একদিন অনেক প্ল্যান করে দিলাম ঝামা ঘষে।’

উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন নন্দ, ‘কী করলেন? কেমন করে ঘষলেন? কোথায়, নাকে নিশ্চয়ই?’

‘বললাম, অনেক হয়েছে আমি এবার গৃহত্যাগ করব।’

‘তারপর? তারপর? সব মিলে যাচ্ছে। বলুন, বলুন।’ নন্দ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ‘আপনার তো মশাই বেজায় সাহস। এমনি এমনি ছেড়ে দিল? কোনও মুচলেকা? গৃহত্যাগ বললে কেমন সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী ভাব এসে যায়।’

ব্রজ থেমে বলে, ‘দেখুন মশাই, অনেক ভেবেচিন্তে একটা উপায় বার করেছি। আপনার পছন্দ না হলে নেবেন না। শুধু বদনাম ছড়াবেন না।’

‘না, না, বলুন দিকি শুনি।’ নন্দ ভাল করে ঘুরে বসে।

‘আমার এক বন্ধু থাকে একটা বৃদ্ধাশ্রমে। তার ওখানে মাঝে মাঝেই যেতাম দেখা করতে, গল্প করতে। বললাম ফোনে কথা তার সাথে। বললাম মানবিক কারণে সাময়িক কয়েকদিন থাকব।’

‘দুর! এরকম হয় নাকি? ওখানে তো একবারে যেতে হয় বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে। ওখানে গেলে আর ফেরা যায় না। বেরোলেই শেষযাত্রা।’

একটা সবজান্তা হাসি দিয়ে ব্রজ নন্দর কাঁধে হাত রাখে। ‘হয় মানে? দারুণভাবে হয়। আপনি জানেন কলকাতার আশেপাশে, একটু দূরে অনেক বৃদ্ধাশ্রম আছে, যেখানে গিয়ে দুতিন সাতদিন থেকে আসা যায়? সাইট ভিসিট। ভাল লাগলে কিনে নিতে পারেন, ভাড়া করতে পারেন। ওখানকার মানুষজনের সাথে রইলেন সময় কাটালেন তারপর ভাল লাগলে পুরোপুরি রয়ে গেলেন। ব্যস। অনেকটা আজকালকার প্রাক-বিবাহ ব্যাপার।’

‘বলেন কি? তারপর?’ নন্দর আর তর সহে না।

‘সাইড ব্যাগে কিছু জামাকাপড় ওষুধ পেস্ট তোয়ালে নিয়ে বেশ আবেগের ঢেউ তুলে বেরিয়ে এলাম। বিচ্ছিরি বাজার করার পর মুখঝামটা শুনে ব্রেকফাস্ট না করেই বেরিয়ে এলাম। মনে মনে বেশ মজা পেয়েছিলাম। বড়ছেলেকে ঠিকানা দিয়ে এলাম। যাবার সময় সামান্য একটু টলেছিল গিন্নি। তবে সন্দেহ ছিল সন্ধে হলেই বাছাধন ল্যাজ গুটিয়ে ফিরে আসবে।’

‘আপনি কী করলেন?’

‘‘ফু! দুদিন ফোন ধরলামই না কারুর। শেষে মাসতুতো শালির ফোন ধরলাম দুদিন পরে। ততদিন ওখানে বন্ধুদের সাথে মিলে যদিও বেপরোয়া ক্যারম, আড্ডা, তাস চলছিল নতুন জায়গায়, তবু একটু অভিনয় করতে হল। গলা ভারী করে বলতে হল ‘অনেক হয়েছে আর নয়।’’

‘এই সব বললেন? আপনি তো মশাই সাংঘাতিক বাজে লোক।’

‘সংসার তো যুদ্ধক্ষেত্র। সবই চলে সংসারে শান্তি রাখতে।’

চোখ উজ্জ্বল হয় নন্দর, ‘তারপর, তারপর?’

মুখ নামিয়ে চারিদিক তাকিয়ে সে বললে, ‘এ গল্প যাকে যাকে বলেছি তারাই একটু বলার পর ডুব জলে ভেসে ওঠার মত বলেছে ‘তারপর, তারপর?’ হ্যাঁ একদিন সকালে বড়ছেলেকে নিয়ে গিন্নি চলে এল।’

‘ব্যস, গেল তো সব দম ফুরিয়ে? আপনি সুড়সুড় করে চলে গেলেন?’

‘‘না, সবে এই তো মাছ টোপ গিলেছে। এত তাড়াতাড়ি ফিরে যাব? গম্ভীরসে দারোয়ানকে বললাম, ‘বাইরের ঘরে বসতে বলো।’ বেশ কিছুক্ষণ পর আমি সেই বন্ধু প্রশান্তকে বললাম, ‘চল আমার সাথে। নাহলে নাটকটা জমবে না।’ আমাদের দুজনকে রিসেপশনিস্ট-এর সামনে দেখে গিন্নি দপ করে জ্বলতে গিয়েও নিভে গেল। শুধু গলা নামিয়ে বলল, ‘বাড়ি চলো।’ শুধু বলেনি ‘বাড়ি চলো, তোমার হচ্ছে।’ ছেলে বললে, ‘বাবা এটা কি ছেলেমানুষী হচ্ছে?’ আমি চুপ। গিন্নি মুখ খুললে, ‘এরকমভাবে আমার মুখে চুনকালি না মাখালে চলছিল না বোধকরি?’ আমি চুপ। গিন্নি বললে, ‘ঠিক আছে, যদি দুয়েকটা কথা বললেই তোমার মনে দাগা লাগে তাহলে কি তাও বলব না! আমার ঘাট হয়েছে। কেউ তোমায় গলা তুলে কথা বলবে না। তুমি যা চাও তাই খেতে পরতে পাবে। শুধু আর লোক হাসিয়ো না। ঘরে চলো।’ বেশ গাম্ভীর্য রেখে বললাম, ‘আজ যাব না। কাল ফিরব।’ গিন্নি উৎকণ্ঠিত গলায় বললে, ‘আজ কেন নয়?’ প্রশান্ত আরেকটু হলেই বলে ফেলছিল, ‘আজ তো ফিস্ট।’ ও মুখ খুলতেই জোরে বললাম, ‘আজ এখানে কী একটা পুজো আছে।’ এবার আবার গিন্নির দুচোখ কুঁচকে গেল। ‘পুজো আর তুমি?’ বললাম মুখ ঘুরিয়ে ‘আমি পরিবেশনের দায়িত্বে।’ ঠোঁট উল্টে গিন্নি বললে, ‘দুদিনেই এত পিরিত?’ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, ‘ঠিক আছে। তোমার সময় করে এসো।’

‘এরপর কী হল?’

‘পরদিন গেলাম। ভাব দেখলাম অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসেছি। তখন গিন্নি একদম নরম, মাখনের মত।’

‘কী? নরম?’

‘‘গলা যেন গোবর। বুঝলেন এটা অনেকটা ভয় পাওয়ার মত। ছোটবেলায় থাকত না? রাস্তার আলো জ্বলে গেছে, বাড়ি ফেরা হয়নি। বা অঙ্কের খাতা দিয়েছে। বুঝতেই পারছেন অনেকটা সেরকম একটা ভয় থাকা দরকার। এখন মশাই দিব্বি চলছে। বেশ নরম করে বলছে, ‘ওগো, বাজারে যাবে না? লিস্টি করে রেখেছি সময় করতে পারলে যেয়ো। না গেলে আমিই গিয়ে নিয়ে আসব।’’

‘বলেন কি? এত মোলায়েম?’

‘মোলায়েম বলে? একদম পায়েস এখন সংসার।’

‘আপনি তো মশাই ডেঞ্জেরাস। কিন্তু শেষটা দারুণ।’

ব্রজ বললে, ‘দেখলাম উপায় নিজেকেই বার করতে হবে। এই বয়সে গিন্নির তো পুজোআর্চা ছেড়ে, সংসার ছেড়ে বেরোনো সম্ভব নয়। আর সত্যি বলতে কী মাঝে মাঝে একটু স্পেস দরকার। তাই অগত্যা আমিই একটু কষ্ট করে নাটকটা করলাম। একটু কয়দিন আলাদা থাকলেই আবার সবুজ তরতাজা হয়ে ওঠে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক।’

নন্দ পুরো ভেবলে গেছেন দেখে ব্রজ আবার বলে, ‘এই বয়সে একটু মাঝে মাঝে বেড়িয়ে পড়ুন। ঝগড়া করতে করতেই। নাহলে একাই, এদিক-ওদিক ঘুরে আসুন।’

নন্দর মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে যায়, ‘আপনি তো অন্য কোথাও সাময়িক ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু আমার তো সে সব চেনা কেউ নেই। কী হবে?’

‘কুছ পরোয়া নেই। তাহলে অন্য কিছু ভেবে বার করুন। আমি বৃদ্ধাশ্রমকে কাজে লাগিয়েছিলাম, আপনি কোনও বাবার আশ্রমকে কাজে লাগাতে পারেন। ভাবনা আপনার। ভয় দেখালেন অথচ গেলেন না এমন যেন না হয়। একটা মাঝে মাঝে সাময়িক দূরত্ব দরকার। ঠাকুর কী বলেছেন? ‘সংসারে থাকবে পাঁকাল মাছের মত।’ এবার আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলি, ‘প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা। যদি মন থেকে ইচ্ছে করে তাহলে অবশ্যই কাছে ডেকে কথা বলবেন। নাহলে মনুষ্যত্বকে অপমান করা হয়। আপনার গিন্নির বাবা, যিনি শয্যাশায়ী, যিনি আপনার ওপর নির্ভরশীল, যিনি জীবনে আপনার ব্যবসায় অনেক এগিয়ে এসে সাহায্য করেছিলেন, তার সাথে কি আজ আপনি কোনও যোগাযোগ রাখবেন না যদি গিন্নির সাথে মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকে? আগে মানুষ ও মনুষ্যত্ব, পরে সম্পর্ক। আর হ্যাঁ, সংসারে একটা পরস্পরের সম্মান থাকা দরকার না হলে মুশকিল। তাহলেই তরতর করে চলবে নৌকা।’

নন্দবাবু ভাবলেন কী একটা বাজে লোকের পাল্লায় পড়লেন? অচেনা, কিন্তু বলছেন খারাপ না। ওর পাড়ায়, ফেসবুকে কিছু বন্ধু আছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করবেন। দেখা যাক ওরা কী বলেন? সংসারে শান্তি থাকা নিয়ে কথা।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 6 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »
যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়?

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »