ছুটির দিনের আরামের ঘুমটা একেবারে মাটি হয়ে গেল। সাতসকালে অরূপের ফোন। এই এক মোবাইল হয়েছে। যেখানেই থাকো, যে অবস্থায় থাকো, তোমাকে কব্জা করে নেবে। মশারিটাও রুমার দাক্ষিণ্যে আধখোলা হয়ে আছে। মশারাও ছাড়ছে না। তার ওপর আবার সকালে দুধ দিতে এসে দরজায় দুমদাম আওয়াজ করেছে মনু। ঘুমের দফাগয়া করল সকলে মিলে। নাঃ, এভাবে চোখবুজে কতক্ষণ আর শুয়ে থাকা যায়। উঠেই পড়ল মলয়।
খেঁচড়ানো মেজাজ নিয়ে ব্রাশ করতে করতেই নজরে এল, দুধের গ্লাস টেবিলে সাজিয়েছে রুমা। দুধ দেখেই চাপা বিরক্তিটা বেরিয়ে এল।
‘তোমার গয়লা মনু রোজ সকালে এত আওয়াজ করে কেন? ওকে বারণ করতে পারো না?’
‘কী বললে, আমার গয়লা? দুধ খাও তোমরা, আর গয়লা আমার হয়ে গেল?’ রুমা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে। এই রুমাকে দেখতে বেশ লাগে! হাঁ করে নিজের বউকে দেখছিল মলয়। রুমাকে আর একটু খেপিয়ে দেবার জন্য ও আবার বলল, ‘দুধের থেকে তো জল বেশি! ওর কাছে নাও কেন?’
‘জল তো সবাই দেয়। ও রোজ আধ মগ দুধ ফাউ দেয় যে।’
মলয় আর কথা বাড়ায় না।
অফিস-ফেরত বাদলের দোকানে একবার ঢুঁ মারতেই হয়। ওর দোকানে সব পাওয়া যায়। ব্যাগ এগিয়ে দিতেই সবকিছু গুছিয়ে দিচ্ছিল বাদল। বাদাম, বিস্কুট সব ঢুকিয়ে দিল ও। সাইকেলে ঝোলানো ব্যাগের খোঁজখবর হল রুমা বাপের বাড়ি থেকে ফেরার পরে।
জিনিস গুছোতে গুছোতেই চেঁচাল রুমা। ‘আবার মাজন আনলে কেন? আস্ত একটা রয়েছে তো!’
সত্যিই তো মাজনের কথা তো বলেনি কেউ। ঘরে মাজন আছে তো। ভাল্লাগে না। এসব দোকান-বাজার করতেও হবে, কৈফিয়তও দিতে হবে।
ঋজু ছবি আঁকছিল। আঁকা ফেলে ছুটে এল। ‘তোমরা জানো না, ওটা তো সাবানের সঙ্গে ফাউ দিয়েছে।’
গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা ।
বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।
নিচের রাস্তায় ঋজুর গলা পাওয়া যাচ্ছে। ওদের হিরো এখন বিরাট কোহলি। এই গরমেও ক্রিকেট খেলছে ওরা। সবাই নিজেকে কোহলি ভাবছে হয়তো। নিচে থেকেই চেঁচাল ও, ‘মা, আজ আধঘণ্টা বেশি খেলব। তুমি বলেছ কিন্তু।’
‘কী ব্যাপার? আধঘণ্টা বেশি কেন?’
রুমা হাসে। ‘একটা বাড়তি অঙ্ক পিছু দু’মিনিট ফ্রি। ও পনেরোটা বাড়তি অঙ্ক করেছে তো।’
‘ও!’
নিচের রাস্তায় রুমা উঁকি মারে একবার, তারপর বলে, ‘‘তুমি এবারে ঋজুর জন্য ‘টোটাল এফেক্ট’
হেলথ ড্রিংকস্ এনো। ওটাতে একটা কাচের গ্লাস ফ্রি দিচ্ছে।”
এবারের গরমের ছুটিতে কোথায় যাওয়া যায় ভেবে না পেয়ে চারদিনের জন্য পুরীতে এসেছে ও। সমুদ্রের বালিতে মাকে জামাকাপড়ের পাহারায় বসিয়ে ওরা তিনজনে জলে নেমেছিল। ভয় পাচ্ছিল ঋজু। ওকে ফের মায়ের কাছে বসিয়ে দিয়ে ফিরে আসতে আসতে নজরে এল অদ্ভুত এক দৃশ্য!
অফিসের বিকাশ আর শিখা চান করছে জড়াজড়ি করে। কানাঘুষো ওর কানেও এসেছে বেশ কিছুদিন, বিশ্বাস হয়নি। বিকাশের মেয়ে এইটে পড়ে। বউ কেকা সেলসে আছে। বিবাহিত জীবনে তেমন অতৃপ্তি আছে বলে তো মনে হয় না। তা হলে?
ওকে দেখতে পেয়ে বিকাশই উঠে এল জল থেকে।
‘কীরে? কবে এলি?’
‘গতকাল।’ কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না ওর।
‘অবাক হয়েছিস আমার সঙ্গে শিখাকে দেখে?’
‘তা হয়েছি। হঠাৎ এভাবে তোদের আশা করিনি তো।’ শক্ত চোখে তাকায় ও।
জবাবে দু’সারি দাঁত ছড়িয়ে হাসে বিকাশ। ‘অফিসে বলিস না মাইরি।’
‘এসব করছিস কেন? কেকা আছে তো।’
‘সে তো আছেই। তুইও যেমন! এসব একটু-আধটু…। জাস্ট ফান! বলতে পারিস ওটা আসল, এটা ফাউ!’
ঢেউ ভেঙে ভেঙে রুমার কাছে ফিরতেই রুমা বলে, ‘ওটা বিকাশদা না?’
‘না। বিকাশের মত দেখতে।’
রাতে নিজে থেকেই কাছে এল রুমা। ঘুম ভাঙিয়ে দিল আগেকার মতো।
‘হঠাৎ কী হল? এ হেন সৌভাগ্য!’ রুমাকে কাছে টানতে টানতে বলছিল ও।
কথা না বলে কাছে আরও কাছে এগিয়ে আসছিল রুমা।
অনেকদিন বাদে ঋজুকে ঠাকুমার কাছে শুতে পাঠিয়েছে ও।
বাড়িতে ঘ্যান্ঘ্যান্ করলেও ছেলেকে ঠাকুমার বিছানায় রুমা অ্যালাউ করে না। এখানে ওকে যেতে দেওয়ায় একটু অবাকই হয়েছিল ও। পরে বোঝা গেছে ব্যাপারটা পূর্বপরিকল্পিত। রুমা ভেবেচিন্তেই ঘটিয়েছে সবটা। কিন্তু কেন?
সন্ধেয় পুরীর এম্পোরিয়ামে ঢুকেছিল ওরা। মা ঠাকুরের জন্য পুরীর বিশেষ হাঁড়ি কিনলেন। অন্যদিকে ছিল কটকী শাড়ির মেলা। নীল রঙের একটা বোমকাই হাতে নেড়েচেড়ে দেখছিল রুমা। ওর পছন্দ হয়েছে বুঝে কিনে দিয়েছিল মলয়।
‘দাম অনেক! এত টাকা দিয়ে কিনতে হবে না।’ রুমা আপত্তি করেছিল। কথাটা না রাখায় একমুখ হাসি নিয়ে শাড়িটা ব্যাগেও ঢুকিয়েছিল। তবে কী রুমা…? ভাবনাটা ঘুম কাড়ছিল ওর।
সকালেই জিবেগজা কিনে নিতে হবে। রাস্তায় খাবার জন্য আরও বেশ কিছু কেনার আছে। বাজারে ঘোরার সময়েই নজরে এল একগামলা জলে মোটরবোটটা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। ঋজু গিয়ে দাঁড়াল ওখানে।
‘বাবা দেখো ওই বন্দুকটা। নকল কর্কের গুলিও আছে। টিপ করে মারলে গায়ে গিয়ে আটকে যায়।’
‘আবার বন্দুক। অনেক আছে তো। তার থেকে মোটরবোটটা দেখ। কী সুন্দর!’
‘আরে ওটা তো পাবই। বন্দুক নিলে ওটা ফ্রি!’
‘ওই বোটটা ফ্রি?’
‘হ্যাঁ তো। তুমি কিছু জানো না।’
‘আমি জানতে চাই না। বাড়ি চল। বন্দুক আমি কিনে দেব না।’
হনহন করে এগিয়ে যায় মলয়। পেছন থেকে রুমা ডাকে, ঋজু চেঁচায়। সাড়া দেয় না।
বাড়ি এসেও গজ্গজ্ করছিল রুমা। ‘মাঝেমাঝে তোমার কী যে হয়। ছেলেটার মনখারাপ করে দিলে শুধুশুধু।’
সমুদ্রের চড়ায় এগোতে এগোতে আবার ঋজুর সঙ্গেই দেখা হয়ে গেল মলয়ের। আলো নিভে আসছে। অন্ধকারে সবটা দেখা যাচ্ছে না। তবু ঋজুর হাতে বন্দুকটা নজর এড়াল না ওর।
‘বন্দুক! কে দিল?’
‘কেন, বিকাশ কাকু।’ একগাল হাসে ঋজু।
‘সেই নিলি?’
‘ফ্রিতে পেলাম তো।’
‘মানে?’
‘হ্যাঁ। এখন সব ফ্রিতে পাব। তোমায় মারলে বন্দুক ফ্রি। মাকে মারলে বোমা ফ্রি। তারপর বোমা দিয়ে বাড়ি ভাঙলে আবার একটা বন্দুক ফ্রি। এটা ফ্রি-এর খেলা বাবা। মারি? মারি তোমায়?’
‘সবাইকে মেরে ফেললে, তুই কোথায় থাকবি বাবা? ঋজু ,ঋজু…।’
‘কী হল? ঘুমের ঘোরে ছেলের নাম ধরে চেঁচাচ্ছ কেন? জল খাবে?’ রুমা ব্যস্ত হয়।
মলয় অন্ধকারের ঘোর কাটিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। একা একা পারে না, বসে পড়ে আবার।
চিত্রণ: মুনির হোসেন






