Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

হিউয়েন সাং, ইবন বতুতা ভারতীয় আমের ভক্ত ছিলেন

‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে/ আম কুড়াতে সুখ…’। কবি জসীম উদ্দীনের লেখা এই কবিতায় আম কুড়োবার সুখকর অনুভূতি আদিকাল থেকে আমাদের মনে বিরাজমান। আম নিয়ে খনাও তাঁর বচনে বলে গেছেন কত কথা! ‘আমে ধান, তেঁতুলে বান।’ ‘বিশ হাত করি ফাঁক/ আম কাঁঠাল পুঁতে রাখ।’

আম ভারতীয় উপমহাদেশীয় একপ্রকারের সুস্বাদু ফল। কাঁচা অবস্থায় এর রং সবুজ এবং পাকা অবস্থায় হলুদ, হলুদাভ লাল ও লাল রঙের হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica। এটা Anacardiaceae পরিবারের সদস্য। ‘আম’ অমৃতফল। আম্র, চুত, রসাল, সহকার, অতিসৌরভ, কামাঙ্গ, মধুদূত, মাকান্দ ও পিকবল্লভ— অনেক নাম তার। এদেশেই ৩৫০ প্রজাতির আম রয়েছে। বাইরের দেশে কিছু কিছু আমের ফলন হয়। মধ্য আমেরিকা, মেক্সিকো, ব্রাজিল, মিশর, শ্রীলঙ্কা, মাদাগাসকার এবং ব্রহ্মদেশেও। কিন্তু এখানকার আমের মত স্বাদ ও প্রাচীন ঐতিহ্য নেই ওদের। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-এ সিন্ধু উপত্যকায় অমৃতফল দেখে অবাক হয়েছিলেন আলেকজান্ডার। হিউয়েন সাং, ইবন বতুতা প্রমুখ পর্যটকেরা প্রচুর সুখ্যাতি করেছেন ভারতীয় আমের। সবচেয়ে বেশি বলেছেন যিনি, তাঁর নাম ইবন বতুতা। আমকে তিনি বলেছেন কমলা আর আপেল— দুই ফলের সর্বগুণসার।

হিউয়েন সাং।

পশ্চিমবঙ্গে যত ফলের বাগান আছে, তার শতকরা ৬১ ভাগই আমের বাগান। আর এই আমবাগানের শতকরা ৩০ ভাগই মালদায়। সেখানে প্রাধান্য ফজলির। ল্যাংড়া, হিমসাগরও আছে। মালদার পরেই মুর্শিদাবাদের দাবি। ২২ হাজার একর জুড়ে আমবাগান। গাছের সংখ্যা লাখপাঁচেক। একটা ব্যাপারে মালদার থেকে মুর্শিদাবাদ এগিয়ে। নবাবদের পুরনো আমবাগান, ‘রইসবাগ’-এ এখনও ১০০ রকমের আমগাছ রয়েছে। আগে নাকি ১৫০ রকমের আমগাছ ছিল। রাজা-বাদশা-নবাবদের উৎসাহে আমের ফলনের চর্চা হত। নষ্ট হয়ে গিয়েছে আকবরের সাজানা দ্বারভাঙার ‘লাখবাগ’। ১,০০,০০০ আমগাছ নাকি ছিল সে বাগানে। বাবরের প্রিয় কৈর্না আমের গাছ এনে এখানে বাগিচা করেন আকবর। দিল্লিতে খুব কদর ছিল কৈর্নার। কৈর্না নাম কেন হয়েছিল আমটির, তা জানা যায়নি। তবে সেকালে বাদশা-বেগমদের যিনি যে আম পছন্দ করতেন সে আম হত তাঁর নামাঙ্কিত। যেমন, রানিপসন্দ, রাজাপসন্দ ইত্যাদি। বড়লাট যে আম খেয়েছেন সে আমটির নাম হল ভাইসরয়।

অনেক সময় আমের নামকরণ হয় বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ দিয়ে। যেমন স্বর্ণরেখা, সিঁদুরটিপ, গোলাপখাস, জাফরানি। এক এক জায়গার বা অঞ্চলের নাম দিয়ে নামকরণ হয়। চেন্নাইয়ের মাদ্রাজি, ব্যাঙ্গালোরের তোতাপুরি, লখনউয়ের দশেরা, চৌসা, বেনারসের ল্যাংড়া, মুম্বাইয়ের আলফানসো।

আম নিয়ে অবশ্য অনেক গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। মালদহের মাধবপুরে আছে রাজ্য সরকারের ‘ম্যাংগো রিসার্চ সেন্টার’। দক্ষিণের নীলম এবং উত্তরের দেরি আম মিলিয়ে নতুন দু’জাতের আমও গবেষকরা তৈরি করেছেন। এই আমের নামও বেশ গালভরা— মল্লিকা ও আম্রপালি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্বের অন্যতম সেরা ফল এই আম। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) আম নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে ফেলেছেন।

Advertisement
ইবন বতুতা।

তবে অতি ভোরে ছুটে এসে আম কুড়ানোর মজাই আলাদা। মালদা-মুর্শিদাবাদে রেওয়াজ, গাছতলার ফল যে কেউ কুড়াতে পারে। শত শত গরিব পরিবার আমের মরসুমে আম কুড়িয়েই বাঁচে। আম, আমচুর, আমসত্ত্ব, আমসি থেকে আমকাসুন্দি পর্যন্ত হরেক জিনিস তৈরি করেন অন্যের বাগানের আম থেকেই। বাগানের মালিক নিষেধ করেন না। একসময় দক্ষিণ ভারতে মালিকের হুকুম ছাড়া গাছতলার আম তুলে নিলে তার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এবং এই দক্ষিণের আমের ব্যাপারে এমন এক করুণ কাহিনি ‘আল রিহালা’-য় লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন ইবন বতুতা, যা চিরকাল আমপ্রেমীদের চোখের জল ঝরাবে।

বতুতা মালাবার থেকে যখন কুইলনে প্রবেশ করেন তখন সেখানে ছিলেন তিবারি পদবিধারী এক রাজা। পুত্রসন্তান না থাকায় তাঁর কিশোর ভ্রাতৃপুত্রকে খুব স্নেহ করতেন। একদিন বিকেলে দুটি ঘোড়ায় দু’জন, সামনে রাজা, পেছনে ভ্রাতুষ্পুত্র যাচ্ছেন ছায়াঘন আমবাগানের পথ দিয়ে। হঠাৎ পেছনের ঘোড়ার খুরের শব্দ না পেয়ে, ভাইপোর জন্য উদ্বিগ্ন রাজা পেছনে তাকিয়ে দেখেন, ঘোড়া থেকে নেমে পরম আনন্দে কিশোরটি আম কুড়াচ্ছে আর সে দৃশ্য দেখছেন পথের লোকজন ও প্রজারা। রাজার সামনেই তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র রাজ্যের আইনভঙ্গ করেছে। এই অপরাধের একমাত্র শান্তি প্রাণদণ্ড। কিশোরের দেহ রাজারই তরবারিতে দ্বিখণ্ডিত হয়। আর তার কুড়নো সেই আমটিকে দু-টুকরো করে পুঁতে দেওয়া হয় তার কবরে। ঘটনাটিকে ‘মর্মান্তিক’ বলেছেন বতুতা।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − 7 =

Recent Posts

প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »