বঙ্গভাষা জননী
অকস্মাৎ দিবাস্বপ্নে “বঙ্গভাষা জননী” আবির্ভূতা হইলেন। অবিন্যস্ত কেশ, ক্লিন্ন বেশবাস, বিষণ্ণ বদনে অশ্রুচিহ্ন। গলদশ্রু মাতা কহিলেন, “বৎস, আজিকে দেশান্তরী হইবার লগ্ন আসন্ন। দীর্ঘ দিনের স্থায়ী সম্মানের আবাস পরিত্যাগ করিতে…”, বলিতে বলিতে তাহার কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হইয়া গেল।
স্তম্ভিত বিস্ময়ে জিজ্ঞাসিলেম, “মাতা, কেন এত মতিভ্রম তব? কী করিয়াছি এ অধম সাহিত্য-সেবক মোরা? যুগযুগান্তর হইতে এই প্রদেশের ঘরে ঘরে অবহিতভাবে তোমার আরাধনা চলিয়াছে। দীর্ঘ শতকের অবসানে ম্লেচ্ছভাষাও তোমার অঙ্গে কালিমা লিপ্ত করিতে পারে নাই। তবে কেন এ বিভ্রম?”
মাতা কহিলেন, “তবে শুন বৎস, গোমুখের উৎস হইতে যেমন পবিত্র গঙ্গানদীর প্রবাহ ভারতকে ফল, ফসল ও পুণ্যদান করিতে আসিয়াছে, তেমনই পবিত্র দেবভাষা হইতে এই বঙ্গভাষা, মাগধী রূপ হইয়া বিবিধ ভাষারূপের সংমিশ্রণে গৌড়ীয় বঙ্গভাষার বর্তমান রূপ ধারণ করিয়াছে। এই বঙ্গভাষার গৌরবের ইতিহাস সহস্রাধিক বর্ষের”…! তিনি একটি সুদীর্ঘ শ্বাস ফেলিলেন, “কিন্তু বর্তমানে এই ভাষা অশিক্ষা, অবজ্ঞা ও অপরিশীলিত জিহ্বার অসংযত উচ্চারণ– পবিত্র ভাষাটিকে যেভাবে কলঙ্কিত করিতেছে, তাহা আমার পক্ষে সহনাতীত। এইবার বিদায় দাও বৎস!”
তাহার পদতলে বসিয়া কাঁদিয়া কহিলাম, “মাতঃ, জ্ঞানতঃ আমরা এই জাতীয় ভ্রান্তি কদাপি করি নাই। (বর্হিবঙ্গে) আমরা সদাই তোমার পদতলে শুদ্ধভাবে সাধনা করিয়াছি। তথাপি যদি কোনও ভ্রান্তি ঘটে মাতা, ক্ষম নিজগুণে!”
সস্নেহে শিরস্পর্শ করিয়া মাতা কহিলেন, “মাত্র এই ভরসাতেই এতকাল বাস করিয়াছি বৎস। পরন্তু, ভাষার প্রাণকেন্দ্র যে স্থল, সে স্থলে যে প্রাণঘাতী অনাচার চলিয়াছে, তাহা সহ্য করিবার সাধ্য অথবা শক্তি আমার নাই। ভরকেন্দ্র যদি বিচলিত হয়– তবে আমার স্থান কোথায়?”
আমার প্রশ্নচিহ্ন-চিহ্নিত কাতর মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া– মাতা ব্যাখ্যা কহিলেন, “অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও জুগুপ্সা যেখানে রথী, আত্মম্ভরিতা যাহার রথ, উৎকোচ ও লালসা যাহার রথের অশ্বদ্বয় এবং সেই রথের রশি টানিতেছে তথাকথিত জ্ঞানী, গুণী, শিল্পী ইত্যাদি। সেই রথচক্রে নিষ্পেষিত হইতেছে অগণিত প্রকৃত পবিত্র আত্মা! সেই অপবিত্র ভূমিতে পবিত্র মাতৃভাষার কোনও স্থান নাই।”
পরক্ষণে নিদ্রা টুটিয়া গেল, দেখিলাম, বঙ্কিমচন্দ্রের এক প্রবন্ধ পাঠ করিতেছিলাম। বাহিরে গলদ্ধার বৃষ্টিতে বিষণ্ণ, বিবর্ণ আকাশ, কর্দমিত ভূমি।
আমি কি সত্যই স্বপ্ন দেখিতেছিলাম?
চিত্রণ: বাপ্পাদিত্য জানা





