Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

জিয়োর্দানো দ্য ব্রুনো: মৃত্যুঞ্জয়ী

রোমের সবচেয়ে পুরোনো জনবহুল একটি বাজার— কাম্পো দ্য ফিয়োরি। ওখানে আছে ব্রোঞ্জের একটি বিশাল উঁচু স্ট্যাচু। স্ট্যাচুটির পরনে পাদ্রীদের মতন আলখাল্লা। মূর্তির মাথাটিও আবরণে ঢাকা। কিছুটা ছায়া ছায়া। মুখমণ্ডলটি তাই স্পষ্ট নয় সেভাবে। তবু দণ্ডায়মান মূর্তির সারা শরীরে ফুটে আছে আত্মপ্রত্যয় আর বীরত্ব। মূর্তির ডান হাতে ধরা রয়েছে একটি বই। অনুমান করে নেওয়া যায়, হাতে ধরা বইটি তাঁর নিজের লেখা। একশ তিরিশ বছর আগে ১৮৮৯ সালে রোমের সিটি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করে এই স্ট্যাচুটি। ইতালির ‘জোয়ান অফ আর্ক’ হিসেবে অভিহিত করা হয় মূর্তির এই মহান মানুষটিকে। স্ট্যাচুটির নিচের ফলকে লেখা আছে:

A BRVNO
IL SECOLO DA LVI DIVINATO
QUI
DOVE IL ROGO ARSE
(English: To Bruno – From the Age he Predicted – Here Where the Fire Burned)

আর কেউ নন, তিনি— জিয়োর্দানো দ্য ব্রুনো (Giordano Bruno, ১৫৪৮-১৬০০)। ইতালীয় দার্শনিক, আবিষ্কারক, নাট্যকার ও ধর্মতাত্ত্বিক। জন্ম দক্ষিণ ইতালির ভেনিসের অদূরে নোলা শহরে।

সূর্যই যে সৌরজগতের কেন্দ্র— কোপার্নিকাসের এই তত্ত্বকে সমর্থন করেছিলেন ব্রুনো। বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রচলিত ধর্মমত ও সংস্কারের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। ধর্মীয় নেতারা মেনে নিতে পারেননি তাঁর এই বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ। ঈশ্বরের বিধানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এই অভিযোগে পাদ্রীদের রোষের আগুনে কী নির্মম পরিণতি হয়েছিল ব্রুনোর, তা আজ আমাদের স্মরণ করার দিন।

কোপার্নিকাসের মৃত্যুর প্রায় পাঁচ-ছ’বছর পরে ব্রুনোর জন্ম হয়। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। মহাকাশ ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণের জায়গা। না, তখনও দূরবিন আবিষ্কার হয়নি। খালিচোখে আকাশের তারাদের পর্যবেক্ষণ করেছেন রাতের পর রাত। তিনি বুঝলেন যে, কোপার্নিকাসের মতবাদই সঠিক। তিনি নিশ্চিত হলেন যে, সূর্য স্থির এবং পৃথিবী সহ অন্য গ্রহগুলি সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে। তিনি আরও নিশ্চিত হন, মহাবিশ্ব অসীম। পৃথিবীর মত আরও অনেক সৌরজগৎ আছে মহাবিশ্বে। আরও বললেন, মহাবিশ্বের পরিবর্তন হয়।

জিয়োর্দানো দ্য ব্রুনোর মর্মরমূর্তিতে বসানো ফলক।

কিন্তু ব্রুনোর এই সমস্ত কথাই যে বাইবেল-বিরোধী ধারণা। তাই তাঁর আবিষ্কারের কথা ও ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদের তীব্র ক্রোধের আগুনের আঁচ এসে লাগল ব্রুনোর গায়ে। রে রে করে উঠলেন ওরা। ব্রুনো যা বলছেন, তা শোনাও যে পাপ। এ তো ভগবানের কথার অমর্যদা করা। অবিলম্বে ব্রুনোকে শাস্তি দেওয়া স্থির হল। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া ব্রুনোর আর কিছু করার ছিল না তখন। ব্রুনো দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। তবু কোথাও সেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারলেন না। জেনিভা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড। এসময় জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শনের ভাবনা এবং কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বেশ কিছু পুস্তিকা প্রকাশ করলেন ব্রুনো।

Advertisement

ব্রুনোকে ধরতে না পেরে, দেশে দেশে চর পাঠালেন চার্চের নেতারা। তাঁকে ধরার জন্যে নানান ছলচাতুরির আশ্রয় নিলেন পাদ্রীরা। অবশেষে ব্রুনো ধরা পড়লেন। দেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে বন্দি করা হল ব্রুনোকে। তারপর চলল চরম নির্যাতন। অন্ধকার কুঠুরিতে দিনের পর দিন চলল মর্মান্তিক অত্যাচার। ছাড়া পাওয়ার একটাই শর্ত দেওয়া হল। ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া। তাহলেই জীবন ফিরে পাবেন ব্রুনো।

না। মাথা নত করলেন না ব্রুনো। নিদারুণ অত্যাচার সহ্য করে সাত বছর কারাগারে কাটল। তারপর বসল ধর্মীয় বিচারসভা। বলাবাহুল্য, যা ছিল নেহাতই প্রহসন। বিচারসভার নির্দেশ অনুযায়ী চরম শাস্তি ধার্য হল ব্রুনোর। চার্চ ইনকুইজিশন তাঁর বিচার করে এবং জীবন্ত দগ্ধ করে হত্যা করার বিধান দিল। জীবন্ত অবস্থায় বেঁধে পুড়িয়ে হত্যা করা হল ব্রুনোকে।

আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেই দিনটিও ছিল ১৬০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। রোমের বধ্যভূমিতে একটি মঞ্চের ওপর বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হল ব্রুনোকে। যাতে তিনি কোনওরকম আর্তচিৎকার না করতে পারেন বা ভগবানের বিরুদ্ধে কিছু বলতে না পারেন, তাই ব্রুনোর জিভ তার দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সত্যনিষ্ঠার এক জ্বলন্ত উদাহরণ জিয়োর্দানো ব্রুনোর মৃত্যু হল এইভাবে। বস্তুত তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন স্বেচ্ছায়। বিজ্ঞানের জন্যে সত্যসন্ধানীর এই মৃত্যুবরণ। শহিদের মৃত্যু হয় না। মৃত্যুঞ্জয়।

ব্রুনোর শহিদ হওয়ার পরে চারশ বছর পেরিয়ে গেছে। তবু আজও তিনি বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মানুষের মনে অমর হয়ে আছেন। তাঁকে আমাদের প্রণাম জানাই।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × one =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »