Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মণি কাউল: যাঁর প্রতিটি ছবি বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক

ইন্দ্রপতনের সময়েই আমরা জন্মগ্রহণ করেছি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই চারপাশে বড় বড় গাছের উপড়ে যাওয়ার শব্দ শুধু শুনতে পাই। তেমনই আর একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০১১-র ৬ জুলাই। সংবাদটা পরদিন খবরের কাগজে ছোট্ট করে বেরিয়েছিল, অধিকাংশ খবরের চ্যানেল তখন এটাকে ‘বিগ নিউজ’ বলে মনে করেনি! তাতে কী, আমরা শুনতে পেয়েছি মড়মড় শব্দে উল্টে পড়ল পেশিবান বিশাল সেগুন। সিনেমা ব্যবসার এই যুগে, যখন দৃ্শ্য-শ্রাব্য এই মাধ্যম ঢুকে পড়েছে পরিত্রাণহীন গোলকধাঁধায়, তখন মণি কাউলের মত পরিচালকদের প্রয়োজন আসলে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

‘উসকি রোটি’ (১৯৬৯)।

১৯৪৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর মণি কাউল জন্মগ্রহণ করেন এক কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে। তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন পরিচালক মহেশ কাউল। দুটি উত্তরাধিকার থেকে তাঁর রক্ত বহন করে এনেছিল সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র। যাকে ঘষে-মেজে দিয়েছিলেন শ্রীঋত্বিককুমার ঘটক। মণি কাউল ‘পুনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (FTTI)-এর সেই ব্যাচের, যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে পেয়েছিলেন শিক্ষক ঋত্বিককে। তাঁর কয়েকজন সতীর্থ হলেন— কুমার সাহানি, কমল স্বরূপ (‘ওম-দার-বি-দার’ নামক আশ্চর্য চলচ্চিত্রের স্রষ্টা), জন আব্রাহাম প্রমুখ। এঁদের কাজের দিকে একবার তাকালেই বোঝা যাবে, ‘ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভ’ বলে যে চলচ্চিত্র ধারাটিকে পণ্ডিতরা চিহ্নিত করেছেন, কেন তার কাণ্ডারি হিসাবে ইতিহাসের পাতায় এঁদের সাক্ষ্য থাকবে।

‘আষাঢ় কা এক দিন’ (১৯৭১)।

মণি কাউলের প্রথম ছবি ‘উসকি রোটি’ বেরয় ১৯৬৯ সালে (যে বছর মৃণাল সেন পরিচালিত ‘ভুবন সোম’ মুক্তি পায়)। এ ছবিতে মণি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করলেন ভারতীয় সিনেমার প্রচলিত যাবতীয় রীতিকে। তা সে গল্প বলার ক্ষেত্রে হোক, অথবা ছবির ক্ষেত্রে। এ অস্বীকার এতই তীব্র এবং মিডিয়ার পক্ষে এতই ভয়াবহ ছিল এই ‘নতুন রীতি’ যে তাঁকে পেতে হল অজস্র বিরূপ সমালোচনা। কিন্তু হায়! বৃথাই সে সব। ঋত্বিককুমার ঘটকের পানপাত্রে একবার চুমুক দিয়ে ফেলার পর কোনও মানুষকে তার নিজস্ব অবস্থানবিন্দু থেকে নড়ানো যে সম্ভব নয়, তা তখন তারা বোঝেনি। তাই এরপর একে একে ভারতীয় মিডিয়া ‘গোলিয়াথ’-এর দিকে ধেয়ে এল মণি কাউল নামক ‘ডেভিড’-এর বেশ কিছু অব্যর্থ পাথর— ‘আষাঢ় কা এক দিন’ (১৯৭১), ‘দুবিধা’ (১৯৭৩), ‘সতহ সে উঠতা আদমি’ (১৯৮০), ‘নজর’ (১৯৯১), ‘নৌকর কি কামিজ’ (১৯৯৯) ইত্যাদি। কাহিনিচিত্র ছাড়াও ‘চিত্রকথি’ (১৯৭৭), ‘পাপেটিয়ার্স অব রাজস্থান’ (১৯৭৪) বা ‘সিদ্ধেশ্বরী’ (১৯৮৯) প্রভৃতি তথ্যচিত্রে মণি দেখালেন কীভাবে বিষয় ও চিত্রগ্রহণের ঊর্ধ্বে উঠে আদতে তৈরি হয় একটি ‘সিনেম্যাটিক অবজেক্ট’।

‘দুবিধা’ (১৯৭৩)।

দুর্ভাগ্য আমাদের, মণি কাউল কোনওদিনই তথাকথিত ‘বাণিজ্যিক’ বা ‘সমান্তরাল’ কোনও ধারাতেই চিহ্নিত হলেন না। আর তাই চলচ্চিত্র উৎসবগুলো ভুলে যেতে লাগল তাঁর নাম। বিভিন্ন ফিল্ম ক্লাবে আমরা মেতে রইলাম ‘গোদার অ্যাট সেভেন্টিস’ নিয়ে। চর্চা করা হল না ‘মণি কাউল অ্যাট সেভেন্টিস’ নিয়ে। রেট্রোস্পেক্টিভ তাঁর ছবি দেখাল না। ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ দিতে ভুলে গেল সব্বাই। বলছি না, এসবগুলো হলে তাঁর সাঙ্ঘাতিক উপকার হত। আসলে উপকারটা হত আমাদের। বহু বছর ধরে যাকে আমরা সিনেমা বলে জেনেছি ও বিশ্বাস করেছি, সেই মাধ্যমটা যে শুধু বিনোদন বা বিদেশি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পাওয়ার জন্য সৃষ্টি নয়— তার যে বিশুদ্ধ শিল্প এবং তার মাধ্যমে মানুষকে ছুঁয়ে ফেলার দায় আছে, আমরা তা জানতে পারতাম। দেখতে পেতাম একজন পরিচালককে যিনি ‘সিনেম্যাটিক স্পেস’-কে নিজের ইচ্ছেমত সঙ্কুচিত-প্রসারিত হতে দেবেন বলে ছবি তোলার সময় একবারও চোখ রাখছেন না ‘ভিউ ফাইন্ডার’-এ। একজন এমন শিল্পীকে দেখতাম যিনি অস্বীকার করেন ‘বাজার’-এর সমস্ত শর্ত, যাঁকে কোনও নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা যায় না এবং যিনি শেষমেশ ‘গ্লোবাল’ নন, ‘ইন্টারন্যাশনাল’।

‘নজর’ (১৯৯১)।

মণি কাউল পেশাগত জীবনে ছিলেন চলচ্চিত্র শিক্ষক। তাঁর কোনও ক্লাস বর্তমান লেখকের করার সৌভাগ্য হয়নি। শুধু তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে একটা মজাদার উক্তি আমার সংগ্রহে আছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনার ছাত্রদের আপনি কীভাবে পড়ান?’ উত্তরটা একসঙ্গে মজার এবং গুরুত্বপূর্ণ— ‘খুব সোজা। আমি ওদের ঋত্বিক ঘটকের আটখানা সিনেমার ডিভিডি কিনে নিতে বলি।’ এই কথার মানে সম্ভবত এটা নয় যে মণি কাউল বিশ্বাস করেন যে, ঋত্বিককুমার ঘটকের পর ভারতীয় সিনেমা এগোয়নি। বরং আমার ধারণা, তিনি একথার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন ‘ফর্ম’ ও ‘কনটেন্ট’ যেকোনও শিল্পমাধ্যমের এই দুই চিরাচরিত ডানাকে ঠিক কীভাবে আন্দোলিত করলে সম্ভব এক স্বপ্নের উড়াল, তার বীজ রোপিত হয়ে আছে ওই আটটি সিনেমায়। তাঁর চলচ্চিত্র দর্শনেও আমরা এটাই পাই। তাঁর প্রতিটি ছবি আশ্চর্যরকম ভারতীয়। তাঁর প্রতিটি ছবি বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক। এই আন্তর্জাতিকতা একদেশিকতা নয়।

‘নৌকর কি কামিজ’ (১৯৯৯)।

সমস্ত সংস্কৃতি-সভ্যতার মাথাকে পায়ের নিচে পিষে ফেলে পৃথিবী জুড়ে বাজারের প্রয়োজনীয় ও উপকারী একটি পঙ্গু সংস্কৃতিকে কায়েম করার জন্য যে তাণ্ডব নৃত্য নাচছে তথাকথিত ‘গ্লোবালাইজেশন’; মণি কাউল তার বিপ্রতীপে দাঁড়ানো গুটিকয় নাবিকদের একজন। প্রবল ঝড়ের রাতেও যাঁরা নৌকা বাইছেন। তাঁর সঙ্গে হাল ধরে আছেন কুমার সাহানি, ইলমাজ গুনে, বেলা তার-এর মত মুষ্টিমেয় কয়েকজন। আমরা যারা জলেটলে নামতে পারিনি, সাহস বলতে শূন্য, লোভ ষোলোআনা এবং শিল্পের প্রতি বিশ্বস্ততা শর্তাধীন, তারা আর কিছু না পারি, একবার অন্তত হাততালি দিয়ে সমবেত কণ্ঠে বলে উঠতে পারি না— ‘হো হো হো! জোরসে চল…’?

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + fourteen =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »