Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সিনিয়র সিটিজেন

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির ওপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভুর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে। এবার কনফারেন্স হলে উপস্থিত হবার পরপরই একজন খাঁটি বাংলা জিজ্ঞেস করলেন:
—কেমন আছেন?
—ভাল। কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না।
—আমি রঞ্জন। ফেসবুকে বন্ধু।

আসলে, অনেকের সাথেই আলাপ হয়, বন্ধুত্ব হয়, তবে সরাসরি আলাপ খুব কম লোকের সাথেই হয়। ওর কল্যাণে আরও কয়েকজন বাঙালি বিজ্ঞানীর সাথে আলাপ হল। যার ফলে মনে হয় এই প্রথম কোনও কনফারেন্সে গিয়ে কফি ব্রেকের সময় বাংলায় মন খুলে কথা বলা হল। বিকেলে সবাই মিলে যখন যে যার আস্তানায় ফিরছি, মেট্রোর কাউন্টারে এসে ওরা জিজ্ঞেস করলেন, আমার টিকেট লাগবে কি না? বললাম:
—আমার বয়েস হয়েছে। তাই সরকার আমাকে বিনে পয়সায় পাবলিক ট্র্যান্সপোর্টে ঘোরার সুযোগ দেয়।
—ও, আপনি সিনিয়র সিটিজেন!
কয়েক বছর আগে কল্যাণদাকে বলতে শুনেছি যে, ও সিনিয়র সিটিজেন হয়ে গেছে। হয়েছে ৬০ বছরে। ব্যাপারটা যে এরকম ডাল-ভাত সেটা আগে বুঝতে পারিনি। সিনিয়র মানেই তো ভারিক্কি একজন মানুষ। আমার নিজেকে সব সময়ই ২৫ বছরের যুবক মনে হয়। তাই একটু অবাকই হলাম। আমার এই সিনিয়র সিটিজেন হওয়া নিয়ে কিছু গল্প, কিছু অ্যাডভেঞ্চার সম্বন্ধে আজকের আলাপ। গল্প মানে গল্প নয়, সত্য। একশ ভাগ সত্য। যাকে বলে ১০০%!

আজকাল আমি ঘরে বসে বসেই বিভিন্ন রোমহর্ষক কাহিনির জন্ম দেই। ২০২৪ সালের দোসরা জানুয়ারি আমার অফিসিয়ালি ৬০ বছর পূর্ণ হল। অফিসিয়ালি এ কারণে যে আমার জন্ম ২৫ ডিসেম্বর। কিছুদিন আগেও নিজের সন্দেহ ছিল সেটা ১৯৬৪, না ১৯৬৩। তবে তপনদা আর কল্যাণদা গড় ডিসেম্বরে একসাথে জানাল, সেটা ১৯৬৩। এর মানে জীবন থেকে নিজের অজান্তে এক বছর গায়েব হয়ে গেল। কয়েক বছর আগেও এদেশে ৬০ ছিল রিটায়ার করার বয়স। আমাদের, মানে শিক্ষক, গবেষক বা অন্যান্য ইন্টেলেকচুয়াল জবের বাইরে অন্য সবাই অবসরে চলে যেত, আমাদের পেশার লোকজন হত শ্রমজীবী অবসরপ্রাপ্ত, মানে আংশিক পেনশন পেত আর কাজ চালিয়ে যেত। এর মূল কারণ যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে বেশি ডেমোগ্রাফিক। তবে এখনও ৬০ বছরে (মেয়েদের ক্ষেত্রে ৫৮) ছেলেরা প্রিপেনশন পায়, মানে ফ্রি পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট, ইন্টারসিটি লোকাল ট্রেন ইত্যাদি সুযোগ পায়। আমাকে যেহেতু প্রতি সপ্তাহে দুবনা-মস্কো-দুবনা করতে হয় তাতে মাসে পাঁচ থেকে ছয় হাজার রুবল যাতায়াত খরচ বাবদ বেঁচে যায়। অঙ্কটা খুব একটা কম নয়। দুবনায় থাকলেও আমার স্থায়ী ঠিকানা যেহেতু মস্কো, তাই আমাকে দেবে মস্কভিচ বা মস্কোবাসীর আইডি। দরখাস্ত করতে গিয়ে দেখি ‘মই ডকুমেন্টের’ যে অফিস আমাদের এলাকা সার্ভ করে সেটা সাময়িকভাবে বন্ধ। তাই আমাকে অন্য যে কোন অফিস থেকে আইডি-টা সংগ্রহ করতে হবে। বাসা থেকে মেট্রো কিয়েভস্কায়া খুব একটা দূরে নয়, মেট্রোয় ১০-১২ মিনিট, হেঁটে গেলে মিনিট ৩৫-৪০। আমি ওটাই বেছে নিলাম। এরপর যখন সাময়িক আইডি তোলার জন্য ওখানে গেলাম, দেখি এই অফিসের নাম কিয়েভস্কি নয়, দ্রাগোমিনস্কি। আর কিয়েভস্কি অফিস মস্কোর বাইরে তাও আবার ঘণ্টা দেড়েকের পথ। আমি আসলে ভেবেছিলাম তখনই সেখানে চলে যাব। নেট ঘেঁটে দেখলাম কিয়েভস্কায়া থেকে ট্রেন যায়, পরে বাসে। এমনকি মেট্রোয় ঢুকেও গেলাম। মনটা একটু শান্ত হলে মনে হল ওখানে যেতে যেতে সন্ধ্যা। আসলে, তখন জানুয়ারি মাস, এ দেশে বিকাল তিনটায় সূর্য ঘুমুতে যায়। এই এক মজার ব্যাপার। সমস্ত শীত জুড়ে সূর্য হাফ-ডে কাজ করে, আর গ্রীষ্মে ওভারটাইম করে সেটা পুষিয়ে নেয়। তাছাড়া যে জায়গার কথা বলছি, সেটার নাম কিয়েভস্কি রাবোচি পাসিওলক বা শ্রমিক বস্তি। তখনই কেন যেন আমার মনের কোণে ভেসে উঠল উনিশ শতকের রুশ সাহিত্যের বস্তির চিত্র, ছোট ছোট খুপরি ঘর, এখানে সেখানে মাতাল মানুষ। কেন যে এমন হল ঠিক জানি না। তারপরেও এই ভাবনাই আমাকে বলল, তুমি বরং এখন বাসায় ফিরে যাও, ভালভাবে রাস্তাঘাট জেনে তখন না হয় যেও। আর যেয়ো সকাল সকাল, যাতে ফিরে আসার বাস বা ট্রেন পাও। এক কথায় যুক্তির কাছে আবেগ নাস্তানাবুদ হল। আমি শূন্য হাতে শূন্য বুকে বাসায় ফিরলাম। ঠিক করলাম, এখন যেহেতু ছুটি তাই মস্কো আসার তাড়া নেই, তাই বরং অপেক্ষা করব মূল ডকুমেন্ট রেডি হওয়া পর্যন্ত। ঠিক মনে নেই এই বোকামির জন্য নিজের চুল ছিঁড়েছিলাম কি না তবে ভেবেছিলাম এসব মুহূর্তে ন্যাড়া বা টাকওয়ালারা বড্ড বাঁচা বেঁচে যায়।

বাসায় ফিরে খুব বেশি দেরি না করে চললাম দুবনার পানে। কয়েকদিন খুব মেজাজ খারাপ রইল নিজের ওপর। এই রাগ ঝাড়তে চিঠি লিখলাম মস্কোর মেয়রের অফিসে। লিখলাম যে, এটা আমার বোকামি, কিন্তু কিয়েভস্কি অফিস কিয়েভস্কায়া মেট্রোর পরিবর্তে দূরে এক উপশহরে করে আপনারা আমাকে এই বোকামি ইন্ধন জুগিয়েছেন। কোনওভাবে সম্ভব কি না ডকুমেন্ট মেট্রো কিয়েভস্কায়া বা দুবনার অফিসে স্থানান্তর করা? উত্তর পেলাম, ওরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আবেদন পৌঁছে দেবেন। এর মধ্যে কেটে গেল দেড় সপ্তাহ। মনিকা অবশ্য বলল, আমি যেন নতুন করে দরখাস্ত করি। কিন্তু কারণ কী বলব? নিজের বোকামি? তাই ঠিক করলাম মেয়রের অফিস থেকে ডকুমেন্ট প্রস্তুত হবার অথবা অন্য কোনও অফিস থেকে ডকুমেন্ট সংগ্রহ করার খবরের জন্য। ইতিমধ্যে কার্ড রেডি ও তা  কিয়েভস্কি শ্রমিক বস্তির অফিসে আছে বলে নোটিশ পেয়ে ঠিক করলাম সেই অফিসেই যাব। এজন্যে মস্কো চলে এলাম। সন্ধ্যায় মেয়রের অফিস থেকে মেইল পেলাম তারা আমার ব্যাপারটা নিয়ে কাজ করতে যথাযথ অফিসে নির্দেশ পাঠিয়েছেন। আমি এখন দ্বিধায় আছি সকালে সেই অফিসে যাব কী যাব না। কথায় বলে, বাঘের এক ঘা, আমলার দশ ঘা। অথবা হতে পারে এটা আমার গাধামির সোপ অপেরা। মস্কো এসে আমি বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে শুরু করলাম, কীভাবে কিয়েভস্কি রাবোচি পাসিওলক যেতে হবে সেটা জানতে। এ এক মহা বিপদ। চারিদিকে হাজার রকমের তথ্য, কোনটা ঠিক কোনটা ভুল সেটাই বের করাই সমস্যা। এরই মধ্যে কয়েক বার মেয়রের অফিসে ফোন করলাম, সেখানেও এক মহা বিপত্তি। সব জায়গায় এআই– কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন করে যাচ্ছে একের পর এক। হাজারটা প্রশ্ন। আমি তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? যদি তোমার এটা দরকার হয় তবে এই নম্বর টেপো, না হলে অন্য নম্বর। উত্তর না দিলে বলে আমি তোমাকে ঠিক বুঝতে পারছি না। আর যেহেতু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এটা মানুষ নয়, তাই জবাব দেবার তেমন আগ্রহ বোধ করছি না। মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। তবে এর একটা ভাল দিক আছে। ও যখন বোঝে আমি বিরক্ত হচ্ছি, তখন বলে— আমি তোমাকে ঠিক বুঝতে পারছি না, এখন অপারেশন অফিসারকে ডাকছি। এভাবে কয়েক বার। কেন না রবোটই মনে হয় সবচেয়ে বেশি জানে, অন্যেরা শুধু নিজের কাজটুকু। তবে শেষ পর্যন্ত কেউই খুব একটা সাহায্য করতে পারল না, যদিও কোত্থেকে যাওয়া যাবে আর কতক্ষণ লাগতে পারে সেটা বলল। আমার ধারণা, এটা ওরা করেছে আমার মতোই নেট ঘেঁটে। তবে এ ব্যাপারে মনিকা, ক্রিস্টিনা, সেভা বেশ বড় এক্সপার্ট। যদিও দুবনা থেকে আমি বিভিন্ন বাসের টাইম টেবিল প্রিন্ট করে এনেছিলাম, ওরা খুব দ্রুত সঠিক বাস ও তার টাইম টেবিল বের করে ফেলল। ঠিক হল পরের দিন সকালে আমি কিয়েভস্কি রাবোচি পাসিওলক যাব।

রাতে মনিকা বলল, ও ছুটি নিয়ে আমার সাথে যাবে যদি ক্রিস্টিনা বা সেভা যেতে না পারে। ছোটবেলায় বাবা আমাকে কোথাও একা ছাড়তে চাইতেন না, এখানে গুলিয়া আর ছেলেমেয়েরা এ রকম অবস্থায় আমাকে একা যেতে দিতে চায় না। ওদের ধারণা, আমি ঠিকঠাক জায়গা মতো পৌঁছুতে পারব না বা কোনও ঝামেলায় পড়ব। এর কারণ আমি প্রায়ই রাস্তাঘাট খেয়াল করে চলি না। ক্রিস্টিনা ফিরল অনেক রাতে। মনিকা হয়তো আগেই ওকে বলেছিল। বলল আমার সাথে ও যাবে ডকুমেন্ট কালেক্ট করতে। এর অর্থ হল, আমরা সকালে রওনা হতে পারব না। ওর ঘুম থেকে উঠে রেডি হতে হতে বারোটা বাজবে। তবে বাস যেখান থেকে ছাড়ে সেটা আমাদের বাসার সাথে একই লাইনে– ৫ স্টেশন পরে ত্রোপারেভায়। আমি, না তখন না এখন ঠিকঠাক নেট ব্যবহার করে কোন ঠিকানা, গাড়ি এসব বের করতে পারি। ভাগ্যিস ক্রিস্টিনা সাথে ছিল। মেট্রো থেকে বেরুনোর পর ন্যাভিগেটর দেখে ও আমাকে ঠিকঠাক বাস স্টেশনে নিয়ে এল। বলল, আর মাত্র চার মিনিট পরে বাস।

আমার ধারণা ছিল, এখান থেকে যেহেতু এক ঘণ্টার জার্নি তাতে বাসের ভাড়া শ’ দুই রুবল হবে। দেখা গেল মাত্র ৫৫ রুবল। আমার ছাত্রজীবনের ১০ বছর কেটেছে মস্কোয়। সেই আমলে চাইলেই কোথাও যাওয়া যেত না, ভিসা বা মিলিশিয়ার পারমিশন লাগত। আমাদের দৌরাত্ম্য ছিল মস্কোর সীমানার ভেতরেই। ফলে তখন লেনিনগ্রাদ, কিয়েভ, মিনস্ক, খারকভ, ওদেসা, আলমা আতা, ফ্রুঞ্জে এসব শহরে গেলেও মস্কোর আশপাশের শহরে তেমন যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ কোরাসের অংশ হিসেবে পাদোলস্ক বা এ রকম ছোট শহরে গেছি অবশ্য। আরও গেছি গোল্ডেন রিংয়ের বিভিন্ন শহরে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে দুবনা চলে যাবার পরে আমার যাতায়াত মূলত মস্কো-দুবনা ঘিরেই। সেটা উত্তরে। আর আজ আমরা যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমে। তবে সেই একই পরিচিত জনবিহীন পথ। মাঠের পর মাঠ। কালেভদ্রে এক আধটা জনপদ চোখে পড়ে। এখন অবশ্য বরফে ঢাকা। সুন্দর রাস্তা। তার ওপর দিয়ে চলছে সারি সারি গাড়ি। পাশেই বরফে ঢাকা বন। যাচ্ছি আর ভাবছি কেন যে ক্যামেরাটা আনলাম না। ইতিমধ্যে গাড়িতে কেউ কেউ জেনে গেছে আমাদের গন্তব্য। মই ডকুমেন্ট। কেউ একজন বলল, আমাদের এই স্টপেজে নামতে হবে। আমি দ্বিধাগ্রস্ত। ড্রাইভার খুব বেশি কিছু বলতে পারল না। কিন্তু ক্রিস্টিনা ন্যাভিগেটর দেখে আমাকে বসে থাকতে বলল। মোটামুটি ৫৫ মিনিট পরে আমরা নামলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। বাসটি মূল রাস্তা থেকে মোড় নিয়ে ছোট্ট একটা গ্রামে আমাদের নামিয়ে দিল। গ্রাম মানে কী, ছোট্ট শহর। অল্প কিছু বহুতলবিশিষ্ট বাড়ি। ক্রিস্টিনা ন্যাভিগেটর দেখে এগিয়ে চলল, আমি স্বভাববশত রাস্তায় দুই-একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। ওদের দেখানো পথে হেঁটেই এলাম এক পুকুর পাড়ে, পুকুর বা লেক। এখন বরফে ঢাকা। মাঝে একটা কাঠের গির্জা। খুব সুন্দর দেখতে। সাথে সাথেই আমার মনে হল কোত্থেকে কীভাবে ছবি তুলতে হবে। ক্রিস্টিনাকে বললাম, যদি সময় করতে পারি তবে গ্রীষ্মে এখানে বেড়াতে আসব ছবি তুলতে।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা এসে হাজির হলাম মই ডকুমেন্ট অফিসে। দুটো মেয়ে কাজ করছিল। আমি ওদেরকে বোঝাতে চাইলাম যে, কীভাবে আমার ডকুমেন্ট এখানে চলে এল। তবে ওরা আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল, তুমিই প্রথম নও, তুমি শেষও নও। এই ভুল লোকজন প্রায়ই করে। আমি বললাম, সেটা ঠিক। ভুলে করে মেজাজ বেশ বিগড়ে গেছিল, তবে ওদের পুকুর আর তার উপর গির্জা দেখে আমার ফিরে আসতে ইচ্ছে করছে। ওরা আমাদের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাল। আমরাও বিদায় নিয়ে হাইওয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ক্রিস্টিনা জানাল মিনিট পাঁচেক পরে বাস আছে। বেলা হয়ে এসেছে। মস্কোয় ফিরে কোনও ফুড কর্নার থেকে খেতে হবে। বাসে উঠে এবার আমার আর টিকেট কাটতে হল না। এই সোশ্যাল কার্ড দিয়েই আমি চলে এলাম মস্কো।

মই ডকুমেন্ট নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়। এর আরেক নাম আদনো আকনো বা এক জানালা। আগে যেকোনও কাজের জন্য হাজারটা জায়গায় যেতে হত, হাজারটা ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে হত। তাতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি পড়ত। এখন এই অফিসে গেলে ওরাই সব ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে দেয়। অনলাইনে যেমন অর্ডার দেয়া যায়, তেমনই অফ লাইনে। এটা জনজীবনকে কতটা যে সহজ করে দিয়েছে সেটা বলে বোঝানো যাবে না। তাছাড়া এখানে যাকে বলে জুতাসেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত সব অফিসিয়াল কাজই হয়, তাই এই অফিস খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

এই সোশ্যাল কার্ড টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হয় না, বিধায় একদিকে যেমন জীবন সহজ করে দিয়েছে অন্য দিকে তেমনই অলসও করেছে কম না। আগে যখন মস্কো যেতাম, বাসা থেকে দু’ স্টপেজ দূরে মস্কোর বাসে ওঠা গেলেও উঠতাম পাঁচ স্টপেজ পরে। না, টাকা বাঁচাতে নয়। দুই জায়গা থেকেই এক দাম। স্রেফ হাঁটতে। আজকাল এক স্টপেজও হাঁটতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় টাকাটা জলে ফেলা হল। ফলে আগে যেখানে হাঁটতে হাঁটতে অফিসে যেতাম বা অফিস থেকে বাসায় ফিরতাম সেখানে আমি বাসে করে অফিস বাড়ি করি। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আমার গাছেরা। আগে ওদের সাথে কথা বলতাম, ফুল আর পাতা দেখতাম, ছবি তুলতাম। এখন ওদের সাথে আমার দেখাই হয় না। বিশেষ করে বসন্তে রাস্তার ধারে সারি সারি লাইলাক খুব মিস করি। তবে নদীর ধারে বা বনের গাছেদের সাথে দেখা হয় আগের চেয়ে ঘন ঘন। অফিসে রাস্তায় হাঁটি না বলে অফিসের পরে নদীর তীরে বা বনে চলে যাই। সেদিক থেকে এখনকার হাঁটা হয় কোয়ালিটি হাঁটা। এখন অনেক বন্ধুরা যারা এর মধ্যে সোশ্যাল কার্ড পেয়েছে, বাসে করে অফিস করে। কিছুদিন আগে আনাতলির সাথে দেখা। আগে আমাদের দেখা হত হাঁটাপথে। বলল, ও সকালে হেঁটে আসে, বিকালে বাসে বাসায় ফেরে। নাতাশা পছন্দ করে না ও সব সময় বাসে করে যাতায়াত করুক। ভিক্টর মাঝেমধ্যে বাসে চলাচল করে। তবে প্রায়ই সাইকেল নিয়ে ঘোরে, যতটা না সাইকেলে চড়ে যায় তার চেয়ে বেশি সাইকেলকে হাঁটায়। না, সাইকেলের দোষ নয়। ও হাঁটতে পছন্দ করে, তবে সাইকেল সাথে রাখে। এটা অনেকটা ছাতা সাথে রাখার মতো, যদি বৃষ্টি আসে ঝেঁপে। বাসের কারণে আমিও আজকাল রুটিনমাফিক চলি। দুবনায় সব বাস সময় ধরে চলে। তাই আমিও বাসেদের সময় দেখে বাসা বা অফিস থেকে বেরুই।

সত্য কথা বলতে কী, আমি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি সিনিয়র সিটিজেন হওয়া আশীর্বাদ, না অভিশাপ। আশীর্বাদ এই অর্থে যে, বিভিন্ন ধরনের কনসেশন পাওয়া যায়। তবে আমি দোকানে কার্ড দেখাতে সব সময়ই ভুলে যাই। শুধু তাই নয়, মাঝেমধ্যে বাসে ভুল করে সোশ্যাল কার্ডের পরিবর্তে ব্যাংক কার্ড পাঞ্চ করি। ব্যাংক থেকে এসএমএস এলে বুঝি ভুল হয়ে গেছে। অন্যদিকে, আগে বাসের জন্য অপেক্ষা করতাম না। যখন খুশি বেরিয়ে পড়তাম। এখন নিজের জীবনকে বাসের টাইম টেবিলের সাথে এক সুতোয় বেঁধে ফেলি। কিছু কিছু কলিগ একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বাসে অফিস যায়। শুধু ওদের সাথে যাওয়ার জন্য আমিও ওসব বাসেই যাই। এটাও নিজের স্বাধীনতার সাথে কম্প্রোমাইজ। তবে আগে যদি বাসে মেট্রোয় বসে যেতে একটু অস্বস্তি অনুভব করতাম, বিশেষ করে খুব ক্লান্ত থাকলে বা হাতে ভারী কিছু থাকলে যখন বয়স্ক কাউকে সিট ছেড়ে দিতে অসুবিধা হত, এখন নিজের বয়সের যোগ্যতা (বয়সের আবার যোগ্যতা হয় সেটা জানা ছিল না) বলে নিশ্চিন্ত মনে বসে থাকতে পারি। তবে সিনিয়র হলে শুধু জীবনের অভিজ্ঞতাই বাড়ে না, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সময়টা আনুপাতিক হারে কমে যায়।

চিত্র: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + 15 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শতবর্ষী বাঙালি

বাঙালিদের মধ্যেও শতায়ু লোক নেহাত কম নেই। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আয়ু নিয়ে বিশেষ কোনও গবেষণা থাকে না। আবার একটু বেশি বয়স্ক মানুষকে শতায়ু বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ-ও রয়েছে। তবে শতবর্ষের আয়ুলাভ যে মানুষের কাঙ্ক্ষিত, তা উপনিষদের‌ একটি বাক্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে— ‘জীবেম শরদঃ শতম্’, অর্থাৎ শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছে করবে। কেবল অলস জীবন নিয়ে বাঁচবার ইচ্ছে করলেই হবে না, কর্ম করে বাঁচার কথাও বলা হয়েছে সেখানে— ‘কুর্বেন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতম্ সমাঃ’।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »