Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বাংলার কাঁথা: গায়েই শুধু নয়, জড়িয়ে বাঙালি জীবনে

ছেঁড়া ধুন্ধুরি একটি কাঁথা। তৈরি হয়েছে খাঁটি কাপাস তুলো দিয়ে আর তার পাশে সাজিয়ে রাখতে বালিশ তৈরি হয়েছে শিমুল তুলো দিয়ে। শিমুল তুলোর বালিশ ভীষণ নরম। তাই গ্রামের মায়েরা তাঁদের শিশুদের জন্য শিমুল তুলোর বালিশ ব‍্যবহার করতেন। আর ধুন্ধুরি মানে ছিন্নভিন্ন। তবুও এই ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে বাংলা প্রবাদে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে মানুষ। চাদর জাতীয় পরিধেয় হিসেবে বা বিছানায় পাতার শয্যাদ্রব্য হিসেবে বাংলায় বহুকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে কাঁথা। বাঙালির গায়েই শুধু নয়, বাঙালির জীবনের সঙ্গেও যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার হাতেবোনা কাঁথা।

জন্ম থেকেই গ্রামবাংলার শিশুদের কাঁথার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। মোলায়েম কাপড়ে তৈরি হওয়ায় সদ্যোজাতকে কাঁথায় একপ্রকার মুড়িয়ে রাখা হয়। বাংলার ঘরে ঘরে মায়ের শরীরের ওমের মত কাঁথা যেন জড়িয়ে থাকে শৈশবের গায়ে। কাঁথা গায়ে এক বাঙালি বিশ্বজয় করেছেন। তিনি ‘গীত গোবিন্দম্’ রচয়িতা কবি জয়দেব। ভারতের বেশিরভাগ আধুনিক ভাষা এবং বহু ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত তাঁর ‘গীত গোবিন্দম্’ কাব্য পড়ে আপ্লুত হয়েছিলেন জার্মান মহাকবি গ্যোটেও। কাঁথা-প্রীতির জন্য কবি জয়দেবকে ডাকা হত ‘কন্থারী’ নামে।

আবার বাংলার সাধু-সন্ন্যাসীদের একটি সম্প্রদায় এই কাঁথা গায়ে দিয়েই সাধন-ভজন করেন। কাঁথা গায়ে দিয়ে থাকেন বলে তাঁরা ‘কন্থারী’ নামে পরিচিত। দীক্ষার পর শিষ্যের কাঁধে তুলে দেন একটি কাঁথা। এটিই গুরুর আশীর্বাদ। এরপর থেকে ওই কাঁথাই হয়ে দাঁড়ায় গুরুভক্তি ও সাধনার উপকরণ। সংস্কৃত শব্দ কম্+থন্+আ=কাঁথা। আর শুদ্ধ ভাষায় তা ‘কন্থা’। এই কাঁথা গায়ে দেওয়া সাধুরা ‘কন্থারী’ নামে পরিচিত। এর মূলে রয়েছে গুরুবাদ। পরবর্তী সময়ে এই কাঁথাই হয়ে যায় বাউলদের সাত তাপ্পিমারা আলখাল্লা। তবে কাঁথা থেকে আলখাল্লায় পৌঁছতে সময় নিয়েছে অনেকে।

আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থে বাউলদের সম্পর্কে লিখছেন, ‘এই সম্প্রদায়ীরা তিলক ও মালা ধারণ করে এবং ওই মালার মধ্যে স্ফটীক, প্রবাল, পদ্মবীজ, রুদ্রাক্ষ প্রভৃতি অন‍্যান‍্য ও বিনিবেশিত করিয়া রাখে। ডোর কৌপিন ও বহির্বাস ধারণ করে এবং গায়ে খেলকা পিরাণ অথবা আলখাল্লা দিয়া ঝুলি, লাঠি ও কিস্তি সঙ্গে লইয়া ভিক্ষা করিতে যায়।… ক্ষৌরি হয় না, শ্মশ্রু ও ওষ্ঠলোম প্রভৃতি সমুদয় কেশ রাখিয়া দেয় এবং মস্তকের কেশ উন্নত করিয়া একটি ধমিল্ল বাঁধিয়া রাখে।’

এ তো গেল গায়ে দেওয়া কাঁথা। এবার আসি শোবার কাঁথায়। কথায় বলে, ‘তোর ক‍্যাঁথায় আগুন!’ মানে কাঁথায় আগুন লাগলে সব শেষ। কাঁথার সঙ্গে শরীর পুড়ে বেগুন পোড়া। কাঁথায় যখন কারুকাজ অর্থাৎ নকশা করা হয়, তখন তার নাম হয় ‘নকশি কাঁথা’। কবি জসীম উদ্দিন ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে নরনারীর অবিনশ্বর প্রণয়ের পাশাপাশি বাংলার কাঁথাকেও অমরত্ব দিয়ে গিয়েছিন। বর্তমানে নানা রূপে নানা নামে নানা ধরনের কাজে ব্যবহারের উপযোগী নকশি কাঁথার চল রয়েছে।

মহাভারত, উদ্যোগ পর্ব, ৯৩ অধ‍্যায়, ২২ শ্লোক থেকে জানা যাচ্ছে: ‘ইত‍্যেবমুক্তা বচনং বৃষ্ণীনামৃতভস্তদা।/ শয়নে সুখ সংস্পর্শে শিশ‍্যে যদুসুখাবহঃ।।’ অর্থাৎ, কুরুপাণ্ডব সভায় সন্ধি সম্পর্কে কৌরবদের সঙ্গে যে সব কথাবার্তা হয়েছিল, শ্রীকৃষ্ণ সেসব বিদুরকে বলে সুখ সংস্পর্শ আরামদায়ক বিছানায় শুয়েছিলেন। এ বিষয়ে মহাভারতের টীকাকার আচার্য নীলকণ্ঠ ‘সুখ সংস্পর্শে’ ও ‘যদুসুখাবহ’ শব্দের অর্থ করেছেন, ‘মহার্ঘ শয্যা’ বলে। এই ‘মহার্ঘ শয্যা’ কী দিয়ে তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে মহাভারতকার ব‍্যাসদেব কিছু না বললেও তা যে দামি কাঁথা দিয়ে ছিল, তা ধরে নেওয়া যায়।

জেলা বীরভূমের খয়রাসোল থানার কালিন্দীর পাটে কাঁথা গায়ে এক ‘কন্থারী সন্ন্যাসী’-র অদ্ভুত কর্মকাণ্ডের কথা জানা যায়। শাল নদীর তীরে অবস্থিত জায়গাটা। সময়কাল খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী। জেলা বীরভূমের বর্তমান প্রান্তিক অঞ্চল তখন ছিল এ জেলার রাজধানী। রাজনগরে তখন রাজত্ব করছেন জনসাধারণের কাছে বীরত্বের জন্য খ‍্যাতকৃত‍্য ‘বীররাজ’ বসন্ত চৌধুরী। কথিত আছে, একবার রাজধানী রাজনগরে আসেন কাঁথা গায়ে এক সন্ন্যাসী। তিনি যাবার সময় কাঁথাটি ফেলে যান। খবর যায় রাজার কাছে। কাঁথাটি অন্য কোথাও সরিয়ে রাখার বহু চেষ্টা হলেও কিন্তু কেউই সেটিকে তুলতে পারলেন না। চারদিকে খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেল, কোথায় সেই সন্ন্যাসী?

একসময় সন্ন্যাসী নিজেই এলেন তাঁর ফেলে যাওয়া কাঁথার খোঁজে। অকুস্থলে এসেই এক হাত দিয়ে কাঁথাটিকে তুলে নিলেন কাঁধে। এ ঘটনায় সন্ন্যাসীর ‘অলৌকিক শক্তি’-র কথা ছড়িয়ে পড়ল এলাকায়। জানা গেল, সন্ন্যাসীর নাম বীর কালিন্দী। এরপর নিজের ইষ্টদেব গোপালকে প্রতিষ্ঠিত করতে বীররাজ বসন্ত চৌধুরীর কাছে প্রয়োজনীয় জমি চেয়ে বসলেন বীর কালিন্দী। এও জনশ্রুতি যে, রাজা এক অভিনব শর্তে জমি দিতে রাজি হন। শর্তটি হল, সন্ন্যাসী একবার প্রস্রাব করে যতটা জায়গায় গণ্ডি দিতে পারবেন, ততটা জমিই তাঁকে দান করা হবে।

এরপর রাজার শর্ত মেনে সন্ন্যাসী বীর কালিন্দী বীরভূম জেলার বর্তমান খয়রাসোল থানার মানকর মৌজায় শাল নদীর তীরের ঘন জঙ্গলটি নিজের উপাসনাস্থল হিসেবে বেছে নিয়ে একবারের পেচ্ছাপেই গণ্ডি কেটে দেন ২৫ একর জমিতে। শর্ত অনুযায়ী বীররাজ বসন্ত চৌধুরী তাম্রপত্রে সেই ২৫ একর জায়গা দান হিসেবে লিখে দেন সন্ন্যাসী বীর কালিন্দী তথা তাঁর গোপালের নামে। সেই থেকে স্থানটির নাম হয়ে গেল ‘কালিন্দীর পাট’। সেখানেই একদিন যোগবলে দেহত্যাগ করলেন সাধক বীর কালিন্দী। প্রতি বছর দোসরা ডিসেম্বর এই উপলক্ষে কালিন্দীর পাটে আয়োজিত হয় গোপাল তথা বীর কালিন্দীর নামে বিশেষ পুজো ও মহোৎসব।

এবার আসি ভারতবর্ষে কাঁথার ব্যবহার ও তার সম্ভাবনার কথায়। তবে তার আগে ভারতীয় সংস্কৃতির কথা বলতেই হয়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যে ধারাটি মাতৃপ্রধান, সেই ধারাটি হল অ-বৈদিক এবং সেটি মূলত তান্ত্রিক ধারা। দেশের শাসক সম্প্রদায় বৈদিক পিতৃপ্রধান ধারাটি গ্রহণ করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অ-বৈদিক ধারাটি প্রবলভাবে টিকে রইল। এর কারণ, এই অ-বৈদিক ধারাটির মধ্যে রয়েছে উৎপাদন পদ্ধতির ছায়া, যার ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা। সোজা কথায়, এই অ-বৈদিক তান্ত্রিক ধারাটি আসলে কৃষি আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িত।

আমাদের দেশে পুরুষ প্রাধান্যকে বলা হয়েছে বীজ প্রাধান্য এবং নারী প্রাধান্য সেখানে হচ্ছে ক্ষেত্র প্রাধান্য। পুরুষ প্রধান বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে, প্রজনন কাজে পুরুষের ভূমিকাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন, অথর্ব বেদ অনুসারে, বিয়ের সময় পুরোহিত বরকে বলবেন, এই নারীই হল তোমার ক্ষেত্র; সেই ক্ষেত্রে বীজ বপন করো তুমি। অন্যদিকে, মাতৃপ্রধান তান্ত্রিক ধারা অনুসারে, সন্তান উৎপাদন ও কৃষি ধন উৎপাদন— দুটোতেই পুরুষ হচ্ছে অ-প্রধান। এখানে নারীই জগদম্বা, নারী থেকেই সব কিছুরই জন্ম। প্রথমদিকে আর্য সমাজ মাতৃপ্রধান থাকলেও পরবর্তী সময়ে যখন কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে, তখন থেকে সে সমাজ হয়ে যায় পুরুষতান্ত্রিক।

‘তন্’ ধাতুর উপর ‘ষ্ট্রন্’ প্রত‍্যয় করে হয় ‘তন্ত্র’। এই ‘তন্’ ধাতুর অর্থ হল— বিস্তৃত করা। বংশবিস্তারের একটি মুখ‍্য অর্থ হচ্ছে— তন্+অয়ট্=তনয়। আবার সম্+তন্+ঘঞ্=সন্তান। মনিয়র উইলিয়ামস দেখাচ্ছেন, পুরোনো পুঁথিপত্রে তন্ত্রের প্রজননার্থক অর্থ আছে। আবার শুধুমাত্র প্রজননই নয়, তন্ত্রের আক্ষরিক অর্থের মধ্যে খাদ্য উৎপাদনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ‘তন্’ ধাতুর অর্থ যে ‘বিস্তৃত করা’, তা অন‍্যদিকে শস্য উৎপাদনকেও বোঝায়।

তন্ত্রের আরেকটি গৌণ অর্থ হল, বয়ন কর্ম, যা কৃষিবিদ্যার পাশাপাশি মেয়েদেরই আবিষ্কার। এই বয়ন কর্ম অর্থাৎ সেলাই-ফোঁড়াই হচ্ছে অন্দরমহলের মেয়েদের একচেটিয়া কাজ, যা কাঁথা তৈরির মূল উৎস। সব দেশেই দেখা গিয়েছে, মূলত মেয়েরাই এই কাঁথা তৈরিতে নিয়োজিত এবং এই সূচিকর্মে তাঁরাই সিদ্ধহস্ত। জানা যায়, আগেকার দিনে তুলো ব্যবহার করে তৈরি হত কাঁথা। পরবর্তীকালে পরতে পরতে পুরনো ও নরম শাড়ি বা কাপড় বসিয়েই বোনা হত কাঁথা। নকশি কাঁথা হোক বা আটপৌরে কাঁথা, তাতে নানা বর্ণের সুতোয় মনের মাধুরী মিশিয়ে কাঁথার গায়ে নকশা তুলতেন মেয়েরা।

এছাড়া কাপাসের কথা উল্লেখ আছে কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকের শেষদিকে (১২৯০ খ্রি.) মার্কো পোলো বলছেন— গুজরাট, কাম্বে, তেলিঙ্গনা, মালাবার ও বঙ্গদেশে কাপাস ও কাপাস বস্ত্রের কথা। কাজেই কাপাস তুলো যেখানে উৎপন্ন হবে, সেখানে শোবার জন্য কাঁথাও তৈরি হবারই কথা। ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, পাকিস্তানেও কাঁথার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম এবং ওড়িশাতে একসময় কাঁথার বহুল ব্যবহার ছিল।

অন্যদিকে, চর্যাপদেও তুলো ধোনার কথা আছে। শান্তিপাদ বলছেন,
‘তুলা ধুঁনি আঁসুরে আঁসু।
আঁসু ধুনি ধুনি নিরবর সেসু।।
তুলা ধুঁনি ধু়ঁনি সুনে আহারিউ।
পুন লইয়া অপনা চটারিউ।।”

বাংলার ঘরে ঘরে পুরনো শাড়ির পাড় থেকে সুতো বের করে মায়েদের কাঁথা সেলাই আজ সোনালি অতীত। কালান্তরে শাড়ির সঙ্গে সঙ্গে হাতেবোনা কাঁথাও কমেছে বাঙালির তোরঙ্গে। বাংলার কাঁথা এখন বিজাতীয় নানা কম্বল ও ব্লাঙ্কেটের সঙ্গে লড়াই করছে এবং বলা ভাল লড়াই করে সে আরও অভিজাত হয়েছে। বাংলার কাঁথাকে নিয়েই গড়ে উঠেছে একশ্রেণির শৌখিন সূচিশিল্প, এর নাম ‘কাঁথা স্টিচ্’। আর উৎস থেকে বিবর্তনের পথ বেয়ে অতীতের ছেঁড়া কাঁথা এখন হরেক নকশা করা শৌখিন কাঁথা। গরিবের ছেঁড়া কাঁথার পাশাপাশি সেই শৌখিন অভিজাত নকশি কাঁথায় শুয়ে এখন বিত্তবানরাও স্বপ্ন দেখেন।

তথ‍্যসূত্র:
১) ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়: অক্ষয় কুমার দত্ত
২) তন্ত্রতত্ত্ব: শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব
৩) বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব: নীহাররঞ্জন রায়
৪) ব‍্যক্তিগত ক্ষেত্রসমীক্ষা

চিত্র: গুগল

One Response

  1. বাঃ খুব ভালো লাগলো। ঋদ্ধ হলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 8 =

Recent Posts

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহাশ্বেতা দেবী: স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

Read More »
মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »