বিজ্ঞান প্রসার (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর, ভারত সরকার) এবং জগদীশচন্দ্র বসু জাতীয় বিজ্ঞান মেধা অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান, কলকাতা (উচ্চশিক্ষা দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার)-এর যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে একটি ওয়েবিনার আয়োজিত হয়৷ ৫ জুন, ২০২০-র এই অনুষ্ঠানটির মূল শিরোনাম ছিল ‘Survival of civilization: our task for environment’৷ এই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য পরিবেশন করেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট বিজ্ঞান-লেখক ড. শ্যামল চক্রবর্তী৷
অধ্যাপক চক্রবর্তী বলেন, রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোম শহরে ১২-দিন ব্যাপী সম্মেলনে ২০০টি দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা সমাবেত হয়ে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে পৃথিবীকে কেমনভাবে বাঁচানো যাবে— এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন৷ এইটি ছিল পৃথিবীর সর্বপ্রথম পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন৷ ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে একটি কেন্দ্রীয় বার্তাকে মাথায় রেখে পৃথিবীব্যাপী বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হচ্ছে৷ বলার অপেক্ষা রাখে না ২০২০ সালে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সংকটের মধ্যে দিয়ে পরিবেশ দিবস উদযাপিত হচ্ছে৷
অধ্যাপক চক্রবর্তী পরিবেশ দিবস উদযাপন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রসংঘের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘোষণা, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের কথা, ২০২০ সালে পূর্ব আফ্রিকা জুড়ে পঙ্গপালের আক্রমণ, অস্ট্রেলিয়ার দাবানল, ব্রাজিলের আমাজন অরণ্যে আগুন লাগা, কোভিড-১৯ নামক ভয়ংকর মহামারী, পশ্চিমবঙ্গে বর্ষার শুরুতে আমফান ঝড়ের আক্রমণ, দক্ষিণ ভারতে ‘নিসর্গ’ সাইক্লোন আছড়ে পড়া— ঘটনাগুলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন৷
বিশ্বব্রম্ভাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে আজ থেকে ১৫০০ কোটি বছর আগে; ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, স্তন্যপায়ী, জলচর, উভচর, সরীসৃপ জীবন পার হয়ে এসেছে মানুষ Homo sapiens sapiens৷ ডারউইনের বিবর্তনতত্ব প্রতিস্থাপিত হয়েছে, পৃথিবীতে জীবনের আবির্ভাব ঘটেছে এবং বিবর্তনের সবচেয়ে শেষে এসেছে মানুষ৷ গাছপালা, অণুজীব, কেঁচো ও অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকবার জন্য মানুষের প্রয়োজন হয়নি কিন্তু মানবসভ্যতা অক্ষুন্ন রাখতে, আমাদের বেঁচে থাকবার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ সম্পদের সঙ্গে সহযোগিতা তৈরি করতেই হবে৷ ২০২০ সালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল ভাবনা ছিল Celebrate biodiversity অর্থাৎ জীববৈচিত্র্য উদযাপন, তার যত্ন ও সংরক্ষণ৷ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত ভাবনায় প্রাকৃতিক জীবসম্পদকে কাজে লাগিয়েছি, প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উপযুক্ত সম্পদে পরিণত করে তার আমরা নিত্যদিনে প্রয়োগ ঘটিয়েছি৷ অধ্যাপক চক্রবর্তী ছোট স্কুলপড়ুয়াদের কাছে পরিবেশরক্ষার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন৷
উত্তরের ও দক্ষিণের পৃথিবী প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জীববৈচিত্র্য ভাণ্ডার (বৈচিত্র্যময়তা) ও মানুষের জীবনযাত্রা দুই ক্ষেত্রে একই প্রকার নয়৷ মানুষের বেঁচে থাকবার জন্য চাই খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান৷ জীবনযাত্রার মান রক্ষার্থে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীববৈচিত্র্যকে কাজে লাগায় মানুষ৷ উত্তরের পৃথিবী অর্থাৎ প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে জীবনযাত্রার মান অনেক বেশি সমৃদ্ধ কিন্তু জীববৈচিত্র্য ভাণ্ডার বা মোট কতগুলি প্রজাতির গাছ, মাছ এবং অন্যান্য প্রাণী রয়েছে (তার গাণিতিক সংখ্যা)— এই বিষয়ে উত্তরের পৃথিবী কিন্তু সমৃদ্ধ নয়৷ উত্তরের পৃথিবীতে জীবনযাত্রার মান উন্নততর কিন্তু জীববৈচিত্র্যে তা দরিদ্র৷ তুলনামূলকভাবে দক্ষিণের পৃথিবী অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে জীবনযাত্রা খুব স্বচ্ছন্দ নয় কিন্তু জীববৈচিত্র্যে তা অনেক বেশি সমৃদ্ধ৷ এককথায় গরিব দেশগুলির জীববৈচিত্র্য বেশি৷ সেই কারণে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রস্তাবনা তৈরির প্রসঙ্গ আসলে উত্তরের ও দক্ষিণের পৃথিবীর দেশগুলি একে অপরকে সায় দিতে পারে না এবং মতপার্থক্য তৈরি হয়৷
পৃথিবীতে মানুষ যেইদিন থেকে এসেছে, সেইদিন থেকেই ক্রমাগত অত্যাধিক শোষণের ফলে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতে শুরু হয়েছে৷ রাষ্ট্রসংঘ ২০১১-২০২০ এই দশকটিকে জীববৈচিত্র্য দশক বা Decade of biodiversity ঘোষণা করেছে৷ ওজনস্তরে ফাটল ধরা, বিশ্বব্যাপী ভূ-উষ্ণায়ণ, কীটনাশকের প্রভাব, শব্দদূষণ— সবকিছুর কবলে আজ পৃথিবী৷ ১৯৮৮ সালে তৈরি হয় Intergovernmental Panel on Climate Change এবং ১৯৯০ সালে সর্বপ্রথম পৃথিবীতে প্রকৃতি নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছিল, এখন পর্যন্ত পাঁচটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে (প্রতি পাঁচ বছরে একটি) এবং বর্ণিত হয়েছে পরিবেশ ধ্বংসের বহুমাত্রিক চেহারা৷ পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের চেহারা কেমন এবং তাকে রক্ষা করতে গেলে কী করতে হবে, এই নিয়ে ২০১৯ সালের ৬ মে রাষ্ট্রসংঘ-এর জীববৈচিত্র্য সম্পর্কিত সংস্থা থেকে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যার নাম Global Assessment Report on Biodiversity and Ecosystem Services৷ আমরা আজ বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে, চিন্তাভাবনা ও নতুনতর গবেষণা প্রয়োজন৷
বায়োমাস বা জীবনভর-এর প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক চক্রবর্তী বলেন, শতকরা ৮২ শতাংশ বন্য-স্তন্যপায়ী জীবনভর চিরকালের জন্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছে৷ আরও ধ্বংস হয়ে গেছে ৪২ শতাংশ উভচর জীবনভর, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী, এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক প্রবাল, শতকরা ১০ শতাংশ কীটপতঙ্গ পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেছে, যেইগুলি প্রকৃতিতে পরাগ সংযোগে (এবং পরোক্ষভাবে খাদ্যফসল উৎপাদনে) সহায়তা করত৷ ফলস্বরূপ বর্তমান সময়ে কৃষি উৎপাদন কমে এসেছে এবং খাদ্য সংকট বেড়েছে৷ এছাড়া বর্তমান সময়ে কীটপতঙ্গদের উপযুক্ত ভৌগোলিক অবস্থানেরও অভাব ঘটেছে৷ বহু হিতকারী আণুবীক্ষণিক প্রজাতি বিলীন হয়েছে৷
সাধারণত বিষুবরেখা বরাবর সমুদ্রে জলের তাপমাত্রা বেশি হয় এবং এই সকল অঞ্চলে (অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যেমন আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া) উত্তরের পৃথিবীর তুলনায় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও বেশি হয়৷ আমরা সঙ্কটজনক অবস্থায় পৌঁছেছি, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের চেহারাকে অক্ষুন্ন রাখতে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে৷
২০২০ সালটি ছিল রাষ্ট্রসংঘ UNESCO ঘোষিত জীববৈচিত্র্য দশকের সর্বশেষ বছর৷ আগামী ২০২১-২০৩০ দশকটির নামকরণ হয়েছে Decade for ecosystem restoration and reformation অর্থাৎ বাস্তুতন্ত্রের পুনর্নির্মাণ তথা জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস হওয়াকে আটকানো ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা করা৷ এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন হল Change in land and sea use৷ জীবনের সেই পাঁচটি উপাদান যথা খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানকে সুরক্ষিত করতে অসংখ্য বন্যপ্রাণের ওপর আমরা হস্তক্ষেপ করেছি, নির্বিচারে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে৷ আরও ধ্বংস হয়েছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল৷ শুধুমাত্র সুন্দরবন অঞ্চলে নয়, ম্যানগ্রোভ সকল মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে এমনকি যারা শহর, শহরতলি ও নগরে বাস করেন৷ মোহনা এবং জোয়ারভাটা প্রভাবিত আধা-নোনা নদীর নিম্নাভিমুখ অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ রোধ করেছে ভূমিক্ষয়৷
অধ্যাপক চক্রবর্তী বলেন, সমুদ্র ও তৎসম্বন্ধীয় জীবসম্পদকে আমরা নির্বিচারে ব্যবহার করতে পারব না৷ বহু স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত উপকূলবর্তী মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রা নির্ভর করে সামুদ্রিক অর্থনৈতিক-গুরুত্বসম্পন্ন মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য প্রাণীসম্পদের ওপর৷ স্থিতিশীল উৎপাদন, মাছের প্রজননঋতু এবং সেই সময়ে মৎস্যশিকার-এর মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা, অপরিণত ও অর্ধপরিণত মাছ না ধরা, প্রথমবার প্রজনন-উপযোগী অবস্থায় উপনীত হলে মাছের শারীরিক দৈর্ঘ্য কত হয়— এমন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান পোষণ করেন সামুদ্রিক মৎস্যজীবীরা৷ কিন্তু অনেক সময়েই বিত্তবান অস্থানীয় মৎস্যজীবীরা মাঝসমুদ্রে বড় বড় মাছ ধরবার ভেসেল ব্যবহার করে বাছবিচারহীনভাবে মৎস্যশিকার করেন, যা অবশ্যই ধ্বংসাত্মক৷ এই মানুষগুলির মূল লক্ষ্য মুনাফা৷ অধ্যাপক চক্রবর্তী বিষয়টি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন৷
জলবায়ু বদল হওয়ার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য৷ রাসায়নিক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, হিতকারী অণুজীব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে৷ কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বনসৃজন বা অণুজীবসৃজন করবার সময়ে আমাদের জানতে হবে সেই অঞ্চলে আগে কীরকম উদ্ভিদ ও অণুজীব বৈচিত্র্য বিদ্যমান ছিল৷ কোন ধরনের উদ্ভিদ প্রজাতি লাগালে একটি জায়গা সমৃদ্ধ হতে পারবে, তা বিজ্ঞানীদের থেকে আমাদেরকে জানতে হবে৷ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগরায়নের নাম করে, বৈজ্ঞানিক সূত্র মাথায় না রেখে পৃথিবীব্যাপী জলাভূমি ধ্বংস করা হয়েছে, অনেক বিনোদন সংস্থাকে সাহায্য করা হছে, যা অনুচিত৷ পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ জলাভূমির আজ আর কোনও অস্তিত্ব নেই৷ মানুষের কাছে এই একটাই বাসযোগ্য গ্রহ— পৃথিবী৷ সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ সংকটের মধ্যে বিপদের মুখে দিনযাপন করছে৷ এই বিষয়ে বিশ্ববিখ্যাত চিন্তাবিদ এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি-র ভাষাবিদ্যার এমেরিটাস অধ্যাপক ড. নোয়াম চোমস্কি মতপোষণ করেছেন, পৃথিবীতে পৃথিবীর মানুষের জয়যাত্রারই ইতিহাস, কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রেও মানুষ জয়লাভ করবে কিন্তু চিন্তার বিষয় সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে, ক্রমাগত সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, নিকট ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ৩০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে পৌঁছে যাবে৷ পৃথিবীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে শীর্ষে রয়েছে, কিন্তু কোভিড-১৯ নামক ভয়ংকর মহামারীর আঘাতের হাত থেকে তারা রেহাই পায়নি৷
অধ্যাপক চক্রবর্তী আরও বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে শুধুমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মানুষ এগিয়ে যেতে পারবে না, জীববৈচিত্র্যকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না৷ আমাদের জীবনের মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করা চলবে না৷ নতুন নতুন যানবাহনের উৎপত্তি হওয়ার ফলে কিন্তু বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড-এর পরিমাণ বেড়ে চলেছে৷ উন্নততর পৃথিবীতে মানুষকে আগামীদিনে ব্যক্তিগতভাবে ও সংঘবদ্ধভাবে ভাবনাচিন্তা করে জীববৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে৷