Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সংহিতা চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা

অপেক্ষা

রাত-বিরেতে ডাকে না আমাকে
তুমি সেই পুরুষকে বুকে জড়িয়ে রেখেছ?
দরজাটা খোলা
আমি কোথায় যাব!
এ কী দেখছি! সারা শরীরে দাগ ছাড়া কিছু নেই!
তুমি আমি নেই সামান্যতম!

আমি হালচাষি—
ভেজা জামাকাপড়ে তোমার নাকে গন্ধ
আমার তবলা-হারমোনিয়াম কিছু নেই
নেই কোনও সরঞ্জাম
উত্তরের দিশাহীন বাবার জুতা ছাড়া
পায়ে সহস্র কড়া,
তবুও সেই পা মাড়িয়ে যায় উনুনের পাশে

খুঁড়িয়ে হাঁটা একটা বালক আমাকে টিউশন শেখায়
ঘামরক্তে জর্জরিত শরীর আত্মার কথা বোঝে না

সমস্ত মাতলামি মুছে বিনির্মাণ করো আমাকে
নগ্ন শরীর খসে পড়ুক আমার শীর্ষদেশে
চারিদিকে শুধু হাহাকার, খিদেরা ডাকছে আমায়
লাঙল মাটির কার্নিশ ছুঁয়ে গেঁথে নেয়
একমুঠো অধিকার আনব কঙ্কাল খুঁড়ে

ডায়েরির ফুসফুসে কবিতারা জন্ম নিচ্ছে
হেঁটে যাই অপরাহ্ন বেলা
উঠে এসো আরেকটি বার,
অনন্তকাল অপেক্ষায় আছি
যদি বলি, তোমার রক্তে আমার পাপ
তখন মাটির পুতুল হয়ে শ্মশানে জেগে উঠো

ধানজমিতে দেহের উপচে পড়া বিষ আমাকে ভাবিয়ে তোলে
পরাজিত হয়ে সফলতার সিঁড়ি বেয়ে চলেছি
কালস্রোতে আমার সভ্যতা হারিয়ে গেছে
স্পষ্ট দেখতে পাই, দাবা খেলায় আমার অসম্পূর্ণতা
শোকের হাঁড়িতে দুঃখ জ্বলছে অশৌচ চৌকাঠ পেরিয়ে

অন্ধকার ঘেঁষে মোমের ফোসকা আমার হাতেপায়ে
ঘরে তুলবে না আমাকে?
আমার কোনও কাকা জ্যোঠা নেই
কোনওদিন মিছিল-মিটিংয়ে যাইনি
গরম ভাতে মরিচ পোড়া আমার বাবার রোজগার
অট্টালিকা কাকে বলে জানি না
জানি না কীভাবে কাঁটা-চামচ ধরতে হয়
সেই থেকে তোমাকে চিনি এবং জানি
অথচ আমি একা দাঁড়িয়ে

ছোড়দির শেষ খাতায় লিখেছিলাম একটা কবিতা
শেষে ছুড়ে মেরেছে জামাইবাবু
কী দুঃসাহসিকতাই না দেখিয়েছিলাম সেদিন
মনে পড়ে না বুঝি কিছুই তোমার?
কাগজের সম্পাদকরা আমার লেখা ছাপাননি
কিন্তু ফোঁটা ফোঁটা রক্তে কবিতার জন্ম হয়েছে
কারও কোনও হুঁশ নেই
ফ্যাকাসে চামড়ার কবিতা বাবুয়ানার মতো কাজ করেনি
শুধুই নামজাদাদের প্রশংসা

যাকে বুকে রেখেছ তাকে ছুড়ে মারো
আমার অপমান তোমার সহ্য হয় কী করে?
একবার তাকাও এদিকে
আমি যে শুকিয়ে যাচ্ছি তা কি চোখ দেখে না?
তার বাক্যে আমার অস্থিচর্মসার,
একবার শোনো
তুমিই বুঝবে আমার ব্যথা
মাথা নত করেছি বহুবার
অক্ষম শরীর আর সয় না

তোমার একটুকরো হাসি আমার ক্যানভাস তৈরি করবে
ঘড়ি থেমে যাচ্ছে
নদীর তীর অপেক্ষায়
তবুও কি তুমি আসবে না?
সাজাবে না আমাকে!

তোমার নামে প্রেসে কবিতা জমা দিয়েছি
প্রতিটি পাণ্ডুলিপি তোমাকে দেব
চলে এসো তাকে ছেড়ে
সেখানে শুধুই মদ বিক্রি হয়
ওরা চায় না আমার অস্তিত্ব
সম্পাদকরা বিকিয়ে বসেছেন
আমার লেখা এখনও শেষ হয়নি
লিখছি আর লিখছি

তোমার ঘামের গন্ধ স্বপ্ন দেখায়
তিলে তিলে রক্ত চুষে খাচ্ছে
ছুড়ে মারছে এক একটা জুতা
আমি বসে আছি তোমার ঠোঁটের তিলে একটা বৃত্ত আঁকব
তুমি এখনও তাকেই আদর করছ?
আমার বুকে বজ্রাঘাতে ধ্বংস হচ্ছে সব
আকাশ আইলাইনার এঁকেছে

আমার অসহায় কাব্যগ্রন্থগুলো রেখে যাব তোমার জন্য
আমাকে ধ্বংস করে তার সুখ কিনেছ, তাতে আমার ক্ষতি নেই
আমার কবিতায় দাঁড়ি কমা বসিয়ো না
ওরা পেট মাটিতে পুঁতে খোলা মাঠে থাকবে

তাকে তুমি আগলে রেখো
আমি যদি পাই, ছিঁড়ে নিংড়ে মাংস বের করব
তখন তুমি কিছু বলতে এসো না
সবকিছুই আমার নিজস্ব
কান্না আমার সহ্য হয় না
গুপ্তধন আগলে আমি মুখস্থ করব
তোমার চিৎকার কখনও শুনব না
আমার ঠোঁটে তখন আর ঠোঁট লাগিয়ো না
বসন্তবিলাপ পছন্দ করি না

অচেনা এক টুকরো হাসির অপেক্ষায় থাকব।

চিত্রণ: ধৃতিসুন্দর মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 2 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »