Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রম্যরচনা: চিরশ্রী বিশী চক্রবর্তী

বঙ্গভাষা জননী

অকস্মাৎ দিবাস্বপ্নে “বঙ্গভাষা জননী” আবির্ভূতা হইলেন। অবিন্যস্ত কেশ, ক্লিন্ন বেশবাস, বিষণ্ণ বদনে অশ্রুচিহ্ন। গলদশ্রু মাতা কহিলেন, “বৎস, আজিকে দেশান্তরী হইবার লগ্ন আসন্ন। দীর্ঘ দিনের স্থায়ী সম্মানের আবাস পরিত্যাগ করিতে…”, বলিতে বলিতে তাহার কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হইয়া গেল।

স্তম্ভিত বিস্ময়ে জিজ্ঞাসিলেম, “মাতা, কেন এত মতিভ্রম তব? কী করিয়াছি এ অধম সাহিত্য-সেবক মোরা? যুগযুগান্তর হইতে এই প্রদেশের ঘরে ঘরে অবহিতভাবে তোমার আরাধনা চলিয়াছে। দীর্ঘ শতকের অবসানে ম্লেচ্ছভাষাও তোমার অঙ্গে কালিমা লিপ্ত করিতে পারে নাই। তবে কেন এ বিভ্রম?”

মাতা কহিলেন, “তবে শুনো বৎস, গোমুখের উৎস হইতে যেমন পবিত্র গঙ্গানদীর প্রবাহ ভারতকে ফল, ফসল ও পুণ্যদান করিতে আসিয়াছে, তেমনই পবিত্র দেবভাষা হইতে এই বঙ্গভাষা, মাগধী রূপ হইয়া বিবিধ ভাষারূপের সংমিশ্রণে গৌড়ীয় বঙ্গভাষার বর্তমান রূপ ধারণ করিয়াছে। এই বঙ্গভাষার গৌরবের ইতিহাস সহস্রাধিক বর্ষের”…! তিনি একটি সুদীর্ঘ শ্বাস ফেলিলেন, “কিন্তু বর্তমানে এই ভাষা অশিক্ষা, অবজ্ঞা ও অপরিশীলিত জিহ্বার অসংযত উচ্চারণ– পবিত্র ভাষাটিকে যেভাবে কলঙ্কিত করিতেছে, তাহা আমার পক্ষে সহনাতীত। এইবার বিদায় দাও বৎস!”

তাহার পদতলে বসিয়া কাঁদিয়া কহিলাম, “মাতঃ, জ্ঞানতঃ আমরা এই জাতীয় ভ্রান্তি কদাপি করি নাই। (বর্হিবঙ্গে) আমরা সদাই তোমার পদতলে শুদ্ধভাবে সাধনা করিয়াছি। তথাপি যদি কোনও ভ্রান্তি ঘটে মাতা, ক্ষম নিজগুণে!”

সস্নেহে শিরস্পর্শ করিয়া মাতা কহিলেন, “মাত্র এই ভরসাতেই এতকাল বাস করিয়াছি বৎস। পরন্তু, ভাষার প্রাণকেন্দ্র যে স্থল, সে স্থলে যে প্রাণঘাতী অনাচার চলিয়াছে, তাহা সহ্য করিবার সাধ্য অথবা শক্তি আমার নাই। ভরকেন্দ্র যদি বিচলিত হয়– তবে আমার স্থান কোথায়?”

আমার প্রশ্নচিহ্ন-চিহ্নিত কাতর মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া– মাতা ব্যাখ্যা কহিলেন, “অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও জুগুপ্সা যেখানে রথী, আত্মম্ভরিতা যাহার রথ, উৎকোচ ও লালসা যাহার রথের অশ্বদ্বয় এবং সেই রথের রশি টানিতেছে তথাকথিত জ্ঞানী, গুণী, শিল্পী ইত্যাদি। সেই রথচক্রে নিষ্পেষিত হইতেছে অগণিত প্রকৃত পবিত্র আত্মা! সেই অপবিত্র ভূমিতে পবিত্র মাতৃভাষার কোনও স্থান নাই।”

পরক্ষণে নিদ্রা টুটিয়া গেল, দেখিলাম, বঙ্কিমচন্দ্রের এক প্রবন্ধ পাঠ করিতেছিলাম। বাহিরে গলদ্ধার বৃষ্টিতে বিষণ্ণ, বিবর্ণ আকাশ, কর্দমিত ভূমি।

আমি কি সত্যই স্বপ্ন দেখিতেছিলাম?

চিত্রণ: বাপ্পাদিত্য জানা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 + 14 =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

চেতনার বিবর্তন ও ঈশ্বরের নৃবিজ্ঞান

মানুষের অজ্ঞানতা ও ভুলের গর্ভেই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল; আর মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার ঐতিহাসিক অগ্রগতিই একদিন ঈশ্বরের কবরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। জ্ঞানতাত্ত্বিক আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে বিনাশ করবে অলৌকিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা, আর সম্পদের সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদ (Communism) বিলুপ্ত করবে প্রাচীন টোটেমীয় কুসংস্কারকে। একদিন ধর্মের এই অন্ধ খোলস ভেদ করে স্থান করে নেবে উচ্চতর গণিত, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত মানবিক কর্তব্যবোধ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »