জীবনের ডায়েরি
কেন যে মিথ্যা কথা বলেছ ইন্দ্রাণী
কেন এ শুকনো ঘাসে ফুটিয়েছ ফুল?
মৌসুমী বায়ু সে তো যাওয়া আসা করে,
কিছু ফুল ফোটে, কিছু কুঁড়িতেই ঝরে
বাতাসের দোষ নেই, সে তো বড় ভাল
বসন্তের হাত ধরে তাই সে হারাল—
কেন তুমি ইন্দ্রাণী স্বপ্ন দেখাও?
কবিকে কবর থেকে উঠিয়ে লেখাও!
সেই মেয়ে যার মুখে প্রথম পুরুষ—
ইস্কুলে যেতে যেতে কত কথা বলে,
দিদি তো তোমার প্রিয়, তাই বুঝি তুমি
কবিকে একলা পেয়ে সবই যে উগরালে!
কবিরও বুকের মাঝে চোরাস্রোত ছিল—
সেই স্রোতে দিদিমণি স্নান সেরে নিল!
কবি যে মুগ্ধ! নদী পুনরায় বয়,
মাছরাঙা ডুব দেয় নদীর তলায়—
মৌসুমী বায়ু পেয়ে দোলে কাশফুল—
বায়ু নাকি নদী— কে যে করেছিল ভুল!
বাতাসের দোষ নেই সে তো বড় ভাল—
প্রকৃতির নিয়মেই নদীকে ফেরাল।
***
শুধুই তুমি
অভিমানী নদী হয়ে তুমি বয়ে গেলে
শ্মশান হয়ে উঠি তোমার এ পাড়ে
যত কাঁদো, তত পড়ে শত শত লাশ
ডোম হয়ে স্নান সারি, তোমার ওই জলে।
মন দেওয়া মন নেওয়া ভীষণ কঠিন
প্রেম যদি মোহ হয়, ছেড়ে চলে যাবে
বলেছে দোয়েল পাখি আমার কানে
বুঁদ হয়ে থাকি আমি তোমার গানে
তুমি যবে হেসে ওঠো, রাধাচূড়া হাসে
কৃষ্ণচূড়া যে দেখি, বড় ভালবাসে
কখন কৃষ্ণ হই সময় জানে!
ভক্তের ঢল দেখি সমানে নামে।
জীবনটা অঙ্ক বুঝিনি তখন
আফসোস করে আর হবে কী এখন
খাদ থেকে পড়ে যাই, ধরে ফেলো তুমি—
তোমার উপমা দেখি, শুধুই তুমি
***
দর্শন
সেদিন সূর্য যখন পাটে যেতে বসেছে
সিমলিপালের জঙ্গলের রাস্তায়
‘নো এন্ট্রি জোন’ ক্রস করে হাঁটার সময়—
শাল গাছের মগডাল থেকে সেগুনের মগডালে ত্রিশ ফুট লাফ দিতে দিতে উড়ুক্কু কাঠবেড়ালি বলেছিল,—
জীবনটা অঙ্ক হতে পারে অবিনাশ, কিন্তু জঙ্গলটা শুধুই দর্শন!
‘যেমন খুশি ভাবতে পারো
দরাজ গলায় গাইতে পারো
ভালবাসাকে ডাকতে পারো
প্রাণের মায়া ছাড়তে পারো!’
২
রাত্রি নামার একটু পরে
জোরান্ডার বনবাংলোয় যাওয়ার পথে, মাথা ভর্তি তারা আর জোনাকির মিটিমিটি আলোয় আমাকে সুদূর কলকাতা থেকে সুনন্দা, গোলাম আলীর সেই বিখ্যাত গজল
‘চুপকে চুপকে রাত দিন আঁশু বাহানা…’
মনে করানোর পর, বরাইপানির ঝর্নার জলে আমার কয়েক ফোঁটা চোখের জল মিশে যাওয়ার পর বুঝেছি; কাঠবেড়ালিটা হককথা বুঝিয়ে গেছে গোধূলিবেলায়।
৩
সত্যি অবিনাশ, অঙ্কতে ভিত কাঁচা থাকলে, জীবন জাহান্নামে যেতে পারে! তবে—
দর্শনে যদি নিদেনপক্ষে চল্লিশ শতাংশ নম্বরও পাওয়া যায়, তাহলে স্বর্গের অনেক কাছাকাছি পৌঁছতে পারো তুমি!
***
জন্মান্তরের কবিতা
গভীর রাতে সারা শহর ঘুমিয়ে পড়লে, রাতের আকাশে পেঁচারা গল্প বলে।
ছাদে একাকী সেই গল্প শুনি, গ্রাম থেকে মেট্রো সিটি হওয়ার গল্প!
পেঁচারা তখনও ছিল, এখনও আছে, শুধু রাতের বেলায় এলাকা বদলায়।
আকাশে একঝাঁক বক বলে,
জেগে থাকো কবি, কবিতার খোরাক পাবে!
চুপ করে চোখ বুঝি!
ঝাপসা চোখ খুলতেই দেখি
নদী থেকে কেশবতি কন্যা
কলস হাতে উঠে আসছে!
আহা কী রূপ! ঘন চুল, এলোকেশ, কাটা কাটা চোখ,
আমি ডেকে উঠি অনিন্দিতা!
সে মুচকি হেসে চলে যায়—
যাওয়ার আগে কাছে এসে বলে যায়, ওগো শহুরে বাবু হয়ে তোমার বউ অনিকে এত বড় নাম দিয়ে ফেললে;
লজ্জায় দুটো হাত চেপে ধরি!
বকের ঝাঁকের আওয়াজের সঙ্গে গত জন্মকে পিছনে ফেলে আসি।