বেশরম পারিজাত
পারিজাত সমাদ্দার বরাবরই ছিল আপাদমস্তক বেশরম। তবে ঠোঁটকাটা দাম্ভিক শয়তানের পরিচয় সে জুটিয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে। কঠোর সমালোচনা সবার সহ্য হয় না জেনেও সে কাউকে ছেড়ে কথা বলত না। অপদস্থ করার জন্য নয় সঠিক পথে আনার জন্যও তো সমালোচনার দরকার হয়। বেঠিক চালে সিংহভাগ মানুষের থাকার কারণে পারিজাতের সমালোচনার হার বরাবরই ছিল ওপরের দিকে। সেসব এখন অতীত। দীর্ঘ বিশ বছর পরে সে এখন অনেক শান্ত। সমালোচনার বিষদাঁত থাকলেও সচেতন ভাবেই সে তার ধার কমিয়ে এনেছে। কত নতুন চিন্তা আর অনুভবের মধ্যে সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে আজকাল। বর্ষার বিকেলে বৃষ্টি দেখতে দেখতে পারিজাতের আজ হঠাৎ মনে হল, জীবনের পরের অন্য কোনও জীবনের কথা, না ঠিক পুনর্জন্ম নয়, আপাতত ধরাছোঁয়ার বাইরে সম্পূর্ণ নতুন এক ধাঁচের জীবনের মর্ম, সাতপাঁচ সুখদুঃখের সংজ্ঞা কেমন হতে পারে। তার মনে হল, চোখের মণি খুব গভীরে পর্যবেক্ষণ করলে তা অন্ধকার রাত্রিতে কোনও আকাশযান থেকে দেখা খুব দূরের পৃথিবীর আকারের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। পারিজাত আরও ভাবে, ঠিক এই সময়ে নতুন কোনও ডাইমেনশনের অস্তিত্বের ব্যাপারে তার যথেষ্ট সচেতন হওয়া উচিত অথচ দৈনিক ছাপোষা হিসেবনিকেশের জঞ্জালে সে সময় করে উঠতে পারছে না। যোগাযোগ কেমন হলে আর তেমন হাস্যকর রকমের ভুল বোঝাবুঝিগুলোই থাকবে না। মানুষের অট্টহাসির তীব্র অভিঘাতে বিষাদ থিতু হয়ে যাবে অথবা বিষাদের চরিত্রটাই আমূল বদলে যাবে। বিষাদের জন্ম হবে কেবলই প্রত্যাশিত ভালবাসার থেকে সামান্য বিচ্যুতির কারণে। অন্যের প্রাপ্য সুখের কথা ভেবে হিংসে থেকে জন্ম নেওয়া বিষাদ হবে অস্তিত্বহীন। সমালোচনার ক্ষেত্রটাও হবে নতুন বা খুব বেশি সমালোচনার প্রয়োজনই হয়তো আর থাকবে না। তখনই পারিজাত মানুষের মস্তিষ্কের অভাবনীয় ক্ষমতার কথা ভেবে শিহরিত হয়ে ওঠে। এই তো সেদিন দেখল, একটি বছর দশেকের ছেলে তিনটে রুবি কিউব জাগলিং করার প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই সেগুলিকে নিখুঁত সাজিয়ে ফেলল মাত্র চার মিনিটে। কী অসামান্য ক্ষমতা! মানুষের এই মস্তিষ্কই তো তাকে এইসব ভাবায়, কেন ভাবায়, এই ভাবনার চরিত্রটাই বা ঠিক কী, এইসব ভাবনার কার্যকারণ, উপযোগিতা বা নিউট্রিশন ভ্যালু কি আদৌ আছে! পৃথিবীর যাবতীয় জীবনধারণভিত্তিক ওই হিসেবনিকেশের থেকে কি এই ভাবনাগুলো অনেক বেশি জরুরি! কী আশ্চর্য! এই সবই তো আবার এই হতচ্ছাড়া মগজটাই ভাবছে! চড়াই কিংবা বেড়ালের এমন বলিষ্ঠ মগজ তো নেই। ওরা ডাইমেনশন, আকাশযান রুবি কিউব নিয়ে থোড়াই ভাবে। কাঠবেড়ালি তার পাশের গাছের কাঠবেড়ালির শরীর খারাপে মোটেও উদ্বিগ্ন হয় না। আহারনিদ্রামৈথুন ছাড়া খুব বেশি মগজের কাজ ওদের নেই। তা হলে…
ফোন বাজছে।
‘হ্যালো–’
‘সুতনু বলছি। কবে ফ্রি আছিস? দেখা করার কথা ছিল তো। এবার দেখাটা হোক।’
‘সুতনু! তুই তো কানাডায় ছিলি। এখানে কবে এলি?’
‘যাব্বাবা। ফেসবুকে অত বড় পোস্ট দিলাম। সপরিবারে ইন্ডিয়া আসছি। এক মাস থাকব। তুই তো শালা লাইকও দিলি।’
‘ও হ্যাঁ, তাই তো।’
‘কবে ফ্রি বল তা হলে? তিমির, অর্ণব, রঞ্জনকেও ডেকে নেব। নেক্সট সানডে হলে ভাল হয়। সময় হবে?’
‘হ্যাঁ, বিকেলের পর ফ্রি আছি।’
‘ওকে দেন, তা হলে ফাইনাল করছি। আর বল কী খবর?’
‘খবর!’
পারিজাত আর বেশি কথা বলতে চাইছিল না। তবু কিছু মানুষের কিছু প্রশ্নের উত্তর বিশেষ কিছু সময়ে দিতেই হয়। পারিজাত খানিক ভেবে বলল, ‘আই আই টি বম্বের স্টুডেন্টরা হাংগার স্ট্রাইক করেছিল। ফি কমানোর জন্য। স্ট্রাইক মনে হয় তুলেও নিয়েছে। কিছু একটা নেগোসিয়েশন হয়েছে মনে হয়। আর সালমান রুশদিকে ছুরি মেরেছে। জানিস নিশ্চয়ই। লিভার ড্যামেজড। একটা চোখ হারাতে পারেন। এই খবরগুলো আমি জানি বলে তোকে জানালাম। আরও খবর আছে। কে কোথায় ডিপ্রেশনে সুইসাইড করল, কতজন দরকারের থেকে বেশি খেয়ে গ্যাস অম্বলের চোটে মাথা গরম করে আধপেটা মানুষকে খিস্তিখেউড় করল, এই সবও তো আকছার ঘটছে। রোজই ঘটে কোথাও না কোথাও। কত বলি বল দেখি।’
সুতনু হাসল। বলল, ‘তোর সেন্স অফ হিউমারটা একটু অন্যদিকে টার্ন নিয়েছে বুঝতে পারছি। ক্রিটিসাইজ করার বাতিকটা এখনও আছে দেখছি। আচ্ছা বেশ। ওগুলো নয় দেখা হলে আলোচনা করা যাবে। বিস্তারিত একেবারে যাকে বলে সোসিও-পলিটিকাল ডিসকাসন। কী ঠিক বললাম তো? এখন তোর খবর বল? অফিস ঠিকঠাক? বাড়িটাড়ি কিনলি নাকি?’
‘না।’
‘কী না?’
‘না মানে দুটোই নেগেটিভ। অফিস ঠিকঠাক নেই আর বাড়িও কিনিনি।’
‘ওকে ওকে। অফিসে আবার কী হল?’
‘কিছু না। বসকে ফ্যানাটিক ইডিয়ট বলেছিলাম। এবার স্যালারি না কমিয়ে দেয়। চাকরিও যেতে পারে। সে বাদ দে, তোর খবর বল। কানাডায় আহারনিদ্রামৈথুন সংক্রান্ত কোনও নতুন সংবাদ? গাড়ির মাইলেজ? বাড়ির গ্যারেজ? ইত্যাদি ইত্যাদি।’
সুতনু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘হুম বুঝলাম।’
‘তাই! বুঝে ফেলেছিস! অতই সোজা নাকি এইসব বুঝে নেওয়া! রবিবার দেখা হোক তা হলে। গাড়ি বাড়ি দেশ বিদেশ নিয়ে কথা হবে। ওকে মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। সি ইউ।’
রবিবার সকাল থেকেই বৃষ্টি। নিম্নচাপ। সন্ধে সাতটায় সকলের সুভাষ সঙ্ঘ ক্লাবের সামনে দেখা করার কথা। বৃষ্টি এখনও থামেনি। ইলশেগুঁড়ি চলছে। পারিজাত ছাতা নেয়নি। ভিজতে ভিজতে সে সময়ে পৌঁছে দেখল কেবলমাত্র অর্ণব যথাস্থানে দাঁড়িয়ে। এক হাতে ছাতা, অন্যটায় সিগারেট।
পারিজাত কাছে আসতেই অর্ণব জিজ্ঞেস করল, ‘ছাতা নিসনি কেন? ঠান্ডা লেগে যাবে তো!’
‘হারিয়ে যায় ছাতা। হাল্কা বৃষ্টি। ঠিক আছে।’
‘আর কী খবর?’
‘খবর! খবর আর কী! এখনও গাড়ি বাড়ি কোনওটাই কিনিনি। আর অফিসেও বিস্তর গণ্ডগোল।’
‘আরে ধুর! আমি কি তোকে এগুলো জিজ্ঞেস করেছি! তোর খবর বল। অফিস-ফফিস ছাড়। ও তো চলতেই থাকবে। কেমন আছিস বল?’
‘আমার খবর! হাল্কা সুগার প্রেসার। জেনেটিক বুঝলি। তবে কোলেস্টেরল নেই। রাতে ঘুম স্বাভাবিকের থেকে কম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আজকাল কী ভাবি জানিস! প্রেম জিনিসটা হয়তো একটা ডাইমেনশন, আমরা এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, মানে সময় যেমন একটা ডাইমেনশন। ছাড় বাদ দে। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। এই সুতনু খাওয়াবে তো? চাইনিজ মোগলাই কন্টিনেন্টাল।’
‘খাওয়াবে না মানে। ঘাড় ভেঙে খাব। শালা ডলার কামাচ্ছে এমনি এমনি।’
দুলতে দুলতে তিমির এল। তিমিরকে প্রথম যখন পারিজাত দেখেছিল, সে বেশ নাদুসনুদুস ছিল। আজও সে একইরকম। এসেই জিজ্ঞেস করল, ‘সুতনু কোথায়?’
‘আসছে। অটোতে আছে।’ অর্ণব বলল।
‘আর রঞ্জন?’
‘আরে শালা, সব খবর আমি নেব নাকি? নিজে ফোন করে জিজ্ঞেস করো না।’
‘এই পারিজাত ফোন কর না।’
‘আমার কাছে রঞ্জনের নাম্বার নেই।’
তখনই রঞ্জনের ফোন এল তিমিরের মোবাইলে। মালটা অনেকদিন বাঁচবে, একথা বলেই ফোনে কথা সারল তিমির। ফোন রেখে বলল, ‘বউয়ের গানের কী প্রোগ্রাম ছিল তো বউ না ফেরা অব্দি মালটা বেরোতে পারেনি। ছানা পাহারা দিচ্ছিল। তাই দেরি হচ্ছে। কাছেই আছে। এসে পড়বে। কত কাছে আছে সেটা কিন্তু ভাই বলেনি। এনআরআই আগে আসুক। তা অর্ণববাবু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আজকাল তো কোনও উচ্চবাচ্যই নেই। কী ব্যাপার?’
‘কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে এত ব্যস্ত যে উচ্চবাচ্য করার আর সময় নেই ভাই। হাজার ঝামেলা। তা তোরটা কত বড় হল?’
‘ছয়। আর বলিস না এমন দুষ্টু হয়েছে না। জ্বালিয়ে মারছে। কোনও কাজ করতে দেয় না।’
পারিজাত ঘড়ি দেখল। তারপর আকাশ। আকাশ অংশত মেঘলা। আকাশ কথা বলে না। আকাশে নাগরিক একঘেয়েমি নেই। আকাশে কান পাতলে মন শান্ত হয়।
‘আর এই যে সমাদ্দারবাবু? কী খবর? আপনি তো গ্রুপেও নেই। ফেসবুকে খালি উঁকি মারেন। আর দশবার ফোন করলে একবার তোলেন। সুতনুর কৃপায় তাও বদনটা আজ দেখতে পেলাম।’
‘একাই আজকাল ভাল লাগে।’
‘সে তো বুঝতেই পারছি। কারও সঙ্গেই তোর জমে না। তা এখন দিব্বি ভাল লাগছে। বয়েস হলে দেখবি আর পাশে কেউ নেই। তখন কিন্তু হাত কামড়াবি। যোগাযোগ রাখিস না। সে তোর ব্যাপার। পরে বুঝবি। মিলিয়ে নিস।’
‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভাল।’
তিমির চুপ।
‘মানে? আমরা দুষ্টু? গরুটা নয় বাদ দিলাম।’ অর্ণব বলল।
‘আরে বাবা, ওটা একটা ফিগার অফ স্পিচ। তিমিরও তো নিজের ছানাকে একটু আগে দুষ্টু বলল। তাই না? তিমির তোর মেয়ে এখন কোন ক্লাসে রে? রাগ করিস না। জানিস তো আমি শয়তানের ডিম।’
‘টু।’
‘আর অর্ণব, তোর?’
‘বড়টা থ্রি আর ছোটটা ন্যাপিতে।’
‘ও তাই নাকি! ছোটর ব্যাপারে জানতাম না।’
তিমির মুখ খুলল, ‘জানার চেষ্টা করলে তো জানবি। নিজের খেয়ালে থাকিস খালি। আর জেনেই বা কী করবি। আদৌ কি জানতে চাস?’
পারিজাত এবার গলা চড়িয়ে বলল, ‘ঝাড়খণ্ডে এই ঘোর বর্ষায় খরা চলছে। গত ১২২ বছরেও এমন খরা দেখা যায়নি। চাষিরা বলছে, কী ফসল ফলাব আর কীইবা খাব। আর ওদিকে উত্তরবঙ্গ তো বন্যায় ভেসে গেছে। ক্লাইমেট চেঞ্জ। আরও জানতে চাস? ছেলেটার নাম ইন্দ্র। আট বছর বয়েস। জল খাওয়ার অপরাধে সে এখন হসপিটালে ভর্তি। এমনই প্রহার দিলেন শিক্ষক! ব্রাহ্মণ দলিত কিসসা। বাঁচবে না মনে হয়। এইসব আদৌ কি তোরা জানতে চাস?’
‘কিছুই বুঝতে পারছি না। তোর সঙ্গে মাইরি কথা বলাই বৃথা। বহুত বাঁকা টোনে কথা বলিস। আমাদের মধ্যে থাকতে না চাইলে থাকিস না।’
‘থাকতেই তো চেয়েছিলাম। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একদিন, তোর মনে আছে, দেশভক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আমি কিন্তু চুপচাপই ছিলাম। আমাকে ঋজু উসকে ছিল। উত্তর দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। ঋজুর পছন্দ হয়নি। সে হতেই পারে। আমাকে বলেছিল, আমি নাকি…। জানিস তো কী বলেছিল। তারপর বলল, যা পাকিস্তানে গিয়ে থাক। ব্যাপারটা কী জানিস, আমার কাছে এইসবের ব্যাখ্যা আছে, এইসব বিচিত্র এবং প্রত্যাশিত আচরণ, যদিও এখন আর কিছুই বিচিত্র মনে হয় না আর তোদের…’
‘ব্যস ব্যস আর নয় পারিজাত তিমির ক্ষান্তি দে বাপ। আমার পুরো খিদেটা মাটি করে দিলি মাইরি। সুতনু এসে গেছে আর ওই যে রঞ্জন আসছে।’ অর্ণব ফোড়ন কাটল।
রঞ্জন এসেই বলল, ‘এখানে দুটো ভাল রেস্টুরেন্ট আছে। সিলভার স্পুন আর ফায়ার ইন বেলি। দুটোই ভাল। আমি খেয়েছি। চাইনিজ হলে ফায়ার ইন বেলি। মাঞ্চুরিয়ানটা পুরো মাখন বানায়। খেয়ে হুব্বা হয়ে গেছিলাম। আর ইন্ডিয়ান হলে সিলভার স্পুন। ডিসেন্ট খাবার। আগে এটা ঠিক কর কোথায় খাব, এটা মোস্ট ইম্পর্টেন্ট। তারপর যা ভাট মারার মার।’
সুতনু বলল, ‘তোদের যেখানে ইচ্ছে চল। আমার সব চলে। হাম সর্বভুক হ্যায়।’
‘সব চলে? তুই কি মানুষের মাংস খেয়েছিস।’ অর্ণব বলল।
‘না ওটা খাইনি। সর্বভুক বলা ভুল হয়ে গেছে।’
‘এই এটা যেন কোন বইতে দেখেছিলাম। বল না। পারিজাত তুই বল। তুই নিশ্চয়ই জানবি।’ রঞ্জন উত্তেজিত।
‘আগন্তুক।’ অর্ণব হেসে বলল।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। সত্যজিৎ সত্যজিৎ।’
ফায়ার ইন বেলির দিকে সবাই এগিয়ে চলেছে। বৃষ্টি আর তেমন নেই। তিনজনের হাতেই সিগারেট। পারিজাত এক হাত পেছনে হাঁটছে। হস্টেলে রঞ্জনের রুমমেট ছিল সে কলেজে। রঞ্জন বাড়ি থেকে দামি বিস্কুট আনত। কাউকে দিত না। তালা দিয়ে রাখত। লুকিয়ে লুকিয়ে খেত। বিশু ছিল তালা খুলতে ওস্তাদ। একদিন রঞ্জন এসে দেখে সব খাবার সাবাড়। এখন সেই রঞ্জন স্কুলের হেডমাস্টার হয়েছে। মিডডে মিল সামলায়। চাল ডালের হিসেব রাখে। সুতনুর অসামান্য গানের গলা। এখন কানাডায় বছরে দুবার বাঙালিদের অনুষ্ঠানে গান শোনায়। রেওয়াজ করা বহু বছর সে ছেড়ে দিয়েছে। আর অর্ণবের কাচ্চাবাচ্চার কারণে উচ্চবাচ্য সত্যিই বন্ধ। মজার ছেলে ছিল সে কলেজে। সবার পেছনে লাগত। পারিজাতের মগজে এসব পুরনো কথা একটা অস্পষ্ট কোলাজ হয়ে দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। কলেজে জীবনে একটা রোমাঞ্চ ছিল। এখন তো একঘেয়ে জীবনের সঙ্গে তালটা স্রেফ মিলিয়ে নেওয়া। এখানেই পারিজাতের বিদ্রোহ। যে মানুষ নিজের ভবিষ্যতের সব ক’টা দিন এমনই একঘেয়ে দুর্বিষহ হবে জেনেও তাকে পালটাবার চেষ্টা করে না তাকে পারিজাত স্বাভাবিক বলে মনে করে না। এই যেমন চল্লিশ পেরোনো চার বন্ধুর এই আচমকা রিইউনিয়ন এবং গড়পড়তা প্রাথমিক আলাপচারিতার পরে পেট ভরে চাইনিজ খাওয়ার মধ্যে যে সমসাময়িক স্বাভাবিকতা রয়েছে তাতে দীর্ঘ সময় ধরে সায় দিতে দিতে পারিজাত এখন ক্লান্ত। ভীষণই ক্লান্ত। সে কিন্তু বিদ্রোহের সংকেত পাঠিয়েছে কথার ফাঁকে ফাঁকে এটা সেটা বলে। তারা বোঝেনি। বুঝতে চায়নি। বুঝতে না চাওয়াটাও তো আরও অনেক বেশি উদগ্র অসহ্য স্বাভাবিকতা পারিজাতের কাছে। সে অন্তর থেকে জানে যে, এই অসহ্য স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধে তার এই সংকেত সমূহ কোনও অহংবোধের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং সে তো একেবারে বিপরীত এক স্বাভাবিকতায় সকলকে আঁকড়ে ধরতেই চায়। অথচ…
‘কীরে আমাদের সঙ্গে একটু কথাবার্তা বল পারিজাত। মানলাম তোর লেভেলটা একটু হাইফাই, তাই বলে পাত্তা দিবি না।’
পারিজাত বোঝে, বন্ধুর মনেও কিছু শত্রু-ভাবনা ঘাপটি মেরে থাকে। তারা মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসে ছদ্মবেশে। পারিজাত বলল, ‘লেভেল দেখিয়ে লেবেল সাঁটাচ্ছিস? এই তো তোদের কথা শুনছি। তোরা যে হারে এগোচ্ছিস তাতে কিন্তু আমার আনন্দই হচ্ছে। আমি পিছিয়ে পড়া মানুষ। তাই পেছনে হাঁটছি। তোদের সঙ্গে পেরে উঠছি কই!’
‘আবার টিটকিরি মারছিস।’
‘না ভাই রঞ্জন। এটা তোর পারস্পেকটিভ। বাস্তব অন্য কথা বলছে।’
‘কী বলছে বাস্তব? মানুষ খেতে পাচ্ছে না আর আমরা রেস্টুরেন্টে গিলতে যাচ্ছি। এটাই বলবি তো।’ তিমির কথা কেড়ে নিয়েছে।
পারিজাত হেসে উঠল। ‘আরে না রে না, বাস্তব বলছে, তোর যে বিশ্ববিখ্যাত ক্রিম বিস্কুটগুলো সাবাড় করা হয়েছিল হস্টেলে, বুঝলি রঞ্জন, তুই ভেবেছিলি সব ব্যাটা তিমিরের কাজ, নাটের গুরু ছিল কিন্তু আমাদের লকস্মিথ বিশু। তালা খুলে সব ক’টা ও একাই গিলেছিল। আমি আর তিমির কিছুই পাইনি, বিস্কুটের আণবিক গুঁড়ো ছাড়া।’
রেস্টুরেন্টে পৌঁছে খাবার অর্ডারের দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নিল রঞ্জন। ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, গ্রেভি নুডলস আর মাঞ্চুরিয়ান।
খাবার তৈরি হতে মিনিট পাঁচেক লাগবে। তিমির জিজ্ঞেস করল সুতনুকে, ‘কানাডায় লাইফ কেমন শুনি?’
সুতনু বলল, ‘এমনি সব ঠিকই আছে। বাট প্রচুর ট্যাক্স কাটে। তোর ইনকাম যত বাড়বে ট্যাক্স তত বেশি কাটবে।’
‘মানে বেশ একটা ব্যালেন্স মেনটেন করে।’
‘সেটা তো ভালই। তাই না?’ অর্ণব জুড়ল।
‘হ্যাঁ কিন্তু সবার সেটা পছন্দ নাও হতে পারে। আমার থেকে ট্যাক্স কেটে হয়তো থার্ড ওয়ার্ল্ডের কোনও ওয়ার্কারকে ফিড করছে। সেটা আমি কেন মেনে নেব বল। আমার তো অ্যাম্বিশন থাকতেই পারে। আই ডোন্ট লাইক দিজ পলিসি অ্যাট অল।’
রঞ্জন বলল, ‘পারিজাত তুই কিছু বল। এই কানাডার ট্যাক্স পলিসি নিয়ে। গুড অর ব্যাড?’
‘হ্যাঁ সত্যিই তো। এত ট্যাক্স কাটলে গাড়ি বাড়ি কেনা তো খুব মুশকিল। ট্যাক্স জিনিসটাই খুব খারাপ। আর সেটা কাটা তো আরও খারাপ। ট্যাক্স কাটলে মানুষের খুব মন খারাপ হয়। অ্যাম্বিশনে বাধা পড়ে। ট্যাক্স বেশি কাটলে আমরা ট্যাক্সিই চড়তে পারি না।’
পারিজাতের মন্তব্যে তিমিরের চোয়াল শক্ত হল। অর্ণবের মুখে মুচকি হাসি। সুতনু আর রঞ্জন কোনও উত্তর দিল না। খাবার এসে পৌঁছেছে। ভাগাভাগির দায়িত্ব রঞ্জন খুশিমনে নিল। সুতনু চিকেনের একটা টুকরো মুখে তুলে নিয়ে বলল, ‘বিয়ে তা হলে করবি না পারিজাত?’
পারিজাত হেসে বলল, ‘আমাকে অন্তত তিনশো জন বলেছে আমি ম্যারেজ ম্যাটেরিয়াল নই। সে ম্যাটেরিয়াল কী বস্তু তা আমি জানি না, গবেষণা করছি, তবে আমি বিয়ে করলে সে বিয়ে টিকবে না। আমার মধ্যে প্রেম নেই। আমি নিরস নারকেলের ছিঁবড়ে। নিরলস ক্রিটিক। সইবে না কারও। বন্ধুত্বই টেকে না তো বিয়ে।’
রঞ্জন এই সুযোগে বলল, ‘কলেজে ক্লাস বাঙ্ক করে যার সঙ্গে দেখা করতে যেতিস, তার কী হল?’
‘জানি না। কলেজে যেটা ছিল সেটা আস্তে আস্তে প্রেম হয়ে উঠছিল। ঠিক প্রেম নয়। আর প্রেম বলতে তোরা যা বুঝিস তার অন্তিম গন্তব্য সংসার কাচ্চাবাচ্চাই তো হয়। সংসার আর প্রেম হল তেল আর জল। যেমন পরিবার আর সামাজিকতা। এগুলো সব অক্সিমোরন।’
‘তাই বুঝি! আর তুই প্রেম বলতে কী বুঝিস? তোর গন্তব্য?’ তিমির জিজ্ঞেস করল।
‘গলা অব্দি গিলে আপাতত বাড়ি। তারপর দেখি।’
রঞ্জন বলল, ‘ভাই কেমন লাগছে ফ্রায়েড রায়েস? খাবার ভাল তো? আর একটা সাইড ডিশ লাগবে মনে হচ্ছে।’
সবাই মাথা নাড়ল।
খাওয়া যখন শেষের দিকে পারিজাত সুতনুকে জিজ্ঞেস করল, ‘আর কিছু আলোচনা বাকি আছে? আমার প্রেম, তোর ট্যাক্স, এগুলো ছাড়া?’
‘মানে?’
‘মানে তুই ফোনে সেদিন বললি না, যে হাংগার স্ট্রাইক, সালমান রুশদি, ডিপ্রেশন থেকে সুইসাইড দেখা হলে এসব নিয়ে আলোচনা করবি। তাই জিজ্ঞেস করছি আর কী। তা সেটা যে একটা ফিগার অফ স্পিচ ছিল তা আবার প্রমাণিত হল। ক্যাসুয়ালি হাওয়ায় একটা মিথ্যে কথাকে ভাসিয়ে দেওয়া। সবাই আজকাল যেভাবে দেয়। ক্রমশ এ কাজে সবাই দিনেদিনে পণ্ডিত হয়ে উঠছে।’
সুতনু ভুরু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করল, পারিজাত কী বলতে চাইছে। বলল, ‘কী বলছিস বল তো কিছুই বুঝতে পারছি না। শুরুর থেকে কেমন পাজল করছিস সবাইকে। না আসলেই তো পারতিস। সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর দিস না। কী আলোচনা করব তোর সাথে। সমস্যাটা কী বল তো তোর?’
তিমির এই সুযোগে যোগ করল, ‘এই জন্যে আমিও আজকাল পারিজাতকে এড়িয়ে চলি। নেহাত তোরা বললি তাই এলাম।’
রঞ্জন বলল, ‘এত সিরিয়াস হয়ো না প্লিস। ইজি ইজি বস। কুল কুল।’
অর্ণব বলল, ‘পারিজাত একটা কথা বল তো, ঘণ্টাখানেক হল তোকে দেখছি, মনে হচ্ছে না তুই আমাদের মধ্যে আছিস। আমরা তো বন্ধু। কিছু সমস্যা থাকলে আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারিস। সব ওকে তো?’
পারিজাত শান্ত গলায় বলল, ‘ওকে। অল ওকে।’
রঞ্জন বলে উঠল, ‘সুতনু এবার একটু ফ্রেশ লাইম সোডা বলি? বাজেট আছে তো?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ যা ইচ্ছে বল না। নো চাপ।’
‘পারিজাত ভাই তুই খাবি তো? তোর মতো আনম্যারেড আর হ্যান্ডু হলে আমি এখন দশটা প্রেম করতাম। বুঝলি পারিজাত। চিয়ার আপ ম্যান। এনজয় লাইফ।’
তিমির বলল, ‘কানাডায় দুর্গাপুজো হয়?’
‘হ্যাঁ ভালই হয়। বেঙ্গলি কমিউনিটির ধর তিনশো বাঙালি আছে। সবাই মিলে করি। ভাল মস্তি হয়। এখন তো আমরা বাড়িতেও কিছ পুজোটুজো করি। একটা গ্যাদারিং হয়। আড্ডা খানাপিনা হয়।’
রঞ্জন বলে উঠল, ‘এই তোরা তিরঙ্গা কিনেছিস? হার ঘর তিরঙ্গা। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর ভাই।’
অর্ণব বলল, ‘হ্যাঁ কিনেছি। আমার কাছে অবশ্য সেলেব্রেশনটা আরও একটা জায়গায়। কমনওয়েলথে ইন্ডিয়া কী পারফর্ম করল মাইরি। ভাবা যায়!’
তিমির বলল, ‘ইয়েস। বাইশটা গোল্ড। পারিজাত তোর এ বিষয়ে কী মতামত। নাকি এখানেও ইন্ডিয়ার খুঁত ধরবি।’
পারিজাত বলে, ‘না না, ইন্ডিয়া এখন নিঁখুত। তোদের প্রেমে দেশ আরও নিখুঁত হয়ে উঠছে।’
‘আর তোর প্রেম? নেই? প্রেম বলতে কী বুঝিস সেটা একটু বল দেখি? শুনি তোর বাণী।’
পারিজাত আর উত্তর দেয় না। সে অর্ণব, সুতনু, রঞ্জন, তিমিরের থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। সে বোঝে কত অন্তর্গত দৈনিক ঝুটঝামেলাকে সঙ্গে করে, কত সব অব্যক্ত যন্ত্রণাকে ভুলে আজ তারা হাসছে, আসলে মিশতেই চাইছে, কলেজের পুরোনো স্মৃতি ঘেঁটে বা অন্য কোনও প্রসঙ্গে জড়িয়ে কত কথাই না তারা বলছে। সমালোচনায় চোট পেয়ে খানিক তেতো কথা বললেও সে তো আসলে তাদের ডিফেন্স মেকানিজম। তারা কি বোঝে এই পৃথিবীর লুকোনো জটিলতা! প্রতিবাদ ভুলে বেবাক উদাসীনতার, কথা দিয়ে কথা না রাখার স্বাভাবিকতার জঘন্য কারবার! প্রেম কী তা না বুঝেই প্রেমে পড়ার, দারিদ্র্য অনুভব না করেই দরিদ্রের কথা বলার। মেকি হাসির, মেকি আচরণের যে স্বাভাবিকতা দাঁত বার করে পোশাকের মতো তা পরে ফেলার রোজকার অনুশীলন! কী নির্বোধ! কদর্য! কী অমানবীয়! তবু পারিজাত এইসবের মধ্যেই সুতনু, তিমির, রঞ্জন আর অর্ণবের ভিতরের খাঁটি মানুষটাকে খুঁজে পায়, যেখানে ভান নেই, চালাকি নেই, খালি সরলতা সততা উঁকি দেয় মুহূর্তের জন্য হলেও। যেহেতু এই পৃথিবীর লেনদেন কলুষিত তাই এই পৃথিবীর বিস্তৃত স্বাভাবিক সব কারবার থেকে অনেক দূরে সে তাদের পরিচ্ছন্ন প্রকৃত অবয়বটুকু খোঁজে কোনও এক দূরবর্তী গ্রহের মাটিতে। দূরের জুপিটার, তার বড় প্রিয় জুপিটারের অতিকায় আয়তনে সে দেখতে পায় নতুন সমাজ। প্রেম! সহযোগিতা! চমৎকার আলাপ! শতকরা একশোভাগ খাঁটি হাসির দমক। কী নিবিড়! কী অসীম! কী ভাল! তবুও এই কল্পনায় কিছু ভয় থেকেই যায়, কিছু রহস্যময় উদ্বেগ। তবুও এখানেই যে উল্লাস! এখানেই বিস্ময় তা যতোই বিপন্ন হোক। পারিজাত কোনও ট্রপিকাল অরণ্য বা পাহাড়চূড়ার কুয়াশা থেকে নয়, কোনও রোমান্টিক সন্ধিক্ষণে মজে গিয়েও নয়, শহরের সম্ভ্রান্ত রেস্টুরেন্টের ভিতরে চার প্রিয় বন্ধুর মশগুল বার্তালাপে, কিছু চিবিয়ে খাওয়া হাড়ের সঙ্গে লেগে থাকা মূল্যবান মাংসের দিকে চোখ রেখে ভয়ংকর আহত মনে সে দেখতে পায় স্যাঁতসেঁতে চাঁদ আর তার প্রিয় রোমাঞ্চকর জুপিটারের মধ্যবর্তী বিপুল সম্ভাবনাময় আকাশ। সে দিকে তাকিয়ে, চার বন্ধু, সকল বন্ধুদের হাতে হাত রেখে সে খোঁজে প্রেমিকের চোখ, প্রেমিকার চোখ। চোখের ভিতর অন্যরকম পৃথিবীর মতো দেখতে নিখাদ সবুজ একটা মণি।
সুতনুর চোখ তখন খাবারের বিলের দিকে। ভুরু কুঁচকে জিএসটি, ট্যাক্স ইত্যাদি সে মিলিয়ে নিচ্ছে। রঞ্জন ওয়েটারকে বলল, ‘একটা ছবি তুলে দিন না প্লিজ।’ অর্ণব ফোনে। তার প্রাক্তন প্রেমিকা, আজকের সহধর্মিণী অর্ণবকে বাড়ি ফেরার তাড়া দিচ্ছে। আর তিমির মাঞ্চুরিয়ান ঢেঁকুর তুলে আড়চোখে দেখল, পারিজাত কেমন হাবার মতো হাসছে। শুধু কি হাবা! শয়তান বেশরম পারিজাত।
চিত্রণ: বাপ্পাদিত্য জানা







