Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: ফাউ

ছুটির দিনের আরামের ঘুমটা একেবারে মাটি হয়ে গেল। সাতসকালে অরূপের ফোন। এই এক মোবাইল হয়েছে। যেখানেই থাকো, যে অবস্থায় থাকো, তোমাকে কব্জা করে নেবে। মশারিটাও রুমার দাক্ষিণ্যে আধখোলা হয়ে আছে। মশারাও ছাড়ছে না। তার ওপর আবার সকালে দুধ দিতে এসে দরজায় দুমদাম আওয়াজ করেছে মনু। ঘুমের দফাগয়া করল সকলে মিলে। নাঃ, এভাবে চোখবুজে কতক্ষণ আর শুয়ে থাকা যায়। উঠেই পড়ল মলয়।
খেঁচড়ানো মেজাজ নিয়ে ব্রাশ করতে করতেই নজরে এল, দুধের গ্লাস টেবিলে সাজিয়েছে রুমা। দুধ দেখেই চাপা বিরক্তিটা বেরিয়ে এল।
‘তোমার গয়লা মনু রোজ সকালে এত আওয়াজ করে কেন? ওকে বারণ করতে পারো না?’
‘কী বললে, আমার গয়লা? দুধ খাও তোমরা, আর গয়লা আমার হয়ে গেল?’ রুমা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে। এই রুমাকে দেখতে বেশ লাগে! হাঁ করে নিজের বউকে দেখছিল মলয়। রুমাকে আর একটু খেপিয়ে দেবার জন্য ও আবার বলল, ‘দুধের থেকে তো জল বেশি! ওর কাছে নাও কেন?’
‘জল তো সবাই দেয়। ও রোজ আধ মগ দুধ ফাউ দেয় যে।’
মলয় আর কথা বাড়ায় না।

অফিস-ফেরত বাদলের দোকানে একবার ঢুঁ মারতেই হয়। ওর দোকানে সব পাওয়া যায়। ব্যাগ এগিয়ে দিতেই সবকিছু গুছিয়ে দিচ্ছিল বাদল। বাদাম, বিস্কুট সব ঢুকিয়ে দিল ও। সাইকেলে ঝোলানো ব্যাগের খোঁজখবর হল রুমা বাপের বাড়ি থেকে ফেরার পরে।
জিনিস গুছোতে গুছোতেই চেঁচাল রুমা। ‘আবার মাজন আনলে কেন? আস্ত একটা রয়েছে তো!’
সত্যিই তো মাজনের কথা তো বলেনি কেউ। ঘরে মাজন আছে তো। ভাল্লাগে না। এসব দোকান-বাজার করতেও হবে, কৈফিয়তও দিতে হবে।
ঋজু ছবি আঁকছিল। আঁকা ফেলে ছুটে এল। ‘তোমরা জানো না, ওটা তো সাবানের সঙ্গে ফাউ দিয়েছে।’

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা ।
বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।
নিচের রাস্তায় ঋজুর গলা পাওয়া যাচ্ছে। ওদের হিরো এখন বিরাট কোহলি। এই গরমেও ক্রিকেট খেলছে ওরা। সবাই নিজেকে কোহলি ভাবছে হয়তো। নিচে থেকেই চেঁচাল ও, ‘মা, আজ আধঘণ্টা বেশি খেলব। তুমি বলেছ কিন্তু।’
‘কী ব্যাপার? আধঘণ্টা বেশি কেন?’
রুমা হাসে। ‘একটা বাড়তি অঙ্ক পিছু দু’মিনিট ফ্রি। ও পনেরোটা বাড়তি অঙ্ক করেছে তো।’
‘ও!’
নিচের রাস্তায় রুমা উঁকি মারে একবার, তারপর বলে, ‘‘তুমি এবারে ঋজুর জন্য ‘টোটাল এফেক্ট’
হেলথ ড্রিংকস্‌ এনো। ওটাতে একটা কাচের গ্লাস ফ্রি দিচ্ছে।”

এবারের গরমের ছুটিতে কোথায় যাওয়া যায় ভেবে না পেয়ে চারদিনের জন্য পুরীতে এসেছে ও। সমুদ্রের বালিতে মাকে জামাকাপড়ের পাহারায় বসিয়ে ওরা তিনজনে জলে নেমেছিল। ভয় পাচ্ছিল ঋজু। ওকে ফের মায়ের কাছে বসিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে আসতে নজরে এল অদ্ভুত এক দৃশ্য!
অফিসের বিকাশ আর শিখা চান করছে জড়াজড়ি করে। কানাঘুষো ওর কানেও এসেছে বেশ কিছুদিন, বিশ্বাস হয়নি। বিকাশের মেয়ে এইটে পড়ে। বউ কেকা সেলসে আছে। বিবাহিত জীবনে তেমন অতৃপ্তি আছে বলে তো মনে হয় না। তা হলে?
ওকে দেখতে পেয়ে বিকাশই উঠে এল জল থেকে।
‘কীরে? কবে এলি?’
‘গতকাল।’ কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না ওর।
‘অবাক হয়েছিস আমার সঙ্গে শিখাকে দেখে?’
‘তা হয়েছি। হঠাৎ এভাবে তোদের আশা করিনি তো।’ শক্ত চোখে তাকায় ও।
জবাবে দু’সারি দাঁত ছড়িয়ে হাসে বিকাশ। ‘অফিসে বলিস না মাইরি।’
‘এসব করছিস কেন? কেকা আছে তো।’
‘সে তো আছেই। তুইও যেমন! এসব একটু-আধটু…। জাস্ট ফান! বলতে পারিস ওটা আসল, এটা ফাউ!’
ঢেউ ভেঙে ভেঙে রুমার কাছে ফিরতেই রুমা বলে, ‘ওটা বিকাশদা না?’
‘না। বিকাশের মত দেখতে।’

রাতে নিজে থেকেই কাছে এল রুমা। ঘুম ভাঙিয়ে দিল আগেকার মতো।
‘হঠাৎ কী হল? এ হেন সৌভাগ্য!’ রুমাকে কাছে টানতে টানতে বলছিল ও।
কথা না বলে কাছে আরও কাছে এগিয়ে আসছিল রুমা।
অনেকদিন বাদে ঋজুকে ঠাকুমার কাছে শুতে পাঠিয়েছে ও।
বাড়িতে ঘ্যান্‌ঘ্যান্‌ করলেও ছেলেকে ঠাকুমার বিছানায় রুমা অ্যালাউ করে না। এখানে ওকে যেতে দেওয়ায় একটু অবাকই হয়েছিল ও। পরে বোঝা গেছে ব্যাপারটা পূর্বপরিকল্পিত। রুমা ভেবেচিন্তেই ঘটিয়েছে সবটা। কিন্তু কেন?
সন্ধেয় পুরীর এম্পোরিয়ামে ঢুকেছিল ওরা। মা ঠাকুরের জন্য পুরীর বিশেষ হাঁড়ি কিনলেন। অন্যদিকে ছিল কটকী শাড়ির মেলা। নীল রঙের একটা বোমকাই হাতে নেড়েচেড়ে দেখছিল রুমা। ওর পছন্দ হয়েছে বুঝে কিনে দিয়েছিল মলয়।
‘দাম অনেক! এত টাকা দিয়ে কিনতে হবে না।’ রুমা আপত্তি করেছিল। কথাটা না রাখায় একমুখ হাসি নিয়ে শাড়িটা ব্যাগেও ঢুকিয়েছিল। তবে কী রুমা…? ভাবনাটা ঘুম কাড়ছিল ওর।

Advertisement

সকালেই জিবেগজা কিনে নিতে হবে। রাস্তায় খাবার জন্য আরও বেশ কিছু কেনার আছে। বাজারে ঘোরার সময়েই নজরে এল একগামলা জলে মোটরবোটটা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। ঋজু গিয়ে দাঁড়াল ওখানে।
‘বাবা দেখো ওই বন্দুকটা। নকল কর্কের গুলিও আছে। টিপ করে মারলে গায়ে গিয়ে আটকে যায়।’
‘আবার বন্দুক। অনেক আছে তো। তার থেকে মোটরবোটটা দেখ। কী সুন্দর!’
‘আরে ওটা তো পাবই। বন্দুক নিলে ওটা ফ্রি!’
‘ওই বোটটা ফ্রি?’
‘হ্যাঁ তো। তুমি কিছু জানো না।’
‘আমি জানতে চাই না। বাড়ি চল। বন্দুক আমি কিনে দেব না।’
হনহন করে এগিয়ে যায় মলয়। পেছন থেকে রুমা ডাকে, ঋজু চেঁচায়। সাড়া দেয় না।
বাড়ি এসেও গজ্‌গজ্‌ করছিল রুমা। ‘মাঝেমাঝে তোমার কী যে হয়। ছেলেটার মনখারাপ করে দিলে শুধুশুধু।’

সমুদ্রের চড়ায় এগোতে এগোতে আবার ঋজুর সঙ্গেই দেখা হয়ে গেল মলয়ের। আলো নিভে আসছে। অন্ধকারে সবটা দেখা যাচ্ছে না। তবু ঋজুর হাতে বন্দুকটা নজর এড়াল না ওর।
‘বন্দুক! কে দিল?’
‘কেন, বিকাশ কাকু।’ একগাল হাসে ঋজু।
‘সেই নিলি?’
‘ফ্রিতে পেলাম তো।’
‘মানে?’
‘হ্যাঁ। এখন সব ফ্রিতে পাব। তোমায় মারলে বন্দুক ফ্রি। মাকে মারলে বোমা ফ্রি। তারপর বোমা দিয়ে বাড়ি ভাঙলে আবার একটা বন্দুক ফ্রি। এটা ফ্রি-এর খেলা বাবা। মারি? মারি তোমায়?’
‘সবাইকে মেরে ফেললে, তুই কোথায় থাকবি বাবা? ঋজু ,ঋজু…।’
‘কী হল? ঘুমের ঘোরে ছেলের নাম ধরে চেঁচাচ্ছ কেন? জল খাবে?’ রুমা ব্যস্ত হয়।
মলয় অন্ধকারের ঘোর কাটিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। একা একা পারে না, বসে পড়ে আবার।

চিত্রণ: মুনির হোসেন

2 Responses

  1. Pingback: ursodiol cost

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 4 =

Recent Posts

যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়?

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »