Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিশেষ নিবন্ধ: নন্দিনী কর চন্দ

এ গহন আঁধারে; তব স্তূপমূলে জ্বালি আলো

বুদ্ধদেব নিজেই বলেছিলেন যে, ধর্মনীতি-চর্চা অনেকটা সাপের বিষের মতো। ভালভাবে ব্যবহার করলে এগুলো শক্তিশালী ঔষধ কিন্তু ভালভাবে ব্যবহার না করলে তা মারাত্মক বিষাক্ত। ধর্মপালনের জন্য সর্বাগ্রে একজন প্রকৃত জ্ঞানী, সদয় ও সঠিক মনের অধিকারী হতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত মন মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তাই মনের যত্ন নেওয়া এবং একে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। বৌদ্ধধর্মে মনকে পরিণত করার বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে বুদ্ধদেব বলেছেন, ধর্মপথের অভিমুখ আকাশ নয়, হৃদয়। ‘বুদ্ধ’ সংস্কৃত অর্থে ‘জাগ্রত ব্যক্তি’ বা ‘আলোকিত ব্যক্তি’। যিনি বলতে পারেন— ‘হাজার যুদ্ধ জেতার চেয়ে নিজেকে জয় করা ভাল। তা হলে জয় তোমারই। কারণ এটা তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া যাবে না।’

স্বামী বিবেকানন্দ ‘নমো সম্বুদ্ধায়’-তে লিখেছেন— ‘বুদ্ধ আমার ইষ্ট, আমার ঈশ্বর।’ লিখেছেন—

‘স্বার্থশূন্য হও! স্বার্থশূন্য হও!
অতন্দ্র বুদ্ধের বাণীঃ
তীব্রগতি কাল, নশ্বর জগৎ, দুঃখ সর্বস্ব যেখানে।
তোমার ঐ উত্তম খানা, সুন্দর বসন, আরামের বাস!
হে মোহনিদ্রিত নর নারী—
ভেবেছ কি কোটি-কোটি ক্ষুধাতুরের কথা যারা মৃত্যুপথযাত্রী
শুধু দুঃখ, শুধু দুঃখ— ভুলোনা এই মহাসত্য।
জগতে প্রবেশের মুখে শিশু কাঁদে,
সেই তার প্রথম উচ্চারণ।
কান্নাই সত্য জগতে— সকলে কাঁদছে-কাঁদবে।
এই জেনে ত্যাগ করো স্বার্থ।’

‘নমো সম্বুদ্ধায়’ নামীয় স্বামীজির দীর্ঘ কবিতার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরার কারণ, এই হানাহানির পৃথিবীতে এক যুগনায়কের দৃষ্টিতে আরেক যুগান্তকারী মহাপুরুষের মতে ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ-ঔচিত‍্য-প্রাসঙ্গিকতা বোঝাতে। (কবিতাটি শ্রীশঙ্করীপ্রসাদ বসু কর্তৃক সংকলিত এবং শ্রীহেমেন্দুবিকাশ চৌধুরীর সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বুদ্ধ প্রণাম’ শীর্ষক সংকলনগ্রন্থ থেকে সংগৃহীত)। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাছে বিমূর্ত ধর্মচর্চা বলতে বিশুদ্ধ মনন-চর্চা বললে বিষয়টা অনেকসময় খালি বাসে ওঠার মতো এবং সব আসন খালি দেখতে পাওয়ার মতো হয়ে পড়ে, যেকোনও আসন বেছে নিতে পারার সুযোগ অনেকের জন্যই একটা বিভ্রান্ত অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। অন্যের বাসে না ওঠা পর্যন্ত নিজেকে সে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা করে… আমি কোথায় বসতে পারি? আমার কোথায় বসা ঠিক হবে? এই ঠিক-বেঠিক বিচারে আমাদের প্রত্যেকেরই জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অন্যান্য যেকোনও ধর্মের মতোই বৌদ্ধধর্মের প্রাথমিক ভিত্তি ও স্তম্ভগুলি সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। যে সংগঠনে আগ্রহ রয়েছে, তা সামগ্রিকভাবে ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়ে খাঁটি জ্ঞান প্রদান করছে কি না এবং তা কোন দিকে আমাদের পরিচালিত করছে? এটি যেমন ধ্যানকেন্দ্র এবং মঠের মতো প্রতিষ্ঠান তো অবশ্যই, যে নির্দিষ্ট পন্থায় আমরা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলার অভ‍্যাস বা অনুশীলন করি— তার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

বুদ্ধের মৃত্যুর পর, তাঁর অনুসারীরা তাঁর শিক্ষাগুলিকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যার ফলে মতবাদগত বিভাজন এবং স্বতন্ত্র বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটে। খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের দিকে বৈশালীতে দ্বিতীয় বৌদ্ধ পরিষদের সময় প্রথম বিভাজন ঘটেছিল, যখন সন্ন্যাসীরা নিম্নলিখিত ভাগে বিভক্ত ছিলেন—

স্থবিরবাদীরা, যাঁরা বিনয় সন্ন্যাস শৃঙ্খলার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলেন আর মহাসাংহিকারা নিয়ম শিথিলতার পক্ষে ছিলেন। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর দিকে, কনিষ্কের নেতৃত্বে চতুর্থ বৌদ্ধ পরিষদের পর, হীনযান বৌদ্ধধর্ম থেকে পৃথক হয়ে মহাযান বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব ঘটে। মহাযান অনুসারীরা একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় গঠন করেছিলেন, যাঁরা অ-ঈশ্বরবাদী হীনযানের বিপরীতে বুদ্ধের মূর্তিগুলিকে ঐশ্বরিক সত্তা হিসেবে পূজা করতেন। সপ্তম শতাব্দীতে, বজ্রযান বৌদ্ধধর্ম মহাযানের একটি তান্ত্রিক শাখা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত হওয়ার ফলে তিব্বতি, চীনা এবং জেন বৌদ্ধধর্মের মতো রূপের উদ্ভব হয়। তবে, চার আর্য সত্য, অষ্টমুখী পথ এবং অ-আত্মার মতো মূল শিক্ষাগুলি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাধারণ ছিল। বিভাজনগুলি নীতির চেয়ে ভিন্ন ভিন্ন অনুশীলন-পদ্ধতি এবং ব্যাখ্যার ওপর বেশি ভিত্তি করে পৃথক ছিল। যেমন থেরবাদ, যার অর্থ ‘বড়দের শিক্ষা’, বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে রক্ষণশীল এবং গোঁড়া রূপ, এটি পালি ধর্মগ্রন্থে বুদ্ধের প্রাচীনতম শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা এবং ধ্যানের মাধ্যমে দুঃখ থেকে মুক্তি অর্জনের ওপর জোর দেয়। এটি একক বুদ্ধ, গৌতম শাক্যমুনির ঐতিহাসিকতায় বিশ্বাস করে। সম্রাট অশোক ভারতে থেরবাদ প্রসারে সহায়তা করেছিলেন। এটি পরবর্তী মহাযান সূত্রগুলিকে গ্রহণ করে না। কঠোর আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে নির্বাণ অর্জনকারী অর্হতকে আদর্শ মনে করে। থেরবাদ মূলত শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাধান্য পেয়েছে।

থেরবাদের উপ-সম্প্রদায় সর্বস্তিবাদ: প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এটি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সকল ধর্মের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং মধ্য এশিয়ায় এর প্রভাব ছিল।
বৈভাষিক: সর্বস্তিবাদের একটি পরবর্তী রূপ, এর প্রধান উদ্দেশ্য হল অভিধম্ম দর্শনকে প্রকাশ করা। এই স্কুলের মূল শাস্ত্রীয় পাঠগুলি হল অভিধর্ম-কোষ। বসুবন্ধু এবং মিলিন্দা পানহো (নাগাসেন এবং মেন্ডার প্রথমের মধ্যে আলোচনা)।
সৌত্রান্তিকা: সর্বস্তিবাদের একটি শাখা। ‘সূক্তপিটক’-এর ওপর ভিত্তি করে, এটি বৈভাসিকদের বাস্তববাদ এবং বহুত্ববাদের বিরুদ্ধে উঠে এসেছিল। এই বিদ্যাদানের প্রধান শিক্ষকবৃন্দ হলেন নাগার্জুনের সমসাময়িক কুমারলতক, যশোমিত্র এবং হরিবর্মণ ।
স্থবিরবাদ: মূল থেরবাদ মতবাদ যেখান থেকে পালি ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল। এটি চারটি আর্য সত্য এবং অর্হতত্ত্বের মাধ্যমে মুক্তির ওপর জোর দিয়েছিল। দক্ষিণ ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় প্রভাবশালী।
বিভজ্জবাদ: স্থবিরবাদ ধারার একটি শাখা, এর শিক্ষাগুলি আধুনিক থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি তৈরি করে।
সম্মিতীয়: একটি প্রাথমিক বিদ্যাভ‍্যাস অনুশীলন, এটি বুদ্ধের সুনির্দিষ্ট এবং ব্যাখ্যামূলক শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য করে। তবে মধ্যযুগীয় সময়ে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সামগ্রিকভাবে থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের প্রাচীনতম রূপ। থেরবাদীরা পালি ভাষায় রচিত ত্রিপিটক বা পালি ক্যানন অনুসরণ করেন, যা বুদ্ধের প্রাচীনতম শিক্ষা ও বক্তৃতার সংগ্রহ। এঁদের মূল লক্ষ্য হল, মুক্তি অর্জন এবং তৃষ্ণা ও অবিদ্যার ফলে সৃষ্ট দুঃখের নিরসন করা। মহাযান পরবর্তীতে উদ্ভূত একটি সম্প্রদায়। এই শাখাটি ‘মহান যান’ নামে পরিচিত। এটি চীন, জাপান, কোরিয়া এবং তিব্বতে জনপ্রিয়। এই সম্প্রদায় বুদ্ধকে একজন স্বর্গীয় সত্তা হিসেবে দেখে এবং বিশ্বাস করে যে, তাঁর শিষ্যরাও নির্বাণ লাভ করতে পারেন।
এই পথের লক্ষ্য: বোধিসত্ত্বের আদর্শ অনুসরণ করে, নিজের ব্যক্তিগত নির্বাণের চেয়েও অন্য সকল সংবেদনশীল প্রাণীকে মুক্তির পথে সাহায্য করা। এই শাখায় মূর্তি পূজা এবং অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত। আবার হীনযান পন্থায় বুদ্ধকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখা হয়, যিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাণ লাভ করেছেন। তাই ব্যক্তিগত জ্ঞানার্জন এবং নির্বাণ লাভ করাকে এই পথে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হীনযান বৌদ্ধধর্মে মূর্তি পূজা করা হয় না। গুপ্ত সম্রাট হর্ষবর্ধন মহাযান ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সংস্কৃতে পাঠ্যপুস্তকের অনুবাদকে সমর্থন করেছিলেন। মহাযান পন্থার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল বোধিসত্ত্বের প্রাধান্য, যিনি অন্যদের সাহায্যের জন্য নির্বাণ বিলম্বিত করেন।

 

মহাযান উপ-সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগচারা এবং মধ্যমাক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১) মধ্যমাক: মধ্যমাক বুদ্ধের বিখ্যাত ‘মধ্যম অবস্থান’ (মধ্যম প্রতিপদ) থেকে এসেছে। এটি নাগার্জুন দ্বারা সুশৃঙ্খলিত হয়েছিল। তাঁর বিখ্যাত রচনা হল মূলমধ্যমিককারিকা। ২) যোগচারা: এটি বিজ্ঞানবাদ নামেও পরিচিত। বৌদ্ধধর্ম এবং ভারতীয় দর্শনের একমাত্র আদর্শবাদী স্কুল, যা কেবল আদর্শবাদ নয়, নিরঙ্কুশতাবাদেরও অনুসারী। এটি মনের কার্যকারিতা এবং চেতনার প্রকৃতির ওপর আলোকপাত করে। এটি একটি অধিবিদ্যক ব্যবস্থা হিসেবে মধ্যমিকার চরম শূন্যবাদের বিরুদ্ধে উঠে এসেছিল। সিল্ক রুট বাণিজ্যপথের মাধ্যমে মহাযান পন্থার সর্বজনীন আদর্শ জনসাধারণের কাছে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ও সমাদৃত হয়েছিল।

ভাস্কর্যযুক্ত বুদ্ধের মূর্তি: অবলোকিতেশ্বর— মহাযানের আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তুকে যেন মূর্ত করেছে। জেন এই মহাযান সম্প্রদায়েরই একটি উপ-শাখা, এটি জ্ঞান অর্জনের জন্য ধ্যানের অনুশীলনের ওপর জোর দেয়। এটি চান বা চ‍্যান নামেও পরিচিত। এই পন্থাটি বিশেষভাবে জাপানের সাথে সম্পর্কিত, সেখানে এটি বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র উপ-বিদ্যালয়ে বিকশিত হয়েছে। চীনের তাওবাদী চিন্তাধারার সাথেও এর মিলমিশ হয়েছে। জেন মানে হল ‘ধ্যান’। এটি সরাসরি জ্ঞানার্জন ও স্বজ্ঞাত উপলব্ধির ওপর জোর দেয় এবং অন্যান্য আচার পালনের পরিবর্তে, ধ্যানের মাধ্যমে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।

জেন বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি ভারতে, কিন্তু এটি চীন ও জাপানে বিকাশ লাভ করেছে। সংস্কৃত ‘ধ্যান’ (মনোযোগ) থেকে চীনা ‘চ্যান’ এবং তারপর জাপানি ‘জেন’ শব্দটির উদ্ভব। এই ধর্ম চীন থেকে কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং পরে জাপানে ছড়িয়ে পড়েছে। মূল ধারণায় জেন সরাসরি অভিজ্ঞতা ও স্বজ্ঞাত উপলব্ধির ওপর জোর দেয়। এটি আত্ম-উপলব্ধি ও জ্ঞান অর্জনের জন্য ধ্যানের (যেমন, জাজেন) অনুশীলন করে। জেন বৌদ্ধধর্মের মূল কথা হল, সরাসরি ও সহজ উপায়ে জীবনের অর্থ বোঝা। জেন বৌদ্ধধর্ম জাপানি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে, যেমন জাপানি বাগানচর্চা, চা-পান অনুষ্ঠান এবং মার্শাল আর্টসের ওপর এর প্রভাব রয়েছে। জেন পন্থায় শিষ্যরা তাঁদের গুরুর কাছ থেকে সরাসরি জাজেনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শিক্ষালাভ করেন।

এবার আসা যাক, অনেকের কৌতূহল নিরসনে ‘ওঁ মণি পদ্মে হুঁ’ এই মন্ত্রের অন্তর্নিহিত বক্তব্যে। এটি এমনি একটি বৌদ্ধ মন্ত্র, যা পরমকরুণাময় অবলোকিতেশ্বরের উদ্দেশে উচ্চারিত হয় এবং মহাযান বৌদ্ধধর্মে এটিকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়।
এই মন্ত্রের অর্থ ও তাৎপর্য:
ওঁ
সম্পূর্ণতা, অসীম এবং অস্তিত্বের প্রতীক।
মণি
রত্ন বা মুক্তার প্রতীক, যা জ্ঞানকে বোঝায়।
পদ্মে
পদ্ম ফুলকে বোঝায়, যা জ্ঞানের প্রতীক, অর্থাৎ বিশুদ্ধতার অর্থবাহী।
হুঁ
পদ্ধতি বা অনুশীলনের প্রতীক, যা শরীর ও মনের অবিচ্ছেদ্য মিলনকে নির্দেশ করে। ধ্যান, অন্তর্দৃষ্টির জাগরণ, শারীরিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি নিরাময়, আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়।

এই প্রসঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা— মহাযান শাখার অনুসারীরা অবলোকিতেশ্বরকে প্রায়ই অমিতাভ বুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং তাঁকে ‘জগতের প্রভু’ বা লোকেশ্বর বলে মনে করেন।
সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, হীনযান ও মহাযান হল বৌদ্ধধর্মের দুটি প্রধান শাখা, যাদের মধ্যে মূল পার্থক্য হল, ব্যক্তিগত মুক্তি (হীনযান) ও সর্বজনীন মুক্তির (মহাযান) ওপর জোর দেওয়া।
বজ্রযান হল মহাযানের একটি সম্প্রদায় যা তান্ত্রিক পদ্ধতি ও গুরুনির্দেশনার মাধ্যমে দ্রুততর নির্বাণলাভের ওপর গুরুত্ব দেয়।

বৌদ্ধধর্মে দালাই লামার প্রভূত গুরুত্ব থাকার জন্য জনমানসে তাঁকে নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা, যিনি ‘করুণাময় বোধিসত্ত্ব’ অবলোকিতেশ্বরের অবতার হিসেবে বিবেচিত হন। ‘দালাই লামা” উপাধিটি এসেছে মঙ্গোলীয় ‘তা-লে’ (সমুদ্র) এবং সংস্কৃত ‘লামা’ (শিক্ষক) শব্দ থেকে, যা তাঁর প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিকতার গভীরতাকে বোঝায়। বর্তমান দালাই লামা, ১৪তম দালাই লামা তেনজিন গিয়াৎসো। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে, প্রত্যেক দালাই লামাই পূর্ববর্তী লামার পুনর্জন্ম এবং করুণাময় বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের অবতার। যখন একজন দালাই লামা মারা যান, তখন বৌদ্ধসাধকেরা তাঁর পুনর্জন্মিত অবতারের সন্ধান করেন। এই আত্মপ্রকাশ সাধারণত একটি ছোট ছেলের মধ্যে ঘটে, যাঁকে পরবর্তী দালাই লামার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই ধরনের আত্মপ্রকাশকারী ব্যক্তিকে ‘তুলকু’ বলা হয়। দালাই লামা তিব্বতের বৌদ্ধধর্মের ‘গেলুগ’ শাখার প্রধান আধ্যাত্মিক নেতা। দালাই লামা বিশ্বজুড়ে শান্তি ও অহিংসার প্রচার করে আসছেন, যা ১৯৮৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে স্বীকৃত হয়েছে।

বিভিন্ন স্থাপত‍্যের বিভিন্নতার আঙ্গিকে যে বৌদ্ধমঠ বা মনাস্ট্রি ভারত ও উপমহাদেশে দেখা যায় তার মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধমন্দিরের প্রধান প্রকারগুলি হল স্তূপ (যেখানে পবিত্র ধ্বংসাবশেষ বা ধর্মগ্রন্থ রাখা হয়), বিহার (আবাসন, ধর্মীয় স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান), এবং চৈত্য (উপাসনালয় বা প্রার্থনা হল)। এই তিন ধরনের কাঠামো ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলভেদে ও ভাষায় এর ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে, যেমন— প্যাগোডা, মঠ, ওয়াট ইত্যাদি। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর, তাঁর দেহাবশেষ দাহ করা হয়েছিল এবং ছাই ভাগ করে আটটি স্তূপের নীচে সমাহিত করা হয়েছিল, এই ধামেক স্তূপ সম্ভবত এই আটটি স্তূপের মধ্যে একটি ছিল। মৌর্য রাজা অশোক সম্ভবত এই স্তূপের সম্প্রসারণের কাজটি করেছিলেন।
স্তূপ: সাধারণত একটি ঘণ্টা-আকৃতির গম্বুজ বা ঢিবি-আকৃতির কাঠামো, যার মধ্যে পবিত্র অবশেষ (যেমন বুদ্ধের পার্থিব শরীরের কোনও অংশ বা কখনও মূল্যবান ধর্মগ্রন্থ) সংরক্ষিত থাকে।
বিহার: এটি একটি মঠ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বাস করেন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন এবং জ্ঞানচর্চা করেন।
চৈত্য (বা চৈত্য গৃহ): এটি একটি উপাসনা-স্থান বা প্রার্থনা-কক্ষ।
প্যাগোডা: এটি বৌদ্ধ স্থাপত্যের একটি সাধারণ প্রকারভেদ, যা মূলত পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে দেখা যায়।
মঠ: এটি মূলত ভিক্ষুদের থাকার জায়গা এবং উপাসনার জন্য ব্যবহৃত একটি স্থান।
ওয়াট: থাইল্যান্ড, লাওস এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলিতে বৌদ্ধ মন্দিরকে ‘ওয়াট’ বলা হয়।
জেন্ডো: এটি জাপানি জেন বৌদ্ধধর্মে ব্যবহৃত একটি ধ্যান কক্ষ, যেখানে জাজেন (কেন্দ্রীয় ধ্যানভঙ্গি, বসে ধ‍্যান করা) অনুশীলন করা হয়।

সিদ্ধার্থ গৌতম লুম্বিনিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং কপিলাবস্তুতে বেড়ে ওঠেন। লুম্বিনী বর্তমানে নেপালে অবস্থিত। তবে, ভারতের বহু মানুষ ব্যাপকভাবে বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করেন বলে ভারতে অনেক সংখ‍্যক বৌদ্ধ মঠ ও বিহার রয়েছে।
হেমিস মঠ: ভারতের বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার হেমিস মঠটি দ্রুকপা বংশের অন্তর্গত একটি তিব্বতি বৌদ্ধ মঠ। এটি ভারতের লাদাখে, হেমিস অঞ্চলে অবস্থিত। হেমিস মঠটি লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লেহ থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ১৬৭৪ সালে, রাজা সেঙ্গে নামগ্যাল এই হিমালয় মঠটি পুনর্নির্মাণ করেন। এখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে গুরু পদ্মসম্ভবের নামে এখানে একটি উৎসব উদযাপন করেন।
সুলগ্লাগখাং মঠ: বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সুলগ্লাগখাং মঠটি ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত মঠগুলির মধ্যে একটি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই স্থানটিকে পরম পবিত্র দালাই লামার আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করেন। এই স্থানটি হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালা জেলার ম্যাক্লয়েডগঞ্জ শহরতলিতে অবস্থিত। অনেকে সুলগ্লাগখাং মঠটিকে দালাই লামার মন্দিরও বলেন।
থিকসে মঠ: থিকসে মঠটি তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের গেলুগ সম্প্রদায়ের দখলে ছিল।
এই মঠটি গোম্পা নামেও পরিচিত। থিকসে গোম্পা হিমালয় পর্বতমালার ১৯ নম্বর স্তম্ভে অবস্থিত, যা ভারতের লাদাখ অঞ্চলের লেহ থেকে ১৯ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। থিকসে মঠটি দেখতে তিব্বতের লাসার পোটালা প্রাসাদের মতো। থিকসে মঠটিতে থাংকা, মূর্তি, দেয়ালচিত্র এবং তরবারির মতো অনেক বৌদ্ধ শিল্পকলার সম্ভার রয়েছে।
নামদ্রোলিং মঠ: কুর্গ থেকে ৩৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নামদ্রোলিং মঠটি তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে বড় শিক্ষাকেন্দ্র যা নিংমাপা নামে বা ‘স্বর্ণমন্দির’ নামে পরিচিত। নামদ্রোলিং মঠটিতে তিব্বতি স্থাপত্য এবং শিল্পকর্মের কিছু চমৎকার উদাহরণ রয়েছে, যেমনট সুসজ্জিত মন্দিরের টাওয়ার এবং অলঙ্কৃত দেয়ালচিত্র। এটি ৮০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং প্রথমে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল যা ভারত সরকার তিব্বত থেকে নির্বাসিত তিব্বতিদের জন্য দান করেছিলেন। বর্তমানে, এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-সহ সংঘ সম্প্রদায়ের প্রায় ৫,০০০ সদস্যের আবাসস্থল।
মহাবোধি মন্দির, বোধগয়া: ভারতের বিহার রাজ্যের বোধগয়া শহরে অবস্থিত, মহাবোধি মন্দিরটি বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র স্থানগুলির মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়।
এটি ভারতের এমন একটি বিখ্যাত বৌদ্ধমন্দির, যেখানে গৌতম বুদ্ধ বিশিষ্ট বোধিবৃক্ষের নীচে বসে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এই মন্দিরে সুন্দর স্থাপত্য রয়েছে, যা বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন রীতিনীতি, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের বোধগম্য প্রতিফলন।
মহাপরিনির্বাণ মন্দির, কুশীনগর: ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের কুশিনগরে অবস্থিত, মহাপরিনির্বাণ মন্দিরে ৬ মিটার লম্বা একটি শুয়ে থাকা ভঙ্গিতে বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের ৫ম শতাব্দীর এই মূর্তিটি ১৮৭৬ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল। মূর্তিটি গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুকালকে চিত্রিত করে এবং এটিকে ভারতের বিখ্যাত বৌদ্ধমন্দিরগুলির মধ্যে একটি করে তোলে।
ওয়াট থাই মন্দির, কুশীনগর: ভারতের অন্যতম স্বতন্ত্র বৌদ্ধমন্দির এই ওয়াট থাই মন্দিরটি থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় রাজা ভূমিবলের বিজয় স্মরণে নির্মিত হয়েছিল। এই মন্দিরটি তার ব্যতিক্রমী স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। এছাড়া সিকিমের রুমটেকে, রাজগীরে, ভুবনেশ্বরের ধৌলিতে এবং ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটি রাজ‍্যেই বিখ্যাত বৌদ্ধমঠ ও বিহার রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গেও অনেক প্রাচীন ও আধুনিক বৌদ্ধ মঠ এবং বিহার রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মেদিনীপুরের দাঁতনের কাছে মোগলমারি বৌদ্ধ বিহার (৬ষ্ঠ-১২শ শতাব্দী) এবং ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহার। এছাড়াও, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে, যেমন কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চল ও উত্তরবঙ্গ ও অন্যান্য জেলায় অনেক সংঘাশ্রম, মঠ, মন্দির এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গের হিমালয় সন্নিকটে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত মনাস্ট্রি আছে:
১) ইগা চোয়েলিং মঠ বা ঘুম মনাস্ট্রি: ভারতের প্রাচীনতম তিব্বতীয় মঠগুলির মধ্যে একটি। ১৮৭৫ সালে গেশে শেরাব গ্যাতসো দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, এই মঠটি গেলুকপা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। এই মঠের অন্যতম বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য হল, মৈত্রেয় বুদ্ধের ১৫ ফুট লম্বা সোনার মূর্তি। এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছিল মঠের দ্বিতীয় প্রধান লামা ডোমো গেশে রিনপোচের আমলে। এই ঘুম মনাস্ট্রি বা মঠ প্রাঙ্গণের মধ্যে অনেক বিরল বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপিও রয়েছে।
ইগা চোয়েলিংয়ের মধ্যে, ভগবান বুদ্ধ ছাড়াও দেওয়ালে অন্যান্য লামাদের ছবি আছে— যেমন চেনরেজিগ এবং জেলুপকা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সোংখাপা। মৈত্রেয় বুদ্ধ মূর্তির সামনে দুটি বিশাল তেলের প্রদীপ রাখা হয়েছে, যা সারা বছর জ্বলতে থাকে। ঘুম মনাস্ট্রির দেয়ালগুলিতে তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের চিত্র ও শিল্পকলার সাথে বোধিসত্ত্বদের বিভিন্ন চিত্র আঁকা হয়েছে। এই সুন্দর পেইন্টিংগুলি সুন্দর করে সাজানো রয়েছে, যাতে মঠের দর্শনার্থীদের বৌদ্ধদর্শনের মূল বিষয়গুলি বোঝার সুবিধা হয়। মঠের উপরে পাহাড়ের চূড়ায় মাকালী মন্দির রয়েছে, যেখানে ভক্তরা প্রতি পূর্ণিমার দিনে এবং তিব্বতি ক্যালেন্ডারের প্রতি মাসের পনেরো তারিখে প্রার্থনা করতে আসেন।

২) জাং ধোক পালরি মঠ, কালিম্পং: কালিম্পংয়ের দুরপিন পাহাড়ের ওপরে এই তিব্বতীয় মঠ অবস্থিত। এটি দুরপিন মঠ নামেও পরিচিত, এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর। এই মন্দিরে বৌদ্ধ কাঙ্গিউরের ১০৮টি খণ্ড রয়েছে।

৩) কর্মা গণ মঠ, কলকাতা: কলকাতার পদ্মপুকুরে চক্রবেড়িয়া এলাকায় অবস্থিত কর্মা গণ মঠটি কর্মা গণ, আক্ষরিক অর্থে কর্মের মন্দির। এটি তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের কর্ম কাগ্যু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। ১৯৩০-এর দশকে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু আক্কা দর্জি দার্জিলিং থেকে কলকাতায় আসেন। তিনি প্রথমে আলিপুরে বসতি স্থাপন করেন কিন্তু পরে বর্তমান চক্রবেড়িয়ায় স্থানান্তরিত হন এবং ১৯৩৭ সালে একটি ছোট মাটির কুঁড়েঘর স্থাপন করেন এবং নামকরণ করেন হিমালয় বৌদ্ধ গোম্বা। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে এটি সিকিমের বিখ্যাত রুমটেক মঠের অধীনে আসে এবং কর্ম গণ মঠ নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমান ভবনটি ১৯৭৬-৭৭ সালে নির্মিত হয়েছিল। এর বিশাল হলঘরটিতে বেশ কিছু তিব্বতীয় বৌদ্ধ দেবতার মূর্তি রয়েছে। ছাদের ওপরে একটি স্তূপ-সহ একটি ছোট উপাসনালয় রয়েছে।

৪) থার্পা চোলিং মঠ, কালিম্পং: কালিম্পং-এর একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মঠটি ১৯১২ সালে ডোমো গেশে রিনপোচে এনগাওয়াং কালসাং প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৫৮০০ ফুট উচ্চতায় মিরিকের সর্বোচ্চবিন্দুতে অবস্থিত, এই মঠ এই অঞ্চলের সবচেয়ে বিশিষ্ট বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলির মধ্যে একটি। মঠটি প্রায় ৫০০ ভিক্ষুর আবাসস্থল, যারা ভগবান বুদ্ধের শিক্ষাগুলি অনুশীলন করেন।

৫) ডালি মনাস্ট্রি, দার্জিলিং: এর পুরো নাম ড্রুক সাঙ্গাগ চোলিং মঠ। ১৯৭১ সালে প্রথম ক‍্যাবজে থুকসে রিনপোচে কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই মঠটি দ্রুকপা সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঠ। হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত প্রায় ৩০০-র বেশি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা এখানে বসবাস করেন।

৬) হিউয়েন সাং মনাস্ট্রি, কলকাতা: এই চীনা-বৌদ্ধ বিহারটি কলকাতায় অবস্থিত। রুবির মোড় থেকে বেশ অনেকটাই রাস্তা ,পশ্চিম চৌবাগা। ১৯৬৪ সালে চিনা ভিক্ষু ‘য়ু শিয়ান’ স্থাপন করেন এই মন্দির অথবা মঠ। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে বৌদ্ধস্তূপ। দেয়াল জুড়ে অসামান্য সব চিত্র। বুদ্ধের বিভিন্ন রূপ-বর্ণনা। রয়েছে একটা বিশাল গ্রন্থাগার। সেখানে চীনা ভাষায় লেখা বহু গুরুত্বপূর্ণ দুষ্প্রাপ‍্য ধর্মীয় পুথি রয়েছে। মন্দির কমপ্লেক্সটিতে বিখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েন সাংয়ের একটি মূর্তি রয়েছে, যিনি মহান ভারতীয় রাজা হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে ভারত সফর করেছিলেন।

৭) তামাং মনাস্ট্রি, মিরিক: এই প্রাচীন তিব্বতীয় মঠ ‘তাশি সামতেং লিং’ মঠ নামেও পরিচিত। এই স্থানটি মিরিক এবং দার্জিলিংয়ের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং সুমেন্দু লেকের চোখ জুড়ানো দৃশ্য যেন এই স্থানটি শান্তি এবং আধ্যাত্মিকতা সন্ধানকারীদের জন্য অনবদ্য করে তুলেছে। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিকেই চিত্র, শিল্পকর্ম এবং মঠের অভ্যন্তরে বিশাল ব্রোঞ্জের কারুকাজ এই বৌদ্ধমন্দিরটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।

৮) ম্যাগ ধোগ ইওলমোওয়া মনাস্ট্রি বা আলুবাড়ি মঠ, দার্জিলিং: স্থানীয়ভাবে আলুবাড়ি মঠ নামে পরিচিত, এই মঠটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত হয়েছিল। বৌদ্ধধর্মের ইওলমোওয়া সম্প্রদায়ের শৈলী-বৈশিষ্ট্য সমস্ত মঠটিতে সুস্পষ্ট।

৯) বোকার নেগেডন চোখোর লিং মনাস্ট্রি, মিরিক: মিরিকের সর্বোচ্চবিন্দুতে দাঁড়িয়ে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৮০০ ফুট উপরে, যেখান থেকে পুরো উপত্যকা ও নদীর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায় এবং তার সাথে মঠের প্রার্থনার শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। ১৯৮৪ সালে কিবজে বোকার রিনপোচে এই মঠের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি ছোট রিট্রিট সেন্টার তৈরি, কিন্তু তাঁর শিষ্য ও অনুগামীদের অনুরোধে তিনি এখানে সন্ন্যাসীদের প্রশিক্ষণ শুরু করেন। ক্রমে এটি একটি মনাস্ট্রি বা মঠে উন্নীত হয়। বর্তমানে এই মঠের সঙ্গে দুটি রিট্রিট সেন্টার ও একটি সন্ন্যাসীদের কলেজ রয়েছে। সারা দেশ, তিব্বত এবং নেপাল থেকে প্রায় ৫০০ বৌদ্ধ ভিক্ষু এখানে থাকেন এবং ভগবান বুদ্ধের মহিমা কীর্তন করেন। বিশাল আকারের বুদ্ধ মূর্তির পাশাপাশি ব্রোঞ্জের অন্যান্য শিল্পকর্ম এখানে পরিলক্ষিত হয়।

১০) জাপানি বৌদ্ধমন্দির, লেক রোড, কলকাতা: ঢাকুরিয়া লেক এবং ঢাকুরিয়া ফ্লাইওভারের পাশে এই জাপানি বৌদ্ধমন্দিরটি অবস্থিত। এটি নিপ্পনজান মায়োহোজি নামে পরিচিত। জাপানি এই বৌদ্ধমন্দিরটি ১৯৩৫ সালে জাপানি বৌদ্ধ ভিক্ষু নিচিদাতসু ফুজি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরটি একটি কম্পাউন্ডের ভিতর অবস্থিত। জাপানি শিলালিপি-সহ একটি স্তম্ভ এবং সিংহের বেশ কয়েকটি মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে একটি ছোট সাইনবোর্ড রয়েছে, যেখানে লেখা আছে ‘না – মু – মায়ো – হো – রেন – জি – কিয়ো’। অনুবাদের অর্থ হল, ‘আমি পদ্মপুষ্প সূত্রের বিস্ময়কর নিয়মের ছত্রছায়ায়’। মন্দিরের ভেতরের বেদিতে বুদ্ধের একটি মূর্তি রয়েছে। প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় দু’বার পূজা-পাঠ অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়াও জলপাইগুড়ির ডামডিমে দুটি পরিচিত বৌদ্ধমন্দির রয়েছে। বোকর মনাস্ট্রি (যা ডামডিম বুদ্ধ টেম্পল নামেও পরিচিত) এবং তাশি কুংসাঙ গুম্বা। এই দুটি স্থানই ডামডিম এলাকায় অবস্থিত এবং তিব্বতি বৌদ্ধ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ডামডিম বুদ্ধ টেম্পল (বোকর মনাস্ট্রি): এটি ডামডিম গ্রামের বেতবাড়ি চা-বাগানের কাছে অবস্থিত। এটি একটি শান্ত তিব্বতি বৌদ্ধ মঠ। বোকর মনাস্ট্রি নামেও পরিচিত এই মন্দিরটি ডামডিম এলাকার অন্যতম প্রধান বৌদ্ধ কেন্দ্র। Bokar Obar Chimey Ling Institute নামে সুপরিচিত এই প্রতিষ্ঠানে বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র ও দর্শন পড়তে বহু দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসেন। এছাড়া তাশি কুংসাঙ গুম্বাটিও ডামডিমের কাছাকাছি নাগরাকাটা অঞ্চলে অবস্থিত। এটিও ডামডিম এলাকার আরেকটি পরিচিত বৌদ্ধমন্দির।

খুব জনপ্রিয় না হলেও মধ্য কলকাতার বো ব‍্যারাক অঞ্চলে বৌদ্ধ টেম্পল স্ট্রিটে অবস্থিত ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ মন্দিরটি ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল বৌদ্ধ সমিতি দ্বারা পরিচালিত এবং পরিচালিত হয়। ১৯০৩ সালে এটি নির্মিত হয়েছিল। এর একটি ছোট মন্দির রয়েছে যেখানে একটি কাচের কক্ষের ভিতরে বুদ্ধের একটি সোনার মূর্তি রয়েছে। বৃহৎ কমপ্লেক্সে একটি গ্রন্থাগার এবং একটি অতিথিশালা রয়েছে, যেখানে মূলত বৌদ্ধ ছাত্র এবং তীর্থযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সকল ধর্মের অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়।

কলকাতায় মূলত বাঙালি এবং ত্রিপুরার বৌদ্ধদের নিয়ে একটি বৌদ্ধ সম্প্রদায় থাকলেও এই শহরে বৌদ্ধমন্দিরের বেশ কিছু অংশ রয়েছে, যার মধ্যে কিছু জাপানি, বর্মী, চীনা, তিব্বতি এবং তাইওয়ানিজ বৌদ্ধ সম্প্রদায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই মন্দিরগুলি শহর জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে— উত্তরে লেক টাউন থেকে দক্ষিণে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত।

কলেজ স্কোয়ারের কাছে বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত শ্রী ধর্মরাজিকা বিহার একটি মহাবোধি বৌদ্ধ মন্দির এবং সম্ভবত শহরের সবচেয়ে বৃহৎ বৌদ্ধমন্দিরগুলির মধ্যে একটি। এই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ১৯১৮ সালে সিংহলী বৌদ্ধ ভিক্ষু অনাগরিক ধর্মপাল, যিনি শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত বিশ্ব ধর্ম সংসদের বক্তাদের একজনও ছিলেন, যেখানে স্বামী বিবেকানন্দ উপস্থিত ছিলেন। ধর্মপালকে প্রায়শই প্রথম বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক হিসাবে উল্লেখ করা হয়।

কলেজ স্কোয়ারের মন্দিরে একটি অবশেষ রয়েছে— ভগবান বুদ্ধের একটি দাঁত, যা তাঁর জন্মদিনে প্রদর্শিত হয়। মন্দিরের ভেতরে অনেক সোনালি বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, এবং উজ্জ্বল রঙের দেয়ালচিত্রে ঢাকা দেয়াল এবং বাঁকা ছাদ বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা চিত্রিত করে। মন্দিরটি উপরের তলায় অবস্থিত এবং ভবনটি মহাবোধি সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার সদর দপ্তর হিসেবেও কাজ করে এবং একটি গ্রন্থাগার এবং একটি অতিথিশালাও রয়েছে।

মায়ানমার বৌদ্ধমন্দির, যা একসময় বার্মা বৌদ্ধ ধর্মশালা নামে পরিচিত ছিল, সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনের পাশে, ইডেন হাসপাতাল রোডের ১০এ-তে অবস্থিত। একটি সাধারণ ভবনের বাইরে দুটি সাইনবোর্ড প্রবেশপথ নির্দেশ করে। কলকাতার মায়ানমার বৌদ্ধমন্দিরটি ১৯২৮ সালে ইউ সান মিন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মন্দিরটি তিনতলা ভবনের উপরের তলায় অবস্থিত, যেখানে নীচের তলায় একটি অফিস, অতিথিশালা এবং একটি গ্রন্থাগার রয়েছে।

এই মন্দিরের অনন্য বুদ্ধ মূর্তিটি আসলে পাঁচটি ভিন্ন অংশের একত্রিত সৃষ্টি, যা ভেঙে একটি ছোট বাক্সে প্যাক করা যেতে পারে। বিদেশি আক্রমণের ক্ষেত্রে মূর্তিটিকে রক্ষা করার জন্য এই বৈশিষ্ট্যটি একটি উপায় ছিল। জানা গেছে যে, বিশ্বে এই ধরনের মাত্র পাঁচটি বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে, এবং বাকি চারটি মিয়ানমারে রয়েছে।

রবীন্দ্র সরোবরের পূর্ব দিকে এবং ঢাকুরিয়া ফ্লাইওভারের পাশে অবস্থিত, নিপ্পনজান মায়োহোজি হল একটি জাপানি বৌদ্ধমন্দির, যা ১৯৩৫ সালে জাপানি বৌদ্ধ ভিক্ষু নিচিদাৎসু ফুজি, যিনি নিচিরেন দাইশোনিনের অনুসারী ছিলেন, দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। স্তূপের মতো সাদা এবং সোনালি রঙের এই মন্দিরটি একটি বিশাল প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত যেখানে সুন্দরভাবে সাজানো বাগান এবং ভিক্ষুদের বাসস্থান রয়েছে। মন্দিরে বুদ্ধের একটি মার্বেল মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

লেক টাউন এবং বাঙ্গুরের মাঝখানে যশোর রোডের একটি সরু গলিতে অবস্থিত এই ছোট মন্দিরটি সেইসব ভবনগুলির মধ্যে একটি, যেখানে কিছু সংস্কারের প্রয়োজন। মূল মন্দিরটি প্রায় ১৯৬২ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং এক দশক পরে এটি সম্প্রসারিত করা হয়েছিল। ভিতরে একটি বড় প্রার্থনা কক্ষ এবং অনেক ছোট মন্দির রয়েছে। ভবনটিতে অসংখ্য হাতে লেখা ধর্মীয় গ্রন্থ-সহ একটি গ্রন্থাগারও রয়েছে।

কলকাতার নতুন মন্দিরগুলির মধ্যে রয়েছে ফো গুয়াং শান মন্দির, যা তাইওয়ান ভিত্তিক একটি চীনা মহাযান বৌদ্ধ সংগঠন এবং সন্ন্যাসীদের দ্বারা নির্মিত। বুদ্ধের একটি বিশাল সোনার মূর্তি নীচতলার প্রার্থনা কক্ষকে শোভা দেয়, আর প্রথম তলায় ধর্মীয় গ্রন্থের বিশাল সংগ্রহ সহ একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। মন্দিরটির প্রধান মহিলা সন্ন্যাসী মিয়াও রু বিনামূল্যে Krne ক্যালিগ্রাফি ক্লাস-সহ সম্প্রদায়ের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রচার এবং বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান এবং ক্লাসের আয়োজন করেন।

আজকের দুনিয়ায় জনপ্রিয় জেন অনুশীলন বা সেই সুপ্রাচীন ‘বুদ্ধম শরণম গচ্ছামি’, যার অন্তর্নিহিত অর্থ হল: আমি জাগ্রত ব্যক্তির (বুদ্ধম) কাছে আশ্রয়ের জন্য (শরণম) যাই। একথা বলাই বাহুল্য যে, সংখ‍্যার বিচারে বিপুল-বিস্তৃত বৌদ্ধ ‘পারমিতা’ অর্থাৎ পরিপূর্ণতার অন্বেষণে এই পর্যালোচনা মহাসমুদ্রের কয়েকটি বিন্দুকে একটি গণ্ডুষে যতটুকু সাধ‍্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা মাত্র। পরিশেষে এই কথাও বলা যায় যে, ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের এই বৌদ্ধমন্দির এবং মঠগুলি কেবল স্থাপত্যের বিস্ময় নয়, বরং দেশের সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক ঝলক প্রদানকারী প্রশান্তির স্থানও। এই প্রতিটি উল্লেখযোগ্য মঠ-মন্দির ভারতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ‍্যায়কে মনে করায়, যা আধ্যাত্মিকভাবে কৌতূহলী এবং ভ্রমণে আগ্রহী উভয় ধরনের মানুষজনকে আরও আরও অন্বেষণ করার জন্য পরিকল্পনা করতে সাহায্য করবে।

চিত্র: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × two =

Recent Posts

প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »