খুলনা জেলার আসাসুনি থানার বাইনতলা গ্রামের প্রফুল্ল বিশ্বাসের ছেলে অজিত বিশ্বাস এখন মালকানগিরির স্থায়ী বাসিন্দা। বয়স ৭২। এম ভি ৭৯ গ্রামে রাস্তার পাশে তাঁর বড় দোকান। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পরিমল সানা, কৃষক গৌতম রায়, চা-দোকানদার অমল মণ্ডল— এরাও কাছাকাছি গ্রামে বাস করেন। সকলেই আপাদমস্তক বাঙালি। বয়সের হেরফের সামান্যই। উড়িয়া বা হিন্দি ভাষাতে সড়গড় সবাই। কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় সে-সব উচ্চারণ হয়ই না। বরিশাল, ফরিদপুর এবং খুলনার বাঙাল-ভাষা চা-দোকানে মিলেমিশে একাকার। এককালে উদ্বাস্তুদের রেশন বিলির জন্য যে অফিসঘর বানানো হয়েছিল, সেটি এখন তালাবন্ধ। কিন্তু সামনের চায়ের দোকানটি সেদিনের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। রেশন নিতে আসা লোকের ভিড়ে চায়ের ব্যবসা করে জীবিকা চালাতেন অমলের বাপ। অমল এখন সেই ব্যবসা চালান। বয়স ৭০। ঝুপড়ি চায়ের দোকানটি এখন পাকা ঘর। সেই ঘরের সামনে বসে গল্প করছিলেন সবাই। তারিখটা ২৯ অক্টোবর ২০২৪। আমরা কয়েকজন কলকাতা থেকে এসেছি শুনে ওঁরা গল্প করায় আগ্রহী হলেন। আমাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছিলেন যিনি, তিনি বিষ্ণুপদ সানা। এককালের বাসিন্দা এখানকার। ১৯৭৮-এ মরিচঝাঁপিতে গিয়েছিলেন। তারপর ভাগ্য হেঁটেছে ভিন্নপথে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন সম্প্রতি। আমাদের সঙ্গে নিয়ে পুরনো স্মৃতি ছুঁয়ে দেখতে এসেছেন। অমলের চায়ের দোকানে প্রতি বিকেলেই অজিত-পরিমলরা গল্প করেন। বাংলা সিরিয়ালের গল্প, বাংলার রাজনীতির গল্প, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থার গল্প, নবীন পট্টনায়কের গল্প। আমাদের সঙ্গী বিষ্ণুপদ সানাকে চিনতে পেরে ওঁরা ফিরে গেলেন পুরনো কথায়।

১৯৭৮-৭৯-র কথা। এই অজিত, পরিমল, অমল, বিষ্ণু, গৌতমেরা তখন ২০-২৫ বছরের তরুণ। মাছ-ব্যবসায়ী সতীশ মণ্ডল এবং রেশন বণ্টনকারী রঙ্গলাল গোলদারের কথা বিশ্বাস করে ওঁরা সবাই সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে গিয়েছিলেন। ওঁরা মানে ওঁদের বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই। বিশ্বাস করার কারণও ছিল যথেষ্ট। কারণ সতীশ মণ্ডল, রঙ্গলাল গোলদার বা রাইহরণ বাড়ৈরাই তো শুধু ডাক দেননি। বিষ্ণুপদ-পরিমলদের কথায় জানা গেল, ডাক দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা রাম চ্যাটার্জির মতো অনেকেই। ১৯৭৭-এ এমপিভি-২৩ গ্রামের মাঠে বক্তৃতা করেছিলেন রাম চ্যাটার্জি। বলেছিলেন, ‘বাংলার মানুষ বাংলায় যাবেই।’ না, সুন্দরবন বা মরিচঝাঁপির কথা হয়তো উচ্চারণ করেননি। সে-সব সম্ভবত জানা ছিল না তাঁর। ‘হুগলির চন্দননগরের মানুষ। আদতে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত। অত কথা জানবেন কীভাবে?’ সন্দেহ প্রকাশ করলেন ওঁরাই। আরও জানা গেল, মানা ক্যাম্পে এসেছিলেন জাম্বুবত রাও, কৃপাসিন্ধু সাহা বাবুদের মতো নেতারাও। আশ্বাস দিয়েছিলেন তাঁরাও। মালকানগিরি তখন শুকনো খটখটে কাঁকুরে জমি। সারাদিন ধরে ঘাম ঝরালেও মাটি কথা বলে না। জোয়ার-বাজরা-মিলেট খেয়ে কি আর বাঙালির পেট ভরে? সতীশবাবুই বলেছিলেন, মরিচঝাঁপির কথা। মানুষটির একটি চোখ নাকি পাথরের। মাথায় লম্বা চুল রাখতেন। কিন্তু কথার মধ্যে জাদু ছিল। বলেছিলেন, লোনা মাছের ফিশারি হবে, সুস্বাদু মধু মিলবে, কাঠের ব্যবসা হবে। তারপর কয়েক বছর গেলেই লোনা জমি মিষ্টি হবে এবং শুরু হবে ধানচাষ। বরদাভাটা ক্যাম্পে উদ্বাস্তুদের সুন্দরবনের মধু খাইয়েছিলেন সতীশবাবুরা। লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে এক শিশি করে মধু। সেই মধু আবেগ তৈরি করেছিল ওঁদের মনে। সুন্দরবনের প্রতি আবেগ। জমির লোভ, মধুর লোভ, সর্বোপরি বাংলায় ফেরার লোভ সামলাতে পারেননি গরিব মানুষেরা। তাই দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের অধীনে পাওয়া জমি ছেড়ে, গোয়ালের গোরু ছেড়ে, ভিটে ছেড়ে— ওঁরা সবাই আর একবার উদ্বাস্তু হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। অজিত গিয়েছিলেন, বিষ্ণু গিয়েছিলেন, পরিমল গিয়েছিলেন। বাবা-মা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ওঁরা আর কী করবেন। কিন্তু চা-দোকানদার অমলের বাবা মঙ্গল যাননি। সরকারের দেওয়া আঠারো বিঘে জমি, ভিটে এবং চারটি গাই-বলদ ছাড়তে মায়া হয়। উদ্বাস্তু নেতাদের সমালোচনা সহ্য করেও রয়ে গিয়েছিলেন কইয়া উপজাতিদের প্রতিবেশী হয়ে। কিন্তু এরকম দু’চারঘর বাদ দিয়ে বাকি সব পাড়া জুড়ে হেঁটেছিল সুন্দরবনের পথে।

পরিকল্পনাটি শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। রামবাবুও তখন মিটিং করতে আসেননি। ১৯৭৫ সাল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সে-সময় মাননীয় সিদ্ধার্থশংকর রায়। সতীশবাবুরা আহ্বান জানিয়েছিলেন, বাংলায় ফেরার। সেই আহ্বানে মরিচঝাঁপির উদ্দেশে পা বাড়িয়েছিলেন লাখখানেক মানুষ। অজিত-পরিমল-বিষ্ণুরা তখন আরও ছোট। পোঁটলা-পুঁটলি মাথায় নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে পথ হেঁটেছিলেন। কিন্তু সুন্দরবনে পৌঁছাতে পারেননি সেবার। রায়পুর স্টেশন থেকে হাওড়ামুখী ট্রেনে চেপেছিলেন। সেখানকার পুলিশের বাধা টপকাতেও পেরেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের খড়্গপুরে ঢুকতেই সিদ্ধার্থবাবুর পুলিশের মুখে পড়েন। দুর্ভেদ্য ব্যবস্থা। পুলিশের কড়াকড়িতে উদ্বাস্তুরা আর এক পা-ও এগুতে পারেননি। লাঠি, গুলি, ধরপাকড়, মিসার কেস— নাজেহাল অবস্থা হয়। ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা। ‘আমরা বাঙালি’ বা ‘হোমল্যান্ড’ আন্দোলনের নেতারা পিছন থেকে অনেক আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই করতে পারেননি তাঁরাও। তারপরে আবার হুজুগ। হুজুগই বলা যায়। কেন না, অজিতবাবু বললেন, ‘সুন্দরবনের জল-মাটি সম্পর্কে সঠিক খবর না জেনে আমাদের এগুনো উচিত হয়নি। বলা হয়েছিল তৈরি জমি পাওয়া যাবে। কিন্তু তা হয়নি। মিথ্যে। আরও কঠিন জীবন ওখানে। চারিদিকে বিপদ। ভুল হয়েছিল যাওয়া।’ গলা মেলালেন বিষ্ণু, পরিমল, সুনীলেরা। পরিমল, সুনীল, তারক— এঁদের বাবা-মা হাসনাবাদ থেকেই ফেরতা ট্রেন ধরেছিলেন। ১৯৭৮-এর এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু টাকিতে লাখখানেক উদ্বাস্তুর সামনে ভাষণ দিয়েছিলেন। বারবার বলেছিলেন, ‘আপনারা ফিরে যান। উড়িষ্যা সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। সব অসুবিধা মিটে যাবে ড্যামগুলি তৈরি হলে।’ কিন্তু রঙ্গলালবাবু, সতীশবাবু কিংবা দেবব্রত বিশ্বাসরা সে-কথায় আমল দেননি। সুনীলের একটা বোন মারা গিয়েছিল হাসনাবাদ ক্যাম্পে। কলেরা হয়েছিল। তাকে নদীর চরে পুঁতে দিয়ে তাঁবুতে ফিরছিলেন। ফেরার পথে হাসনাবাদ স্টেশনে সরকারি একটি লিফলেট হাতে এসেছিল তাঁর। সেই লিফলেটে লেখা ছিল ফিরে যাওয়ার আহ্বান। তলায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নাম। কথাগুলি মনে ধরেছিল ওঁর। উদ্বাস্তু নেতাদের চোখ এড়িয়ে ফেরার ট্রেন ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ওঁরা। সঙ্গী হয়েছিল আরও শ’খানেক পরিবার। পুলিশ সাহায্য করেছিল। বর্ধমান স্টেশন থেকে হাজারে হাজারে ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন ওঁরা। কিন্তু ফেরার পথে বাধা দিয়েছিলেন উদ্বাস্তু নেতারা। লোক কমে গেলে হার হবে যে তাঁদের। মানুষ ভর্তি ট্রাক আটকে দেয় রাস্তায়। বর্ধমান স্টেশনের কাছে তো পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও বাধায়। কয়েক জন পুলিশকে পুড়িয়ে মেরেছিল ওরা। সে-সব বিশ্রী ব্যাপার। কিন্তু হাতে যাদের কিছু পয়সা ছিল তারা বাধা মানেননি। সবাই ফিরে গিয়েছিলেন। পরিমলের কথায় সংখ্যাটা প্রায় ৬০-৭০ হাজার। ‘দুধকুণ্ডি ক্যাম্প, মেদিনীপুর জজ কোর্টের ক্যাম্প হয়ে ফিরে এসেছিলাম কুরুদ ক্যাম্পে। সেখান থেকে মালকানগিরি।’ রয়ে গিয়েছিলেন খুব গরিব যারা তাঁরাই এবং নেতারা।

সন্ধ্যা নেমে এল কথা বলতে বলতে। অমল চা খাওয়ালেন আমাদের। পয়সা নেবেন না কিছুতেই। ওঁদের প্রত্যেকেরই অর্থনৈতিক অবস্থা এখন সচ্ছল। সি এন ১৩ নামে একধরনের ধান চাষ হয়। চিত্রকোণ্ডা বাঁধের জলাধার থেকে জলের অভাব হয় না। ফুটখানেক লম্বা ধান গাছ। কিন্তু ফসল হয় বিঘে প্রতি ২০-২৫ মণ। সারাবছরের খোরাকি রেখেও ফসল বিক্রি করা যায়। এছাড়া তিল ও ভুট্টার চাষ তো আছেই। আছে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা ছাড়াও নানা ধরনের কারবার। কইয়া উপজাতির সেই মানুষেরা এখন বাঙালিদের মতো হয়ে গেছেন। বাংলা ভাষা বোঝেন। বাঙালিদের দোকানে কেনাকাটা করেন। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়। অজিত জানালেন, ‘সব মানুষ যখন মরিচঝাঁপিতে চলে গিয়েছিল, তখন কইয়ারা অনেকেই আমাদের বাড়িঘর দখল নেয়। কিন্তু আমরা যখন ফিরে আসি, ওরা স্বেচ্ছায় বাড়িঘর ছেড়ে দিয়েছিল। কোনও ঝামেলা করেনি। তবে যারা মরিচঝাঁপি থেকে ফেরত আসে, তাদের জমিটা একটু কম হয়েছিল। জমি ফুরিয়ে আসছিল তো। আগে এসেছিল যারা তারা বেশি জমি পেয়েছে।’ অজিত বিশ্বাসের ভাগে জমি জুটেছিল চার একর ১৬ ডেসিমেল। গৌতম রায়ও তাই। ১৯৮১-তে যাঁরা মালকানগিরি ভিলেজে পুনর্বাসন পেয়েছেন প্রত্যেকেরই ওই একই পরিমাণ জমি। ১৬ ডেসিমেল ভিটে এবং বারো বিঘে জমি। জানা গেল, এখন এক বিঘে জমির দাম দশ থেকে পনেরো লাখ টাকা। সাজানো-গুছানো ভিটের ওপর নানা ধরনের সবজি এবং ফলের গাছ। জমি হাতছাড়া করতে চান না কেউ। মালকানগিরি আর পটেরু নদীর কূল ধরে মোট ৩৬০টি বাঙালি ভিলেজ। এম ভি এবং এম পি ভি। অর্থাৎ মালকানগিরি ভিলেজ এবং মালকানগিরি পটেরু ভিলেজ। সংখ্যাগুলি হল গ্রামের ক্রম। লাখ দেড়েক বাঙালি বাস করেন ওখানে। হরিনাম, যাত্রানুষ্ঠান, দুর্গাপূজা, কালীপূজা সবই আছে পাড়ায় পাড়ায়।

এবারে আসি ইতিহাসের কথায়। না, মহাকাব্যের দণ্ডক বন নিয়ে এখানে কিছু বলব না। বাঙালি যে দণ্ডকারণ্য নিয়ে আজও পথেঘাটে আফসোস করে, দুঃখ করে, সেই দণ্ডকের ইতিহাসই এবার বলব সংক্ষেপে। দেশভাগের পর যখন পশ্চিমবঙ্গের অকৃষিভূমি, খাসভূমি সমস্তই উদ্বাস্তুদের বসতিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল, তখন দরকার হয়েছিল নতুন ফাঁকা জমির। তাই ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন কেন্দ্র সরকারের উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়েছিল দণ্ডকারণ্য-পরিকল্পনা। এখানে উল্লেখ্য, দেশভাগের পর প্রথম দিকে যতটা সম্ভব উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গেই পুনর্বাসন দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্যবহৃত ইংরেজদের সেনাছাউনিগুলিতে, জমিদারি উচ্ছেদ পরবর্তী খাসজমিগুলিতে, এমনকি সুন্দরবনের জঙ্গল পরিষ্কার করেও উদ্বাস্তুদের বসতি গড়া হয়েছিল (ঝড়খালি, ডাবু এবং মথুরাপুরে)। কিন্তু ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে হজরতবাল মসজিদ-সংক্রান্ত ঘটনার পর দাঙ্গা হলে এবং ১৯৭০-এ রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার শুরু হলে পূর্ব-পাকিস্তানের কৃষিজীবী হতদরিদ্র মানুষেরা দলে দলে চলে আসেন এদেশে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পূর্ব-বাংলায় ১৯৭০-এর প্রবল ঘুর্ণিঝড়ের বলি হাজার হাজার মানুষ। তৎকালীন ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার এত বিপুল পরিমাণ উদ্বাস্তু এবং শরণার্থীর চাপ সামলাতে নাজেহাল হয়ে যায়। তাই একাংশকে পাঠানো হয় দণ্ডকারণ্যের অপ্রস্তুত ভূমিতে। সমসময়ে সে-সব নিয়ে বিতর্ক-আন্দোলন হয়েছিল অনেক। বাঙালি কৃষিজীবী উদ্বাস্তুরা বাংলার মাটিতেই থাকতে চেয়েছিলেন আপ্রাণ। কিন্তু স্বাধীনতার পর বর্গাদার আইন-সহ ভূমিসংস্কার আইনগুলি কার্যকর হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় সমস্যা হয়ে ওঠে বিপুল পরিমাণ এদেশীয় ভূমিহীন শ্রমিক এবং ভাগচাষিদের মধ্যে ভূমি-বণ্টন। পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের আগমনের পর সেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই দুঃসহ পরিস্থিতির চাপে সরকার বাধ্য হয়েছিল আন্দামান এবং দণ্ডকারণ্যের কথা ভাবতে। সেখানে প্রথমদিকে বিভিন্ন ক্যাম্পে ক্যাম্পে অস্থায়ী আশ্রয় গড়ে উদ্বাস্তুদের রাখা হয়েছিল। দণ্ডকারণ্যের মানা, কুরুদ, বরদাভাটা, মানাভাটা সেইসব ক্যাম্প এবং ট্রানজিট ক্যাম্পের নাম। তারপর জঙ্গল পরিষ্কার করে পটেরু নদীর জলকে কাজে লাগিয়ে, চিত্রকোণ্ডা-সতীগোড়া-ভাস্কল প্রভৃতি জলাধার নির্মাণ করে কাঁকর-ভর্তি জমিকে চাষযোগ্য করার চেষ্টা হয়। এখানে মনে রাখতে হবে যে, বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বনবাসী কইয়া উপজাতিদের মূলস্রোতে ফেরানোর একটা চেষ্টাও সরকারের ছিল। যেহেতু তৎকালীন উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের অনাবাদি বনাঞ্চল নিয়ে এই পরিকল্পনা হয়েছিল, উক্ত রাজ্যগুলির নানাবিধ স্বার্থ এখানে জড়িয়েছিল। তাঁরা চেয়েছিলেন উদ্বাস্তুদের শ্রমকে ব্যবহার করে আবাদি বসতি গড়তে। কিন্তু প্রায় অসভ্য কইয়া উপজাতিদের সঙ্গে পাথুরে ও কাঁকুরে মাটিতে বাঙালি উদ্বাস্তুরা মানিয়ে উঠতে পারেননি। তাই বারবার তাঁরা ফিরে আসতে চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। ঘুরপথে লুকিয়েচুরিয়ে ফিরে এসেছিলেনও অনেকে। কিন্তু অধিকাংশই আবার ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন সরকারি উদ্যোগে। তারপর কেটে গেছে প্রায় অর্ধ শতক। কেমন আছেন তাঁরা? বাঙালিসত্তা বজায় রাখতে পেরেছেন কি? জানার জন্য গিয়েছিলাম মালকানগিরির এমপিভি ৩৩, ২৩ এবং এমভি ৭৯, ৮০ গ্রামে। পুরো দুটো দিন ঘুরলাম এ পাড়া থেকে সে পাড়া। বাড়িতে বাড়িতে ঝিঙেমাচা, সবজি খেত এবং ভিটের পাশের জমিতে ধান খেত ও তিল চাষের বাহার দেখে মনে হচ্ছিল নদীয়া-চব্বিশ পরগনার কোনও গ্রামেই আছি। ভাবতেই পারছিলাম না কলকাতা থেকে সাড়ে ন’শো কিলোমিটার দূরে কোরাপুট স্টেশনে নেমে, আরও ১৫০ কিলোমিটার দূরবর্তী পটেরু নদীর তীরবর্তী এক গ্রামে আছি।

উড়িষ্যায় চিত্রকোণ্ডা, সতীগোড়া, ভাস্কল ইত্যাদি আরও অনেক বাঁধ তৈরি হয়েছিল মালকানগিরির অনাবাদি জমিকে চাষযোগ্য করার জন্য। পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করার চেষ্টা হয়েছিল সেইসব বাঁধে। কারণ, ধানচাষের জমি ছাড়া এবং সাদা ভাতের আস্বাদ ছাড়া বাঙালি কৃষকের জীবন অচল। প্রথম দিকে জনা, ভুট্টা, কোচড়া খেয়ে তাঁদের প্রাণান্তকর অবস্থা হয়। সমস্যা তৈরি হয় এখানেই। কাজ শুরু হওয়া আর ফসল ফলতে শুরু করা তো একসঙ্গে হয় না। তাছাড়া অচেনা-অজানা ভূমিতে ভিন্ন ভাষাভাষী উপজাতীয় মানুষদের সঙ্গে বসবাস কার-ই বা ভাল লাগে? দাবি ওঠে, বাঙালি বাংলায় ফিরবে। দণ্ডকারণ্য ত্যাগ করার জন্য সংঘবদ্ধ হন মালকানগিরি থেকে ছত্তিশগড়-রায়পুর পর্যন্ত উদ্বাস্তুরা। পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সকলেই যে ফিরতে চেয়েছিলেন, তা কিন্তু নয়। প্রত্যেক উদ্বাস্তুকে গোরু-বাছুর এবং জমি দেওয়া হয়েছিল যে। মিলত রেশনও। তাই ফিরতে চেয়েছিলেন ট্রানজিট ক্যাম্পে ছিলেন যাঁরা তাঁরাই। ক্যাম্পে ক্যাম্পে চলতে থাকে প্রচার। বাঙালিত্বের আবেগ চেপে রাখা সোজা কথা নয় তো। সাড়া পড়ে যায় চারিদিকে। মানা থেকে মানাভাটা, বরদাভাটা থেকে কুরুদ কিংবা নওগাঁ। সাড়া পড়ে মালকানগিরিতেও। বসত ছেড়ে, ক্যাম্প ছেড়ে মানুষ চলতে থাকে বাংলার পথে। ১৯৭৫ একবার খড়্গপুর অবধি আসে লাখখানেক মানুষ। সুন্দরবনে যেতে চায়। বিপুল উত্তেজনা। কিন্তু সেখান থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। তারপর আবার ১৯৭৮-এ। ক্যাম্প ছেড়ে, মালকানগিরির জমি ছেড়ে হাজার হাজার বাঙালি সুন্দরবনের পথে হাঁটে। স্বপ্নের ঘোর যেন। মালকানগিরি ছেড়ে এলে ফাঁকা হয়ে যায় অনেক গ্রাম। এই অবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কইয়া উপাজাতিদের পাশে কতিপয় বাঙালি পরিবারের থাকা মুশকিল হয়ে ওঠে। ফলে বাধ্য হয়ে চলে আসতে হয় পাড়াজুড়ে সবাইকে। সরকারের দেওয়া গাই-বলদ, ভিটে-জমি, নিজেদের পেতল কাঁসার বাসন— সব ছেড়ে আসেন তাঁরা। তারপরের কথা তো বাঙালিমাত্রেই জানেন। সংরক্ষিত অভয়ারণ্যের অনাবাদি ভূমি থেকে উঠে যেতে হয় দণ্ডকারণ্য ফেরত সেই উদ্বাস্তুদের। দুধকুণ্ডি ক্যাম্প এবং মেদিনীপুরের জজ কোর্টের ক্যাম্প হয়ে তাঁরা আবার প্রায় সবাই ফিরে গিয়েছিলেন মালকানগিরিতে। আর যাঁরা পুলিশের চোখ এড়াতে পেরেছিলেন, তাঁরা রয়ে গিয়েছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগনার কয়রা-কদম্বগাছি, মালতীপুর, মসলন্দপুর, বারাসত কিংবা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ঘুটিয়ারিশরিফ বা মুকুন্দপুরে।

মরিচঝাঁপিতে এসে বিড়ি কারখানায় কাজ করতেন অজিত বিশ্বাস। কারখানার মালিকের নাম ছিল মনোরঞ্জন বিশ্বাস। তাঁর অধীনে সপরিবারে কাজ করে যা আয় হত তাতেই সংসার চলত। তখন তাঁর বয়স পঁচিশ। জানতে চেয়েছিলাম, মরিচঝাঁপি থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? গুলির মুখে পড়েছিলেন কি? অজিতবাবু অকপটে জানালেন, ‘ও সব গুলিটুলি কিচ্ছু চলেনি, সব বানানো কথা। মে মাসের পনেরো তারিখ কী ষোলো তারিখ আমাদের তোলে। ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়েছিল। আগুনও দিয়েছিল। যাতে লোক আর ফিরতে না পারে, তার জন্য এটা করে। কিন্তু গুলিগালা চলেনি কিছুই। এখন সব রাজনীতি করে বাংলার লোকজন। ফালতু কথা সব। গুলি চলেছিল কুমিরমারির পারে ১৯৭৯-র জানুয়ারিতে। সেটার অন্য কারণ ছিল। আমিও ছিলাম তাতে। একজন লোকাল মহিলা সমেত উদ্বাস্তুদের এক-দু’জন মরেছিল। তবে পুলিশের অবস্থাও খারাপ করে দিয়েছিলাম। গরানের হল্পা বিঁধে গিয়েছিল ওঁদের অনেকের গায়ে।’ ৪৭ বছর পার হয়ে গেছে তার পর। এখন অজিতবাবু এমভি ৭৯ ভিলেজের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মূল রাস্তার পাশে দু’তলা বাড়ির নীচের পুরোটা স্টেশনারি আর হরেক কসমেটিক্স ঠাসাঠাসি। কেনা-বেচা ভালই। ছেলেমেয়েরাও প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা থাকেন এম ভি ১১৭-তে। জানালেন, দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের অধীন মালকানগিরি সে সময়ে কোরাপুট ডিস্ট্রিক্ট-এর অধীনে ছিল। এখন সেই ডিস্ট্রিক্ট ভেঙে চারটি আলাদা জেলা। মালকানগিরি সেই চারটির একটি। বাঙালিদের জেলা। বললেন, দিন বদলেছে অনেক। এই বাঙালি আর পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে চায় না। অনেক ভাল আছে এখানে। ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরের রাজ্যে কাজ করার প্রয়োজন পড়ে না পশ্চিমবঙ্গের মতো। বাংলাতেই কথা বলেন সবাই। তবে লেখাপড়াটা উড়িয়া ভাষায়। বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনার উচ্চারণ এখানে মন খুলে করা যায়। প্রয়োজন হলে উড়িয়া এবং হিন্দিও চলে। পরিবারপিছু চার একর জমিতে ধান ও তিলের চাষ এবং দশ ডেসিমেল ভিটেতে মজবুত পাকা বাড়ি। কোনও অসুবিধা নেই। কালীমেলা রাস্তার পাশে দুই সারিতে বড় বড় দোকান, নার্সিংহোম, হোটেল, পরিবহণের ব্যবসা। স-ব বাঙালিদের। সেখানকার সেই কইয়া উপজাতিরা এখন ভদ্র-সভ্য। আধুনিক কালের পোশাক পরেন। বাঙালিদের থেকে আলাদা মনে হয় না একেবারেই। তাঁদের ঘরের ছেলেমেয়েরা কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো করেন। বাঙালিদের সঙ্গে পাল্লা দেন। টের পাওয়া গেল মাঝখানে মাওবাদীরা এসে পড়ায় টেনশনও তৈরি হয়েছে। বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কে ভাঙনও ধরেছে কোথাও কোথাও। কিন্তু সেটা এমন কিছু চিন্তার বিষয় নয়। মালকানগিরি এখন শহর। কালীমেলা রাস্তার পাশে দু’কাঠা জমির দাম পঞ্চাশ লাখ টাকা। ব্যবসা করার জন্য কলকাতা থেকে বাঙালিরাও এসেছেন। গড়ে তুলেছেন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, বস্ত্রালয়। ঘরে ঘরে ব্যবসা, মাঠে মাঠে ধান-তিল-সবজি। সতীগোড়া ড্যামের জলে মাছ মেলে ভালই। জ্যান্ত কই, জ্যান্ত ট্যাংরা। অনেকেই বাড়িতে পুকুর বানিয়েছেন। রুই-কাতলা-সিলভার কার্প বাড়ছে সেই পুকুরে। তাই মালকানগিরির বাঙালিরা আর কেউ বাংলায় ফেরার কথা বলেন না। তাঁরা এখন গর্ব করেন পটেরু নদী আর পঞ্চবটী জলাধার নিয়ে।
চিত্র: লেখক








One Response
অসাধারন লেখা। এমন সব লেখা ছড়িয়ে পড়ুক।