১৯৪৬ সালের ১১-১৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতার রাজপথে লেখা হয়েছিল ছাত্র-যুব-মজুরদের সংগ্রামের এক ‘নয়া ইতিহাস’। ইতিহাসে এই সংগ্রাম রশিদ আলি দিবসের সংগ্রাম নামেই পরিচিত । নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন আব্দুল রশিদ আলিকে ব্রিটিশ সরকার লালকেল্লার কুখ্যাত বিচারে সাত বছরের জন্যে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬-এ (প্রথমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডর সাজা ঘোষণা হলেও পরে তা কমিয়ে সাত বছর করা হয়)। এই অন্যায় বিচারের প্রতিবাদে এবং রশিদ আলির মুক্তির দাবিতে কলকাতায় ওই তিনদিন জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহের আগুন, পুলিশ মিলিটারির গুলিতে শহিদ হয়েছিলেন প্রায় দুশো মানুষ, গুরুতর আহত হয়েছিলেন বহু। ওই আন্দোলন একদিকে যেমন দেখিয়েছিল হিন্দু-মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইকে, তেমনই এই আন্দোলন দেখিয়েছিল কলকাতা ও শহরতলির ছাত্র-যুব-মজুর এবং সমাজের নীচুতলার মানুষদের মরণপণ সংগ্রামকে। এই আন্দোলনের তাত্পর্য তাই স্বাধীনতার আগে ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে ব্যাপক। ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নৌবিদ্রোহের মধ্যেও কলকাতার এই রশিদ আলি দিবসের আন্দোলন বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। এই আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ঘটনাক্রম এইরকম।
ওই অন্যায় বিচারের প্রতিবাদে এবং রশিদ আলির মুক্তির দাবিতে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের ছাত্র শাখা মুসলিম স্টুডেন্টস লিগ (এমএসএল)-এর কলকাতা শাখা ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬-এ কলকাতায় একটি সাধারণ ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেয়। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন, বিপিএসএফ (বেঙ্গল প্রভিনশিয়ল স্টুডেন্টস ফেডারেশন)-এর কলকাতা ব্রাঞ্চ এই ধর্মঘটকে সমর্থন করে। কংগ্রেস সহ অন্য রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলি এই ধর্মঘটের বিরোধিতা করেনি। কোনও বড় রাজনৈতিক দল এই ধর্মঘটে সরাসরি যুক্ত না হলেও তাদের ছাত্রযুবদের কর্মীরা এই ধর্মঘটে পথে নেমে এসেছিলেন। সেদিন দুপুরে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে একটি বড় জনসভার পরে প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্রদের একটি মিছিল ডালহৌসি স্কোয়ারের দিকে এগোতে থাকে। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন বিপিএসএফের সম্পাদক অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য এবং এমএসএলের নেতা শাহ আজিজুর রহমান। মিছিল থেকে স্লোগান ওঠে ‘লিগ কংগ্রেস এক হো’, ‘হিন্দু মুসলিম এক হো’, ‘ডাউন উইথ ব্রিটিশ ইম্পিরিয়ালইজম’ (ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক), ‘পুলিশি জুলুম বন্ধ করো’। কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, খাকসার পার্টি এবং কমিউনিস্টদের পতাকা নিয়ে সেই দৃপ্ত মিছিলকে ফেয়ারলি প্লেসের কাছে কলকাতা পুলিশ আটকায়। ডিসি শামস-উদ-দোহা সশস্ত্র গোর্খা বাহিনীকে নিয়ে মিছিলকারীদের পাঁচ মিনিটের মধ্যে মিছিল ভেঙে না দিলে গুলি চালানোর হুমকি দেন। তার জবাবে অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘তোমরা আমাদের পেটাতে পারো, খুন করতে পারো, চূর্ণ করতে কিছুতেই পারবে না।’ এর পর কলকাতা পুলিশের দুশ সার্জেন্ট এবং গোর্খা বাহিনী একঘণ্টা ধরে ওই ছাত্রদের ওপরে নির্মম লাঠিচার্জ করে। প্রায় একশো ছাত্র আহত হন। অন্নদাশঙ্কর-সহ কুড়িজন ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন।
ছাত্রদের ওপরে এই পুলিশি নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই কলকাতা অশান্ত হয়ে ওঠে। প্রতিবাদে ট্রাম ও বাস বন্ধ করে দেন চালকরা। কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র যুব এবং মজুরদের (যাঁদের অধিকাংশই বস্তিবাসী) সংঘর্ষ শুরু হয়। মিলিটারির গাড়িতে আগুন লাগানো হয়। পুলিশও বেপরোয়া গুলি চালায়। তত্কালীন বিশিষ্ট ছাত্রনেতা গৌতম চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ১১ তারিখ রাতেই বারোজনের বেশি কমবয়সি প্রতিবাদী পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। ঠেলাগাড়ি, প্যাকিং বাক্স, ডাস্টবিন রাস্তার মাঝখানে এনে ব্যারিকেড করে পুলিশের গাড়ি আটকাবার চেষ্টা করে আন্দোলনকারী মানুষেরা।
এই পুলিশি বর্বরতার প্রতিবাদে ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ কমিউনিস্ট পার্টির পরিবহণ শ্রমিকরা ধর্মঘট ডাকেন, ট্রাম বাস রিকশা বন্ধ থাকে, বিপিটিইউসি কাঁকিনাড়া এবং বজবজে শিল্প ধর্মঘটের ডাক দেয়। শহরতলিতে রাস্তা এবং ট্রেন অবরোধ করা হয়। ট্রেন অবরোধ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নৈহাটি এবং কাঁকিনাড়ায় ১২ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি চারজন কারখানার মজুর শহিদ হন। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রাখেন। কলকাতায় ১২ তারিখ ওয়েলিংটন স্কোয়ারে একটি বিরাট প্রতিবাদ সভা আয়োজিত হয়েছিল। কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগ এই প্রতিবাদে সামিল না হলেও সভায় উপস্থিত ছিলেন মুসলিম লিগ নেতা সুরাবর্দি এবং বিশিষ্ট গান্ধীবাদী নেতা সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত। সভায় ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ লাহিড়ী প্রমুখ। সভার পরে লাখো মানুষের এক মিছিল ডালহৌসির দিকে যায় (‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ সেদিনের মিছিলের মানুষের সংখ্যাকে এক লাখের বেশি বলে লিখেছিল)। কংগ্রেসের তেরঙ্গা, মুসলিম লিগের সবুজ আর কমিউনিস্টদের লাল পতাকা মিছিলে আর রাস্তায় এক সঙ্গে উড়তে থাকে। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ব্যাপক কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। কলকাতার রাস্তায় জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ চলতেই থাকে। ১২ তারিখ বিকেলে পরিস্থিত হাতের বাইরে যেতে ছোটলাট কেসি ভারতীয় পুলিশ ও সেনা তুলে নিয়ে ব্রিটিশ সেনার হাতে কলকাতার আইনশৃঙ্খলার ভার তুলে দেন। দেখামাত্র গুলির আদেশ দেওয়া হয়, কাউকে বাইরে আসতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু তাতে আন্দোলন দমেনি। কলকাতার রাজপথে শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। একদিকে টমিগান হাতে, নিরাপদ গাড়িতে সদ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফেরত ব্রিটিশ ফৌজ আর অন্যদিকে কলকাতার ছাত্রযুব, দিনমজুর, ঠেলাওয়ালা, রিকশাওয়ালা ইত্যাদি খেটে-খাওয়া মানুষেরা। ব্রিটিশ সেনা নির্বিচারে গুলি করে আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে থাকে। তাদের বন্দুকের নিশানা থেকে বাদ যায়নি বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ানো ছোট শিশুরাও। প্রায় পঁচিশটি মিলিটারির গাড়ি জনতা জ্বালিয়ে দেয়। ১১, ১২ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ সেনার গুলি চালনায় শহিদ হন সরকারি মতে ৮৪ জন, বেসরকারি মতে সংখ্যাটা ২০০-র বেশি। গৌতম চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, বেসরকারি হিসেবটি ঠিক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি কারণ সেটি তৈরি করা হয়েছিল সেদিন কলকাতার হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিত্সকদের রিপোর্টের ভিত্তিতে।
২০১৬-তে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত “DICTIONARY OF MARTYRS: INDIA’S FREEDOM STRUGGLE (1857-1947)”-এর খণ্ড চার-এর ১৪-১৫ পাতায় এই আন্দোলন সম্বন্ধে বলা হয়েছে:
“… students’ agitation in Calcutta against the 7 years’ rigorous imprisonment of Captain Abdul Rashid of the INA between 11 and 13 February 1946, and demanding his release. The agitation started on 11 February 1946 at the call of the Muslim Students League, supported by CPI-led BPSF. A massive meeting was held at the Wellington Square (now Subodh Mullick Square), and at the end of the meeting a protest demonstration of around 5000 people started to march towards the Dalhousie Square, carrying the Congress and League flags and shouting slogans: “Congress-League ek ho”, “Police zoolum Bandh Karo”. The procession was stopped at Fairlie Place by the Deputy Commissioner of Police, accompanied by a large contingent of armed Gurkha force, asking the processionists to disperse. On their refusal, the Gurkha force resorted to brutal lathi-charge before the eyes of the crowd that had gathered to witness the valiant struggle. Around 100 students were injured in the lathicharge and about 20 students were arrested each of whom was applauded by the crowd. The news of police brutality on the students spread all over the city and the plying of trams and buses was halted by the people. There were confrontations between the people and the police at a number of places throughout the night. The next day, on 12 February 1946, there was a complete transport strike, as well as strike by the workers of the industries in and around Calcutta, bringing the whole area to a standstill. The Wellington Square was jampacked with people who turned up to listen to a few political leaders’ condemnation of the police atrocities on the students. Afterwards, the ever-increasing crowds, carrying flags of the Congress, the Muslim League, the CPI and the Khaksar Party, marched towards the Dalhousie Square, deafeningly raising the slogans of “CongressLeague ek ho”, “Stop police zoolum”, “Down with British Imperialism”. The mass upsurge forced the British authorities to withdraw the ban on entry into the Dalhousie Square. Near Bowbazar the police fired tear gas shells to disperse the crowd, but these were neutralized with the help of buckets full of water, thrown down by the women from the balconies of their houses. The intensifying anti-British popular sentiments and the constant governmental provocaions resulted in many street battles between the people and the police. The police opened indiscriminate firing at a good number of places, killing more than 20 people and injuring over 200. By the evening of 12 February 1946, the city was handed over to the military and Section 144 imposed on it to deter any furtherance of the anti-imperialist struggle. Even then, the pitched battles between the civilians and the imperialist forces continued till 13 February 1946, and this mayhem resulted in the deaths of about 84 persons and injuries to many more.”
তবে এই শহিদ-অভিধানে ওই আন্দোলনের ৩৯ জন শহিদের নাম পরিচয় দেওয়া আছে। আরও কয়েকজনের নাম পরিচয় আছে অমলেন্দু সেনগুপ্তর ‘উত্তাল চল্লিশ: অসমাপ্ত বিপ্লব’ (পার্ল পাবলিশার্স, ১৯৫৭) এবং গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘Bengal Students in Revolt Against the Raj, 1945-46’ (in ‘Myth and Relaity: The Struggle for Freedom in India 1945-47’, Manohar, 1987)-তে। এই তিনটি সূত্র থেকে এখানে কলকাতার রশিদ আলি দিবসের শহিদদের ৪৫ জনের নাম পরিচয়ের একটি অসম্পূর্ণ তালিকা এখানে দেওয়া হল:
১. আজমিরি, কলকাতা, ১৪ বছর, ১৩ ফেব্রুয়ারি রিপন স্ট্রিটে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু
২. আলি হোসেন, কলকাতা, ২৫ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৩. অমূল্যকুমার বিয়াস, কলকাতা, ৪০ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৪. অন্নদা দত্ত ঘোষ, কলকাতা, ২০ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৫. অসিত কুন্ডু, কলকাতা, ১২ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৬. অসিত সেন, কলকাতা, ১৪ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৭. বঙ্কিমবিহারী ব্যানার্জী, কলকাতা, ১৪ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৮. বঙ্কিম দত্ত, কলকাতা, ২০ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৯. বিহারী মিঞা, কলকাতা, ১৬, বি টি নম্বর ৬, কাঁকিনাড়া, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, পুলিশের গুলিতে ১৩ই ফেব্রুয়ারিতে কাঁকিনারা স্টেশনে রেল অবরোধ করতে গিয়ে মৃত্যু
১০. বীরেন্দ্রনাথ লাহা, কলকাতা, ২০ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
১১. চান্দের সিং, কলকাতা, ১৮ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
১২. দেবব্রত ওরফে বাঘা, বালিগঞ্জে জগবন্ধু স্কুলের ছাত্র, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
১৩. দোসাদ বুধু, ২২ বছর, ইস্ট ঘোষপাড়া রোড, পুলিশের গুলিতে ১৩ ফেব্রুয়ারিতে কাঁকিনাড়া স্টেশন এ রেল অবরোধ করতে গিয়ে মৃত্যু
১৪. ফজলুল আহমেদ, কলকাতা, ১৮ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
১৫. ইশাক মিঞা, ২০ বছর, নৈহাটি স্টেশনে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু
১৬. জান মহম্মদ, কলকাতা, ২২ বছর, বিড়িশ্রমিক, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
১৭. জানকি সাহা, কলকাতা, ২৮ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
১৮. খগেন্দ্র নাথ বোস, কলকাতা, ২৮ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
১৯. ললিতমোহন সরকার, কলকাতা, ৩৫ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
২০. মণিগোপাল মল্লিক, কলকাতা, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
২১. মনোরঞ্জন দত্ত, কলকাতা, ৩৫ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
২২. মতিলাল রায়, কলকাতা, ২৬ বছর সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
২৩. মিঞা রমজান, ৭ নম্বর ওয়েলেসলি স্ট্রিট কলকাতা, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ গুলির আঘাত নিয়ে ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানো হয় ও সেদিনই মারা যান
২৪. মিশির লাল মুনিয়া, রবার্টসন রোড নৈহাটি, নৈহাটি স্টেশনে প্রতিবাদ করতে গিয়ে গুলিতে মৃত্যু, ২৮ বছর
২৫. মহম্মদ ইউসুফ, কলকাতা, ২৫ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু। তাঁর গুলিবিদ্ধ দেহ ৭/২ বীরপাড়া রোডে পাওয়া যায়
২৬. মোহিত রায়, বছর ১৫, বাবা ছিলেন টাটানগরের কেমিস্ট, মধ্য কলকাতায় একটি ব্যারিকেড রক্ষা করতে গিয়ে মিলিটারির গুলিতে আহত হন ও ১৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় তাঁর।
২৭. মহম্মদ কদম রসুল, গ্যাস ফ্যাক্টরির শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
২৮. উড়িয়া কাহার, ১৮ বছর, গৌরীপুর তেলিপাড়া নৈহাটি, শ্রমিক, নৈহাটি স্টেশনে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু
২৯. নিজামুদ্দিন, কলকাতা, ১৮ বছর, ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ পুলিশের গুলিতে মারা যান, তাঁর মরদেহ নাখোদা মসজিদ থেকে মানিকতলা নিয়ে যাওয়ার শেষ যাত্রায় ২০০০ হিন্দু মুসলমান যোগ দিয়েছিলেন
৩০. পরমেশ্বর মাহাতো, ১৮ বছর, ব্যারাক লাইন নম্বর ১৯, কাঁকিনাড়া, কাঁকিনাড়া স্টেশনে রেল অবরোধ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু
৩১. রতন লাল, কলকাতা, ১১ বছর, পি ১৩ নিউ জগন্নাথ রোডের বাড়িতে বারান্দায় বোনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার সময় মিলিটারির গুলিতে মারা যান ১৩ তারিখ
৩২. রত্না শেঠ, কলকাতা, ১১ বছর, তিন তলায় বাড়ির বারান্দায় দঁড়িয়ে সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৩৩. এস দত্ত, কলকাতা, গুলিবিদ্ধ হয়ে ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে ১২ তারিখে মারা যান
৩৪. এস এম মাঝিফ, কলকাতা, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৩৫. সরোজিনী রায়, কলকাতা, ১৩ বছর, পি ১৩ নিউ জগন্নাথ রোডের বাড়িতে বারান্দায় ভাই সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার সময় মিলিটারির গুলিতে মারা যান ১৩ ফেব্রুয়ারি
৩৬. সুবোধ কুমার মণ্ডল, কলকাতা, ২৫ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু। তাঁর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ রাসবিহারী এভিনিউ থেকে উদ্ধার হয়
৩৭. উড়িয়া পিঠ বাস, গোয়ালপাড়া রোড, ভাটপাড়া, পুলিশের গুলিতে ১৩ ফেব্রুয়ারিতে কাঁকিনাড়া স্টেশনে রেল অবরোধ করতে মৃত্যু
৩৮. শঙ্কর দে, কলকাতা, ১৪ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৩৯. সোমনাথ বোস, কলকাতা, ১৩ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৪০. উলফত হোসেন, কলকাতা, ১৯ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৪১. বহর মিঞা, কলকাতা, ৩০ বছর, ৯, রাণী রাসমণি রোড, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৪২. মহম্মদ ইজরায়েল, কলকাতা, ২৩ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৪৩. মেহু খান, কলকাতা, ২৪ বছর,সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৪৪. রাম চন্দ্র, কলকাতা, ২৫ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
৪৫. মহম্মদ শেরিফ, কলকাতা, ২৫ বছর, সশস্ত্র সরকারি বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু
তালিকাতে চোখ বোলালেই দেখা যাবে, দেশের স্বাধীনতার জন্যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ছাত্র-যুব-মজুররা শহিদ হয়েছিলেন। আর স্বাধীনতার আটাত্তর বছর পরে বহু প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশকে আমরা ভেতরে ভেতরে টুকরো টুকরো করার পথে হাঁটছি হিন্দু-মুসলমান করে। দুঃসময়ে ইতিহাসের কাছে ফিরতে হয় শিক্ষার জন্যে, বর্তমানকে বোঝার জন্যে। কলকাতার রাজপথে জাতধর্মর ভেদকে চূর্ণ করে সংঘটিত রশিদ আলি দিবসের আন্দোলনের বীরত্বের কাহিনি ধর্মান্ধ মানসিকতা থেকে দেশকে দেখার নতুন অর্জিত ন্যাবাদৃষ্টি থেকে আমাদের দেশের মানুষকে মুক্তি দিক।
চিত্র: গুগল






