আয়না ভাঙার পর
একটা আশ্চর্য স্বপ্ন— যা ছুরি দিয়ে ফালা ফালা করে কাটা নাকি খান খান হয়ে ভেঙে পড়া, অদৃশ্য হবার পর সোহেল বুঝল স্বপ্নটুকরোগুলোর মধ্যে কোনও মিল নেই। আয়না ভাঙলে প্রতিটি খণ্ড পৃথক আয়না হয়, অথচ স্বপ্ন ভেঙে টুকরোগুলো বেহাত হলে আর জোড়া নিতে চায় না। ঘুম থেকে জেগে সেটাই মিলাতে বসল সোহেল। আনন্দ ও শঙ্কার দোটানার মধ্যে ভাবতে লাগল সেই দৃশ্যহীন গল্পটা।
কোথায় যেন পড়েছিল চকমকিটোলার সেই সাঁওতাল রাজা দোবরু পান্নার কন্যা ভানুমতির কথা। কালো মহিষের মতো পাহাড়চূড়ার শক্ত পাথরে পড়ে ভেঙে গিয়েছিল তার শখের আয়না। কিন্তু ভাঙা প্রতিটি খণ্ডে তার বিম্বিত রূপ দেখে নিজেই বিহ্বল হয়ে পড়েছিল ভানুমতি। অমঙ্গল আশঙ্কার চেয়ে খণ্ডিত আয়নায় নিজেকে ঝলমলে রূপে দেখে খলবল করে হেসে উঠেছিল সেই সাঁওতাল রাজকন্যা। রাতদুপুরে আয়না ভাঙার শব্দ কি সেই পাহাড়চূড়া থেকেই ভেসে এল? নাকি পুরোটাই সোহেলের কল্পনা! ভানুমতির মতো খলবল করে হেসে ওঠার আগে একটা ভয়জড়ানো নিঃসীম শূন্যতা গড়িয়ে নেমে এল ওর চোখে।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় ভীষণ জলতেষ্টা পেল সোহেলের। খাবারঘরের বাতি জ্বালাতেই চোখে পড়ল বাঁধানো লম্বা আয়নাটা উপুড় হয়ে আছে মুখ থুবড়ে। ঢকঢক করে গলা ভিজিয়ে দেখল ফুরফুরে হাওয়ায় জানালার পর্দা উড়ছে। কার্নিশ থেকে নিশ্চয়ই বিড়াল ঢুকেছিল জানালা টপকে, নয়তো হঠাৎ হাওয়ার ধাক্কায় ঘটেছে এমনটা। খুব সাবধানে কাচের গুঁড়ো থেকে পা বাঁচিয়ে আবার এসে বসল খাটের ওপর। একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করছে। সিগারেট জ্বালালেই মনে পড়বে রোদসীর কথা। ওর শাসন চোখে তাকানোর কথা। কিন্তু রোদসী কি ভানুমতির মতো উচ্ছল হতে পারত না?
রোদসীকে যত দেখছে ততই যেন নতুন করে চিনছে সোহেল। সেই প্রথম দেখার দিন থেকে আজ পর্যন্ত ওর মধ্যে হেঁয়ালিপনা দিন দিন বাড়ছেই। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া পরিষ্কার হবার পরই দু’জনের সম্পর্কটা এগিয়ে গেছে অনেকদূর। কিন্তু, এক জায়গায় থিতু হতে গিয়ে আবারও হোঁচট খেয়ে থমকে উঠছে প্রথম শুরুর মতো। গত এক বছরে এমন চেষ্টায় সোহেল হাঁপিয়ে উঠেছে অনেক। সুতোয় বাঁধা ফড়িংয়ের মতো এখন শুধু ডানা ঝাপটে মরছে কিন্তু কী করবে ঠিক ভেবে পাচ্ছে না।
সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল রোদসী একাই। আট বছরের সম্পর্কের শুরু থেকেই ও ঢাকার বাইরে— সেই সুদূর ময়মনসিংহে। পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে সেখানেই স্থায়ী হয়েছে চাকরিসূত্রে। ঢাকা থেকে বাস-ট্রেন ধরে প্রায় প্রতি সপ্তাহে সেদিকেই ছুটে গেছে সোহেল। ভালবাসার মূল্য যে এত কঠিন হবে, তখনও বুঝতে পারেনি। রোদসীর ছেলেমানুষিকে বারবার প্রশ্রয় দিয়ে ভালবাসার টানে ভেসে যেতে চেয়েছিল স্বর্গনদীর স্রোতে।
তুমি চলে এসো না বদলি নিয়ে… একসাথে সংসার শুরু করব। সোহেল একদিন বলেছিল।
ব্যাপারটা অত সহজ নাকি? পারলে তুমিই না হয় একটু চেষ্টা-তদবির করো। আমার একার পক্ষে তো কুলাচ্ছে না।
সোহেল পারেনি। কঠিন সেই ব্যাপারটা কঠিনই রয়ে গেল। তবে বদলি হয়ে দু’একবার ঢাকায় আসবার যে চেষ্টা করেনি তেমনটাও নয়। কিন্তু সেগুলো আর বেশিদূর এগোত না। তারপর হঠাৎ একবার একটা ট্রেনিংয়ে এসে থেকে গেল মাসখানেকের জন্য। তখনই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে, দু’দিনের জন্যে সংসারযাপন আর ফিরে যাবার আগে জানিয়ে যাওয়া যে, সকলের সঙ্গে থাকতে তার ঘোর আপত্তি। সেই থেকে দু’জনের দাম্পত্য শুরু হল দুটি ভিন্ন শহরে সবটুকু বিশ্বাস ও ভালবাসাকে সংহার করে।
সোহেল প্রস্তুত ছিল তারপরও। রোদসীর কথামতো কয়েকমাস পরে নিজের বাসা ছেড়ে ফ্ল্যাটও নিয়েছিল সে। ওর পছন্দ আর রুচিমতো এটা-সেটা দিয়ে সাজিয়েওছিল। শুধু অপেক্ষায় ছিল রোদসীর জন্যে। এভাবে চলল অনেকদিন। তারপরেই ফোনে এল সিদ্ধান্তটা। সোহেলের দিক থেকে অনুযোগটা ঠিক এখানেই।
মধ্যরাতে আয়না-কাণ্ডের পর অ্যাশট্রে খুঁজতে গিয়ে খাবারঘরে আবারও গেল সোহেল। নিজের নির্বুদ্ধিতা আর আলসেমির জন্যে আফসোস হচ্ছে খানিকটা। কয়েকদিন ধরেই ভাবছিল আয়নাটা ঝোলাবে কোথাও। তারপর আবার ‘থাকুক’ বলে রেখে দিয়েছিল একপাশে। রোদসী এলে না হয় ওর পছন্দমতোই ঝোলাবে। হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে উল্টে-পাল্টে দেখল ক্ষত-বিক্ষত আয়নাটা।
গতকাল সন্ধ্যায়ও ভাঙা ছিল না। নিজেকে দেখবার চেষ্টা করেছিল সামনে দাঁড়িয়ে। অথচ এখন? স্বচ্ছ চকচকে মসৃণতার ওপর চৈত্রের রুখো মাঠের মতো অসংখ্য চিকন চিড় দেখতে পেল সোহেল। ভাঙা ফাটলের মধ্যে নিজের খণ্ড-বিখণ্ড মুখচ্ছবি বিম্বিত হতেই কেমন একটা অশনির সংকেত টের পেল অজান্তে। ধুর, এসব আবার সত্যি হয় নাকি? রাতদুপুরে কী সব আজব কথা মনে আসছে তার? যাই হোক, রোদসী যাতে বুঝতে না পারে তেমনিভাবে না হয় বদলে দেবে তাড়াতাড়ি। একটা আয়নাই তো, রোদসীর যে খুব প্রিয় জিনিস।
দুই
ঢাকায় এলে রোদসী আগে ওর মামার বাসায়ই উঠত। লেকসিটি কনকর্ডের কাছে মামার বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট। মামা-মামির সন্তানাদি নেই। রোদসী এলে ওদেরও পোয়াবারো। যে ক’দিনই থাকুক না কেন কেবল হৈহৈ করে আনন্দ। মামা বোরহানউদ্দিন ঠিকাদারি করে। দু’হাত ভরে যেমন কাঁচাপয়সার উপার্জন, খরচের হাতও ঠিক তেমনি। রোদসী এলে মামিরও আনন্দের কোনও কূল-কিনারা থাকে না। একমাত্র ভাগ্নি মেয়ের চেয়ে কোনও অংশে কম নয় তাদের কাছে।
সেদিন রাতের বেলা মামার কাছে হঠাৎ ফোন এল রোদসীর।
কেমন আছ মামা?
আছি রে। আমরা সবাই ভাল আছি। তোর একা একা কোনও সমস্যা হচ্ছে না তো?
কী যে বলো মামা? রোদসী তেমন মেয়েই নয়। তুমি না আমাকে সাহস নিয়ে একলা চলতে শিখিয়েছ। এত ভয় করলে চলে?
হুম, সেটাই। সোহেল কেমন আছে রে? সেই যে কবে একবার আমাদের বাসায় এল আর পাত্তা নেই। তুই না হয় থাকিস না, কিন্তু আমরা তো আছি। তোর মামি সবসময় ওর কথা বলে।
ঠিক আছে বলব মামা। শোনো, একটা খুশির খবর দিই। আমি ঢাকা আসছি।
ক’দিন থাকবি এবার?
ক’দিন-টদিন নয় এবার আসছি একেবারে পাকাপোক্তভাবে। আমার অনেক চেষ্টা আর দেনদরবার অবশেষে হেড অফিস গ্রাহ্য করেছে। তাই বদলিটাও হল একেবারে সেখানেই। এই তো আস্তে আস্তে সব গুছিয়ে নিচ্ছি।
সোহেল জানে? বিয়ের পর সেভাবে তো তোদের থাকাই হল না একসাথে। কিছু দরকার হলে আমাকে জানাস।
ভাবছি সবাইকে চমকে দেব। এখন রাখছি মামা। মামিকে বোলো পরে কথা বলব।
মামা-মামি দু’জনেই খুশিতে আত্মহারা। যাক, আর ঢাকা ময়মনসিংহ টানাটানি নয়। মফস্বল টাউনের মায়া কাটিয়ে অবশেষে মেয়েটা গুছিয়ে সংসার করার সুযোগ পাবে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিও কমবে এবার।
বোরহানউদ্দিনের বাসা সোহেলের বাসার খুব কাছেই। মাঝখানে শুধু ব্যস্ততম তিনশো ফিটের সড়ক। ছুটির দিনে মাঝেমধ্যে দেখাও হয়ে যায় দু’জনের। সেদিনও এমনিভাবে হঠাৎ সাক্ষাৎ হল কুড়াতলি বাজারে। সোহেল প্রথমে দেখতে পায়নি। রোদসীর মামাই পেছন থেকে হাত ধরে টেনে নিলেন।
কী হে? তোমার তো দেখাই পাওয়া যায় না ইয়াং ম্যান। কোথায় থাকো আজকাল?
পরিচিত কণ্ঠস্বরে কিছুটা চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় সোহেল।
আরে মামা, আপনি। স্লামালাইকুম…
ওয়ালাইকুম সালাম। আজকাল তোমার সাথে শুধু বাজার, রাস্তা-ঘাট আর দোকানপাটেই দেখা হয়। মামা-মামিকে তো একদম ভুলেই গেছ।
ঠিক তা নয় মামা। আসলে লাস্ট প্রমোশনটা হবার পর অফিসে কাজের চাপ বেড়েছে। নিজের জন্যেই ঠিকমতো সময় পাই না।
হুম, বুঝেছি। রোদসীও অবশ্য সেই কথা বলছিল। তুমি নাকি কল ধরারও সময় পাও না। একেবারে এক লাফে হেড অব সাপ্লাই চেন… দ্যাটস ভেরি গুড, ব্রিলিয়ান্ট। বেসরকারি জবে লেগে থাকাটাই আসল। সাকসেস আসবেই। শুনলাম ফ্যাক্টরির দিকটাও আজকাল সামলাচ্ছ তুমি। ওটা এডিশনাল চার্জ নাকি? খুব ভাল।
সেরকমই মামা। তাই তো ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। সবকিছুতে টায়ার্ড লাগে খুব। নিজেকে বিল্ড আপ করার সময়টাই পাই না।
অথচ দেখো, আজ তিন বছর ধরে কেবল শুনেই আসছিলাম রোদসীর পোস্টিংটা হবে। কত তদবির, দেন-দরবার। শেষমেশ অবশ্য হল একেবারে হেড অফিসে। তুমি জানো তো?
হাঁ, এই তো… শুনলাম মামা… সোহেল হালকা ইতস্তত করে অপ্রস্তুতভাবে। বাজারের হৈ-হট্টগোলে বোরহানউদ্দিন অতটা খেয়াল করতে পারেননি।
চলো তো, সামনে এগোই।
কথা বলতে বলতে বাজারের ভিড় ঠেলে কিছুটা নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়ায় দু’জন। বোরহানউদ্দিন পকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার হাতে নেয়। সোহেলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, তুমি একটা ধরাবে নাকি?
থাক মামা, এখন নয়। ইচ্ছে করছে না একদম।
সিগারেট জ্বালিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকায় বোরহানউদ্দিন। একটু কী যেন ভেবে তারপর বলল, বুঝলে সোহেল… রোদসী আমার আদরের ভাগনি। বড়বোনের একমাত্র মেয়ে। ওর বাবা-মা মারা যাবার পর আমার কাছেই থেকেছে সবচেয়ে বেশি। ভীষণ জেদি মেয়েটা। তবে ওর আবেগ-অনুভূতিগুলো আমি ভাল বুঝতে পারি। তোমাদের দু’জনের এতদিনের সম্পর্ক কিন্তু তোমাদের নিজেদের বোধ হয় আরেকটু সময় দেওয়া জরুরি। নিজেদেরকে জানা-বোঝার জন্য হলেও আরেকটু কাছাকাছি থাকা দরকার। আমার কেন জানি মনে হয়, তোমরা দূরে থাকাটাকেই উপভোগ করছ বেশি, অকারণ ভয়ে কাছে আসতে চাইছ না। এতে করে তোমাদের মধ্যে প্রায়ই খিটমিট লেগে থাকে। এবার একসাথে থাকবে যখন মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কোরো।
সোহেল কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল। বাজারের মধ্যস্থলে চারপাশের এই হৈ-হট্টগোলের মধ্যে গভীরভাবে ভাবার কোনও সুযোগ নেই এখন। তবে এটুকু ভাবল, মামা খুব মিথ্যে বলেননি। স্পর্শের দূরত্ব বাড়তে বাড়তে দু’জনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বেড়েছে অনেকখানি। সমস্যাটা যে কোথায়, সে নিজেও ঠিক জানে না। দু’জনের মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ কি কমে গেল? নাকি ফুরিয়ে গেল জীবনের সব বোঝাপড়া? সংসারযাপনের আগেই কি দমে গেল দু’জন, নিজেদেরকে যুযুধান কল্পনা করে?
সোহেলকে চুপ থাকতে দেখে খেই ধরিয়ে দেন বোরহানউদ্দিন।
শোনো, এখানে দাঁড়িয়ে নয়, তোমার মামি বলছিল বাসায় যেতে। চলে এসো একদিন বিকেলে চুটিয়ে আড্ডা দেব। রোদসীও তো আসছে মাসশেষে। একেবারে তল্পিতল্পা গুটিয়ে।
রোদসীর বিষয়ে যতটুকু শোনা, তা বোরহানউদ্দিনের কাছ থেকেই। একসঙ্গে থাকা ও সংসার শুরু করার পেছনে হঠাৎ এমন গড়িমসি উঠল কেন এক সপ্তাহ ধরে, সেই কথাটাই ভাবছিল সোহেল। রোদসী যদি নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সোহেলের কাছ থেকে দূরে রাখে, তবে তাই হোক। এ রহস্যময়তা আর ভাল লাগে না। দু’জনের যোগাযোগ নেই বেশ কিছুদিন, চোখের দেখা তো আরও পরে। সেই কারণে ওর ঢাকায় বদলির খবরটা পর্যন্ত জানতে হল মামার কাছ থেকে! আজ বাজারের এই তুমুল ভিড়ের মধ্যে!
অভিমান আর রাগে সোহেল কুঁকড়ে যায় ক্রমশ। বোরহানউদ্দিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাজারের ব্যাগ হাতে হাঁটতে থাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে। নিজের দায়টুকু মেলাতে চাইল। কিন্তু, হিসাব মিলছে না। ঠিক আছে, ওকে বাদ দিয়ে যদি সব সম্ভব হতে পারে, তবে তাই হোক। আগ বাড়িয়ে কোনও কিছুতে ও নিজে থেকে আর হাত বাড়াবে না। সম্পর্কের পরিণতি যদি এমনটাই হয়, নিয়তি যদি এভাবেই টেনে নিয়ে যায়, তবে আক্ষেপ করে লাভ কী? সেদিন মধ্যরাতে খান খান হয়ে আয়না ভাঙার ঘটনাটা কি তারই ইঙ্গিত দিয়ে গেল?
তিন
সোহেলের সাথে রোদসী গাঁটছড়া বেঁধেছে দু’বছরের মতো। কিন্তু, তার পরে সংসার গুছিয়ে নিয়ে একসাথে কখনওই ওদের থাকা হয়নি। সবার সাথে মানিয়ে নিয়ে রোদসীর দিক থেকে সেই অভাব ছিল প্রকট। অথচ এর মধ্যেই বেজে উঠল একটা টানাপড়েনের সুর। রোদসী ক্রমাগত যে ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে, তার ফল কি আদৌ শুভ হবে?
নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা সোহেলের জানা ছিল না। তখন মায়ের সাথে ঠিকমতো বনিবনা না হওয়ায় বাসার কাছেই ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট একটু একটু করে গুছিয়ে নিয়েছিল রোদসীর কথায়। অনেকটা মায়েরই অগোচরে টুকিটাকি দিয়ে ঘর সাজিয়েছিল নিজেদের পছন্দে। অথচ মামার কাছ থেকে শুনল, সে নাকি মামার ওখানেই উঠবে! হঠাৎ এ হেঁয়ালিপনা কেন?
বদলি নিয়ে ঢাকায় আসার পর রোদসী থিতু হল মামার বাসাতেই। অফিসও করছে রোজ সেখান থেকে। সময়-সুযোগ ও ইচ্ছে হলে সোহেলের সাথে মাঝেমধ্যে যোগাযোগও রাখছে। কিন্তু আচরণগুলো কেমন যেন নিঃসাড়, ধোঁয়াটে।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সোহেল একদিন বলেছিল, ঢাকায় আসার আগে ওভাবে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিলে কেন? তোমার এই রহস্যময় আচরণ বোঝার সামর্থ্য নেই আমার। তাছাড়া মামার ওখানে উঠলে যে!
ফোনের ও প্রান্তে সব চুপচাপ, শুধু ভারী কিছু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। প্রাণহীন প্রাণের ভাষা বুঝবার সামর্থ্য নেই যেন। রোদসীর কাছে কোনও জবাবও নেই।
তারপরও সোহেল ডেকেছিল, তোমার ফ্ল্যাটটা দেখবে না? দূর থেকে আমাকে দিয়ে একটু একটু করে গোছালে! রাজ্যের জিনিসপত্র এনে জড়ো করলাম। অথচ এখন…
আমার খুব আগ্রহ নেই। ফ্ল্যাটটা বরং ছেড়েই দাও।
হঠাৎ এই কথা? আকাশ থেকে পড়ল যেন সোহেল। চোখ কপালে তুলে বলল, কই, গত এক বছর ধরে যখন আঁকড়ে রাখলাম, তখন তো কিছু বলোনি।
তখন আমার নিজেরও একটা স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ অনেকটাই ফিকে।
তোমার কথার মাথামুন্ডু আমি ধরতে পারছি না। আমাদের মধ্যে কী এমন হল যে, স্বপ্নটা ভেঙে গেল তাড়াতাড়ি। তাছাড়া তোমার কারণেই তুমি এতদিন ময়মনসিংহ ছিলে। আমি তো তোমার অসুবিধা করে কিংবা চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় আসতে চাপ দিইনি কোনওদিন। সত্যিই এর কারণটা জানতে চাই আমি।
রোদসী জানায়, কারণ যদি খুঁজতেই হয় নিজেকে জিজ্ঞেস করো। তোমার সুবিধা ভেবেই তুমি জোর করোনি হয়তো! আমি নিজেও ঠিক জানি না, কেন এমন হল? দেখি না আলাদা থেকে কিছুদিন, তোমার দিকে মনটা আবার ধাবিত হয় কি না! শোনো… আমি এমনি একদিন গিয়ে দেখে আসব ফ্ল্যাটটা। বাসা থেকে কয়েকটা জিনিস এনে রাখব নিজের কাছে।
সোহেল নিরুত্তর। বোকার মতো শুধু চুপচাপ শুনছিল রোদসীর কথা। বদলি হতে না পারার দোষটাও যে ওর কাঁধে এসে পড়বে বুঝতে পারেনি। যুদ্ধহীন মানসিক দ্বৈরথে বসবাস করে অনেকটাই ক্লান্ত আজ। মনে মনে ভাবল, সম্পর্কটাই যেখানে দোদুল্যমান কিছু বস্তুগত জিনিস কী এমন মহার্ঘ হয়ে উঠল, যেটা সম্পর্ককে মহিমান্বিত করতে পারে? তবু সে ধীরে ধীরে বোঝার চেষ্টার করল, রোদসীর স্মৃতিদগ্ধ মনের ভেতরে অবিশ্বাস আর প্রেমহীনতার আশ্চর্য তন্তু কীভাবে জাল ফেলে ছড়িয়ে পড়ল অজান্তে। কে সেই সুকৌশলী তন্তুবায়? যে কি না ওদের আট বছরের একটা শান্ত-সঙ্গত-সহজ সম্পর্ককে নিপুণ কৌশলে দাঁড় করাল অনিশ্চিত চ্যালেঞ্জের দিকে।
সেদিন বিকেলবেলা। বাইরের কিছু ডেলিগেটদের সাথে সোহেল খুব ব্যস্ত একটা মিটিং কনডাক্ট নিয়ে। হঠাৎ মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে উঠল রোদসীর মুখ। কল রিসিভ করতেই বুঝল জরুরি। গম্ভীর মুখে শুনে গেল কেবল ওপাশ থেকে ও কী বলছে? তারপরই অফিস থেকে ফিরে এসে রাজ্যের গম্ভীরতা নিয়ে মুখভার করে বসে রইল বারান্দায়। পরদিন ছুটির দিন হওয়ায় রাত জাগল অনেকটা। একটার পর একটা সিগারেট পোড়াল অ্যাশট্রেতে। অফিসের পেন্ডিং কাজগুলো শেষ হতে হতে রাত প্রায় দুটো। শরীর আর মনের যাবতীয় ক্লান্তি মাথায় নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল শেষে।
বারোশো স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটা পাঁচতলায়। বিকেল চারটার পরেই সেখানে পৌঁছে গেল সোহেল। মূল দরজার বাইরে ঘণ্টার ঝাড়টা বাতাসে টুংটাং করে বাজছে। সেটার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত কিছু ভাবল যেন! ফ্ল্যাটের দরজা আগে থেকেই খোলা দেখে অবাক হয়নি সোহেল। একছড়া চাবি রোদসীর কাছেও ছিল। ভেতরে মনে হল কারও গুনগুন বা পায়ের খসখসে শব্দ। রোদসীই হবে! ঢাকায় আসার পর আজ অনেকদিন বাদে ওদের দু’জনের আবার সাক্ষাৎ হতে চলেছে। তারপর দেখাও হল। কিন্তু দেখা হবার পর বুঝল, দু’জনের মধ্যে উচ্ছ্বাসের খামতি। উত্তেজনা আর শিহরণে সেই থরথর কাঁপুনিটা নেই। যেন দুটো নিরেট কাঠের মূর্তি মুখোমুখি এখন দাঁড়িয়ে।
ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে ঢুকলে বাঁয়ের দেওয়ালে অনেকগুলো মুখোশ। মুখোশের অন্তরালে থাকতে চাওয়া মানুষের মুখোশই পছন্দ হবে। সোহেলের ইচ্ছে হল একটা মুখোশ খুলে নিয়ে নিজেকে আড়াল করে আর আরেকটা এঁটে দেয় রোদসীর মুখে। আজ দু’জনই ভীষণ অপরিচিত হয়ে উঠেছে সহজ দাম্পত্য ভুলে। সোহেলের সামনে থেকে সরে খাবারঘরের মাঝখানে যেখানে লম্বা আয়নাটা ঝোলানো সেখানেই গিয়ে স্থির দাঁড়াল রোদসী। কী মনে করে একবার চোখ কুঁচকে তাকাল সেদিকে। আয়না ব্যাপারটা ওর ভীষণ পছন্দের। ওটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রহস্যময়তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে আপাদমস্তক নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল রোদসী।
কখন এলে? আমাকে জানালেই পারতে। একসাথে আসতে পারতাম। নিস্তব্ধতা ভাঙাল সোহেলই প্রথম।
রোদসী আগের মতোই চুপচাপ। হালকা নিচু স্বরে কী যেন বলল। সোহেলের কান পর্যন্ত এল তা গুনগুনিয়ে। তারপর বলল, তুমি ফ্ল্যাটটা কেমন করে গোছালে তাই দেখতে এলাম হঠাৎ। সবকিছুই সুন্দর।
তুমি তো এখানে কখনওই থাকোনি। আমার দীর্ঘ অপেক্ষার অজস্র নিশ্বাস জমে আছে চার দেওয়ালের মধ্যে। নিরুত্তাপ গলায় বলল সোহেল। আচ্ছা, গত ছয় মাসে একটিবারের জন্যেও তোমার মন চাইল না এখানে আসতে? আমি তাই ভেবে অবাক হচ্ছি প্রচণ্ড।
বিষয়টা এমন নয়… আমিও অপেক্ষা করেছি। ভেবেছি তুমি গিয়ে আমাকে নিয়ে আসবে ময়মনসিংহ থেকে। চেয়েছিলাম একা নয়, আমরা দু’জনে একসাথে উঠব এখানে। তুমি কি আর আসতে পেরেছিলে, না কি কথা রেখেছিলে?
তুমি কি অভিযোগ করছ আমাকে? আমি নিশ্চয় ইচ্ছে করে…
না না থাক, বাদ দাও। তর্ক করতে চাই না। আমি বিশ্বাস করি, তুমি ওয়ার্কহলিক মানুষ। কিন্তু, কাজের বাইরেও একটা ইচ্ছের জীবন থাকে। সেটাকে তুমি আলাদা করতে পারোনি। যাই হোক, আমি আজ একটা জিনিস নিতে এসেছি। তুমি মানা করবে না।
ঘরের সব জিনিসই তোমার। হয়তো দু’একটা জিনিস তোমার নিজের আর বাকি সবই তো তোমার জন্যে কেনা।
আচ্ছা, এটা কি সেই আয়না যেটা তুমি একদিন আমায় উপহার দিয়েছিলে? একটু অন্যরকম লাগছে। আয়নাটা বদলে যায়নি তো?
সোহেল উত্তর দেয় না। অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকে অন্যদিকে। বলে, তুমি চলে এসো এখানে… কী সব হেঁয়ালি করছ বুঝতে পারছি না।
খাবারঘরের আয়নাটা খুব জমকালো দামি কিছু নয়। ছয় ফিট লম্বা আর প্রশস্তে তিন ফিট মতো একটা সাদাসিধে আয়না। সোনালি কাঠের ফ্রেমে। সে আয়নাতে শেষে মন বিঁধল মেয়েটার!
কোনও একবার রোদসীর জন্মদিনে ওর পছন্দমতো কিনে এনে দিয়েছিল নিউ মার্কেট থেকে। ময়মনসিংহ যাওয়ার আগে ও নিজে থেকে রেখে গিয়েছিল ফ্ল্যাটে। যদিও সেই আয়না এটা নয়। রোদসীর কাছে আয়নাটা ভিন্ন এক জগৎ। যার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে কথা বলা যায় আপনমনে, নিজের প্রতিবিম্বের সাথে যুদ্ধ করা যায় যতটা ইচ্ছে। বদলে যাওয়া রোদসীকে তখন অচেনা অন্যরকম লাগে সোহেলের।
সোহেল ভাবল, শেষমেশ সেই আয়নাটা। সেদিন মধ্যরাতের ভেঙে যাওয়া আয়না তাড়াতাড়ি বদলে নিয়ে এসেছিল আবার। রোদসীর মনে কী আছে কে জানে! ওর নিজের মনের ভেতরের শঙ্কাটাকে কি বাস্তব করে তুলছে এটা? তবে সবকিছুর পরেও রোদসী যে বরাবর খুব হেঁয়ালি পছন্দ করে, সেটাই আরেকবার প্রমাণ করে দিল ও।
চার
রোদসী দাঁড়িয়ে আছে লম্বা আয়নাটার সামনে। ওর পেছনে ঘাড়ের পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে সোহেলের মুখ। দু’জনের মুখেই সম্পর্ক টেনে নেওয়ার এক দীর্ঘ ক্লান্তির ছাপ। আবার দু’জনের ঠোঁটেই দীপ্তিহীন হালকা হাসির রেখা। রহস্যময় ঘোলাটে।
ঘাড়ের পেছন দিয়ে অমন করে দাঁড়িয়ো না। অমঙ্গল হয়।
কথাটা দু’একবার রোদসী আগেও বলেছে সোহেলকে। একসাথে সংসারপনের স্মৃতি খুব কম বলে যদিও সেটা সোহেলের ঠিক মনে পড়ে না।
সোহেল বিস্ময়ে বলল, অমঙ্গল না ছাই! বলো, তোমার ভাল লাগে না। তুমি নিজে থেকে আর থাকতে চাইছ না, অমঙ্গল আর কতটুকুই বা হবে?
থাক… এটা আমার পছন্দ। বলতে পারো বিশ্বাসও। আয়না দেখতে হয় খুব একান্তে একা। আয়নার সামনে ভনিতা করা যায় না। যে বিম্ব ফুটে ওঠে সেটাও একদম সত্য। তুমি ওসব বুঝবে না।
তোমার কথার সাথে আমার দ্বিমত আছে। আয়না কখনওই মানুষের সঠিক প্রতিবিম্ব দেখায় না। ওখানে সব ফুটে ওঠে উল্টোভাবে। জোর দিয়ে বলল সোহেল।
উল্টো হলেও মানুষের চেহারার অনুভূতি কিংবা প্রকাশ তো আর মিথ্যে হয়ে যায় না। মানুষ যেভাবে নিজেকে দেখতে চায় তাই তো দেখায়। আচ্ছা, বাদ দাও। আয়নাটা আমি নিয়ে যাব। তুমি খুলে দাও।
সোহেল আয়না খুলতে গিয়ে কিছুটা অন্যমনস্কতায় কাত হয়ে পড়ে একদিকে। হাত থেকে ফসকে যায় ঝোলানো আয়নাটা। মেঝেতে পড়ে আড়াআড়ি কয়েকটা চিড় দেখা যায় তাতে। তারপর চড়চড় করে ভেঙে পড়ে কয়েক খণ্ড।
এটা কী হল? এমন হল কেন? দু’জনেই হতভম্ব হয়ে ওঠে। রোদসীর মুখটা যেন বেশিই বিমর্ষ।
সোহেল সান্ত্বনার সুরে বলে উঠল, আয়না ভেঙে গেলে কী এমন হয়? তুমি বলবে অমঙ্গল তো! তোমার কথার সুরে আমি ক’দিন তাই ভেবেছিলাম। আজ বলব, যে বস্তু সবকিছু উল্টো করে প্রতিফলন করে সেখানে বিশ্বাস স্থির রাখবার কিছু নেই। সবকিছুই আপেক্ষিক। আর মানুষ অকারণে সেই আপেক্ষিকতা সৃষ্টি করে আনন্দ পায়।
রোদসীর চোখে তখনও বিস্ময় লেগে ছিল। বলল, কী বলছ এসব? আমার মাথায় ঢুকছে না।
ঠিকই বলছি। আসলে আয়নার ভাঙা টুকরোগুলো এক একটা মুক্ত স্বাধীন আয়না। ওতেও পূর্ণ প্রতিবিম্ব দেখা যায় যদি তুমি দেখতে চাও। কে কীভাবে দেখবে সেটাই আসল। ঠিক তেমনি জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলোতে যে সত্য, অর্ধসত্য কিংবা অস্বচ্ছ কাহিনি ভেসে ওঠে, সেটাকে পূর্ণ জীবন মনে করলে তোমারই অশান্তি। ওটা কেবল জীবনের খণ্ডিত রূপ মাত্র। খুব সামান্য। সেগুলো জড়ো করে ধরলে চিড় ধরা আয়নাই পাবে। সেগুলো অবিশ্বাস আর দূরত্ব ছাড়া আর কিছুই তৈরি করে না। রোদসী কাঠ হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনতে থাকে একা। নিজেদের চিনতে এখনও অনেক বাকি। পরস্পরকে তাই আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন ভীষণভাবে।
সোহেল পেছন থেকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল রোদসীকে। বলল, এদিক ওদিক থেকে খণ্ড খণ্ড গল্পগুলোকে জোড়া দিয়ে আমার সম্পর্কে তুমি যা জেনেছ, তা ওই চিড়ধরা আয়নারই মতো। আমাকে তীব্রভাবে পেতে গিয়ে আমাকেই আবার হারিয়ে ফেলছিলে তুমি।
রোদসীর শরীর তখন কাঁপছে। মুখে কোনও কথা নেই। সোহেল আবার বলল, আয়না নিয়ে তোমার মনে কিছু সংস্কার আছে। তা না হয় থাকুক। কিন্তু, সামান্য বস্তুগত জিনিসকে আঁকড়ে ধরে সংস্কারকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমরা যেন নিজেদেরকেই হারিয়ে ফেলছি। এটা ঠিক নয়। আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে সেই আমাকেই আবার আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিলে। কী অদ্ভুত আমরা! অমঙ্গলেই যেন সুখ! এ কেমন পরিণতি? সম্পর্কের ইতি টানা কি এত সহজ?
বাইরে তখন শরতের সন্ধ্যা নেমেছে। খাবারঘরের ঝাড়বাতির আলো ঠিকরে নেমেছে ঘরের মাঝখানে, চারদিকের ধূসর দেওয়ালে। সেই আলোয় দু’জন পথভোলা অভিমানী মানুষ দৃঢ় আলিঙ্গনে দাঁড়িয়ে। শরীরের উত্তাপ ভেঙে মোমের মতো গলছিল তারা।
চিত্রণ: মনিকা সাহা







