Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

প্রবন্ধ: সত্য ভাদুড়ি

বাংলা নাটকে প্রান্তজনেদের উপস্থিতি

[সাহিত্য অকাদেমি ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক লোকমানস’ শীর্ষক আলোচনাচক্রে পঠিত ভাষণ। অবশ্য ভাষণটি এখানে পত্রস্থ করার সময় বেশ কিছুটা পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা হল। এটি পাঠ করেছিলেন ২৪ জুন ২০২৫ একে বসাক প্রেক্ষাগৃহে (প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)।]

আলোচ্য বিষয়ের দাবিতে আমি প্রথমে চলে যাচ্ছি ১৮৬০-এ। এ-সালেই মাইকেল মধুসূদন লেখেন তাঁর কালজয়ী প্রহসন, ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। এখানে ফতেমা ও তাঁর স্বামী হানিফ নামে দুই প্রান্তিক মুসলমান চরিত্র পাই, যাঁরা তাঁদের বুদ্ধিমত্তার জোরে জমিদার ভক্তপ্রসাদের ভণ্ডামীর মুখোশটা খুলে দেন। মধুসূদনকে নাটক লেখার সাহস জুগিয়েছিলেন বেলগাছিয়ার রাজারা। কিন্তু এই প্রহসনের শেষে জমিদার ভক্তপ্রসাদের যে ভণ্ড রূপ নাটককার দেখালেন, সেই দৃশ্য পাঠ করে, কায়েমি স্বার্থের কারণে উক্ত প্রহসনটি বেলগাছিয়ার রাজারা অভিনয় করেননি।

এর কয়েক বছর পর ‘আরপুলি নাট্যসমাজ’ ১৮৬৬-তে এটির অভিনয় করে। তারপর একে একে ‘শোভাবাজার রাজবাড়ি’, ‘জোড়াসাঁকো রাজবাড়ি’ এবং প্রহসনটি লেখার ১৩ বছর পর ‘কলিকাতা ন্যাশনাল থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি’ এটির প্রযোজনা করে। তখন টিকিট কেটে সাধারণ মানুষ প্রথম ‘বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ দেখার সুযোগ পান।

উত্তরকালে এই প্রহসনটির সাড়া জাগানো প্রযোজনা করে এলটিজি। উৎপল দত্তের নির্দেশনায়। উৎপল নিজে এখানে ভক্তপ্রসাদের অভিনয় করে খুবই প্রশংসিত হন। এর প্রথম শো হয়, মিনার্ভা থিয়েটারে, ৭ অগাস্ট ১৯৫৬-তে। পরে এলটিজি সাইনবোর্ড পাল্টে যখন পিএলটি হয়, তখন, ১৯৭৫ সালে পুনরায় এটি অভিনয় করে। উৎপল দত্তের নির্দেশনায়। এখানেও ভক্তপ্রসাদের ভূমিকায় থাকেন উৎপল দত্ত।

উপরোক্ত ১৮৬০-এই দীনবন্ধু মিত্র লেখেন, সমাজ-বাস্তবতার নিরিখে প্রথম সাড়া জাগানো পূর্ণাঙ্গ নাটক, ‘নীলদর্পণ’। এ-নাটকে আমরা চারজন প্রান্তিকজনের চরিত্র পাই। এরমধ্যে তোরাপ মিয়াঁ খুবই বলিষ্ঠ ও সাহসী চরিত্র। নাটকটি প্রথম অভিনীত হয় ১৮৬১-তে, ঢাকায়। ওই বছরেই বাংলার বাইরেও এর অভিনয় হয়। ৫ ডিসেম্বর ১৮৬১-তে ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ লেখে, ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ থেকে এও জানা যায় যে, ‘বোম্বাই সমাচার দর্পণ’-এর সম্পাদক স্ট্রান্ড রোড থিয়েটারে ‘নীলদর্পণ’ অভিনয় করতে চলেছে। এর ১১ বছর পর ‘কলিকাতা ন্যাশনাল থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি’ মধুসূদন সান্যাল মহাশয়ের বাটিতে ৭ ডিসেম্বর ১৮৭২-এ এই নাটকটির প্রথম অভিনয় করে। এই থিয়েটারটির মধ্যে দিয়ে শুরু হয় বাংলার সাধারণ রঙ্গালয়ের পথচলা। টিকিট কেটে থিয়েটার দেখার সুযোগ এখানে জনসাধারণ প্রথম পান। ঢাকায় কিন্তু এর ৮ মাস আগে (৩০ মার্চ ১৮৭২) টিকিট কেটে ‘রাজ্যাভিষেক’ অভিনয় হয়েছিল।

ন্যাশনালের ‘নীলদর্পণ’ দেখে নবগোপাল মিত্র সম্পাদিত ‘ন্যাশনাল পেপার’ ১১ ডিসেম্বর এই থিয়েটারটির উচ্চ প্রশংসা করে লেখে: This event is of national importance। উত্তরকালে এই ‘নীলদর্পণ’ সম্পর্কে উৎপল দত্ত লেখেন: ‘‘গিরিশ-অমৃতলাল-ধর্মদাস সুর প্রতিষ্ঠিত সাধারণ রঙ্গমঞ্চের উদ্বোধন হয়েছিল একটি সংগ্রামী নাটক নিয়ে রাজনৈতিক নাটক নিয়ে। ‘নীলদর্পণ’ অত্যাচার শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নাটক, প্রতিরোধের ও প্রত্যাখ্যানের নাটক।’’ এখানে সবিনয়ে বলি, সাধারণ রঙ্গমঞ্চের উদ্বোধনের দিন, উৎপল কথিত গিরিশ কিন্তু ছিলেন না।

পরবর্তীকালে ‘নাট্যচক্র’ দিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বিজন ভট্টাচার্যের নির্দেশনায় ২৭ অগাস্ট ১৯৫০-এ রেলওয়ে ম্যানসন ইনস্টিটিউটে এ-নাটকটির একটি উল্লেখযোগ্য শো করে। নির্দেশনায় বিজন ভট্টাচার্য। আলো তাপস সেন। মজার কথা হল, পরবর্তীকালে বিশ্ববরেণ্য সিনেমা পরিচালক মৃণাল সেন ছিলেন এটির প্রম্পটার।

এই প্রযোজনায় প্রান্তিক ভূমিহনি তোরাপ মিয়াঁর বলিষ্ঠ চরিত্রে স্বয়ং নির্দেশক বিজন ভট্টাচার্য অভিনয় করেন। এ-প্রযোজনার এক সাক্ষী-দর্শক বিজন ভট্টাচার্যর তোরাপ মিয়াঁর একটি দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছেন এই ভাষায়: ‘‘ক্ষেত্রমণি পা জড়িয়ে ধরেছে রোগ সাহেবের– ‘আমারে ছাড়ি দাও সাহেব। তুমি আমার বাপ হও। আমার প্যাটে ছেল্ল্যা আছে সাহেব। আমার সব্বোনাশ কইরো না।’

তার এই করুণ আকুতির প্রতি কান নেই নারীমাংসলোলুপ সাহেবের। সে তাকে বিবস্ত্র করতে উদ্যত (হয়)। হঠাৎ কুটিরের খোলা জানালা টপকে সুঠামদেহী এক যুবক গভীর রঙের চেক লুঙ্গি– হাঁটু পর্যন্ত তুলে শক্ত করে পরা। কোমরে গামছা বাঁধা। হাতে বহুব্যবহারে ঝকঝকে বেশ বড় একখানা কাস্তে। মাথায় কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে পড়া ঝাঁকড়া চুল, ঘামে ভরা চকচকে শরীরটা নিয়ে লাফিয়ে পড়ল রোগ সাহেবের উপর– তোরাপ মিয়াঁ, ওরফে ‘নবান্ন’-এর নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য। এক অসাধারণ পরিস্থিতি। প্রেক্ষাগৃহ আলোড়িত। রোগ সাহেবের প্রতি দর্শকের তীব্র ঘৃণা ক্রোধে রূপান্তরিত হল। সমস্ত দর্শক হৈহৈ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। যেন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি ছড়িয়ে পড়েছে।’’ এর প্রথম অভিনয় ২৭ অগাস্ট ১৯৫০-এ। রেলওয়ে ম্যানসন ইনস্টিটিউট-এ।

বাংলার সাধারণ রঙ্গালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘রবীন্দ্র সদন কর্মী সংসদ’ বিজন ভট্টাচার্যকে আমন্ত্রণ জানায় দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নির্দেশনা দেবার জন্য। বিজন ভট্টাচার্য তখন নিজে এটির অসাধারণ সম্পাদনা করে নির্দেশনা দেন। তাঁর ওই সম্পাদনা প্রসঙ্গে এক সমালোচক বলেছেন, ‘‘নীলদর্পণ’ নাটকটা অত্যন্ত বিশ্রী কিন্তু ওটার মধ্যে নাটক আছে। ওটাকে কেটে ছোটো করে, সম্পাদনা করে রবীন্দ্রসদনে বোধহয় করেছিলেন (বিজন ভট্টাচার্য)। তাতে সবাই বলে উৎপলবাবু ‘রিভলভিং ডিস্ক’ শিখিয়েছেন– বিজনদা ওখানে ডিস্কের উপরে একটা লাঠিয়াল নামিয়েছিলেন। এই দৃশ্যটা এখনো আমাকে চমৎকৃত করে। চোখ বন্ধ করলে চোখের সামনে ভাসে। ডিস্কটা ঘুরল, তার উপর লোক। পরিচালক হিসেবে বিজনবাবু সবসময় এঁদের থেকে এগিয়ে (শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়), প্রতিভায় উনিই শ্রেষ্ঠ।’’ ‘নীলদর্পণ’ ছাড়াও আমরা ১৩টি ওই দর্পণ নাটক পাই। এর মধ্যে মশারফ হোসেন-এর ‘জমীদার দর্পণ’ (১৮৭৩), দক্ষিণাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘চা-কর দর্পণ’ উল্লেখ্য। এ-সব নাটকেও প্রান্তজনের কথা আছে। কিন্তু নাটক হিসেবে এগুলি খুবই দুর্বল।

এই পর্যন্ত এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নাটকে প্রান্তজনরা চরিত্র হিসেবে উল্লিখিত নাটকগুলিতে উঠে এলেও— এঁরা সকলেই মূলত পার্শ্বচরিত্র। কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। প্রান্তজনেরা নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠে আসবেন এর বহুকাল পরে। এর কারণ আছে।

কলকাতায় সাধারণ রঙ্গালয় গড়ে ওঠার ৭ মাস আগে, ১৮ মার্চ ১৮৭২-এ একটি দৈনিক লেখে: ‘‘সমাজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন আমোদ-আহ্লাদের আবির্ভাব হয়। ইংরেজি সভ্যতা এদেশে অন্যান্য আমোদের মধ্যে মদ্যপান এবং নাটকাভিনয় আনয়ন করিয়াছে। বিষ ও বিষহরি বিধাতা একেবারে সৃষ্টি করেন। মদ আসিয়া হিন্দু সমাজে নানা পাপ প্রস্রবণ খুলিয়াছে। সমাজ-সংস্কার নিমিত্তে তেমনি অভিনয়ের সৃষ্টি হইয়াছে।’’

যাত্রাপথের প্রথম দিকে, বাংলার সাধারণ রঙ্গালয় ওই সমাজ-সংস্কারের কাজটা যত্ন নিয়েই শুরু করেছিল– বিশেষ করে নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রতাপচাঁদ জহুরীদের মতো অর্থগৃধ্নু মালিকরা যেদিন থেকে থিয়েটারে ছড়ি ঘোরাতে আরম্ভ করল– তখন থেকে দর্শকদের স্থূল বিনোদন দেওয়াটা সাধারণ রঙ্গালয়ের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল। ব্যতিক্রম যে একদমই ছিল না, তা কিন্তু নয়, তবে তা বিধিকে টলানোর শক্তি রাখেনি। ফলে বাবুদের এই থিয়েটারে প্রান্তিক মানুষজনেরা উপেক্ষিত হয়ে রইলেন– এ-পর্যায়ে ইতিবাচক প্রান্তিক চরিত্র চেঁচিয়ে ঘোষণা করার মতো মিলল না।

এরজন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হল– বহু বহু বছর। সময় বয়ে গেল। এল বিশ শতক। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলা থিয়েটারের খোল-নলচে বদলাতে শুরু করল। ধীরে ধীরে গ্রামের প্রান্তিকজনেদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে উঠে আসতে লাগল। অবশ্য সাধারণ রঙ্গালয়ে এঁদের দেখা বড় একটা মিলল না– মেলার কথাও ছিল না। কারণ, সাধারণ রঙ্গালয় তখন পুরোপুরি বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে– যেখানে মালিকের মুনাফাটাই বড় কথা। এরজন্য প্রয়োজন হল অন্য ধারার থিয়েটারের। সেই অন্য ধারার থিয়েটার, প্রথমে গণনাট্য নাম নিয়ে এঁদের কথা খুবই গুরুত্ব সহকারে বলতে শুরু করল। কেন এমনটা হল? এরও একটি প্রেক্ষিত আছে।

১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ থেকে ৮ মে ১৯৪৫ পর্যন্ত বিরামহীন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলল। অনুমান করা হল, এই মহাযুদ্ধ হরণ করে নিল ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন মানুষের জীবন। একদিকে ওই ভয়াল-করাল যুদ্ধ, অপরদিকে ইতালিতে, জার্মানিতে, ফ্যাসিবাদ, সোভিয়েতে স্টালিন জামানায় সোসালিজম-এর নামে একনায়কতন্ত্র। আবিশ্বে মুক্তমনা মানুষের জীবনকে ত্রস্ত করে তুলল। মানবিকতার এহেন দুঃসময়ে আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলায় গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো দেখা দিল দুর্ভিক্ষ-মহামারী-মন্বন্তর। ‘‘এই মানুষখেকো মন্বন্তর শুষে নিল ৫০ লক্ষ মানুষের প্রাণশক্তি। মা বিক্রি করলেন সন্তান। বউ-ঝি বিক্রি করলেন সম্মান। আমেরিকান সৈন্যদের সুতীক্ষ্ম শিস নিদ্রিত মহানগরীকে করল বিধ্বস্ত। দিনরাত দরজায় দরজায় বুকফাটা আর্তনাদ– ‘মাগো একটু ফ্যান দাও।’’

তখন বাবু শ্রেণির লোকেরা সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণির প্রতি দায় অনুভব করতে লাগলেন। নিজেদের সীমায়িত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে। বিশেষ করে, ওইসব প্রান্তিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে, তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে একটা সংযোগসূত্র গড়ে তুলতে চাইলেন। এক্ষেত্রে এক অর্থে তাঁরা হলেন ‘দ্যা ক্লাশে’। তাই উক্ত সময়ের মর্মান্তিক দৃশ্য ধরা পড়ল জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের নবজীবনের গানে, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ফ্যান’ কবিতায়, বিভূতিভূষণের ‘অশনি সংকেত’-এ, তারাশঙ্করের ‘মন্বন্তর’-এ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আজ-কাল-পরশু’ ও ‘সাড়ে সাত সের চাল’-এ, চিত্তপ্রসাদ সোমনাথ হোর জয়নুল আবেদিনের অঙ্কনে, উদয়শঙ্করের ‘কল্পনা’-তে।

এই কালবেলাতে আমরা প্রথম একটি স্কেচধর্মী নাটিকা পেলাম, যা ‘কালের মাত্রায়’ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। লিখলেন, বাংলার পল্লিসমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রান্তিকজনদের যিনি হাতের তালুর মতো চিনতেন– সেই আকাড়া যুবক বিজন ভট্টাচার্য। ‘আগুন’ নাটকের বিষয়– ওই দুর্ভিক্ষের সময় দু’সের চাল পাওয়ার আশায় রেশনের দোকানে লাইন দিয়েছে সাধারণ মানুষ– এদের মধ্যে কৃষক আছে, সর্বহারা শ্রমিক আছে, শ্রমিকের ঝগড়ুটে বউ আছে ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আছে। কিন্তু এখানেও প্রোটাগনিস্ট হিসাবে কোনও প্রান্তিক চরিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। তবে, এ-নাটিকা একটা বড় কথা বলছে– আর তা হল, এই মন্বন্তরের সময় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকতে হবে– জাতধর্ম ভুলে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় সংহতি, যদি তা পারি– তা হলে এই সংকট নিশ্চয়ই আমরা পার করতে পারব।

‘আগুন’ অভিনয় করে ‘ফ্যাবলেসিস’ (ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ), এর প্রথম অভিনয় মার্চ ১৯৪৩, নাট্যভারতী মঞ্চে। ঝগড়ুটে বউয়ের চরিত্রে তৃপ্তি ভাদুড়ি-র খুব নাম হল। পরবর্তীকালে যিনি তৃপ্তি মিত্র নামে পরিচিতি লাভ করবেন। এটাই ছিল তাঁর প্রথম মঞ্চাভিনয়।

সময় আরও এগোল। ২৫ মার্চ ১৯৪৩-এ প্রতিষ্ঠা পেল ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’। এই সংঘের প্রথম নাটক ‘জবানবন্দী’। এটি একাঙ্ক। নাটককার বিজন ভট্টাচার্য। আমাদের খোঁজ এবার উত্তর পেল। প্রান্তিক কৃষক পরিবারের কত্তা পরান মণ্ডল হল প্রোটাগনিস্ট। বিজন এক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। কারণ এর আগে বাংলা নাটকে আর কোনও কৃষক কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠে আসেননি।

‘জবানবন্দী’ পরান মণ্ডল ও তার পরিবারের করুণ কাহিনি। দুর্ভিক্ষের কারণে গ্রাম ছেড়ে তারা বাধ্য হয়েছেন মহানগরে চলে আসতে। একটি ঝুপড়ি ঘরে অস্থায়ীভাবে, বাস করছেন। শুধুমাত্র দু’মুঠো খাবার পাওয়ার আশায়। বাবুদের লঙ্গরখানায় তাদের জন্য যে খিচুড়ি বরাদ্দ হচ্ছে, তাতে পরিবারের সকলের পেট ভরছে না। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বেধে যাচ্ছে বচসা। এমনকি আদিম ক্ষুধার তাড়নায় ওই পরিবারের অনেক মানুষই তখন হারাচ্ছেন তাদের বিবেক-মনুষ্যত্ব-চরিত্র। পরানের বউ তাঁর বুড়ো অসুস্থ স্বামীকে তাঁর ভাগের খিচুড়ি না দিয়ে, চোরের মতো লুকিয়ে গোগ্রাসে তা গিলছেন। সেই অবস্থায় তার একরত্তি নাতিটির কথাও মনে রাখছেন না। ওদিকে নাতিটি খিদের জ্বালায় কাঁদতে কাঁদতে একসময় নেতিয়ে পড়ছে। মরে যাচ্ছে। শেষদৃশ্যে, যে পরান তাঁর গ্রামের মাটিতে সোনা ধান ফলাতেন– তিনিও না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছেন। এ একাঙ্ক যেমন একদিকে দুর্ভিক্ষের সময়ের Stark reality-কে প্রকাশ করে, অপরদিকে এ মহতী কথাই বলে যে, মানুষ চলে গেলেও মানবসমাজ চিরবহমান। শত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়েও সে লড়াই-সংগ্রাম করে শেষমেশ বাঁচে। ‘জবানবন্দী’-র প্রথম অভিনয় ৪ জানুয়ারি ১৯৪৪, স্টার থিয়েটারে। নির্দেশনায় বিজন ভট্টাচার্য।

ওই বছরেই ২৪ অক্টোবর শ্রীরঙ্গম-এ ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ প্রযোজনা করে, সর্ব-অর্থেই বাংলা থিয়েটারে মোড় ঘোরানো পূর্ণাঙ্গ নাটক বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’। ‘জবানবন্দী’-র মতো এ-নাটকের বিষয় মন্বন্তর হলেও এর ব্যাপ্তি বিশাল। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত গ্রাম-বাংলার প্রান্তিক জনমানসের মধ্যে যে যে বিপর্যয় অভিশাপের মতো নেমে এসেছিল, তার প্রত্যেকটিকে বিচ্ছিন্ন করে, টুকরো টুকরো করে দেখানো হয়েছে। গণজীবনের বিরাট এক গোষ্ঠীকে নিয়ে এর পরিকল্পনা। এখানে প্রোটাগনিস্ট একজন কেউ নয়। বিপরীতে নিপীড়িত গ্রামীণ সমাজই এই নাটকে প্রোটাগনিস্ট হয়ে দেখা দিল। আগে আমাদের নাটক ছিল মূলত পরিবার-কেন্দ্রিক। ‘নবান্ন’ সেই ট্রাডিশনকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে প্রান্তিক কৃষকসমাজকে নাটকে তুলে আনল। এখানে সেই ছিন্নমূল নিরন্ন মানুষদের ‘‘দু’হাতা ফ্যান দাও’’ আর্তনাদ যেমন শোনানো হল– ঠিক তেমনই এদের বেঁচে থাকার জন্য নান্দনিকভাবে এ-কথাও বলা হল: ‘‘জোর, জোর প্রতিরোধ প্রধান এবার। জোর প্রতিরোধ।’’ দর্শক বুঝল, থিয়েটার মানে শুধু বিনোদন নয়, সমাজ সচেতন করাই হল এর উদ্দেশ্য।

বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র– এই থিয়েটারটির নির্দেশনা দেন। এই থিয়েটারের অন্যতম নির্দেশক শম্ভু মিত্র ‘নবান্ন’ প্রযোজনার খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে পরিশেষে বলেন: ‘নবান্ন’ অভিনয়ে একটা কাব্য সৃষ্টি হত। আবেগের কাব্য। মানুষের নিঃসহায়তার কাব্য, তার ভালবাসা কাব্য।

ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বিজন ভট্টচার্যের এ-দুটি নাটকই করে। ১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিজনবাবু গণনাট্য ছেড়ে দেন, এবং ছেড়ে দেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্যপদও। কিন্তু এর পরেও বিজনবাবু কম করে ২৫টি নাটক লিখেছেন– এর মধ্যে সিংহভাগ নাটকেই গ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকজনেরা প্রোটাগনিস্ট হিসেবে উঠে এসেছে।

এখানে আমি বিজন ভট্টাচার্যের আরও দুটি নাটক নিয়ে কথা বলব। একটি ‘কলঙ্ক’ ও অপরটি হল ‘হাঁসখালির হাঁস’।

‘কলঙ্ক’ একাঙ্কটিতে গ্রাম-বাংলার প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠী বেদেদের জীবন সংগ্রাম দেখানো হয়েছে। বেদে মংলার বউ রত্না। সে তার হাতের তৈরি জিনিস বিক্রি করে সংসারের ভাত-কাপড়ের জোগান দেয়। সে কারণে সে গোরা সৈন্যদের বারাকেও যায় জিনিস ফেরি করতে। তো একদিন সেখানে গিয়ে রত্না এক গোরা সেনার লালসার শিকার হল। একসময় সে একটা ফুটফুটে ফর্সা ছেলে প্রসব করল। ছেলের গায়ের রং দেখে রত্নাকে সন্দেহ করে তার স্বামী মংলা। বংশের কুলরক্ষার জন্য সে সালিশিসভা বসায়। সকলেই রত্নাকে কলঙ্কিনী বলে। এবং শিশুটিকে মেরে ফেলতে বলে। সদ্য মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া রত্না তা করতে চায় না। সে শিশুটিকে বড় করতে চায়– এই নিয়ে শুরু হয় নাটকের যা কিছু দ্বন্দ্ব সংঘাত-মুহূর্ত। পরিশেষে সব কিছু দেখেশুনে রত্নার শাশুড়ি সকলের সামনে চিৎকার করে বলে ওঠে– ‘‘কীসের কলঙ্ক, কার কলঙ্ক– মংলা যখন ওই বউমার শরীর বিক্রির টাকায় ভাত খেয়েছিল, তখন কোনো কলঙ্ক হয়নি!’’ এতে মংলার টনক নড়ে। তার বউকে সে আবার কাছে টেনে নেয়। আমাদের এই পুরুষশাসিত সমাজে নাটক এভাবে নারীর অস্তিত্বের কথা বলে। ভেঙে দেয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ট্যাবো। ‘কলঙ্ক’-র প্রথম অভিনয় হয় ১৩ মে ১৯৫১-তে, ইবিআর ম্যানসনে। নির্দেশনায় থাকেন বিজন ভট্টাচার্য, প্রযোজনা ক্যালকাটা থিয়েটার। শাশুড়ির ভূমিকায় প্রভাদেবীর অভিনয় আজও সাক্ষী-দর্শকের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।

বিজন ভট্টাচার্যের শেষ নাটক ‘হাঁসখালির হাঁস’। এটিও একটি একাঙ্ক। কলকাতা মহানগরীতে যখন মেট্রো রেলের সুড়ঙ্গ কাটা হয়, তখন বেশ কিছু প্রান্তিকজন তাদের গ্রাম ছেড়ে দুটো বেশি টাকার আশায় ওই কাজে যোগদান করেন। শেষে সেইসব প্রান্তিক মানুষদের কী মর্মান্তিক পরিণতি হয়– মর্মস্পর্শী ভাষায় নাটককার এখানে তা তুলে আনেন। এই একাঙ্কটি প্রথম অভিনয় হয়, ৩০ নভেম্বর ১৯৭৮। বিজন ভট্টাচার্য তখন প্রয়াত। এটির প্রযোজনা করে ঋত্বিক সাউথ। নির্দেশনায় থাকেন প্রণব চট্টোপাধ্যায়।

বাংলার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকজনদের নিয়ে নাটক লেখার ভগীরথ হলেন বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর নাটকেই গ্রামের প্রান্তিকজনদের জীবন চূড়ান্ত গুরুত্ব সহকারে এবং আঁকাড়া হয়ে উঠে এসেছে। সামগ্রিকতার নিরিখে এক্ষেত্রে তাঁর তুলনা এখনও তিনিই।

তুলসী লাহিড়ীর ‘ছেঁড়া তার’ এ গোত্রের একটি উল্লেখযোগ্য নাটক। বাহে উপভাষায় লেখা এই পূর্ণাঙ্গের পটভূমি– উত্তর বাংলার মুসলমান-প্রধান একটি গ্রাম। বেশ কিছু হিন্দুও বাস করে ওই গ্রামে। মোটামুটি লেখাপড়া জানা, বুদ্ধিমান কৃষক রহিমুদ্দিন এ-নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রহিমুদ্দিনের পরিবারের ট্র‌্যাজেডি এর বিষয়মুখ।
রহিমুদ্দিনের বিপরীত মানসিকতার মানুষ হাকিমুদ্দি। ও এ-গ্রামের মোড়ল। গরিব কৃষকদের শোষণ করে, চড়া সুদে টাকা ধার দেয়– সেই সুদ শোধ করতে না পারলে তার লেঠেলদের নিয়ে তাদের ওপর অমানসিক নির্যাতন করে। রহিমুদ্দিন এসব সহ্য করে না। তাই ওর ওপর ভীষণ ক্রোধ হাকিমুদ্দির। ‘‘আকাল আসে, আক্রমণ হয় যুগপৎ শক্তিমানের আর যুদ্ধের বাজারের।’’ হাকিমুদ্দির কারসাজিতে রহিমুদ্দিনের পরিবার লঙ্গরখানায় খেতে যেতে পারে না। রহিমুদ্দিন তাই বাধ্য হয়ে তালাক দেয় তার বউ ফুলজানকে। ছোট ছেলেকে নিয়ে সে চলে যায় শহর কলকাতায়। ফুলজান বাঁচার আর অন্য কোনও পথ না পেয়ে হাকিমুদ্দির বাড়ির বাঁদী হয়। শেষ পর্যন্ত আকাল কাটে। অসুস্থ ছেলে নিয়ে গ্রামে ফেরে রহিমুদ্দিন। কিন্তু বোঝে গ্রামের হিন্দু-মুসলমানরা আগে যেমন মিলেমিশে বাস করত কোথাও যেন তার সুর কেটে গেছে। বড়লোক আর গরিব লোকের মধ্যে বিভেদ বাড়তে থাকে। ‘‘দুর্ভিক্ষ এবং যুদ্ধ যেন মানুষের নৈতিক বোধকে বেশি করে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যায়। তবুও রহিমুদ্দিন আর ফুলজানের পুনরায় বিযে দেবার জন্য গ্রামের সমস্ত মানুষ– হিন্দু-মুসলমান একত্রে রুখে দাঁড়ায় হাকিমুদ্দির বিরুদ্ধে। তবু শেষরক্ষা হয় না। হদিজের পাকে পড়ে মরতে হয় একজনকে।’’

অসম্ভব ‘টাচি’ এই নাটকটি অভিনয় করে বহুরূপী, শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায়। প্রথম অভিনয় ১৭ ডিসেম্বর ১৯৫০। ইবিআর ম্যানসনে। ‘‘এই নাটকের বহু অভিনয় হয়েছে। যাঁরা দেখেছেন তাঁরা আজও ফুলজানরূপী তৃপ্তি আর রহিমুদ্দিনের ভূমিকায় শম্ভু মিত্রকে ভুলতে পারেন না। ভুলতে পারেন না, এই নাটকের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া মূল্যবোধের বাণী। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকাতেও এ-নাটক অভিনীত হয়েছে ১৯৫৭-৫৮ সালে। জানি না এখন আর এ-নাটক আর বাংলাদেশে অভিনীত হতে পারবে কিনা! অথবা, এখনকার রাজনৈতিক দাদারা এ-নাটক অভিনীত হতে দিবেন কিনা! সমাজের মূল্যবোধ নিম্নমুখী হতে হতে তল পাচ্ছে না। যে বীজ বৃটিশ পুঁতে রেখে গিয়েছিল, সেই বীজ বিষবৃক্ষ হয়ে সমস্ত মানুষের নিঃশ্বাসে যেমন বিষ ছড়াচ্ছে।’’

Advertisement

এ-প্রসঙ্গে দিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি নাটকের কথা বলব। নাম ‘দীপশিখা’। এ-নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকে এক চাষিবউ। সে দুর্ভিক্ষের সময় বাধ্য হয়েছে দুটি সন্তান নিয়ে শহরে আসতে। শহরের মানুষের কাছে তখন সে দু’হাতা ফ্যান চেয়ে বেড়ায়, ভিক্ষাও করে– কিন্তু এ-সব করেও তার দু’সন্তানকে রাখতে পারেননি। একদিন ছোট ছেলেটা ‘খেতে দাও’ ‘খেতে দাও’ বলতে বলতে মরে যায়। মেয়ে নীলা হারিয়ে যায় উদ্বাস্তুদের ভিড়ে। হন্যে হয়ে খুঁজে ফেরে তার মা, তার নীলাকে কিন্তু পায় না। দিন যায়– একদিন কেন্দ্রীয় আত্মরক্ষা সমিতির এক সদস্য হারিয়ে যাওয়া নীলাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়– তখন ওই প্রান্তিক নারী ঘর-বাড়ি-সংসার এবং ছেলেকে হারিয়ে নতুন করে আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখে– নীলা হয়ে ওঠে তার কাছে দীপশিখা।

‘নয়নপুর’-এর নাটককার অনিল বসু। সুন্দরবন অঞ্চলের নয়নপুর গ্রামে তেভাগা আন্দোলন এ-নাটকের পটভূমি। আন্দোলনকে দমন করার জন্য গ্রামের জোতদার পুলিশ ডাকে। তখন সর্বহারা কৃষকদের সঙ্গে গ্রামের বউ-ঝিরাও তার প্রতিবাদে সামিল হয়– সে-সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ চলে যায় এক প্রান্তিক চাষার বউয়ের। নাটকটি ১৯৪০ সালে গণনাট্য অভিনয় করে। এ-নাটকে সলিল চৌধুরী অভিনয় করেছিলেন।

১৯৫২ সালে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক ও নির্দেশনায় গণনাট্য সংঘের দমদম কেন্দ্রীয় শাখা মঞ্চস্থ করে ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। শাসকের বিরুদ্ধে প্রান্তিক সাঁওতাল জীবনের লড়াই-সংগ্রাম এ-নাটকে উঠে আসে। এ-বিষয় নিয়েই মন্মথ রায় লেখেন ওই একই নামে একটি নাটক। যেটি করে রূপদক্ষ, ১৯৬৩ সালে।

শেখর চট্টোপাধ্যায়ের ‘জন্মভূমি’ নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্র এক প্রান্তিক মানুষ। ২১ দিন ভাত খেতে না পেয়েও সে এই আত্মপ্রত্যয়ী কথা বলে, ‘‘আমি একুশ দিন ভাত খাইনি। তবু বেঁচে আছি, ওই খটখটে তালগাছটার মতন। জন্মভূমির রস খেয়ে। এখনও আমার অনেক শক্তি।’’

‘নতুন ইহুদি’-র নাটককার সলিল সেন। এই নাটকে দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ তার ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু ও পুরোপুরি প্রান্তিক হয়ে যখন এই বাংলায় এল তখন তারা কীভাবে জীবন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে একসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়াল, তারই আলেখ্য। এটি কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় ১৯৪৯ সালে প্রথম অভিনীত হয়।

১৯৫২ সালে এলটিজি ‘অঙ্গার’ প্রযোজনা করে মিনার্ভা থিয়েটারে। নাটক ও নির্দেশনায় থাকেন উৎপল দত্ত।

সেই সময় দুটি কয়লা খনিতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। একটি চিনাকুরিতে। অপরটি বড়া ধেমোতে। সেই দুর্ঘটনায় খাদের মধ্যে বহু শ্রমিকের মৃত্যু হয়। বড়া ধেমোতে প্রায় ২১ দিন বাদে ১১ জন শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে উৎপলের ‘অঙ্গার’। সে-সময় এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রযোজনা।

অদ্বৈত মল্লবর্মনের সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দেন উৎপল দত্ত। প্রযোজনা করে এলটিজি। এই নাটকে গ্রামের প্রান্তিক শ্রেণি মালো সম্প্রদায়ের জীবন-সংগ্রাম জয়-পরাজয় চূড়ান্ত নাটকীয়ভাবে উঠে আসে। বস্তুত, গ্রামীণ জীবন নিয়ে এত ভাস্ট নাটক ‘নবান্ন’-এর পর বাংলা থিয়েটারে দেখা যায়নি। এটিও একটি জনপ্রিয় প্রযোজনা। এর প্রথম অভিনয় ১০ মার্চ ১৯৬৭, মিনার্ভা থিয়েটারে।

মনোজ মিত্রের ‘চাক ভাঙ্গা মধু’ এ-গোত্রের একটি ইউনিক নাটক। এর বক্তব্য ও বিন্যাস দুটিই শক্তিশালী। এই নাটকের বিষয়বস্তু মূলত গ্রাম-বাংলার প্রান্তিক মানুষের ওপর শোষণ ও নিপীড়ন এবং তার হাত থেকে বাঁচার জন্য জেহাদ– নকশালবাড়ির আন্দোলনের সময় এ-নাটক লেখা হয়।

নাটকের প্রধান চরিত্র অঘোর ঘোষ একজন মহাজন। সে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করে। তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এই অঘোরকে একদিন বিষাক্ত সাপ কামড়ায়। বিষ ঝাড়ানোর জন্য ওঝা মাতলার কাছে আসে। ওঝার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা বাদামি। অনেকে বলে ওর বিষ ঝাড়িও না– মাতলাও চায় ও মরে যাক– কিন্তু বাদামি মানবিকতার কারণে বাবাকে ওর বিষ ঝাড়াতে বলে। মাতলা তাই করে। অঘোর প্রাণ ফিরে পায় কিন্তু এর পরে সে অন্তঃসত্ত্বা বাদামিকে ভোগ করতে উদ্যত হয়। বাদামি বোঝে এ-ক্ষেত্রে সে মানবিকতা দেখিয়ে ভুল করেছে। এবার সে নিজমূর্তি ধারণ করে। তখন হঠাৎই তার মনে পড়ে যায় মধুর কলসির কথা। যেখানে তার বাপ রেখেছিল কালসাপ। সেই কলসি সে অঘোরকে তুলে দেয়। কিন্তু সে জানতে পারে তার বাপ মাতলা আগেই ওই সাপটাকে মেরে রেখেছে। তখন নিজের প্রাণ বাঁচানোর আশায় হাতে তুলে নেয় এক সড়কি। অন্ধকারেই অঘোরের দিকে এগিয়ে যায়, সেই সড়কির ঘায়ে অঘোর মারা যায়।

শ্রেণিসংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে সশস্ত্র রাজনৈতিক নাটকটি প্রযোজনা করে থিয়েটার ওয়ার্কশপ। নির্দেশনায় থাকেন বিভাস চক্রবর্তী। খুবই আলোচিত ও জনপ্রিয় থিয়েটার এটি। বাদামির বহুস্তরিক ও সাহসী চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন মায়া ঘোষ। প্রথম অভিনয় ১৬ মে ১৯৭২, রঙ্গনা-তে। সময়টা নকশালবাড়ির সশস্ত্র আন্দোলনের সময়।

এবার মনে পড়ে যাচ্ছে, প্রেমচাঁদের ছোটগল্প ‘কফন’ অবলম্বনে দেবাশিস মজুমদারের নাটক ‘দানসাগর’-এর কথা। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনের নৈতিক অবক্ষয় এ-নাটকে ধরা পড়ে। গল্পটিতে মাত্র দুটি চরিত্র– বাপ ঘিসু ও বেটা মেধো। যাঁরা তাঁদের মরা বউকে কফনের জন্য রাখা টাকা অভাবের অজুহাতে খরচ করেন এবং মৃত নারীটির জন্য এতটুকু শোকাভিভূত না হয়ে উল্টে দেদার মদ ও মদের চাট গিলতে থাকেন। এটি প্রযোজনা করে থিয়েটার কমিউন, নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তের নির্দেশনায়। নীলকণ্ঠের ঘিসু ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেধো চরিত্রে অভিনয় নাট্য ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে ধরা আছে।

দেবেশ রায়ের বিশাল উপন্যাস ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’-র একটি সংহত নাট্যরূপ দেন সুমন মুখোপাধ্যায়। তিনিই এটির নির্দেশক। তিস্তার তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, বিশেষ করে ওই অঞ্চলের প্রান্তিক ভূমিহীন কৃষকরা কী নিদারুণ জীবন কাটান– তারই আলেখ্য এই নাটক। এই নাটকের বাঘারু সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক প্রান্তিক চরিত্র। এই কাহিনিকে ভরকেন্দ্রে রেখে যে আধুনিক নাট্যভাষায় এই থিয়েটারটি সুমন গড়ে তুলেছিলেন– তার কথা সাক্ষী-দর্শকরা এখনও স্মরণ করেন। এটি আধুনিক বাংলা থিয়েটারে পাথব্রেকিং প্রোডাকশন।

বাদল সরকারের ‘ভোমা’ একটি প্রতীকধর্মী নাটক। ভোমার মধ্যে দিয়ে সামাজিক বৈষম্য, শোষণ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ভিন্ন ভাষায় উঠে এসেছে। নাটকের মূল চরিত্র (ভোমা) তাদের ক্ষোভ ও বঞ্চনা নিয়ে কথা বলে। ভাষার বিমূর্ততার জন্য এ-নাটক সাধারণ দর্শকের কাছে জটিল হয়ে যায়। বাদল সরকার এটির নির্দেশনা দেন এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। তৃতীয় ধারার নাটক এটি। শতাব্দী নাট্যদল এটি প্রযোজনা করে।

‘বিয়ে গাউনি কাঁদন-চাপা’-র বিষয়মুখ বলি। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় , যেমন বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদীয়ার গ্রামাঞ্চলের কতিপয় মুসলিম মেয়ে বিয়ের গান গাইবার জন্য বরাত পান। এই বিয়ে গাউনিরা সমাজের বিভিন্ন অংশের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে এই গানের ভিতর দিয়েই তাদের নিজস্ব জীবন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলেন তাদের নিজেদের কাঁদনকে চাপা দিয়ে। রত্না রশিদের গবেষণার ফলস্বরূপ চার খণ্ডে ‘মুসলিম বিয়ের গীত’ বইটিকে প্রসঙ্গে রেখে চন্দন সেন লিখেছেন এই নাটক। নাটকে গ্রামীণ এক মুসলিম ঘরের শিক্ষাপ্রাপ্ত বউ মানোয়ারা তার শাশুড়ির কাছে শোনে এই গান, তারপর গাউনিদের সন্ধানে বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরে তুলে আনে গাউনিদের জীবনগাথা। বর্ধমানের বাজিতপুর গ্রামের গোলবিবি, মুর্শিদাবাদের সালারের কাছের ফেলনা বিবি, অথবা বর্ধমানের প্রৌঢ়া ওলেমা যে নিজের নামের আগে রাখেন ‘শেখ’ পদবি, তারা তাদের জীবনে পুরুষ, মোল্লা-মৌলবিদের কথা বলেন, তাদের অত্যাচার নিয়ে গান ব্যঙ্গের গান– ‘‘শানায় ন অ তেনার শানায় না/ পুরুষ জেতের শানায় না/ এক বিবিতে পুরুষ জেতের শানায় না।’’ অথবা, দেখেন রঙিন সুখের স্বপ্ন: ‘‘ওই মা গংগারো ঘাটে বসে,/ প্রেমেরো কাদা ঘষে/ হলে হলে বোষ্টমী সেজেছি/ ও নাগর তোমার প্রেমে মজেছি।’’

এটির প্রযোজনা করে থিয়েটার ওয়ার্কশপ। প্রথম অভিনয় ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, গিরিশ মঞ্চ। সম্পাদনা ও নির্দেশনায় থাকেন অশোক মুখোপাধ্যায়।

এ-ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ-গোত্রের একাধিক সাহিত্য-কর্মের ওপর থিয়েটার হয়েছে। মহাশ্বেতা দেবীরও একাধিক সাহিত্য নিয়ে থিয়েটার হয়েছে। এ-সব নিয়ে বিস্তারে বলার সুযোগ এখানে নেই। তবে এ-সময়ের দুটি উল্লেখযোগ্য নাটকের কথা এবার বলি।

শোষিত সাঁওতাল সমাজের ওপর গাছ-মাফিয়াদের ও রাষ্ট্রের নির্যাতনকে বিষয়মুখ করে অনুপম চক্রবর্তীর নাটক ‘মন্দ্রিত আগামী’। এটি প্রযোজনা করে ফুলেশ্বর উদ্দীপন, দক্ষিণ বারাসত সমাজ দর্পণ।১০

জঙ্গলমহলের প্রান্তিক জনজাতি শবররা স্থানীয় জঙ্গলের কাঠ, পাতা, মধু, ছোটখাটো বন্যপ্রাণী শিকার করে বেঁচে থাকেন। দীর্ঘ দিনের সরকারি ও প্রশাসনিক অবহেলায় তাদের মধ্যে দারিদ্র, অপুষ্টি ও নানাবিধ রোগের প্রাদুর্ভাব আছে। অনুপম দাশগুপ্তের ‘নরখাদক’ নাটকের ভিত্তি, এই জঙ্গলে চলে আসা একটি বাঘকে কেন্দ্র করে। দলছুট, দিশাহীন এক বাঘ, যাকে সন্দেহ করা হচ্ছে নরখাদক হিসেবে। প্রশাসন এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসে এবং বাঘটিকে ধরার বিভিন্ন প্রকরণের আয়োজন করে। তবে নাটকীয় বিভিন্ন ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে এই প্রশ্নই উঠে আসে যে, প্রকৃত নরখাদক কে? ওই বাঘটি, নাকি সর্বিকভাবে আমাদের সিস্টেম?

এই নাটকটি এখনও প্রযোজনা হয়নি। স্যাস নাট্যপত্রের আগামী সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হতে চলেছে।

এবার আলোচনা শেষ করতে হচ্ছে, তবে শেষ করার আগে এ-প্রসঙ্গে আমি বাংলাদেশের তিনটি নাটকের কথা বলতে চাই।

প্রথমটি ‘কিত্তনখোলা’। এটি লেখেন সেলিম আল দীন। এটি মূলত গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং প্রান্তিকজনদের জীবন-সংগ্রামের আলেখ্য। একটি মেলা ও যাত্রাদলকে কেন্দ্রে রেখে নাট্যঘটনা আবর্তিত হয়েছে। যেখানে উঠে এসেছে শোষণ, লোভ, বেদনা ও বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম। এ-নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হল সোম নামে এক প্রান্তিকজন।

দ্বিতীয় নাটকটি হল ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। এটি একটি কাব্যনাটক। প্রেক্ষাপট হল, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি গ্রামের পটভূমিতে যুদ্ধের পরের পরিস্থিতি ও তখনকার গ্রামের মানুষদের জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, এবং শত্রুর প্রতি ঘৃণা। ভাস্ট ক্যানভাসের এই নাটকটি প্রযোজনা করে বাংলাদেশ থিয়েটার সম্প্রদায়।

তৃতীয় নাটকটি হল, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’। একটি বিরতি সহ চোদ্দটি দৃশ্যের এই কাব্যনাটক মহাকাব্যিক দ্যোতনা পেয়েছে। নূরলদীন এখানে জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে অতীত থেকে। তখন ব্রিটিশ শাসনকাল। নীলকরদের অত্যাচারে গ্রাম-বাংলা ছারখার। ওই ভয়ানক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে ‘‘নূরলদীন হয়ে ওঠে, অত্যাচারিত কৃষকদের আশা-ভরসা-স্বপ্ন, সে তাদের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের পথ দেখায়। মহাজন, জমিদার, ইংরেজ, নীলকরদের অত্যাচারে সর্বস্বান্ত কৃষকেরা। একদা নূরলদীনের বাবাও বলদের অভাবে লাঙল টানতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন-শোষণে ব্যতিব্যস্ত বঙ্গদেশ, কৃষকদের অবস্থা আরও করুণ, নূরলদীনের ভাষায়, ‘‘নীল বুনিয়া দেয় গোরা হামার মিনার পরে।’’ (তৃতীয় দৃশ্য)।১১

এ-সবের বিরুদ্ধেই নূরলদীন লড়াই করে– শোষণমুক্ত একটা সমাজ গড়তে চায়। এটি প্রথম মঞ্চস্থ করে নাগরিক সম্প্রদায় (ঢাকা)। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নূরলদীনের সারাজীবন’– দুটি নাটকের রচয়িতাই সৈয়দ শামসুল হক।

স্বীকৃতি:
১. গৌরচন্দ্রিকা— উৎপল দত্ত, এপিক থিয়েটার, মে ১৯৭৭
২. শান্তনু ঘোষ—
৩. অমৃতবাজার পত্রিকা, ১৮ মার্চ ১৮৭২
৪. ধরণী ঘোষ, রঙ্গপট নাট্যপত্র, দশম সংখ্যা
৫. গণনাট্য কথা— সজল রায়চৌধুরি
৬. ‘রাজা’-র কথায়, রচনা সমগ্র ১, শম্ভু মিত্র
৭. গণনাট্য, নবনাট্য, সৎনাট্য ও শম্ভু মিত্র— শাঁওলী মিত্র
৮. তদেব
৯. একযুগের নির্বাচিত নাট্য সমালোচনা (২০০৬-২০১৭)— সুব্রত ঘোষ
১০. কমল সাহা, হোয়াটসঅ্যাপ
১১. বাংলা থিয়েটারে নিম্নবর্গ: আছে বল দুর্বলেরও— ঋতম মুখোপাধ্যায়— সাধারণ বঙ্গ রঙ্গালয়ের সার্ধ-শতবর্ষ, পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাডেমি

কৃতজ্ঞতা:
শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপম দাশগুপ্ত, গুগল

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × four =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »