Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

দেশান্তরে মনোবেদনা

স্বর্ণকেশী রাজকুমারী পাশের সিটে ঘুমে
রূপকুমারী বিমানবালা চোখে ধরায় নেশা
প্রথম প্লেনে চড়ার সেই স্মৃতিমেদুর দিনে
মাদল মনে, শিউরে ওঠা বুকে অশ্বহ্রেষা

যেতেই হবে বরফজমা দূরের দেশান্তরে
শিখতে হবে অন‍্য ভাষা, অন‍্য রীতিনীতি
পাতালরেলে চড়ার মতো নতুন কিছু ঘটা
সোনা তো নয়, আনতে যাব সোনায় মোড়া স্মৃতি

অতীতে সেই দূরের দেশে ঘটল অনেক কিছু
জটিল কিছু সমীকরণ নিয়েই আঁকিবুঁকি
খুচরো প্রেমে জড়িয়ে পড়া, তীব্র দহনজ্বালা
অর্থ আনে মদির নেশা, শেখায় নিতে ঝুঁকি

গভীর ভালবাসাও ছিল অধীর অপেক্ষাতে
একদিন সে নিকট হয়ে তিরের মতো বেঁধে
শুধুই পরে ভাসতে থাকা, ভেসেই চলা স্রোতে
শেষটা যেমন হওয়ার কথা, তাই হল বিচ্ছেদে

যেভাবে বিষ জেনেও তাকে সবাই করে পান
আমিও করি শ্রান্ত পায়ে, দলি ফুলের কলি
হোক বেদনা, তবুও মধুর স্মৃতির সেই ঘ্রাণ
অন্ধকারে প্রদীপ হয়ে জ্বলুক মনে অলি।

**

মনের লকারে অলি

নাচের আসরে উজ্জ্বল আলো জ্বলেছিল সেই রাতে
যুবতীকে নাচে ডাকার সাহস আসেনি তখনও বুকে
অনির্দেশ্য চলাফেরা করি মস্কোর রাস্তাতে
অপরিচয়ের জড়তা কাটিয়ে নারীদের সম্মুখে
নিজেকে জাহির করার তখন ছিল না তো প্রবণতা
নারীশরীরকে কোনো কৌশলে চেনার দুরভিসন্ধি
ছিল না, তখন কল্পনাতেই প্রিয়ার সঙ্গে কথা
প্রথম রিপুর প্রলোভনে আমি হইনি তখনও বন্দি
ভীত কুণ্ঠিত দাঁড়িয়েছিলাম একান্তে নির্জনে
হঠাৎ নতুন নাচের নিয়মে যুবতীরা ডাকাডাকি
করে ধীরে ধীরে, আমাকে যে কেউ ডাকবে সেকথা মনে
আসেনি, তবুও ডানা ঝাপটাল মৃদু সুরে সুখপাখি
অঘটন বুঝি আজও ঘটে, আর ঘটেছিল সেই রাতে
বনহরিণীর ডাক শুনে আমি চকিতেই দিই সাড়া
ওলিয়া নামের অলি ডেকেছিল নির্ভুল ইশারাতে
প্লাবনে ধ্বস্ত নৌকোয় আমি কম্পিত দিশাহারা
পরে বাসে আর মেট্রোতে চড়ে বহু দিগন্ত পার
হয়েছি দু’জনে, অলির ওভারকোটের বোতাম খুলে
চঞ্চল দুটি পায়রার খোঁজে আবিষ্ট বারবার
পৃথিবী সূর্য প্রদক্ষিণের কথা গিয়েছিল ভুলে
চারিদিকে শুধু তুষারের স্তূপ, শরীর অসাড় হিমে
তবুও অলির শরীরে তখনও সঞ্চিত উষ্ণতা
আমরা মজেছি কখনো বিয়ারে, কখনো আইসক্রিমে
ভালবাসা হয়ে নদী বয়ে যেত শরীরে খরস্রোতা
সেই দিনগুলি ধূসর অতীতে, রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি
মনের লকারে অলিকে রেখেছি, তারই এই বিবৃতি।

*

বৃষ্টিতে অজন্তা ইলোরা

সাতটি আশ্চর্য আছে পৃথিবীতে সবাই তা জানে
আমাদের দেশে আছে একটি স্মৃতির সৌধ সেই তালিকায়
চাঁদনি রাতের এক রুপোলি জ্যোৎস্নার সাজে সেই মোহিনীকে
দেখার সৌভাগ‍্য আজও স্মৃতি হয়ে মনকে ভরায়
বাকিরা বিদেশে তাই ইন্টারনেটে শুধু সীমিত আলাপ
পকেটে শূন্যতা বলে ওইটুকু পরিচয় নিয়ে সুখে থাকো
একটিও আশ্চর্যকে স্বচক্ষে না দেখে সুখে অনেক মানুষ
সীমার মধ্যেই রাখো ছোট সুখ, পেরিয়ো না স্বপ্ন দিয়ে তৈরি করা সাঁকো
সাতটি আশ্চর্য নয় দেখতে চেয়েছি শুধু গুহাচিত্রে ধরা দৃশ‍্যাবলি
তাও তো হল না দেখা, অপরূপ সে আশ্চর্য আজও নিরালায়
তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত
রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা
আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর
কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি
তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়
ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি
অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা
তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

চিত্রণ: মনিকা সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + twelve =

Recent Posts

সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহাশ্বেতা দেবী: স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

Read More »