Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কবি ও বিজ্ঞানী মিরোস্লাভ হোলুব

‘কিছু কি আছে যা কবিতায় থাকা উচিত নয়? কবিতার কি কোনও সীমারেখা হয়?’। কোনও একটি সাক্ষাৎকারে যখন তাঁকে এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল, তিনি এর উত্তরে বলেন— ‘‘কবিতা তো একটা সাধারণ প্রক্রিয়া, যেখানে সব কিছুই থাকতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা প্রতিনিধিত্বমূলক আর ‘কবিতা’ হয়েই থাকছে। কবিতার ক্ষেত্রেই একটাই মাত্র সীমারেখা— তা হল ‘কবিতা’। আর অন্য কোনও সীমারেখা নেই। … আমি মনে করি, সবই ধারণ করতে পারে কবিতা, যদি তা একটি অ্যালজাবরিক ফাংশান হয়, তাও।’’

“আমার কাছে খুব অপছন্দের একটি প্রশ্ন হল, ‘তোমার কবিতা কী বিষয়ের?’ কবিতা তো যে কোনও বিষয়েরই হতে পারে। কবিতা তো তোমার চোখ থেকে মহা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অবধি। বিশাল ও বিস্তৃত। There is poetry in everything, that is the biggest argument against poetry.”

ওপরে উদ্ধৃত সাক্ষাৎকারের উত্তর এবং উদ্ধৃতিটি যাঁর, তিনি একজন সমাদৃত কবি হিসেবেই পরিচিত। চেকোস্লোভাকিয়ায় জন্ম স্বনামধন্য কবি ও গদ্যকার মিরোস্লাভ হোলুব (Miroslav Holub, ১৯২৩–১৯৯৮)।

মিরোস্লাভ হোলুবের নামটি সম্ভবত অনেকেরই জানা। বাংলা ভাষায় হোলুবের কবিতা অনুবাদ করে তাঁর কবিতার সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়েছেন বিশিষ্ট কবি ও গদ্যকার মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। মিরোস্লাভ হোলুবের শ্রেষ্ঠ কবিতা [প্রথম প্রকাশ ১৯৮৫, দে’জ পাবলিশিং] বই হিসেবে প্রকাশের আগে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের হোলুবের লেখাগুলির অনুবাদ ‘পরিচয়’, ‘বিভাব’ প্রমুখ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। এছাড়াও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কবি আনন্দ ঘোষ হাজরাও হোলুবের কবিতা অনুবাদ করেছেন এবং হোলুবকে নিয়ে তাঁর কয়েকটি রচনাও রয়েছে। হোলুবের কবিতা সম্পর্কে অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন— ‘প্রায় শল্যবিদের মতো শ্লেষ-পরিহাসের ছুরি বসানো হোলুব কবিতার বিষয়ের মধ্যে, কিংবা হয়ত অণুবীক্ষণের মধ্যে বীজাণু যেমন তেমনি ভাবেই শব্দগুলোকে তন্ন তন্ন করে হাতড়ে হাতড়ে দেখেছেন এই কবি’।

টেড হিউজেস (Ted Hughes), যিনি একজন স্বনামধন্য, বন্দিত ইংরেজ কবি, অনুবাদক ও সমালোচক, যাকে তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এই টেড হিউজেস সম্পর্কে ‘দ্য টাইমস’ জার্নাল লিখেছেন, ‘১৯৪৫ পরবর্তী পঞ্চাশজন কবিদের তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকবে তাঁর নাম’। তিনি মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতা সম্পর্কে কী বলেছেন শোনা যাক, ‘‘পৃথিবীর যে কোনও স্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘হাফ ডজন’ কবিদের নাম বলতে হলে হোলুবের নাম তার মধ্যে থাকবে।’’

উল্লেখ্য যে, হোলুবের নাম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্যেও নমিনেটেড হয়েছিল। তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি, সে অন্য কথা।

কোনও কবিকে পড়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট কবির পরিচয় জানার দরকার নেই, কবিতা-ই চিনিয়ে দেবে কবিকে। এমন কথার সত্যতা থাকলেও আমার মনে হয়, সব ক্ষেত্রে এ কথা সম্পূর্ণ সত্য হতে পারে না। অন্তত মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতার ক্ষেত্রে নয়। কেন না, তাঁর কবিতা পড়ার পাশাপাশি যদি কবির পরিচয়টুকু জানা থাকে, তাহলে বলা বাহুল্য যে, কবিতার প্রতিটি শব্দ ও পঙ্‌ক্তির আরও অন্যতর স্তরগুলির কিছু কিছু ধরা দেবে পাঠকের অনুভবে।

মিরোস্লাভ হোলুব চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমডি ডিগ্রি এবং ইমিউনোলজি ক্ষেত্রে গবেষণা করে PhD ডিগ্রি পান। বস্তুত তিনি ছিলেন ‘ইমিউনোলজি’ ক্ষেত্রে একজন বিশিষ্ট গবেষক বিজ্ঞানী। তা বোঝা যায় সহজেই, কারণ ১৫০টিরও বেশি গবেষণাপত্রের রচয়িতা তিনি। বিভিন্ন হাসপাতাল এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মাইক্রোবায়োলজি ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তিনি বলতেন, ‘কবিতা’ তাঁর কাছে ছিল বিজ্ঞানের জগৎ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ার একটি অন্য ঠিকানা। তিনি বলতেন, তাঁর কাছে ‘বিজ্ঞান’ প্রথম, দ্বিতীয় হল কবিতা।

কুড়িটি কাব্যগ্রন্থ তাঁর। এছাড়াও সাহিত্য ও কবিতার ওপর লেখা বেশ কিছু নিবন্ধের রচয়িতা। উল্লেখ করা দরকার যে, ‘চেকোস্লোভোকিয়া লেখক ইউনিয়ন’ একবার তাঁকে দু-বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখার জন্যে সুযোগ দিয়েছিল। আর এর জন্যে তাঁকে ‘রিসার্চ সায়েন্টিস্ট’ হিসেবে বেতনের সমান ‘স্টাইপেন্ড’ দিয়েছে।

স্বনামধন্য আইরিশ কবি, নাট্যকার এবং অনুবাদক সাহিত্যে নোবেলজয়ী সিমাস হ্যেনে মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতার প্রশংসা করে লিখেছেন— “Holub as a poet who could lay things bare, not so much the skull beneath the skin, more the brain beneath the skull; the shape of relationships, politics, history; the rhythms of affections and disaffection; the ebb and flow of faith, hope, violence, art.”

তাঁর ভেতরের বিজ্ঞানী সত্তা, তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কবিতার ভাঁজে ভাঁজে ফুটে উঠতে দেখা যেত। ফুটে উঠত— মানবিকতা, যা কখনও শ্লেষাত্মক, কখনও সরাসরি ও সংবেদনশীল।

কবিতা ও বিজ্ঞানের সহযোগের কথায় অনিবার্যভাবে যাঁর নাম আসবে তিনি মিরোস্লাভ হোলুব। হোলুব বলেছেন— ‘বিজ্ঞানে আসলে আমরা কিছু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন করতে শিখি, আর শিল্প ও মানবীয়বিদ্যায় আমি কখনওই নিশ্চিত নই, কী সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি। তাই এভাবে বলা যায়— শিল্পকলা ও মানবীয়বিদ্যায় প্রশ্নের তুলনায় অনেক উত্তর আগে থেকেই রয়েছে।’ সম্ভবত হোলুব-ই একজন সার্থক কবি, যিনি কবিতার দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটাতে সক্ষম হন।

গবেষণার কাজে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানো এই বিজ্ঞানীই চল্লিশ বছর ধরে কবিতা লিখেছেন। তাঁর অধিকাংশ কবিতার বই অনুবাদ হয়েছে ইংরেজিতে। ইংরেজি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে হোলুবের কবিতা। এমনকি গুজরাতি ও বাংলা ভাষাতেও অনুবাদ হয়েছে হোলুবের কবিতা। তিরিশটির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে হোলুবের কবিতা। যার মধ্যে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত কবিতাগুলি বেশি জনপ্রিয়। তাঁর কবিতা বুদ্ধিদীপ্ত, বিশ্লেষণমূলক, মেধা, মনন, শ্লেষ ও প্রহসনের বুননে অসাধারণ রচনা।

তাঁর নামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি আউটার মেইন বেল্ট অ্যাসট্র্যয়েডের নাম রাখা হয়— minor planet 7496 Miroslavholub

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, এই বিজ্ঞানী-কবির জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, সব শেষে রাখলাম ১৯৬২ সালে লেখা তাঁর একটি কবিতা ‘দ্য ডোর’।

The Door

Go and open the door.
           Maybe outside there’s
           a tree, or a wood,
           a garden,
           or a magic city.

Go and open the door.
.             Maybe a dog’s rummaging.
.             Maybe you’ll see a face,
or an eye,
or the picture
          of a picture.

Go and open the door.
.             If there’s a fog
           it will clear.

Go and open the door.
.             Even if there’s only
           the darkness ticking,
           even if there’s only
           the hollow wind,
.             even if
                       nothing
.                                       is there,
go and open the door.

At least
there’ll be
a draught.

চিত্র: গুগল
5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সনজীদা খাতুন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাতচল্লিশ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে ওঠে, যাদের মধ‍্যে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’, ‘ক্রান্তি’, ‘উদীচী’ অন‍্যতম। রাজনৈতিক শোষণ ও পূর্ববঙ্গকে নিপীড়নের প্রতিবাদে কখনও পরোক্ষভাবে কখনও সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল এইসব সংগঠন। ‘ছায়ানট’ এমনি আর এক আগ্নেয় প্রতিষ্ঠান, ১৯৬৭-তে জন্মে আজ পর্যন্ত যার ভূমিকা দেশের সুমহান ঐতিহ‍্যকে বাংলাদেশের গভীর থেকে গভীরতরতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে সুস্থ ও সংস্কৃতিবান নাগরিক গড়ে তোলা। ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের মানসসন্তান এই ছায়ানট। মূলত রবীন্দ্রনাথের আদর্শে গড়ে ওঠা সঙ্ঘ, কাজী নজরুলের প্রিয় নামটিকে জয়ধ্বজা করে এগিয়ে চলেছে বহু চড়াই-উৎরাই, উপলব‍্যথিত গতি নিয়ে।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর গুচ্ছকবিতা

বিলাপ অভিসার জল আনতে চল রে সখী, জল আনতে চল নিভু নিভু আলোর সাজে সূর্য অস্তাচলে শেষবিকেলের রশ্মিমালায় বুকে ব্যথার ঢল লজ্জা আমার আবির হয়ে

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

যত মত তত পথ

বহুদিক দিয়েই একজন স্বতন্ত্র মননের ধর্মীয় সাধক। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ধারণাতীত, আর তা কেবল তাঁর স্বদেশ বা এই উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। এবং দিনের পর দিন তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদামণি ও স্বামী বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে যে ভাব-আন্দোলন, তার ফলশ্রুতিতে তাঁদের নিয়ে নিয়ত চর্চা ও গবেষণা হয়ে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী দুশোর ওপর রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলি প্রমাণ করে (প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে), আজকের এই অশান্ত বিশ্বে তাঁরা মানুষের কতখানি আশ্রয়।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব ছয়]

রবীন্দ্রভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরও একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব পাঁচ]

বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসত সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ীকুলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে?

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব চার]

তৎকালীন দেশের বাস্তব সত্যের সঙ্গে মিলছে না বর্ণবাদ, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মিলছে না পিকেটিং ও বিদেশি দ্রব্য পোড়ানোর আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গরিব মানুষের খাওয়া নেই, নেই বেশি দাম দিয়ে দেশি ছাপ মারা কাপড় কেনার ক্ষমতা। দেখছেন পিকেটিংয়ের নামে গরিব মুসলমানের কাপড়ের গাঁঠরি পুড়ে যাচ্ছে যা দিয়ে সে তার পরিবার প্রতিপালন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করছেন তাঁর লেখায়। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এমনই দু’টি উপন্যাস। গোরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯১০ সালে। ঘরে বাইরের প্রকাশকাল ১৯১৬।

Read More »