Search
Generic filters
Search
Generic filters

প্রাক-পাল যুগের আয়ুধসহ বিষ্ণুমূর্তি: উদ্ধার প্রসঙ্গে

ইতিহাসে উল্লিখিত বরেন্দ্রভূমির প্রাচীন অংশ আজকের মালদা জেলার গাজোল, পাকুয়া বা হবিবপুরের বিস্তীর্ণ অংশে হিন্দু ও বৌদ্ধযুগের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধারের ঘটনা অতীতে একাধিকবার ঘটেছে। সম্প্রতি গাজোলের শাহজাদপুর পঞ্চায়েতের ভাদো গ্রামের সাতকাদিঘিতে পুকুর খননের সময় উদ্ধার হয়েছে দুটি বিষ্ণুমূর্তি। এই দুই মূর্তিকে কেন্দ্র করে উদ্দীপনা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে গবেষক ও আঞ্চলিক ইতিহাসে উৎসাহী মহলে।

উদ্ধার হওয়া দুটি মূর্তির মধ্যে একটি সম্পূর্ণ কালো পাথরে নির্মিত আড়াই-তিন ফুট দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট পূর্ণাবয়ব মূর্তি এবং অন্যটি অসম্পূর্ণ ও পরিত্যক্ত। পরিভাষাগতভাবে একে প্রাইমারি আইকনোগ্রাফিক স্ট্রাকচার বলা হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অনুমান, পাল যুগের প্রাথমিক অবস্থায় অর্থাৎ অষ্টম-নবম শতকের মধ্যে এই মূর্তিদুটি নির্মিত হয়েছিল। অষ্টম শতকে পাল মূর্তি নির্মাণশৈলীর যে সুষম ভারসাম্য এবং অবয়ব সংস্থান তা বিষ্ণুমূর্তিটির মধ্যে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সেই হিসেবে দেখতে গেলে মূর্তিটির বয়স আনুমানিক ১৪০০ থেকে ১৫০০ বছর। অসম্পূর্ণ মূর্তিটিরও বয়স কাছাকাছি, তবে কোনও কারণে ভাস্কর এই মূর্তি নির্মাণ সম্পন্ন করেননি। অনুমান করা যায়, ওই অঞ্চলে মূর্তি নির্মাণের কোনও কেন্দ্র ছিল, যেখানে হয়তো ধারাবাহিকভাবে প্রস্তর নির্মিত মূর্তি তৈরি হত।

নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পুরাতাত্ত্বিক উৎখনন হলে আরও ঐতিহাসিক নিদর্শন কি উঠে আসবে না? এই জাতীয় মূর্তি নিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষক ড. অনিন্দ্যবন্ধু গুহ বলেন, ‘ছবি দেখে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, এই মূর্তি প্রাক-পাল যুগের। প্রাক-পাল যুগের মূর্তির সঙ্গে গুপ্ত যুগের মূর্তিশৈলীর একটা স্পষ্ট মিল দেখা যায়। বিষ্ণুমূর্তির মাথার মুকুট বা গলার উপবীত থেকে আরম্ভ করে সমস্ত দেহগঠনের মধ্যে সেই স্ট্রাকচারাল সিমেট্রির ছাপ স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। বিষ্ণুমূর্তির নিচের দুটি হাতে চক্র পুরুষ ও গদা দেবী অবস্থান করছেন। এই জাতীয় মূর্তিকে ভগবানের আয়ুধসহ মূর্তি বলা হয়। নিশ্চিতভাবেই আরও কিছু মূর্তি আশপাশের অঞ্চলে থাকতেও পারে। কেননা, এশিয়াটিক সোসাইটির ক্যাটালগ বলছে, প্রাক-পাল যুগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি উদ্ধার হয়েছিল রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চল থেকে।’

উদ্ধার হওয়া বিষ্ণুমূর্তি।

এই মূর্তি উদ্ধার প্রসঙ্গে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মালদা ডিভিশনের কনজার্ভেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট রোহিত কুমার জানান, মূর্তি উদ্ধারের খবর পেয়ে তিনি থানা ও বিডিওর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশ-প্রশাসনের অনুরোধে তাদের বিশেষজ্ঞ টিম একটি মূর্তিকে পাল যুগের এবং অন্যটিকে অসম্পূর্ণ হিসেবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে। প্রশাসন যদি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে মূর্তিদুটিকে তাদের হাতে তুলে দেয় তাহলে তারা ঠিকভাবে সংরক্ষণ করে কোচবিহার ও মুর্শিদাবাদে অবস্থিত এএসআই-এর কোনও একটি মিউজিয়ামে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে পারেন।

মালদা থেকে উদ্ধার হওয়া এই মূর্তি মালদাতেই যেন থেকে যায়, এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুনীতি ঘোষ মিউজিয়ামের দায়িত্বপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক ড. বিশ্বজিৎ দাস। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিয়াম আকারে ছোট হতে পারে, কিন্তু এই জাতীয় মূর্তি সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের সমস্ত ব্যবস্থা আমাদের হাতে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় নতুন ভবন সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে মিউজিয়ামের আকারও বাড়ছে। প্রশাসন যদি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে মূর্তিদুটি আমাদের হাতে তুলে দেয়, আমরা নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যতের গবেষক ও আগ্রহীদের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে পারব। আমরা এ নিয়ে আশাবাদী।’

অসম্পূর্ণ মূর্তি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯২৮ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত পুরাতাত্ত্বিক জে. সি. ফ্রেঞ্চের কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য আর্কিটেকচার অফ পালা এম্পায়ার অফ বেঙ্গল’-এ এই সময়কালের চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূর্তির উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে— ঢাকার সুখবাসপুরে প্রাপ্ত তারা মূর্তি, ভারতীয় জাদুঘরের রক্ষিত কুমিল্লা থেকে প্রাপ্ত বুদ্ধমূর্তি, রাজশাহী জাদুঘরে রক্ষিত সূর্যমূর্তি ও দিনাজপুরের মঙ্গলবাড়িতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্তি। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের পর্যবেক্ষণ, এই শেষোক্ত মূর্তিটির সঙ্গে গাজোলে প্রাপ্ত মূর্তিটির সাদৃশ্য রয়েছে।

২০২৩-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি ভাদো গ্রামের বাসিন্দা সুবোধ চৌধুরীর পুকুর খননের সময় দুটি মূর্তি উদ্ধার হয়। গ্রামবাসীরা উদ্ধার হওয়া মূর্তিদুটিকে কেন্দ্র করে পূজাপাঠ আরম্ভ করেন। অবশেষে গাজোল থানার পুলিশ অফিসার শুভেন্দুবিকাশ পতির নেতৃত্বে পুলিশকর্মীরা গ্রামবাসীদের বুঝিয়ে মূর্তিদুটি গাজোল থানায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। উল্লেখ্য, গাজোল থানার পাঁচিলঘেরা সীমানার মধ্যেই একজায়গায় উদ্ধার হওয়া এই জাতীয় অনেকগুলি মূর্তি রাখা রয়েছে— সেখানে নিয়মিত পূজাপাঠ হয়।

বারবার মালদার প্রাচীন বরেন্দ্রভূমি অঞ্চল থেকে একের পর এক মূর্তি উদ্ধার হয় কিন্তু মালদা মিউজিয়াম বা ইউনিভার্সিটি মিউজিয়ামে তাদের কোনও স্থান হয় না। জেলার ইতিহাসকেন্দ্রিক গবেষণায় এই বিষয়কে নিয়তি হিসাবে মেনে নিয়েও একটা অল্প আলোর মতো দুঃখবোধ গ্রাস করেছে জেলার ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের।

চিত্র: প্রতিবেদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + 12 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »