Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

আর্জেন্টিনার গল্প: ২৫-এ অগাস্ট ১৯৮৩

হোর্হে লুইস বোর্হেস

অনুবাদ: মানবসাধন বিশ্বাস

ছোট্ট স্টেশনের ঘড়িতে দেখি, এর মধ্যে এগারোটা বেজে কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে গেলাম। আগে বহুবার এমন হয়েছে, এবারও মনে হল, বেশ ফুরফুরে মেজাজ ফিরে এল, সঙ্গে একটা স্বস্তি, আর তার সঙ্গে একটু মুক্তির ফুরসত; আমাদের খুব চেনা জায়গাগুলোর জাদু এটাই। বিশাল গেটটা খোলা ছিল, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা।
আমি হলঘরে ঢুকে পড়লাম। ঝলমলে রোশনাই-মুক্ত নরম আলোয় আয়নাগুলোয় ঘরের সাজানোগোছানো গাছগুলো দুটো করে দেখা যাচ্ছিল। একটা জিনিস লক্ষ্য করে অবাকই লাগল, হোটেল-কিপার লোকটি আমায় চিনতে পারেনি। সে আমার হাতে হোটেলের রেজিস্টার ধরিয়ে দিল। ডেস্কের সঙ্গে চেনে-বাঁধা পেনটা তুলে ব্রোঞ্জের দোয়াতে ডুবিয়ে নিয়ে, রেজিস্টারের খুলে রাখা পাতায় ঝুঁকে পড়ে দেখি অবাক কাণ্ড। সেদিনের সেই রাতটা আমায় তাজ্জব করেছে বহুবার, তবে তার মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে প্রথম। আমার নাম হোর্হে লুইস বোর্হেস, সেটা আগেই লেখা হয়ে আছে, আর সে-লেখায় কালি তখনও তাজা– জ্বলজ্বল করছিল।
হোটেল কিপার বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি এর মধ্যেই ওপরতলায় চলে গিয়েছেন।’ এবার সে আমায় ভাল করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, মনে হয় নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার জন্যে। ‘মাফ করবেন স্যার, আমি সত্যিই দুঃখিত; অন্যজনও দেখতে একেবারে হুবহু আপনার মতো। তবে এখন বেশ বুঝছি, আপনি বয়েসে তার চেয়ে ছোটই হবেন।’
‘তা, উনি আছেন কোন ঘরে?’
জবাব এল, ‘উনি তো উনিশ নম্বর চাইছিলেন।’
আমি এই ভয়টাই করছিলাম।
আমি পেন ফেলে ওপরতলায় ছুটলাম। ঘরের নম্বর উনিশ-– সেটা তিনতলায়। হোটেলের সবচেয়ে উঁচুতে। সোজাসুজি নজরে পড়ল একটা দেখভাল-হীন অপরিষ্কার চাতাল, আর তার লাগোয়া বারান্দা। বেশ মনে পড়ল, একসময় ওখানে একটা বেঞ্চ রাখা ছিল। দরজার হাতলে হাত লাগাতেই সেটা খুলে গেল। দেখি ঘরের লাইটটা নেভানো নেই, সেটা দিব্বি জ্বলছে। চড়া আলোয় এসে শেষে নিজেকে চিনতে পারলাম। ওই তো ওখানে, ওই ছোট্ট লোহার খাট, বহু পুরনো, রুখাশুখা, আর রংও ফিকে হয়ে গেছে।
বিছানায় শুয়ে স্টাটকো দেখছিলাম, উঁচু দেয়াল-জুড়ে সেই কারুকাজে আমার দৃষ্টি হারিয়ে গেল।
কানে এল সেই কণ্ঠস্বর। ওটা হুবহু যে আমারই মতো, তেমন নয়; আমার রেকর্ডিংয়ে যেমন শোনা যায়, খানিকটা সেরকম। পুরোপুরি বেপছন্দ। আর সেই এক ঘ্যানঘেনে আওয়াজ-– কোনওরকম ওঠানামা নেই।
‘আজব কাণ্ড বটে’, সে আওয়াজটা দিব্বি বলল, ‘আমরা দুজন, আবার আমরা একও।’
‘কিন্তু তাহলে তো, আমার দেখা স্বপ্নগুলোয় আদতে তাজ্জব কিছু নেই।’
আমি হতভম্ব হয়ে ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘এসবের সবটাই তাহলে স্বপ্ন?’
‘শেষে যে স্বপ্ন দেখলাম, এ নিশ্চয়ই সেটাই।’ সে নাইট টেবিলের মার্বেল টপের ওপরে রাখা ফাঁকা বোতলটা দেখিয়ে দিল। ‘কিন্তু এই রাতে এখানে এসে পৌঁছনোর আগে গুচ্ছের আরও স্বপ্ন দেখা তো এখনও বাকি। তোমার জন্যে তারিখটা কী হবে?’
‘আমি অনিশ্চিত গলায় বললাম, ‘ঠিক জানি না। তবে গতকাল আমার জন্মদিন ছিল– একষট্টি নম্বর জন্মদিন।’
‘এই রাতের যে সময়ে তুমি এলে, মানে গতকাল সেটা তোমার চুরাশি নম্বর জন্মদিন হতে পারত।’
‘আজ ২৫-এ অগাস্ট, ১৯৮৩।’
‘তার মানে আরও বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে।’ আমি নিচু গলায় বললাম।
‘আমার হাতে কিন্তু আর সময় নেই’, সে আচমকা বলে উঠল, ‘এবার আমার যাওয়ার পালা; যে-কোনও মুহূর্তে মারা যেতে পারি।’
‘যা কোনওদিন জানতে পারিনি, হয়তো সেই অজানায় স্রেফ মিলিয়ে যেতে পারি। তবু এই ‘ডবল’ বা জোড় সত্ত্বার স্বপ্ন দেখা আজও আমি ছাড়িনি। ওই চাতাল-ঘটিত থিমটা আমায় জুগিয়েছে কবি স্টিভেনসন, আর, প্লাথের আয়না!’
বিষয়টা মোটেও দিগ্গজ মহাপণ্ডিতের মতো ঘুরিয়ে বলছি না, ভেবেছিলাম স্টিভেনসনের নাম নেওয়ার মানেই শেষ বিদায়ের মুহূর্ত চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া। আমিই ছিলাম সে-– আর সেটা আমি বেশ বুঝেছি। আসলে ব্যাপারটা বোঝার জন্যে কাউকে শেক্সপিয়ারে পরিণত হয়ে মনে রাখার মতো কিছু উদ্ধৃতিযোগ্য যুতসই কথা বসিয়ে কোনও অতিনাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করেও তার ধারেকাছে আসে না। তাকে অন্য প্রসঙ্গে টানার চেষ্টায় বললাম:
‘আমি জানতাম, এবার তোমার কি হতে পারে। এই হোটেলের নিচের ঘরগুলোর একটায়-– ঠিক সেই জায়গাটাতেই আমরা এই আত্মহত্যার গল্পটার খসড়া লিখতে শুরু করেছিলাম।’
‘ঠিক,’ সে বেশ ধীরেসুস্থে উত্তর দিল। মনে হল, সে অস্পষ্ট পুরনো স্মৃতিগুলোকে একে একে জুড়ে মনে করার চেষ্টা করছিল। ‘কিন্তু আমি তো তেমন মিল কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। ওই খসড়ায় ছিল– আদ্রিগে যাওয়ার এক-পিঠের টিকিট কিনেছিলাম, আর উঠলাম হোটেল লাস্ ডেলিসিয়াসের উনিশ নম্বর ঘরে, যেটা ছিল বাকিদের চেয়ে সবচেয়ে দূরের ঘর। সেই ঘরেই আমি আত্মহত্যা করলাম।’
‘ওই জন্যেই তো এখন আমি এখানে।’ আমি বললাম।
‘এখানে মানে? আমরা সারাক্ষণই তো এখানে। ক্যালে মাইপুর এই বাড়িতেই তোমায় স্বপ্নে দেখছি। জায়গাটা এটাই। আর এই ঘরটাই এককালে মায়ের ছিল। এখান থেকেই এবার চিরবিদায় নিতে চলেছি।’
তার কথা কিছু না বোঝার চেষ্টায় আমি তাকে ফের বললাম, ‘ঘরটা মায়ের ছিল’, আর ওই সবচেয়ে ওপরের তলায়, ওই উনিশ নম্বর ঘরে আমি তোমার স্বপ্ন দেখে চলেছি। তার পরেই ছাদের ছাউনি দেওয়া সেই বারান্দা।’
‘তাহলে স্বপ্নে কে কাকে দেখছে? আমি জানি, আমি তোমায় স্বপ্নে দেখছি, কিন্তু সেইভাবে তুমিও আমায় স্বপ্নে দেখছ কিনা জানি না ।
আদ্রোগে শহরের এই হোটেল ধ্বংস হয়ে গেছে বহু বছর আগে। হয়তো বিশ বছর, কিংবা, হতেও পারে, ত্রিশ বছর আগে। কে জানে?’
একরকম জেদের বশেই তাকে জবাবটা দিলাম– ‘আমি বরাবরের স্বপ্ন-দেখা মানুষ।’
‘কিন্তু, আপনি কি বুঝছেন না যে, জরুরি বিষয়টা হল– স্বপ্ন-দেখা মানুষ শুধু একজনই, নাকি দুজন-– যারা স্বপ্নে পরস্পরকে দেখছে?’
‘আমি বোর্হেস। আমি তোমার নাম রেজিস্টারে দেখেই তো এই ঘরে উঠে এলাম।’
‘কিন্তু বোর্হেস তো এই আমি, এই ক্যালে মাইপুর এই বাড়িতে মরতে চলেছি আমিই।’
খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতা ছিল। তারপর সে আমায় বলল:
‘তাহলে একবার পরখ করে নেওয়া যাক। বলো তো, আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত ঠিক কোনটা?’
আমি একবার তার দিকে ঝুঁকে পড়তেই দুজনেই কথা বললাম একইসঙ্গে। আমি জানি, আমাদের দুজনের কেউই সত্যি বলিনি। বয়স্ক মুখটায় এক চিলতে হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল। আমার যেন মনে হল, সেই হাসিটা কোনও না কোনওভাবে আমার নিজের হাসিরই হুবহু প্রতিফলন ।
‘আমরা কিন্তু দুজনেই একে অন্যকে মিথ্যে বললাম’, সে বলল, ‘কেননা আমরা নিজেদের আলাদা দুজন ভাবি, মোটেই ভাবি না আমরা একজন। আর সত্যিটা এই যে, আমরা দুজন, কিন্তু আদতে একজন।’
‘এই বকবকানিতে রীতিমত বিরক্ত হতে শুরু করেছি। সেটা তাকে স্পষ্ট করে বলেও দিলাম; তারপর জিগ্যেস করলাম, ‘আর তুমি তাহলে ১৯৮৩ সালে। যে বছরগুলো এখনও বাকি রয়ে গেছে, সেগুলো নিয়ে কিছু বলবে তুমি?’
‘হায় বেচারা বোর্হেস, আমি আর কী বলব, যে অতীতের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিগুলোর সঙ্গে নিজেকে বেশ রপ্ত করে নিয়েছ; ফের সেটাই হতে থাকবে; আর এই বাড়িতে তোমায় একলাই থাকতে হবে। তখন তুমি বারে বারে সেই বইগুলো ছুঁয়ে দেখবে, যেগুলোয় কোনও অক্ষর নেই। ফেডারেল ক্রুশ-লাগানো কাঠের বারকোশে রাখা সুইডেনবোর্গ মেডেলটা বার বার ছুঁয়ে দেখবে। অন্ধত্ব কিন্তু অন্ধকার নয়-– এ এক ধরনের একাকিত্ব। আর, তুমি আইসল্যান্ডে ফিরেও যাবে।’
‘আইসল্যান্ড! সমুদ্রে-ঘেরা সেই আইসল্যান্ডে?’
‘রোমে গিয়ে তুমি কবি কিট্‌স-এর কবিতাও আউড়াবে। আর সবার মতো তার নামও সেখানে স্রেফ জলে লেখা দলিল।’
‘রোমে আগে কোনওদিন যাইনি।’
‘বাকি এখনও আরও অনেক কিছু– আমাদের সবসেরা কবিতা লিখবে তুমিই; তবে তা হবে একটা শোকগাথা।’
‘…-র মৃত্যুর উদ্দেশে।’ শুরু করতে গিয়েও নাম নিতে সাহস পাইনি।
‘না, আরও অনেকদিন বেঁচে থাকবেন সেই মহিলা কবি।’ আমরা চুপচাপ হয়ে গেলাম। তারপর সে বলতে থাকল:
‘এতদিন ধরে আমরা যে বইয়ের স্বপ্ন দেখেছি, সে বই তো লিখবে তুমিই। কতকগুলো নকশা, কিছু হাবিজাবি খসড়া-– এসব করেই তুমি একটা বিশাল মহান বই লিখে ফেলবে। ১৯৭৯ নাগাদ তুমি ঠিকই বুঝে যাবে, তোমার ওই তথাকথিত সৃষ্টি আসলে অর্থহীন শুচিবাই বাতিকের কাঙ্গালিপনা ছাড়া আর কিছুই নয়। গোয়ঠের ফউস্ট, ফ্লবার্টের সালাম্বো, জয়েসের ইউলিসিস-– বইগুলো আমাদের মধ্যে গেঁথে দিয়েছে স্রেফ সেই ছুতমার্গ। অবিশ্বাস্য ঠেকলেও বলতেই হয়– অনেক অনেক পাতা আমি ভরিয়ে ফেলেছি।’
‘তাহলে, শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলে, তুমি ব্যর্থ।’
‘তার চেয়েও খারাপ। আমি বুঝলাম, বইটা শ্রেষ্ঠ কীর্তি বা মাস্টারপিস হল বটে, তবে সেটা একেবারে অভিভূত করে ফেলার পর্যায় অব্দি। প্রথম কয়েকটা পাতা পেরতেই আমার সাধু উদ্দেশ্য আর বেশিদূর গড়াতে পারেনি। পরের পাতাগুলোয় সব তালগোল পাকানো গোলকধাঁধার জট: কিছু অস্ত্রপাতির গল্প, সেই লোকটির গল্প যে খোদ নিজেকেই আদতে একটা প্রতিকৃতি ধরে নিল– আর প্রতিকৃতি নিজেকেই ভেবে নিল বাস্তব; রাতের আঁধারে হানা দেওয়া সেই বেপরোয়া বাঘের দল, তার মাথায় আসা চিন্তাগুলোকেই সে সত্যি ভেবে নিল, রাতের বাঘেরা, যুদ্ধটা যার রক্তেই লেখা আছে, সেই অন্ধ ভয়ানক দুঃসাহসী জুয়ান মুরানা, লিখিয়ে মাসিদনিয়া ফার্নান্দেজের কলম, মরা মানুষের হাতের নখে তৈরি আস্ত একটা জাহাজ-– এইসব। আর, রোজ সন্ধের আড্ডায় যতসব তামাদি ইংরেজির বস্তাপচা বোলচালের একঘেয়ে চর্বিতচর্বণ।’
একরকম ঠাট্টা করেই বললাম, ‘মিউজিয়ামের কথা উঠলে মনটা ভাল হয়ে যায়।’
‘মিথ্যে স্মৃতিচারণের কথা বলছি না, সঙ্কেতগুলোর দুরকম অস্তিত্ব, লম্বা লম্বা ক্যাটালগ, কাঠখোট্টা বাস্তবকে নিপুণ হাতে সামলানো, সামঞ্জস্যে গলদ, যেটা আবিস্কার করে সমালোচকেরা উল্লসিত, সবসময় না হলেও বেঠিক উদ্ধৃতি ব্যবহার-– এইসব ব্যাপারস্যাপার।
‘প্রকাশ করেছ বইটা?’
‘নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল এমন নয়, তবে বইটা নষ্ট করে অতিনাটকীয় কিছু একটা করে ফেলার কথাও ভেবেছিলাম; সম্ভবত আগুনে পুড়িয়ে ফেলতাম।’
সেসব গুটিয়ে নিয়ে বইটা প্রকাশ করলাম মাদ্রিদ থেকে– তাও বেনামে। সবাই ধরে নিল, বইটা আসলে বোর্হেসের কোনও এক রুচিহীন ওঁচা টুকলিবাজের কীর্তি। স্বয়ং বোর্হেস না হওয়ার অবধারিত অসুবিধের ফলে সে কাজটার ধাঁচাটাকে বাইরে থেকে চোখেপড়ার মতো জিনিসগুলো ওপর ওপর দেখে শুধু ধাঁচাটাই টুকে গেছে।’
‘একটুও অবাক হইনি’, আমি বললাম, ‘প্রতিটি লেখকই শেষকালে তার নিজেরই সবচেয়ে কমবুদ্ধির চ্যালা হয়ে পড়ে।’
এই রাতে আমায় এখানে এনে ফেলার যতগুলো রাস্তা, তারমধ্যে একটা কিন্তু ওই বইখানা। বাকি রাস্তাগুলোর মধ্যে আছে বৃদ্ধবয়সের নাকাল-বেহাল দশা, সামনের দিনগুলোয় টিকে থাকার অকাট্যতা …।
‘অমন বই আমি অন্তত লিখতে যাব না।’
‘আমি জানি তুমি লিখবে, খুব লিখবে! আমার এ কথাগুলো, যেগুলো এখন তোমার বর্তমান, একদিন সেটা রয়ে যাবে শুধু একটা স্বপ্নের স্মৃতি হয়ে।’
সন্দেহ নেই, তার অহেতুক একতরফা বকবকামি শুনতে শুনতে বিরক্তি এসে গেল। যদিও সন্দেহ নেই, ক্লাসরুমে আমি নিজেই কিন্তু ঠিক এমনটাই করে থাকি। আসলে ঘটনা এই যে, আমাদের দুজনের চেহারায় বড় বেশি মিল-– মিল এতটাই যে, মৃত্যু শিয়রে এসে পড়ার জন্যে মিলে যাওয়া রেহাইয়ের সুবিধেটা সে ভাল করেই নিচ্ছিল। রাগের বশে তাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম– ‘মরণ আসন্ন? তুমি সত্যিই নিশ্চিত?’
সে জবাব দিল, ‘একদম। মনে একটা মিঠেস্বাদের শান্তি পাচ্ছি, সেই সঙ্গে সোয়াস্তি-– যা আগে কখনও পাইনি। আমার মনে হচ্ছে, এতক্ষণ যা বললাম, সেসব শুনে তুমি বেজায় চটেছ, তাই তো?’ ‘কারণ আমরা ভীষণভাবে একরকম। তোমার মুখখানা একেবারে অখাদ্য– ওটা যেন আমার মুখের একটা জলজ্যান্ত ব্যঙ্গছবি। গলার আওয়াজ, সেটাও বড় বিশ্রী-– হুবহু আমার নকল। তোমার বাক্য তৈরির ভঙ্গিও বড় বেদনাদায়ক, সেটা আমি ঘৃণা করি-– কেননা আদপে ওসব আমারই।’
শুনে সে হাসতে হাসতে বলল, ‘আমার বেলাতেও কিন্তু ওই একই কথা। আর এইজন্যেই ঠিক করেছি, আর নয়, নিজেকে শেষ করে দেব এবার।’
বাগানে একটা পাখি গান গাইছিল ।
অন্যজন বলল, ‘ওটাই শেষ পাখি।’
সে ইশারায় আমায় ডেকে নিয়ে পাশে বসাল, আমার হাত ধরল। আমি সরে সরে যাচ্ছিলাম; ভয় হচ্ছিল, হয়তো দুটো হাতই এবার এক হয়ে মিশে যাবে।
সে বলল, ‘নির্বিকারবাদীরা শিখিয়ে গেছেন, এ জীবন ছেড়ে চলে যাওয়া নিয়ে কোনও দুঃখবোধ মনে রাখতে নেই। জেলখানার গেটগুলো অবশেষে খুলল। আমি বরাবরই জীবনকে এভাবেই দেখে এসেছি। তবু ঢিলেমি আর ভীরুতা আমায় দোটানায় ফেলে। মোটামুটি বারো বছর আগে, লা প্লাটায় ভার্জিলের ‘আনিঅ্যাড’-এর ষষ্ঠ খণ্ড নিয়ে একটা কনফারেন্স ছিল। সেখানে হঠাৎ করেই একটা ছয় মাত্রার কবিতা খুঁটিয়ে পড়ে বুঝলাম কোন রাস্তায় চলতে হবে আমায়। তখনি মনস্থির করে নিয়েছি। সেই মুহূর্ত থেকেই আমি নিজেকে একটি দুর্মর, অভেদ্য অস্তিত্ব বলে মনে করে আসছি। এবার আমার নিয়তি হবে তোমার। তুমি এই আকস্মিক অন্তর্দর্শন পাবে ‘ল্যাতিন’ আর ‘ভার্জিল’-এর মাঝামাঝি জায়গায় এসে। আর তারপরেই, এই অদ্ভুত দিব্যদর্শী কথোপকথন যা ঘটেছিল দুটো আলাদা জায়গায়, আর সময়ের দুটো আলাদা মুহূর্তে, সেটা বেমালুম ভুলে যেতে হবে। তুমি জিনিসটা আবার স্বপ্নে দেখলে, যা আমি এখন আছি-– তুমিও হয়ে উঠবে হুবহু সেরকমই। তখন তুমিই হবে আমার স্বপ্ন।’
‘এ আমি ভুলব না, কালই লিখে ফেলব।’
‘তোমার দেখা স্বপ্নের জোয়ারের অতলে এ তোমার স্মৃতির গভীরে গিয়ে থিতু হবে। যখন এসব লিখতে বসবে, তোমার মনে হবে এক কল্পলোকের গল্প তৈরি করে ফেলছ। আর কালই যে সেটা ঘটবে, এমনও নয়। সেটা হবে এখন থেকে বহু বহু বছর পরে।’
সে কথা বলা বন্ধ করল। বুঝতে পারলাম, সে মারা গেল। এক দিক থেকে দেখলে, ওর সঙ্গে মারা গেলাম আমিও। শোকে দুঃখে ওর বালিশের ওপর ঝুঁকে পড়লাম, কিন্তু সেখানে তখন আর কেউ নেই।
আমি শেষে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বাঁচলাম। দেখি বাইরে কোনও আঙিনা নেই, মার্বেলের সিঁড়ির-ঘর-– সেটাও নেই, বিশাল নিস্তব্ধ হোটেলবাড়িটা, ইউক্যালিপ্টাস গাছগুলো, স্ট্যাচুগুলো, বাগানের মাঝখানের আশপাশ দেখার ছোট্ট ছাউনির গেজ্‌বো, ফোয়ারা-– কিচ্ছু নেই, আদ্রোগের এই হোটেলচত্বর-ঘেরা পাঁচিলের গেটটাও নেই।
বাইরে তখন আরও কিছু স্বপ্ন অপেক্ষা করছে।

চিত্রণ: মনিকা সাহা

Advertisement

***

লেখক পরিচিতি

আর্জেন্টিনার স্প্যানিশ সাহিত্যের বিশ্বখ্যাত লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসের (১৮৯৯-১৯৮৬) জন্ম ১৮৯৯ সালে বুয়েনস এয়ারেসের এক সম্ভ্রান্ত উচ্চশিক্ষিত সাহিত্য-সংস্কৃতি অনুরাগী পরিবারে। শিশুকাল থেকেই তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। বাবার বিশাল লাইব্রেরির নানা বিষয়ের বইপত্র নাড়াচাড়া করতে করতে শুরু হয় তাঁর পড়াশোনায় হাতেখড়ি। মাত্র নয় বছর বয়েসে তিনি অস্কার ওয়াইল্ডের গল্প ‘হ্যাপি প্রিন্স’ অনুবাদ করেন। সেক্সপিয়ার শেষ করেন বয়েস যখন মাত্র ষোল। প্রথম জীবনে মূলত কবিতা লিখতেন, পরে তিনি কবিতার সঙ্গে গদ্যসাহিত্যে আরও সক্রিয় হন। তিনি বুয়েনস এয়ারেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে লিখে গেছেন অজস্র কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। অনুবাদক হিসেবেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। দেশের ন্যাশনাল লাইব্রেরির ডাইরেক্টর পদে তিনি কিছুকাল কাজ করেন। দেশের তদানীন্তন একনায়কতন্ত্রী শাসনের বিরোধিতা করে সক্রিয় রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ধ্রুপদী ভাষাশৈলী, সাহিত্য শিক্ষা, দর্শন, ইতিহাসে গভীর প্রজ্ঞা, সেই সঙ্গে মননে ও সৃজনশীলতার গুণে তিনি অগ্রগণ্য চিন্তাবিদ হিসেবেও পরিচিতি পান। সাহিত্যে ভাব ভাষা ও আইডিয়া উপস্থাপনে গতানুগতিক ছকের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে এক নতুনতর অভিমুখ দিয়ে তাঁর স্বতন্ত্র ঘরানার সাহিত্যকৃতি কিছু রক্ষণশীল পাঠকের কাছে হয়তো সুখপাঠ্য না হয়ে উঠলেও নির্দ্বিধায় অবশ্যই সুপাঠ্য। পাঠকের কাছে নির্ভুল মৌলিক সৃষ্টিশীলতার বিচ্ছুরিত দীপ্তি তাঁর দেশের সীমা ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ শতকের বিশ্বসাহিত্যের উত্তর-আধুনিকতার প্রেক্ষিতে স্বমহিমায় সমাসীন। শোনা যায়, নোবেল কমিটিতে তাঁর নাম একাধিকবার মনোনীত হলেও সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে থাকার কারণে তাঁকে শেষ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কারলাভের সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
জীবনের বেশ কিছু সময় তিনি দৃষ্টিহীন অবস্থায় অতিবাহিত করে গেছেন। ১৮৮৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ছিয়াশি বছর বয়েসে এই কালজয়ী প্রতিভা প্রয়াত হন। তাঁর অনন্য সৃষ্টিগুলির মধ্যে A Universal History of Iniquity (1935), Fictions (1944), The Aleph and Other Stories (1949), In Praise of Darkness (1962), Labyrinths (1962), Brodie’s Report (1970), The Book of Sand (1975), Shakespeare’s Memory (1983) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − 7 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »