Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পোল্যান্ডের গল্প: দুনিয়ার কুৎসিততম মহিলা

ওল্গা তোকারচুক

অনুবাদ: মানব সাধন বিশ্বাস

লোকটি বিয়ে করেছিল দুনিয়ার কুৎসিততম মহিলাকে। সার্কাস দলের বহু পরিচিত অধিকারী হিসেবে সে ভিয়েনায় গিয়েছিল বিশেষভাবে তাকেই দেখতে। কাজটা একেবারেই পূর্বনির্ধারিত ছিল না। সে যে তাকে তার স্ত্রী হিসেবে নেবে— এ তার কল্পনাতেও ছিল না। তবে তাকে একবারমাত্র দেখার পর— প্রথম ধাক্কাটা সামলে নেওয়ার পর থেকেই তার দৃষ্টি সে আর সরিয়ে নিতে পারেনি। মাথাটা বেঢপ বিশাল, নানা আকারের পিণ্ড আর আবে ভরা। সারাক্ষণ জলে-ভরা কুঁতকুঁতে চোখদুটো নিচু-খাঁজযুক্ত ভ্রূয়ের একেবারে কোল-ঘেঁষে বসানো। দূর থেকে মনে হয় সরু ফাটলের মত। নাক-বরাবর এখানে-ওখানে ভাঙা-ভাঙা খাঁজ, কালচে-নীল ডগায় ইতস্তত ছড়িয়ে ছোট ছোট শক্ত রোঁয়া। মুখ বেশ বড়সড় আর ফুলোফুলো— বাইরের দিকে বেরিয়ে আসা মুখের সুচালো দাঁতগুলোর জন্যে সবসময় ভিজে থাকে। আর এসমস্ত কিছু ছাপিয়ে— সেটাও বোধহয় যথেষ্ট নয়— মুখমণ্ডল জুড়ে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে গজিয়ে ওঠা লম্বাটে সোনালি চুল।

প্রথমদিন সে তাকে দেখেছিল, ভ্রাম্যমাণ সার্কাসের দৃশ্যপট-আঁকা কার্ডবোর্ডের আড়াল ছেড়ে যখন সে দর্শকদের সামনে অবতীর্ণ হল। বিস্ময় আর বিরক্তির চিৎকারের মধ্যে শুরু হওয়া আওয়াজ সমাগত দর্শককুলের সর্বত্র ছড়িয়ে গিয়ে শেষ অব্দি তাকেই বেছে নিল। তখন সে হয়তো হেসেছিল, কিন্তু তার দুর্ভাগ্যের দোষে মনে হল, সে যেন ভেংচি কাটছে। সে ধীরস্থির হয়ে সোজা দাঁড়িয়ে রইল। ডজন-খানেক চোখের নজর তখন তার দিকে— প্রতিটি লোভী চোখ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যেন তাকে গিলছে। এমনভাবে যেন উপস্থিত দর্শকেরা তার মুখের বিবরণ তাদের বন্ধুবান্ধবদের বা প্রতিবেশীদের কিংবা তাদের নিজেদের বাচ্চাদের কাছে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে, যাতে করে বার বার এই মুখ ডাক পেতে থাকে। তারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সঙ্গে এই মুখের তুলনা করে স্বস্তিতে হাঁফ ছাড়ছিল। সে তখনও ধৈর্য ধরে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে— হতে পারে সেটা তাঁর ওপরে চাপানো কেউকেটা ভাবের আবরণটি ধরে রাখার প্রয়োজনে। দর্শককুল ছাপিয়ে তার দৃষ্টি তখন পেছনের বাড়িগুলোর ছাদগুলোয়।

লম্বা নৈঃশব্দ্যের পর বিস্ময়ের ঘোরে ফুলেওঠা কেউ একজন শেষে বলে উঠল, ‘এবার আমরা চাই তুমি তোমার নিজের সম্বন্ধে কিছু বলো।’

সে জনতার দিকে নজর করে খুঁজতে লাগল সেই কণ্ঠস্বরকে। কোন মানুষটি এ কথা বলল? ঠিক তখনই একজন শক্তপোক্ত মহিলা রিংমাস্টার দ্রুত কার্ডবোর্ডের কক্ষের আড়াল থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে দুনিয়ার সেই কুৎসিততম মহিলার হয়ে সাড়া দিল: ‘দুঃখিত, ও কথা বলে না।’

‘বেশ, তবে ওর কথা তুমিই না-হয় আমাদের বলো।’ কণ্ঠস্বরটির অনুরোধ রাখতে সেই মহিলা গলা পরিষ্কার করে নিয়ে এবার বলতে শুরু করল।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর, সার্কাসের চাকাওয়ালা গাড়ির মধ্যে ছোট একটি টিনের স্টোভ, যার আঁচ ভেতরটা গরম রেখেছে, তার পাশে গিয়ে সে সেই কুৎসিততম মহিলার সঙ্গে চা খেতে বসল। তাকে বেশ বুদ্ধিমতী মনে হল। অবশ্যই সে কথা বলতে পারে। বেশ কাণ্ডজ্ঞান-সম্পন্নও বটে। প্রকৃতির খেয়ালিপণার প্রতি লোকটির নিজের কিছু দুর্বলতা ছিলই; এবার সে তাকে খুব ভালভাবে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। স্ত্রীলোকটি লোকটির মধ্যে দিয়েই যেন এবার নিজেকে দেখতে পাচ্ছিল।

‘আপনারা ভাবলেন, আমার সব কথা অদ্ভুতুড়ে, উদ্ভট কিছু— ঠিক আমার মুখের মত, তাই না?’

সে এর কোনও উত্তর দিল না।

স্ত্রীলোকটি চা খাচ্ছিল রাশিয়ানরা যেমন খায়, তেমন করে— রাশিয়ান কেটলি বা স্যামোভার থেকে ছোট হাতলবিহীন কাপে ঢেলে, প্রতি চুমুকে চিনির দানাগুলো চিবিয়ে।

খুব তাড়াতাড়িই লোকটি বুঝতে পারল, সে অনেক ভাষায় কথা বলতে পারে। তবে আসলে কোনওটাতেই খুব যে সড়গড়, তা নয়— প্রায়ই এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় চলে যায়। এতে বিস্ময়ের কোনও কারণ নেই। শিশুকাল থেকে তার বেড়ে ওঠা সার্কাসের মধ্যেই, যে সার্কাস সম্ভাব্য সকলপ্রকার বৈচিত্র্যময় অদ্ভুতদর্শন মানুষের একটি বহুদেশি দল। এরা কখনওই একই জায়গায় দ্বিতীয়বার যায় না।

‘আমি কিন্তু জানি আপনি কি ভাবছেন।’ প্রাণীসুলভ খুদে ফোলাফোলা চোখে তার দিকে চেয়ে সে আবার বলল। স্বল্পক্ষণ চুপচাপ থেকে সে আরও বলল, ‘যে মানুষের কোনও মা নেই, তার কিন্তু মাতৃভাষাও নেই। আমি বহু ভাষা ব্যবহার করি বটে, তবে কোনওটাই কিন্তু আমার নিজের নয়।’

এর কোনও জবাব দেওয়ার সাহস হল না লোকটির। এ তার পক্ষে বেশ উত্ত্যক্তিকর হয়ে উঠল, যদিও সে আন্দাজ করতে পারছিল না কি তার কারণ। স্ত্রীলোকটির মন্তব্যগুলি ছিল যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত। তার কথা বরাবর গোছালো ও ঠিকঠাক, যা সে একেবারেই আশা করেনি।

এবার সে তার কাছ থেকে বিদায় নিল। সেসময় তাকে একেবারে হতবাক করে সে দেখল, নারীসুলভ ইশারায় স্ত্রীলোকটি তার দিকে তার হাতটি বাড়িয়ে দিয়েছে— একেবারে খাঁটি পরিণত ভদ্রমহিলার ভঙ্গিতে। আর সে হাতও সত্যিই পুরোপুরি নিখুঁত, সুন্দর। লোকটি সেদিকে মাথা ঝোঁকালো, তবে তার ঠোঁট ছোঁয়াল না।

হোটেল-রুমের বিছানায় পিঠ রেখে সে তখনো তার সম্পর্কে ভাবছিল। সে চেয়ে রইল হোটেলের প্রায় ভ্যাপসা, গুমোট গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকা সেই বদ্ধ ঘরে, যা তার কল্পনা-শক্তিকে সোচ্চারে আমন্ত্রণ জানাল আরও উদ্দাম উত্তুঙ্গে। সে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, এরপর ঠিক কি অপেক্ষা করছে তার জন্যে। ঠিক কীসের অনুভব তার সামনে উঠে আসতে চলেছে। আর কীভাবেই বা তামাম দুনিয়া ওই শুয়োরছানা-সদৃশ কুঁতকুঁতে চোখ ভেদ করে কেমন দৃষ্টিতে তাকে দেখবে। আর এমন বিকটদর্শন নাকের সাহায্যে কি করেই বা ঘ্রাণের অনুভূতি আসে? সাধারণ মানুষের মতই কি হবে সেই স্বাভাবিক অনুভুতি? প্রতিদিনের ওঠাবসা— ধোয়া-মাজা সমেত ছোটবড় নানা নৈমিত্তিক কাজের যাপন হবে কেমন করে? তার শরীর স্পর্শের অনুভূতিই বা কেমন হবে?

সে কিন্তু একটিবারের জন্যেও তার প্রতি কোন দুঃখবোধে পীড়িত ছিল না। সত্যিই সমব্যথী হয়ে থাকলে সে কোনওমতেই তার প্রস্তাবের কথাটাই মাথায় আনত না।

কেউ কেউ একে এক প্রেমহীন ভালবাসার গল্প হিসেবে বর্ণনা করতে পারে এইজন্যে যে, কোনও না কোনওভাবে সে তার অন্তর্ভেদী হৃদয় দিয়ে তার ভেতরটা সরাসরি দেখেছিল এবং চূড়ান্ত বিকর্ষক বিকটাকার রূপ সত্ত্বেও সে যেন এক দেবদূতী-সম মানুষের প্রেমে উদ্বেল ছিল— তার মিষ্টি ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিল। কিন্তু না, তেমন কিছু এর মধ্যে একেবারেই ছিল না। সেই প্রথম রাত— যেদিন সে তাকে দেখেছিল, তারপর থেকেই এক মুহূর্তের জন্যেও তার একটি ভাবনা কখনও থেমে থাকেনি। সেটা হল, তাদের একান্ত অন্তরঙ্গ গভীর গোপন ঘনিষ্ঠতার প্রকরণ ঠিক কেমনতর হবে।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ লোকটি সার্কাস-চত্বরে আনাগোনা করতে লাগল। প্রতিদিনই সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও সে আবার ফিরে আসত। এমনি করে ধীরে ধীরে সে সার্কাসের ম্যানেজারের বিশ্বাস অর্জন করল। দলের ব্রনো সফরের চুক্তির ব্যবস্থাও সে পাকা করে ফেলল এবং সত্যিই সার্কাসের দলের সঙ্গে সেও সেখানে গেল। এইভাবে সার্কাসের লোকজন তাকে তাদেরই একজন মনে করতে লাগল। তারা তাকে টিকিট বিক্রির কাজও দিল। এবং পরবর্তীকালে সে সেই পৃথুলা মহিলা রিংমাস্টারনির কাজটা নিজের হাতেই নিল। আর এটা স্বীকার করতেই হবে, এ-কাজেও সে যথেষ্ট এলেমদার। নিরেস উৎকট রং করা পর্দাটার উপরে ওঠার পর থেকে দর্শকদের উৎসাহ ও মেজাজ সমান তালে ধরে রাখার কাজে সে ছিল সত্যিই পারদর্শী।

‘অনুগ্রহ করে এবার আপনারা আপনাদের চোখ বন্ধ করুন।’ সে গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল— ‘বিশেষ করে মহিলা আর বাচ্চারা— স্পর্শকাতর চোখের পক্ষে এই প্রাণীটির চেহারার কিম্ভুত-কিমাকার কদর্যতা সহ্য করা সত্যিই ভয়ানক কঠিন। যে কেউ— যারা প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা নিজের চোখে দেখেছেন, তারা আর কখনও শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন না। কেউ কেউ তো এরই মধ্যে সৃষ্টিকর্তার ওপর তাদের বিশ্বাস খুইয়ে ফেলেছে।…’

এই সময় মনে হল, কথাটা শেষ না করেই সে তার মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু ঘটনা তা নয়। আসলে সে বুঝে উঠতে পারছিল না, তার আর ঠিক কি বলা বাকি রয়ে গেল। ‘সৃষ্টিকর্তা’ কথাটা সবকিছুকেই সঠিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে স্ত্রীলোকটি পর্দার পেছনে অপেক্ষা করছিল, হতে পারে তাকে দেখে কিছু মানুষ তাদের সৃষ্টিকর্তার ওপর তাদের বিশ্বাস খুইয়ে ফেলেছে। সে নিজে কিন্তু এর বিপক্ষের অবস্থনে এসে দৃঢ়প্রত্যয়ী: যদি কিছু হয়ে থাকে, তা হল এটাই যে, ব্যবস্থাপক হিসেবে তাকেই বেছে নিয়ে সৃষ্টিকর্তা তার অস্তিত্ব জোরালোভাবে ঘোষণা করেছেন— এই সুযোগ তার হাতে অর্পণ করে। দুনিয়ার কুৎসিততম মহিলা। সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে কোনও কোনও আহম্মক ডুয়েল লড়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি পর্যন্ত করে। মেয়েদের নানান বাতিক খেয়ালখুশি-সখ-আহ্লাদ-আত্তি মেটাতে কিছু কিছু গর্দভ তাদের রাজার ধনদৌলত অব্দি উড়িয়ে দেয়। সে তাদের মত নয়। দুনিয়ার কুৎসিততম এই মহিলা পোষমানা প্রাণী-হিসেবে লাভ করেছে তার স্নেহের ছায়া। সে অন্য মেয়েদের চেয়ে একবারেই আলাদা। সে এমনকি তাকে লাভজনক আর্থিক সুযোগ তৈরি করে দিয়ে তার সহায়তা করেছে। এ-অবস্থায় সে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলে সে প্রতিষ্ঠিত হবে অন্যরকমভাবে— একজন বিশেষ মানুষ হিসেবে। সে এমন কিছুর অধিকারী থাকবে, যা অন্য কারও নেই।

সে তার জন্যে ফুল কিনতে লাগল। সেটা মোটেও অতিবিশেষ কোনও ফুলের তোড়া নয়, নেহাতই পলকা টিস্যু পেপারে-তৈরি কাগজের সাধারণ সস্তা ফুলের ‘বাউ’ বা গুচ্ছবিশেষ। কখনও গলায় জড়িয়ে রাখার জন্যে সুতির রুমালও সে তাকে দিত। কখনও চকচকে রিবন, আবার কখনও মাখন-চকোলেট-আখরোটের মিষ্টি কুকি বা ‘প্র্যালিন’-এর ছোট্ট একটা বাক্স। তারপর সে সন্মোহিতের মত তার দিকে চেয়ে থাকত। সে রিবনটা তার কপালের চারদিকে জড়িয়ে নিত। অলঙ্কার হিসেবে না হয়ে সেই রংবাহারি বাউ তখন হয়ে উঠত রীতিমত একটা ত্রাস-বিশেষ। সে লক্ষ করত যখন বাইরে বেরিয়ে-আসা বড় আকারের জিভটি দিয়ে সে চকোলেট চাটতে থাকত, তখন তার দূরে দূরে থাকা সুচালো দাঁতগুলোর ফাঁক দিয়ে বাদামি লালা ফোঁটায় ফোঁটায় চুঁইয়ে পড়ত রোঁয়া আর আঁশে-ভরা গালে।

তাকে দেখতে লোকটির আরও ভাল লাগত, যখন সেই দেখার বিষয়টি ঘটত তার একেবারে অজান্তে। কাউকে না জানিয়ে সে সকালের দিকে তাঁবু বা ট্রেইলরের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকত। সে এমনটা করত তাকে ভাল করে লক্ষ রাখার জন্যে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঠের বেড়ার ফাঁকের মধ্যে দিয়েও সে পর্যবেক্ষণ করত। সে রোদস্নানও করত। সেসময় অনেকক্ষণ ধরে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে থাকা চুলের জন্যে সে আবিষ্টমনে চিরুনি ব্যবহার করত। অতি সরু বিনুনি করে সে চুল বাঁধত। তাড়াতাড়ি সেটা খুলে নিয়ে আবার বাঁধত। এ না হলে সে কুরুশকাঠি দিয়ে কাজ করত। সূর্যের চড়া আলোয় কাঁটাগুলো চকচক করত। যেমনটি তারা সার্কাসের হট্টগোলের গরম উত্তেজনাপূর্ণ ছোরার খেলায় মেতে ওঠে। অথবা, ঢিলেঢালা জামায়, হাত উন্মুক্ত করে সে বালতিতে তার জামাকাপড় কেচে নিত। তার চামড়া আর বক্ষ-দেশের উর্ধাংশ ঢাকা থাকত পশমী জামায়। ভালই লাগত তখন। প্রাণীদের মত নরম, মোলায়েম।

তার এই গোয়েন্দাগিরির দরকার হয়েছিল, কেননা তার বিরক্তি বা যা কিছু অপছন্দ সবই দিনে দিনে কমে আসছিল। সবই রোদের তাপ নিয়ে গলে যাচ্ছিল, রাস্তার গর্তের জমা কাদাজল যেন সহসা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল অপরাহ্ণের উষ্ণতায়। ধীরে ধীরে লোকটির চোখ তার অস্বাভাবিক অনুপাতের বেদনাদায়ক গঠনগত অসামঞ্জস্যে, তার যাবতীয় কমতি, যাবতীয় আতিশয্যে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। এমনকি মাঝে মাঝে তাকে নিতান্তই স্বাভাবিক হিসেবেও ধরে নিল সে।

যখনি সে অস্বস্তি অনুভব করত, সবাইকে বলত, সে ব্যবসার জরুরি কাজে বাইরে যাচ্ছে, বা কারও সঙ্গে মিটিংয়ে যেতে হবে। তখন কোনও অচেনা লোকের নামও সে উল্লেখ করত। আবার বিপরীত-ক্রমে, কখনও কোন নামী মানুষের নামও বলত। সে ব্যবসায়িক বিষয়গুলো স্থির করত, লেনদেনের আলোচনা চালাত; আবার নিজের বুট নিজেই পালিশ করত, নিজের সবচেয়ে ভাল জামা সে নিজেই ধুয়ে নিত, আর কাজে বেরিয়ে পড়ত। তবে কখনওই সে কিন্তু বেশি দূরে যেত না, একেবারে কাছের কোনও শহরে এসে থামত। কারও মানিব্যাগ চুরিও করত। তারপর নেশা করত। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, কখনওই, কিছুতেই সে তার কবল থেকে মুক্ত হতে পারত না। কেননা সে তার সম্পর্কে বলতে শুরু করেছে। তাকে ছাড়া তার একেবারেই চলত না— এমনকি এই স্বল্পকালীন পলায়ন অভিযানের মধ্যেও না।

আশ্চর্যের বিষয় হল, সে এখন তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠেছে। তার কদর্যতার বিনিময়ে সে এখন মদ্যপানের জন্যেও খরচ করতে প্রস্তুত, এবং এমনকি তার চেয়েও বেশি কিছু করতে রাজি। সুন্দরী মেয়েদের কাছে তার চেহারার বর্ণনা করে সে তাদের সন্মোহিত, বিস্ময়বিহ্বল করে দিত। এমনকি পরে সন্ধ্যায় যখন তারা একসঙ্গে মিলিত হত, আরও চমকিত হয়ে তারাও তার সম্পর্কে আরও জানতে চাইত।

তারপর সে ফিরে এসে, যখনি সে চাইত, তার কদর্যতা সম্পর্কে জনতার সামনে আরও নতুন গল্প পেশ করত— এমনকি তার চেয়েও বেশি কিছু হাজির করত, যদিও সে ভালভাবেই জানত, বিশেষ করে বলার মত কিছু বাদে তেমন কিছু সত্যিই বাস্তবে অমিল ছিল। প্রথম দিকে সেই গল্পগুলো তাদের বলতে বলতে মুখস্ত করিয়ে দিত। পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিল, দুনিয়ার কুৎসিততম এই মহিলার বানিয়ে গল্প বলার মত পটুতা একেবারেই নেই। সে কথা বলত বড় একঘেঁয়েভাবে এবং মাঝে মাঝেই শেষমেশ কান্নায় ভেঙে পড়ত। আর তখন লোকটিই তার হয়ে তাদের গল্প শোনাত। লোকটি একদিকে বসত, আর সে বসত উলটোদিকে— হাত দিয়ে তাকে দেখাত আর আউড়ে যেত তার গল্প: ‘যে দুর্ভাগা প্রাণীটিকে তোমরা সামনে দেখতে পাচ্ছ,— যার চেহারা তোমাদের নির্দোষ চোখে এত মারাত্মক ভয়ংকর, তার মা ব্ল্যাক ফরেস্টের ধার-ঘেঁষে থাকা একটি গ্রামে বাস করত। সেখানে, এক গ্রীষ্মের দিনে যখন সে জঙ্গলে জাম কুড়োচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে, এক বুনোশুয়োর তাকে আক্রমণ করে। সে তার উন্মত্ত জান্তব শয়তানির শিকার হয়ে পড়ে।’

এই সময়ে অবধারিতভাবেই তাকে ভয় পাওয়া চাপা কান্নার আওয়াজ শুনতে হয়। কিছু মহিলা, যারা তখনই উঠে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়— তারা তাদের স্বামীদের জামা ধরে টেনে নিয়ে সেখান থেকে চলে আসার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে থাকে।

তার কাছে এই গল্পের অন্য বয়ানও মজুত ছিল: ‘এই স্ত্রীলোকটি ঈশ্বরের অভিশপ্ত একটি দেশের। সে এক অশুভশক্তির ক্রুর-প্রজাতির বংশধর। এরা কপর্দকশূন্য দুর্বল মানুষদের কোনওরকম দয়া দেখাত না। এবং সেই কারণে সেই পুরো গ্রামটাকেই আমাদের সর্বশক্তিমান প্রভু এই ভয়ানক বংশানুক্রমিক কদর্য চেহারার সাজা দিয়েছেন।’

অথবা, তার আরও বিকল্প ছিল: ‘অধঃপতিত স্ত্রীলোকদের বাচ্চাদের বরাত এমনই হয়। এ হল সিফিলিসের ফল— অতীব ভয়ংকর ব্যাধি, যে দুর্ভোগের শাস্তি পরবর্তী পাঁচ জন্ম পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়!’

এসব বলার সময় তার মনে কখনও কোনওরকম অপরাধবোধ কাজ করত না। হয়তো এগুলোর কোনও একটি সত্যিও হলেও হতে পারে।
দুনিয়ার কুৎসিততম মহিলা একবার তাকে বলেছিল, ‘আমার বাবা-মা কারা জানিনা।’ সে বলত, ‘আমি তো সবসময় এরকমই ছিলাম। এই সার্কাসেই আমাকে পাওয়া গিয়েছিল। তখন আমি খুব ছোট। আজও কেউ মনে করতে পারে না, এখানে তখন ঠিক কি এসেছিল।’

তারা তাদের প্রথম মরসুম একসঙ্গে কাটানোর পর, যখন সার্কাসের দল অলসভাবে একেবেঁকে ভিয়েনার দিকে তাদের বার্ষিক শীতকালীন বিরতির জন্যে ভিয়েনার দিকে চলেছে, তখনই সে প্রস্তাব দিল। সে এতে খুবই লজ্জিত বোধ করল, ভিতর থেকে তার কাঁপুনি হল। আলতোভাবে তার মাথা লোকটির হাতে রেখে সে শান্তভাবে বলল, ‘বেশ, তাই হোক।’ লোকটি তার শরীরের সুঘ্রাণ উপভোগ করছিল। তার আবেদন ছিল নমনীয়, কিন্তু তোষামোদপূর্ণ। মুহূর্তটি লোকটির মোটামুটি সহনসীমার মধ্যেই কাটল। সে সহজ হয়ে তাকে বলতে লাগল তাদের যৌথ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। তারা কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবে, তার তালিকাও তৈরি হতে লাগল। যখন লোকটি ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিল, সেই সারাটা সময় ধরেই সে লোকটির ওপর একভাবে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিল। সে বড়ই মনমরা আর চুপচাপ ছিল সেসময়। অবশেষে সে লোকটির হাত ধরল, তারপর বলল, তার পছন্দ ঠিক উল্টো— তার মতে শহর-নগর থেকে বহু বহুদূরে কোথাও গিয়ে থাকলেও দিব্বি চলতে পারে তাদের জীবন। এবং সেখান থেকে অন্যত্র কোথাও যাওয়ার বা বাইরের কিছু দেখার প্রয়োজনও হবে না। তাদের বাচ্চারা সেখানেই মানুষ হবে, তাদের একটি বাগান থাকবে।

‘এসব তুমি সামলাতে পারবে না,’ লোকটি রাগে উত্তেজিত হয়ে বিরক্তির সঙ্গে পাল্টা জবাব দিল, ‘জন্ম তোমার সার্কাসে। তুমি চাও তোমার দেখভাল হোক। তার ওপর তুমি চাইছ, তুমি এমনভাবে মরতে চাও যা লোকজনের নজরে আসবে না।’

সে এর কোনও জবাব দিল না।

ক্রিসমাসে একটা ছোট্ট গির্জায় তারা বিয়ে সারল। যে যাজকটি তাদের বিয়েতে পৌরোহিত্য করছিল সে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বিয়ের মন্ত্র পড়ার সময় তার গলার স্বর কেঁপে উঠছিল বারবার। অতিথিরা সবাই ছিল সার্কাসের লোক, কেননা সে বলেছিল, তার পরিবারের লোক বলতে এরা ছাড়া তার আর কেউ নেই; এই দুনিয়ায় সে একেবারেই একা, যেটা সত্যিই তাই।

যখন তারা তাদের সিটে বসে ঝিমোচ্ছে, যখন সমস্ত বোতল খালি হয়ে গেছে, তখন ঘুমের সময় হয়ে গেছে। (এমনকি সেও খানিকটা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, লোকটির জামা ধরে সে টানাটানি করতে লাগল।) লোকটি প্রত্যেক অতিথিকে থাকার অনুরোধ করল, তাদের জন্যে আরও কিছু মদের অর্ডার দিল। যথাসাধ্য চেষ্টা করেও সে নিজে কিন্তু মাতাল হতে পারেনি। তার ভিতরের কিছু বোধ তখনও সতর্ক ও সজাগ— তারের মত টানটান সোজা। এমনকি কাঁধটাও কিছুতেই শিথিল করতে পারছিল না, যেমন পারছিল না পায়ের ওপর পা টেনে তুলতে। শিরদাঁড়া সিধে শক্ত করে সে বসেছিল। তার গাল রক্তিমাভ হয়ে উঠছিল, চোখ চকচক করছিল।

‘এবার তাহলে ওঠা যাক, প্রিয়তম।’ লোকটির কানে কানে সে ফিসফিসিয়ে বলল।

কিন্তু সে টেবিলের কিনারায় এসে বসে রইল। মনে হল সে যেন অদৃশ্য কোনও পেরেকে শক্তভাবে আটকে গেছে। অতিথিরা যতই তাকে খুব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছিল, সে ততই আরও বেশি ভয় পাচ্ছিল আসন্ন অন্তরঙ্গতা নিয়ে, যা কিনা বিধিসম্মতভাবে একটি আবশ্যিক বিবাহোত্তর কর্তব্যবিশেষ। ঘটনাটি কি সত্যিই সেরকম কিছু ছিল?

অন্ধকারে সে লোকটিকে বলেছিল, ‘তুমি আমার মুখখানা ছুঁয়ে দেখ।’ সে কিন্তু তা করতে পারেনি। ঘরের বাকি অংশ থেকে খানিকটা ফিকে অন্ধকারে তার ‘সিলুএট’ বা ‘ছায়াপরিলেখ’-এ দৃশ্যমান থেকে অবশ্য তারা অন্তরঙ্গ হয়েছিল— তা ছিল পরিষ্কার সীমারেখাহীন আবছা সেই দৃশ্য। তারপর লোকটি চোখ বন্ধ করল, তবে সে কিন্তু তাও দেখেনি।

তারা নিজেদের মত করে শুরু করল পরের মরসুম। লোকটি তার কিছু ফটোগ্রাফ পৃথিবীর সর্বত্র পাঠিয়েছিল। টেলিগ্রাফ মারফৎ বুকিং আসতে লাগল। বহুবার তারা জনসমক্ষে এসেছে, প্রথম শ্রেণিতে ভ্রমণ করেছে। স্ত্রীলোকটি বরাবর হ্যাট ও তার সঙ্গে পরত ধূসর রঙের ভারি পর্দা, যার আড়াল থেকে দেখেছে রোম, ভেনিস, প্যারিসের সাঁজ-এলিজে প্রাসাদ। স্ত্রীর জন্যে সে প্রচুর জামাকাপড় কিনেছে। এমনকি তার কাঁচুলি ইত্যাদি অন্তর্বাসের ফিতেও লোকটি নিজেই বেঁধে দিয়েছে। কেননা ইউরোপের শহরগুলোর জনাকীর্ণ রাস্তায় তারা যখন হাঁটবে, সেসময় যেন তাদের সন্দেহাতীতভাবেই স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর মত লাগে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, ভাল সময়ে লোকটি মাঝেমাঝেই উধাও হয়ে যেত। এ আর কিছুই নয়, লোকটি আসলে এমনই ছিল: চিরকালীন ঘরছুট ফেরারি। কখনও কখনও একধরনের ভয় তার মধ্যে আচমকা জেগে উঠত। তখন সে এক অসহ্য উদ্বেগময় ঘোরতর সংশয়ের আক্রমণের শিকার। সে তখন ঘামতে শুরু করে, তার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আর তাই টাকার বান্ডিল গুছিয়ে, টুপি তুলে নিয়ে সে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়। অভ্রান্তভাবেই তারপর সে জাহাজঘাটার কাছে কোথাও নিজেকে আবিষ্কার করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুব দেয়। এখানেই সে বিশ্রাম পায়— তার মুখে চাপের চিহ্ন শিথিল হয়ে আসে। তার চুল এলোমেলো, পেছনদিকের টাকের অংশটা— যা নকল চকচকে কোঁকড়ানো চুলে ঢাকা থাকে, সেটা বেপরোয়াভাবে জেগে ওঠে আর সবাই সেটা দেখতে পায়। তখন সে নির্দোষ অমল আনন্দে সেখানে বসে থাকে, মদ খায়। নিজেকে তার ইচ্ছেডানা মেলে আপন খুশিতে ভেসে যেতে দেয়। তখন সেটা চলে কোনও বারাঙ্গনার খপ্পরে পড়ে সবকিছু উড়িয়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অব্দি।

এই ঘটনার পর এই প্রথম কুৎসিততম মহিলা তার ব্যবহারে ভীষণ রেগে গিয়ে কিছু ঝাঁঝালো কথা শুনিয়েছিল। তখনই লোকটি হাত চালিয়েছিল। ঘুঁষি পড়েছিল তার পেটে। কেননা এমনকি তখনও সে তার মুখ স্পর্শ করতে ভয় পেত।

সেই থেকে সে আর সিফিলিস কিংবা জঙ্গলের বুনোশুয়োরের গল্পের অবতারণা আর করে না, যেমনটি আগে রুটিনমাফিক করত। খুব অল্পকিছুকাল আগে ভিয়েনার চিকিৎসাবিজ্ঞানের একজন প্রফেসরের একটি চিঠি সে পেয়েছে। আজকাল সে তার স্ত্রীকে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে উপস্থাপিত করতে আগ্রহী:

‘মহোদয়া ও মহোদয়বর্গ, আমাদের সামনে এবার প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালি সৃষ্টি। এখানে উপস্থিত জীববৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের আর একটি রূপ— ‘মিউট্যান্ট’, বিবর্তনের ভ্রম, আর আদত ‘মিসিং লিঙ্ক’। এই ধরনের নমুনা খুবই বিরল। এমন একজনের জন্মের সম্ভাবনা— এই আমি ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি— সেখানে আকাশের কোনও অতি ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ড আছড়ে পড়ার সম্ভাবনার মতই অতি ক্ষীণ!’

অবশ্যই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের কাছে যেত, তার সঙ্গে দেখা করত। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছবি একসঙ্গে নেওয়া হত। ছবিতে স্ত্রীলোকটি বসে থাকত, লোকটি তার কাঁধে হাত রেখে পেছনে দাঁড়াত।

একবার যখন স্ত্রীলোকটির মাপজোক চলছে, তখন প্রফেসর লোকটির সঙ্গে কথা বলতে বসে গেলেন।

‘অবাক লাগছে, এই ধরনের মিউটেশন কি নেহাতই বংশানুক্রমিক?’ তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, তোমরা কি বাচ্চা নেওয়ার কথা ভেবেছ? চেষ্টা করেছ? আসলে, তোমরা কি…?’

এর অনতিকাল পরে— হয়তো সেটা এই কথোপকথনের সঙ্গে সম্পর্কিত নাও হতে পারে— লোকটিকে সে জানিয়েছিল, সে গর্ভবতী। এর পর থেকেই মানুষটি দুটি বিভাজিত সত্ত্বায় থাকতে শুরু করল। লোকটি চাইত, সন্তান হোক সবদিক থেকে ঠিক তার মায়েরই মত। তেমনটি হলে তারা আরও বেশি যোগাযোগ তৈরি করতে পারবে, আসবে আরও বেশি ডাক বা আমন্ত্রণ। প্রয়োজনে সে তার জীবিকার দীর্ঘস্থায়িত্ব সুনিশ্চিত করে নিতে পারবে, এমনকি ইতিমধ্যে স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে গেলেও। আর, কালে সে একজন নামজাদা মানুষ হয়ে উঠবে— এমন সম্ভাবনাও কি আছে? কিন্তু একই সঙ্গে শিশুটি একটি ভয়াল দানব হয়ে উঠবে কি না সেই চিন্তাও তাকে পেয়ে বসে। মায়ের মত তাকেও যেন অভিশপ্ত জীবন না কাটাতে হয়, সেজন্যে প্রয়োজনে মায়ের বিষাক্ত ত্রুটিসংকুল রক্তের সংমিশ্রণের বিপদ থেকে রক্ষা করতে বরঞ্চ সে তাকে তার পেট চিরে বের করে আনবে। সে স্বপ্ন দেখে, যে শিশুটি বন্দিদশায় তার এমন একজন স্ত্রীলোকের গর্ভে শুধু তারই আদর-ভালবাসায় বাড়ছে, সে তার ছেলে। এবং গর্ভের ঘেরাটোপে বেঁধে ধীরে ধীরে সে তার মুখের আকৃতি বদলে দিচ্ছে। আবার এমনও হয়— সে স্বপ্নে দেখল, জঙ্গলের এক হিংস্র বুনোশুয়োর একটি নিষ্পাপ মেয়ের পিছু নিয়েছে। এর পরেই সে ঘামতে ঘামতে জেগে উঠে প্রার্থনা করতে থাকে— তার স্ত্রীর গর্ভধারণ যেন নিষ্ফল হয়।

তার সেই গর্ভই দর্শকদের সাহস জুগিয়েছিল। তার কিম্ভুত-কদাকার চেহারাকে মাফ করে দেওয়ার কাজটা দর্শকদের পক্ষে হয়ে গিয়েছিল সহজতর। তারা তাকে নানারকম সওয়াল করতে শুরু করল। শান্ত, কিন্তু দুর্বল প্রত্যয়ে সেও সলজ্জভাবে সেসবের জবাব দিত। তাদের নিকট পরিচিত মানুষেরা— কেমন হবে সেই সন্তান— এবং সে ছেলে, নাকি মেয়ে— এই নিয়ে বাজি ধরতে শুরু করল। মেষশাবকের মত সে সবই শান্তভাবে নিত ও জবাব দিত।

সন্ধেবেলায় সে বাচ্চার জন্যে জামা সেলাই করতে বসত।

‘দেখো’, এক মুহূর্ত থেমে দূরের কোনও একটি জায়গায় তার দৃষ্টি স্থির রেখে তখন সে বলত, ‘মানুষ কত ভঙ্গুর, কত একলা। যখন লোকজন আমার সামনে এসে বসে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে, তখন এদের জন্যে সত্যিই দুঃখ হয়। তখন মনে হয়, তারা নিজেরাই আসলে এক শূন্যতায় ভুগছে। মনে হয় তাদের কোন জিনিসকে ভাল নজরে নিয়ে নিজেদের পূর্ণ করে নেওয়া উচিত। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, তারা সবাই আমায় হিংসে করে। আমি অন্ততপক্ষে কেউ একজন তো বটে। অন্যরকম কোনও কিছু বোঝার মত বোধ তাদের নেই— নিজেদের বিশেষত্বটুকুও বুঝতে পারে না।’

সে যখন একথা বলছিল, লোকটি সংকোচে চুপ করে রইল।

সেই রাত্রে কোন হইচই ঝামেলা ঝঞ্ঝাট ছাড়াই প্রাণীদের মত সে প্রসব করল। ধাই এসেছিল শুধু নাড়ি কেটে দিতে। বিষয়টি অতিশীঘ্র ছড়িয়ে না পড়া নিশ্চিত করতে লোকটি ধাইয়ের হাতে একটি নোটের বান্ডিল তুলে দিয়েছিল। তার হৃৎকম্প শুরু হয়েছিল। সবকিছু ভালভাবে দেখার জন্যে তখনই সে সব লাইট জ্বেলে দিল। শিশুটি ভয়ংকর চেহারার— এমনকি তার মায়ের চেয়েও। তীব্র ঘেন্নায় লোকটির বমি পেতে লাগল। এর অনেক পরে সে নিজে সন্তুষ্ট হল শুধুমাত্র এই কারণে যে, নবজাতক কন্যাসন্তান— ঠিক যেমনটি তার মা বলেছিল।

তো এবার ঘটনটা ঘটল এইরকম: সে অন্ধকারময় শহরের পথ ধরল। শহরটা ভিয়েনা, কিংবা হতে পারে বার্লিন। ভিজে ভিজে হাল্কা বরফ পড়ছিল। এসময় পাথুরে রাস্তায় জুতো টেনে নিয়ে হাঁটা বড় যন্ত্রণাদায়ক। সে আবার মানসিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। সে খুশি, কিন্তু একই সময়ে তার মধ্যে কঠিন হতাশাও প্রবল।

সে মদ্যপান করতে লাগল, তবে মাতাল না হয়ে বেশ সুস্থির রইল। দিবাস্বপ্নের ঘোরে ছিল, তবে ভয়ও পেয়েছিল। এর বেশ কিছুদিন পর সে আবার যখন ফিরে এল, তখন তার ভ্রমণ-পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা— সবকিছুই একেবারে তৈরি।
ওদিকে সে প্রফেসরকে চিঠি লিখল। একজন ফটোগ্রাফার ডেকে নিল। সে লোকটি তার কাঁপা হাতে ম্যাগনেসিয়ামের আলোর ঝলকের পর ঝলকের মধ্যে সেই বিকটাকার প্রাণী-দুটোর চেহারার বিশাল বীভৎসতা নথি হিসেবে ধরে রাখল।

সে ভাবছিল, শীত শেষ হতেই, উজ্জ্বল হলুদ বাহারি ফরসিথিয়া ফুল ফুটতে থাকে, বড় বড় শহরের রাস্তার পাথর শুকিয়ে উঠতে থাকে। পিট্স্‌বার্গ, বুখ্রেস্ট, প্রাগ্‌,ওঅরশো— আরও আরও দূরের নিউ ইয়র্ক, বুএনস্‌ আইরেস্‌ পর্যন্ত। পৃথিবীর ওপরে প্রকাণ্ড মেঘমুক্ত উজ্জ্বল উন্মুক্ত নীল আকাশ যতই টান টান প্রসারিত হতে থাকে, তামাম দুনিয়া তখন মা ও মেয়ের চেহারার কদর্যতার জাদুকরী মোহিনী মায়ায় আচ্ছন্ন হয়, নতজানু হয়ে পড়ে।

মোটামুটি সেই মুহূর্তেই— এই প্রথমবারের জন্যে তার মুখে চুম্বন করল। তবে তা ঠোঁটে একবারেই নয়— তার ভ্রূ স্পর্শ করে। ঝকঝকে উজ্জ্বল চোখে মনুষ্যসুলভ দৃষ্টিতে সে লোকটির দিকে চেয়ে রইল। তারপর কিন্তু প্রশ্নটা আবার ফিরে এল— যে প্রশ্ন সে আগে তাকে কখনও করেনি— ‘কে তুমি? —বলো, তুমি কে? কে?’ সে বারবার করে জানতে চাইল। সে খেয়ালই করতে পারল না, অন্যরা যে প্রশ্ন তুলেছিল, সেই প্রশ্নটি কখন সে নিজেও শুরু করেছিল। এমনকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাড়ি কামানোর সময়েও তার কিছুই মনে এল না। এক সময় তার মনে হল সে যেন একটা রহস্যের জট খুলতে পেরেছে। রহস্যটা হল, আসলে দুনিয়ায় প্রত্যেকেই ছদ্মবেশে ঘুরছে। বহিরঙ্গে মানুষের মুখগুলো আদতে মুখোশ— সারা জীবনটাই যেন এই মুখোশ-পরা মানুষদের ভেনিসীয় নৃত্য-মেলা। মাঝে মধ্যে নেশার ঘোরে তার মাথায় এমনই সব অদ্ভুত কল্পনার উদয় হয়, স্বাভাবিক সময়ে অবশ্য এমন কোন উদ্ভট আজগুবি চিন্তার স্থান নেই। আলতো হাতে কড়কড় শব্দে আঠা-লাগানো কাগজের পটি খুলে মুখোশগুলোকে সরিয়ে দিতে দিতেই চোখের সামনে বেরিয়ে পড়ছিল…। কি সেটা? সে জানে না। প্রশ্নটা তাকে হয়রান করছিল এতটাই যে, স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে এভাবে ঘরে আটকে থাকার বিড়ম্বনা সে আর নিতে পারছিল না। লোকটির ভয়, একদিন না একদিন এই অদ্ভুত অতিস্পৃহ অনুসন্ধিৎসা তাকে ছাড়তে হবে, শুরু করতে হবে তার মুখমণ্ডলের বীভৎসতার আস্তরণকে ঘষেমেজে সাফ করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। সে তার মাথার চুলের মধ্যে সেই আঠা-লাগানো লুকোনো পটি আর ফিতের শেষ প্রান্ত খুঁজতে আঁতিপাঁতি করে হাতড়াতে লাগল। গলা ভিজিয়ে নেওয়ার জন্যে সে ঘর ছেড়ে সে দ্রুত বেরিয়ে গেল। এবার তাকে তাদের পরবর্তী ভ্রমণের সূচি, পোস্টারের নক্সা আর নতুন টেলিগ্রামগুলোর খসড়া তৈরি ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হবে।

কিন্তু এরপরেই— বসন্তের শুরুতেই শুরু হল সেই ভয়ংকর মহামারী— স্প্যানিশ ফ্লু। মা আর শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ল। তীব্র জ্বরের বিকারে কাবু হয়ে তারা পাশাপাশি জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকত আর ভারি শ্বাস টানত। আতঙ্ক-তাড়িত অপত্যস্নেহের সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই সে বাচ্চাকে নিজের মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখত। কিন্তু কিছু শুষে নেওয়ার বিন্দুমাত্র শক্তিও তখন যে আর শিশুটির নেই— সে মৃত্যুপথযাত্রী। অবুঝমতি মা জ্বরের ঘোরে প্রলাপের মধ্যেও সন্তানকে খাওয়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত শিশুটি মারা গেল। লোকটি সযত্নে তাকে সরিয়ে নিয়ে বিছানার একধারে শুইয়ে দিল। তারপর একটা সিগারেট ধরাল।

সেই রাত্রে অল্প কিছুক্ষণের জন্যে কুৎসিততম মহিলার জ্ঞান ফিরে এল। সেই সময়টুকু শুধু বাঁধভাঙা চরম হতাশায় ডুবে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ডুকরে, গোঙানি দিয়ে কেঁদে ওঠার জন্যেই ছিল। এ কান্না লোকটি আর সহ্য করতে পারছিল না— এ ছিল রাত্রির কণ্ঠস্বর— অন্ধকারের অট্টরোল, নিবিড়তম কালো অতল অপ্রমেয় গহ্বর। সে তার কান ঢেকে রইল, শেষে টুপিটি আঁকড়ে নিয়ে ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল। সে অবশ্য বেশিদূর এগোতে পারেনি। সে তার বাড়ির জানলার নীচে সকাল পর্যন্ত অনবরত পায়চারি করতে লাগল। আর এইভাবেই সে তার মৃত্যুতেও সাহায্য করেছে। যেমনটি আশা করেছিল, এবার তার থেকেও বড় তাড়াতাড়ি ঘটনাটি ঘটে গেল।

সে নিজেকে তাদের শোওয়ার ঘরে বন্দি রেখে দুটো মৃতদেহের দিকে একভাবে চেয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে হল, লাশ দুটো ভারী, বোঝার মত, দৃঢ়কায় কোনও অস্তিত্ব। ওদের পিঠের নিচে বিছানার গদিটার খানিকটা নেমে যাওয়া দেখে সে আশ্চর্য হয়ে গেল। সে ভেবে পেল না ইতিকর্তব্য এখন কী হবে। এ অবস্থায় তাই প্রফেসর ছাড়া বলার জন্যে আর কাউকেই সে পায়নি। বোতল থেকে সরাসরি মদ ঢেলে খেতে লাগল, বসে বসে দেখতে লাগল বিছানার নিথর মূর্তি দুটোর দেহরেখায় ধীরে ধীরে এসে পড়ছে ভোরের প্রথম আলো।

প্রফেসর পোস্টমর্টেমে আসতেই অসংলগ্ন কণ্ঠস্বরে সে একবার তাঁকে অনুরোধ করল, ‘প্রফেসর, এদের বাঁচান।’

‘পাগল নাকি? ওরা বেঁচে নেই।’ প্রফেসর তীক্ষ্ণভাবে সোজাসাপ্টা জবাব দিলেন।

কিছুক্ষণ পরে তিনি তার হাতে একটুকরো চিরকুট তুলে দিলেন। মৃতদার মানুষটি বাঁ হাতে টাকা নিতে নিতে ডান হাতে সেই কাগজে সই করল।

সেই দিনই জাহাজঘাটার দিকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে সে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক অব্দি লাশদুটি পৌঁছে দেওয়ার জন্যে গাড়ির বন্দোবস্ত করে প্রফেসরকে সাহায্য করেছিল। সেখানে দেহ দুটি গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণযোগ্য করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে— যতক্ষণ পর্যন্ত না অপেক্ষাকৃত ভাল সময় ফিরে আসে— তা প্রায় কুড়ি বছর হবে— সংরক্ষিত দেহ দুটি বিল্ডিংয়ের হিমশীতল বেসমেন্টে রাখা ছিল। তারপর সেখান থেকে তাদের তুলে আনা হয় মূল সংগ্রহসম্ভারে, যেখানে তারা জুড়ে গেল কিছু ইহুদি ও স্লাভনিক মানুষের করোটি, জোড়া-মাথাওয়ালা শিশু, একত্রে জুড়ে-থাকা যমজ ইত্যাদির সম্ভাব্য সবরকমের বহু বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে। আজও সেখানকার প্যাথোলজি-অ্যানাটমি প্রদর্শশালায় কাচের মত চকচকে চোখের সেই মা ও তার মেয়েকে দেখতে পাওয়া যায়। কিছু নতুন অসফল প্রজাতির অবশিষ্টাংশ হিসেবে নিখুঁত মর্যাদাপূর্ণ ভঙ্গিতে হিমায়িত হয়ে আজও তারা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

***

লেখক পরিচিতি

ওল্গা তোকারচুক (১৯৬২-বর্তমান): সমকালীন পোলিশ সাহিত্যের স্বনামধন্য লেখিকা। ওল্গা নওয়োজা তোকারচুকের জন্ম পোল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের জিয়েলোনা গোরা কাউন্টির অন্তর্গত সুলেচাও শহরে এক শিক্ষক পরিবারে। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বাড়িতে একটি লাইব্রেরি ছিল, নানা বিষয়ে পড়াশোনা— বিশেষ করে সাহিত্যের প্রতি তাঁর আজীবনের সখ্যতা গড়ে ওঠে সেখান থেকেই। ১৯৭৯ সালে ‘নাতাশ্চা বোরোদিন’ ছদ্মনামে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম দুটি ছোটগল্প। পোল্যান্ডের ওঅরশো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে কিছু সময়ের জন্যে মনোবিদ হিসেবেও কাজ করেন। এছাড়া শিক্ষকতার প্রশিক্ষণও নেন। এসব কিছুর সঙ্গেই চলতে থাকে তাঁর প্রিয়তম বিষয় সাহিত্যচর্চা। অজস্র উপন্যাস কবিতা ছোটগল্প ও সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় তিনি আধুনিক পোলিশ ভাষা ও সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।

এপর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় ৪০টি অগ্রগণ্য ভাষায় তাঁর বহু বই অনুদিত হয়েছে। তাঁর দেশ ও ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় বহু পুরস্কার ছাড়াও বিশ্ব-খ্যাত ‘ম্যান্‌ বুকার ইন্টারন্যাশনাল’ পুরস্কারও তিনি লাভ করেন। সাহিত্যে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিতে তাঁকে ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক-প্রদানে সম্মানিত করা হয় ২০১৯ সালে। নোবেল কমিটির প্রশস্তিপত্রে লেখা হয়: ‘লেখিকার সাহিত্যকৃতিতে বর্ণনাকুশল কল্পনাশক্তি ও তাঁর বহুবিচিত্র জ্ঞানানুসন্ধান-প্রসূত আবেগের সহযোগে সীমাবদ্ধতার প্রাচীর অতিক্রমণ প্রক্রিয়া জীবনেরই একটি অন্যতম প্রবৃত্তি হিসেবে প্রতীয়মান।’

‘প্রিমেভ্যাল অ্যান্ড আদার টাইমস’, ‘ফ্লাইটস’, ‘ড্রাইভ ইয়োর প্লাউ ওভার দ্য বোন্স অফ দ্য ডেড্‌’, ‘দ্য বুকস অফ জ্যাকব’ তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »