Search
Generic filters
Search
Generic filters

সুজিত বসুর কবিতাগুচ্ছ

ব্যাপ্ত হয় সারা অঙ্গে

মুখের উপরে তবু কেবলই সশব্দে ঘোরে একটি নীল মাছি
বেঁচে আছি আজও বেঁচে আছি
এইসব অনুভূতি ম্লান হয়, হতে হতে শব্দচূর্ণ ঝরে
তোমার আমার মুখে নিঝুম মর্মরে
অথবা এমনই ব্যস্ত স্তব্ধতা সঞ্চিত ছিল মায়াবী বাক্সোতে
হিমঘন তুষারের স্রোতে
অবশ স্পন্দন দেবে এইভাবে গাঢ় নীল বিষাক্ত মক্ষিকা
সমাধি তুহিন পাত্রে বিষে স্নিগ্ধ শিখা
মৃত্যুর শীতল দিয়ে আলস্যে নির্মম প্রেমে জ্বালো; ধ্বংসবীজ
রোপণে তন্দ্রার মোহ ভেবেছ বিলীন হবে, জানো না কিছুই
কীভাবে ধূসর মৃদু ঘুমের পরিজ
গলে যায় কৃপণের তালু বেয়ে, শনিবার এলে
বন্দি দুই বাহু পদ অঙ্গ দিয়ে মনে হয় ছুঁই
অনেক জমানো কাজ, লুপ্ত হবে সব জানি রবির বিকেলে
কফির হেলানো কাপে, সামান্য সঞ্চয় নীল কুণ্ডলীটুকুও
এভাবে মাছির মতো উড়ে উড়ে ‘দুয়ো’

বলে বলে ঘুরে যায়; বাসে ট্রামে রাস্তাতেও সর্বক্ষণ ঘুম
ব্যাপ্ত হয় সারা অঙ্গে, মাথায় কুয়াশা, পথে নিহত কুসুম।

*

যা হতে পারিনি

যা হতে পারিনি, যা হতে পারি না
যা হবে না কোনোদিন
তাই নিয়ে কত ঈর্ষা হিংসা
ক্ষোভ বিদ্বেষ ঋণ

রেখে চলে যাওয়া, শীতে কেঁপে ওঠা
ভোর ভোর কুয়াশায়
বুকে অভিমান, গলায় আগুন
জ্বর ছমছম গায়

আগুনে পুড়ছে কেউ সে পুড়ুক
আমার কী আসে যায়
আমি পুড়ছি না জ্বর জ্বর গায়ে
অভিমানে বেদনায়!

হতে কি পেরেছি কিছুই কখনো
ছুঁয়েছি রুপোলি মুখ!
নিরুদ্দেশেই যাব, বুকে কাঁটা
ফুটছে, তা সে ফুটুক

*

পাঁচিল

টাকার মধ্যে জমিয়ে রেখেছে তারা
কিছুটা কি অভিমান
বড় স্নেহে তাই তুলে তুলে নেয় লোকে
রুমালেতে মোছে ঘাম
ব্যাংকে লকারে দিয়ে রাখে তাকে চাবি
তার বুঝি করে শীত
ঘাসের শিশির পড়ে থাকে ভিজে ভোরে
রাস্তার কংক্রিট
তারা চেয়ে চেয়ে দেখে মুগ্ধের চোখে
সকলেই অসহায়
মোহরের মেঘ অভিমানে জমে জমে
বৃষ্টি শুধু ঝরায়

আমিও পারিনি ফেরাতে দুচোখ লোভী
তুমিও পারোনি কিছু
দুজনের মাঝে পাঁচিল তুলেছি শুধু
ক্রমশ হয়েছি নিচু

*

বিষাদে আপ্লুত থাকি

যে হাতে ছুঁয়েছি তাকে সেই হাত রক্তকালিমায়
ভরা আজ, যে শরীরে একদিন তাকে আলিঙ্গনে
জড়িয়েছি, শয্যাশায়ী সে শরীর বিনম্র লজ্জায়
চুম্বনে ঝরে না মধু আজ শুধু অকালবোধনে
প্রতি মধ্যরাতে কত জ্বলেছিল স্বপ্নের জোনাকি
কত ভেসেছিল নীল জাহাজেরা সমুদ্রের জলে
নিশীথে সুগন্ধি ধূপ, জল্পনা কল্পনা
সারাদিন সারারাত তার সঙ্গে, সেসব কথা কি
বিস্মরণ ধুলোচাপা, অনেক বলেছি কথা, আর বলব না
সাত সমুদ্রের পারে কুমারীর চোখের কাজলে
কী ছিল কুহক মোহ, সাবানের ফেনিল বুদ্বুদ
কত না রক্তিম হত গোধূলির ম্লান সূর্যালোকে
কবে যেন বিস্ফোরণে ভেঙে গেল, গুলি ও বারুদ
বিষাক্ত করেছে আজ জতুগৃহ, শিরায় শিরায়
শুধু শ্বেতকণিকার পদধ্বনি সুগম্ভীর, শোকে
বিষাদে আপ্লুত থাকি, পরাজিত গ্লানি বেদনায়
ভাঙা জানালার ফাঁকে হিমতুষারের ঝড়, শীত
দিদিমা কেন যে নাম রেখেছিলে আমার সুজিত!

*

নৌকো কবে ভেসে গেছে

কোথাও কেমনভাবে স্বর্ণরেণু কুহেলির মতো
স্তূপময় জমেছিল, জলধারা বর্ষাকণা মেঘময়তার
প্রান্তে এসে পড়ে থাকে, ওই তার স্তনচূড়ো, যেন ক্ষয় তার
ধূম হয়ে ঝরে পড়ে, ঝরোঝরো নম্র অবনত
ভারে ভারে ভরে থাকা এ মেদুর পরাবৃত্ত গোল বৃত্তাকার
ফলানো ছুরির নিচে ফুলে থাকে, যেন তার কত
আদরে আদুর হয়ে ভরে থাকা, ভরে থাকা কোমল সংখ্যার
শঙ্খধ্বনি বেজেছিল, কোমল লাবণ্য গন্ধ আলোর সন্তত
এভাবে বঙ্কিম হয়ে অস্পষ্ট আভাস হয়, কোমল পাতার
নৌকো কবে ভেসে গেছে মায়ার কুয়াশাপুরে চূর্ণ পরাহত।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

3 Responses

  1. অসাধারণ এই গুচ্ছ কবিতা। সুজিত বসুর কবিতা আমাদের প্রাণিত করেছে সাতের-আটের দশকে। দেশ পত্রিকা সহ সেসময় সব নামী পত্র পত্রিকায় সুজিত বসুর কবিতা পড়তাম। মাঝে হাতে এসেছে দুটি কাব্যগ্রন্থ; কিন্তু কবি যেন হঠাৎ নিখোঁজ। আবার এখানে সেখানে দেখছি তাঁর কবিতা। গত বছর শারদীয় কবি সম্মেলন সহ বিভিন্ন শারদ সংখ্যায় অসাধারণ সব কবিতা পড়েছি। ভালোভাষাকে ধন্যবাদ, এই কবিতাগুচ্ছ পাঠকদের উপহার দেবার জন্য।

  2. কবি সুজিত বসুর কবিতাগুচ্ছ অসাধারন। এই কবিতাগুচ্ছ এর ছন্দে ও আবেগে পরিপূর্ণ অর্থপূর্ন প্রতিটি কবিতা পড়ে খুবই ভালো লাগলো। কবির এই কবিতাগুচ্ছ পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ভালোবাসা কে অশেষ ধন্যবাদ। আশাকরি আগামীতেও কবি সুজিত বসুর লেখা সুন্দর সুন্দর কবিতা আমাদের উপহার দেবেন।

  3. কবি সুজিত বোস আত্মাকে আলোড়িত করে এমন কবিতা লিখেছেন। কবিতাগুলো পড়তে খুব ভালো লাগে। আরো কবিতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 + 15 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »