দেশান্তরে মনোবেদনা
স্বর্ণকেশী রাজকুমারী পাশের সিটে ঘুমে
রূপকুমারী বিমানবালা চোখে ধরায় নেশা
প্রথম প্লেনে চড়ার সেই স্মৃতিমেদুর দিনে
মাদল মনে, শিউরে ওঠা বুকে অশ্বহ্রেষা
যেতেই হবে বরফজমা দূরের দেশান্তরে
শিখতে হবে অন্য ভাষা, অন্য রীতিনীতি
পাতালরেলে চড়ার মতো নতুন কিছু ঘটা
সোনা তো নয়, আনতে যাব সোনায় মোড়া স্মৃতি
অতীতে সেই দূরের দেশে ঘটল অনেক কিছু
জটিল কিছু সমীকরণ নিয়েই আঁকিবুঁকি
খুচরো প্রেমে জড়িয়ে পড়া, তীব্র দহনজ্বালা
অর্থ আনে মদির নেশা, শেখায় নিতে ঝুঁকি
গভীর ভালবাসাও ছিল অধীর অপেক্ষাতে
একদিন সে নিকট হয়ে তিরের মতো বেঁধে
শুধুই পরে ভাসতে থাকা, ভেসেই চলা স্রোতে
শেষটা যেমন হওয়ার কথা, তাই হল বিচ্ছেদে
যেভাবে বিষ জেনেও তাকে সবাই করে পান
আমিও করি শ্রান্ত পায়ে, দলি ফুলের কলি
হোক বেদনা, তবুও মধুর স্মৃতির সেই ঘ্রাণ
অন্ধকারে প্রদীপ হয়ে জ্বলুক মনে অলি।
**
মনের লকারে অলি
নাচের আসরে উজ্জ্বল আলো জ্বলেছিল সেই রাতে
যুবতীকে নাচে ডাকার সাহস আসেনি তখনও বুকে
অনির্দেশ্য চলাফেরা করি মস্কোর রাস্তাতে
অপরিচয়ের জড়তা কাটিয়ে নারীদের সম্মুখে
নিজেকে জাহির করার তখন ছিল না তো প্রবণতা
নারীশরীরকে কোনো কৌশলে চেনার দুরভিসন্ধি
ছিল না, তখন কল্পনাতেই প্রিয়ার সঙ্গে কথা
প্রথম রিপুর প্রলোভনে আমি হইনি তখনও বন্দি
ভীত কুণ্ঠিত দাঁড়িয়েছিলাম একান্তে নির্জনে
হঠাৎ নতুন নাচের নিয়মে যুবতীরা ডাকাডাকি
করে ধীরে ধীরে, আমাকে যে কেউ ডাকবে সেকথা মনে
আসেনি, তবুও ডানা ঝাপটাল মৃদু সুরে সুখপাখি
অঘটন বুঝি আজও ঘটে, আর ঘটেছিল সেই রাতে
বনহরিণীর ডাক শুনে আমি চকিতেই দিই সাড়া
ওলিয়া নামের অলি ডেকেছিল নির্ভুল ইশারাতে
প্লাবনে ধ্বস্ত নৌকোয় আমি কম্পিত দিশাহারা
পরে বাসে আর মেট্রোতে চড়ে বহু দিগন্ত পার
হয়েছি দু’জনে, অলির ওভারকোটের বোতাম খুলে
চঞ্চল দুটি পায়রার খোঁজে আবিষ্ট বারবার
পৃথিবী সূর্য প্রদক্ষিণের কথা গিয়েছিল ভুলে
চারিদিকে শুধু তুষারের স্তূপ, শরীর অসাড় হিমে
তবুও অলির শরীরে তখনও সঞ্চিত উষ্ণতা
আমরা মজেছি কখনো বিয়ারে, কখনো আইসক্রিমে
ভালবাসা হয়ে নদী বয়ে যেত শরীরে খরস্রোতা
সেই দিনগুলি ধূসর অতীতে, রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি
মনের লকারে অলিকে রেখেছি, তারই এই বিবৃতি।
*
বৃষ্টিতে অজন্তা ইলোরা
সাতটি আশ্চর্য আছে পৃথিবীতে সবাই তা জানে
আমাদের দেশে আছে একটি স্মৃতির সৌধ সেই তালিকায়
চাঁদনি রাতের এক রুপোলি জ্যোৎস্নার সাজে সেই মোহিনীকে
দেখার সৌভাগ্য আজও স্মৃতি হয়ে মনকে ভরায়
বাকিরা বিদেশে তাই ইন্টারনেটে শুধু সীমিত আলাপ
পকেটে শূন্যতা বলে ওইটুকু পরিচয় নিয়ে সুখে থাকো
একটিও আশ্চর্যকে স্বচক্ষে না দেখে সুখে অনেক মানুষ
সীমার মধ্যেই রাখো ছোট সুখ, পেরিয়ো না স্বপ্ন দিয়ে তৈরি করা সাঁকো
সাতটি আশ্চর্য নয় দেখতে চেয়েছি শুধু গুহাচিত্রে ধরা দৃশ্যাবলি
তাও তো হল না দেখা, অপরূপ সে আশ্চর্য আজও নিরালায়
তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত
রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা
আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর
কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি
তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়
ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি
অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা
তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।
চিত্রণ: মনিকা সাহা





