Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

শতবর্ষে মহানায়ক উত্তমকুমার

উত্তমকুমার আজ শতবর্ষে পড়লেন। ১৯২৬-এর এই দিনে কলকাতায় তাঁর জন্ম, আর ১৯৮০-র ২৪-এ জুলাই এই শহরেই তাঁর প্রয়াণ। মাত্র চুয়ান্ন বছরের আয়ু ছিল তাঁর। প্রধানত চলচ্চিত্রাভিনেতা হলেও প্রথম যৌবনে ব্যবসায়িক মঞ্চে ‘শ্যামলী’ নাটকে মুখ্যচরিত্রেও পেয়েছি তাঁকে। তাঁর বিপরীতে ছিলেন বাংলার অন্যতম বিখ্যাত অভিনেত্রী কাবেরী বসু। উল্লেখ্য, ‘শ্যামলী’ ছবিও হয়েছিল এই দুজনকে নায়ক-নায়িকা করে।
উত্তমকুমারকে ‘মহানায়ক’ শিরোপা দিয়েছেন তাঁর অনুরাগী শ্রোতা-ভক্তেরা। এটি কিন্তু গতানুগতিক বা মামুলি কোনও উপাধি নয়। এই অভিধা অর্জনের যোগ্যতা তাঁর ছিল ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা। কীরকম? কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
প্রথমত, তিনি গোড়া থেকেই ছিলেন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য চূড়ান্ত প্রত্যয়ী আর যত্নশীল। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে সাঁতার শেখা, ব্যায়ামচর্চা, ধ্রুপদী সঙ্গীতশিক্ষা, ছাত্রবয়স থেকেই স্কুলে ও বিদ্যালয়ে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছিলেন তিনি।
দ্বিতীয়ত, অটুট মনোবল ছিল তাঁর। গোড়ার দিকে তাঁর অভিনীত একের পর এক ছবি মার খায়, কম করে সাতটি। তবুও পণ ছিল তাঁর, শেষ পুরস্কার অর্জন করবেন-ই। এবং তার সুফল পেয়েছিলেন তিনি অবশেষে।
তৃতীয়ত, কেরিয়ারের প্রথম থেকেই তিনি নিজেকে ক্রমশ তৈরি করে নিয়েছিলেন আরও আরও ভাল অভিনয়ক্ষমতা অর্জনের। সেজন্য দেখা যাবে, তাঁর প্রথম দিককার অভিনয়ের সঙ্গে পরবর্তীকালের অভিনয়ের মানের কী অসীম পার্থক্য। যে উত্তমকুমার ‘বসু পরিবার’ এবং ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ বা ‘বড়দিদি’-তে অভিনয় করেন, তার সঙ্গে ‘এন্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘সপ্তপদী’, বা ‘নায়ক’-এর তফাৎ প্রায় আকাশচুম্বী।
চতুর্থত, এটা বলা হয়ে থাকে যে, সুচিত্রা সেনকে নায়িকা হিশেবে পেয়ে তাঁর অভিনয়ক্ষমতা উত্তুঙ্গস্পর্শী হতে পেরেছিল। কথাটি আংশিক সত্য হলেও পুরোটা নয়। কেন, না ‘শঙ্খবেলা’-য় মাধবী, চৌরঙ্গী’ ও ‘রাজদ্রোহী’ ছবিতে অঞ্জনা ভৌমিক, ‘জতুগৃহ’ এবং ‘বিচারক’-এ অরুন্ধতী, শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে ‘অমানুষ’, ‘দেয়া-নেয়া’-তে তনুজা, ‘বহ্নিশিখা’-য় অলিভিয়া, এমনকি তাঁর চেয়ে অনেক ছোট অপর্ণা-সুমিত্রা-আরতির সঙ্গে জুটি বেঁধেও যেসব ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি, তাতে-ও রোমান্টিকতা-ম্যাচোয়িজমে তিনি কম যাননি। এবং এটাও মনে রাখা দরকার, সুচিত্রার সঙ্গে তিরিশটি ছবিতে অভিনয় করা উত্তম সুপ্রিয়ার সঙ্গেই কিন্তু সবচেয়ে বেশি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় নেমেছিলেন,– তেত্রিশটি!
পঞ্চমত, ছবির জন্য যখন যে বিদ্যা আয়ত্ত করা দরকার, কঠোর মনোযোগ দিয়ে তিনি তা করতেন। ‘ঝিন্দের বন্দী’ করার সময় ফেন্সিং বা তরবারি চালনা শিখে নিয়েছেন যেমন, তেমনই যখন দেখলেন, আদালতে উকিলের ভূমিকায় অভিনয় করতে গেলে সাবলীলভাবে ইংরেজি বলার গুরুত্ব সমধিক, তিনি আর এক অভিনেতা এবং ইংরেজি ভাষা ও উচ্চারণে পারদর্শী এন. বিশ্বনাথনের কাছে গিয়ে তা শিখে নিলেন, অত বড় এক অভিনেতা, অথচ সঙ্কোচহীনভাবে!
ষষ্ঠত, নিজের অভিনয়কে জোরদার করতে যে তিনি হলিউডের ছবি নিয়মিত দেখতেন, তা সত্যজিৎ রায়ের চোখ এড়ায়নি। অকপটে স্বীকারও করেছেন সত্যজিৎ। আর কেবল হলিউড-ই নয়, পাহাড়ী সান্যাল, ছবি বিশ্বাসের অভিনয়কুশলতাকেও যে তিনি আত্মীকৃত করতেন, উত্তম তা নিজমুখে স্বীকার করে গিয়েছেন।
সপ্তমত, তিনি যে রবীন্দ্রনাথ,শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্করের কাহিনি-নির্ভর ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি শংকর, গৌরকিশোর ঘোষ, বিমল কর বা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনিতেও রূপদান করেছেন, মাত্রাজ্ঞান বজায় রেখে, তা এক বিস্ময়। কোথায় রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ আর শরৎচন্দ্রের ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, আর কোথায় ‘যদুবংশ’-এর গনাদা! এই বৈচিত্র্য আর অভিনয় কুশলতার প্রসারতা বাংলা সিনেমা তো বটেই, ভারতীয় বা এমনকি বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও দুর্লভ, সুদুর্লভ।
অষ্টমত, তিনি একদিকে যেমন গুরুগম্ভীর নায়ক, অন্যদিকে সেরা কমেডিয়ান। বাংলা ছায়াছবিতে কৌতুকাভিনেতার অভাব নেই,– হরিধন, ভানু, জহর, রবি ঘোষ, নৃপতি, সন্তোষ দত্ত, পরবর্তীকালের আরও বহু। কিন্তু স্রেফ কমেডি চরিত্রে, কী ‘ভ্রান্তিবিলাস’, কী ‘দেয়া-নেয়া’, আর কী-ই ‘মৌচাক’, ‘ব্রজবুলি’ বা ‘ধন্যি মেয়ে’, উত্তম এককথায় তুলনারহিত।
সবশেষে তাঁর অভিনীত বিখ্যাত মানুষদের ভূমিকা। খুব বেশি ও অসাধারণ মনীষীর চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাননি তিনি, যেমন পেয়েছেন পাহাড়ী সান্যাল (বিদ্যাসাগর), অনিল চট্টোপাধ্যায় (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন), বসন্ত চৌধুরী (রাজা রামমোহন)। কিন্তু যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন এন্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রা বা বরাহ চরিত্রে,(খনাবরাহ), তিনি তাঁর পরিপূর্ণ মেধা ব্যয় করেছেন সেইসব চরিত্রকে বাস্তবানুগ করে তুলতে। এজন্যই তিনি মহানায়ক।
‘মহা’ শব্দটি মহান আর বিশাল, এই দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন ‘মহাকাব্য’ বা ‘মহারাজ’। কাব্য আর রাজার চেয়ে তার মাত্রা ভিন্ন, মহিমা অনেক বেশি তাৎপর্যময়। উত্তম বাংলা চলচ্চিত্রের সেই তাৎপর্যময়তার একমাত্র উদাহরণ। যাঁকে শ্রদ্ধাভরে আমরা ‘কিংবদন্তি’-ও বলে থাকি। তাই সত্যজিৎ রায়ের মতো আরেক কিংবদন্তি তাঁকে নিয়ে চিত্রনাট্য লেখেন, ছবি বানান, আর সে ছবির ‘নায়ক’ হন উত্তমকুমার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + eighteen =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »