আবার এসেছে শ্রাবণ! এ মাসটি এলেই বাঙালি মাত্রেই বিষাদে অভিভূত হন। এই শ্রাবণ মৃত্যু দেখেছে রবীন্দ্রনাথের। প্রয়াণ দেখেছে কাজী নজরুল ইসলামের। এবং আরও এক স্বনামধন্য বাঙালির,– উত্তমকুমার। তাঁর জন্মদিনের চেয়েও মৃত্যুদিনটিকে অধিকভাবে স্মরণ করা হয়, এ এক আশ্চর্য ব্যাপার। তাছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রজগতে তো কম খ্যাতিমান ব্যক্তির আবির্ভাব হয়নি, সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল, ছবি বিশ্বাস-কানন দেবী-সুচিত্রা-সৌমিত্র, তবু তাঁর মতো, ঠিক তাঁর মতো স্মরণযোগ্য হয়ে রইলেন না কেউ।
শ্রাবণের অনুষঙ্গে নয়, উত্তমকুমারের প্রয়াণদিবসটি চিহ্নিত চব্বিশে জুলাই তারিখটির বিধুরতায়। ১৯৮০-র এই দিনটিতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এই দিকপাল প্রতিভার জীবনাবসান ঘটে। আজ তাঁর মৃত্যুর পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্তিতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে উত্তম সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্যের ডালি মেলে দিলাম।
উত্তমকুমার, আমরা জানি, এমন একজন অভিনেতা, যাঁর নাম কোনও ছায়াছবির সঙ্গে যুক্ত হওয়া মাত্র প্রযোজক-পরিবেশক ঝাঁপিয়ে পড়তেন সে ছবির পেছনে অর্থ লগ্নি করতে। অথচ তাঁকে এমন জনপ্রিয়তা অর্জনের আগে পেরিয়ে আসতে হয়েছিল সাত-সাতটি ছবিতে তাঁর ব্যর্থ হওয়ার পথ। একদিকে নিজের অধ্যবসায়, অন্যদিকে পরিচালক-প্রযোজকদের অপার আনুকূল্যই ‘নায়ক’, ‘সপ্তপদী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘যদুবংশ’-সহ দুই শতাধিক ছবির এই মহানায়ককে জন্ম দিয়েছে।
উত্তমকুমার জীবনে একবার, মাত্র একবারই, একটি তথ্যচিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় পরিচালক তপন সিংহ দেশাত্মবোধক একটি দু-রিলের ছায়াছবি নির্মাণ করেছিলেন, যা তখন বিভিন্ন চিত্রগৃহে মূল ছবি দেখানোর আগে পরিবেশিত হত। সে ছবিতে বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা ও গায়কদের মতো উত্তমকুমার-ও আছেন।
উত্তমকুমার কি এমন কোনও ছবিতে অভিনয় করেছিলেন, যা ‘প্রাপ্তবয়স্ক’-দের ছবি বলে চিহ্নিত হয়েছিল? হ্যাঁ, একটিমাত্র চলচ্চিত্র, ১৯৫২-সালে তৈরি, যে বছরটিতেই তিনি নির্মল দে-পরিচালিত ‘বসু পরিবার’-এর মাধ্যমে সিনেমাজগতে সর্বপ্রথম খ্যাতির মুখ দেখেন। উত্তম-অভিনীত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছবিটির বিষয়বস্তু এমন, সেসময় এ-ছবি নির্মাণ করার দুঃসাহস,আর সে ছবিতে অভিনয় করার, দুটোই ছিল অভাবিত। যৌনরোগ ছিল ছবিটির বিষয়বস্তু। নায়িকা মঞ্জু দে ছিলেন যৌনরোগীর ভূমিকায়। এ ছবিতে উত্তম অভিনয় করতে রাজি হয়ে সত্যি সত্যি আধুনিক মনের পরিচয় দিয়েছিলেন। এবং আরও বেশি করে অবশ্যই মঞ্জু-ও।
খুব ভাল গান জানতেন উত্তম। গান শিখেছিলেন ধ্রুপদী কণ্ঠশিল্পী নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। প্রথমজীবনে তিনি যে একটি গানের স্কুলে মাস্টারি করতেন, এ তথ্য খুব একটা জানা নেই আমাদের। স্কুলটির নাম সাউথ চক্রবেড়িয়া মনোরমা গার্লস স্কুল। গৌরী দেবীকে গান শেখাতেন। অবশেষে প্রণয়, বিয়ে। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ বসুশ্রী সিনেমাহলে বাংলার সব শিল্পীদের নিয়ে যে গানের আসর বসত, তাতে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন তিনি। হেমন্ত, মান্না দে, সন্ধ্যার মতো নামী শিল্পীদের সঙ্গীত পরিবেশনের আসরে। তাছাড়া রবীন্দ্রসদনেও কয়েকবার গান গাইতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। খুব ভাল গান জানতেন বলেই ছবিতে গানের সঙ্গে অসামান্য ঠোঁট মেলাতে পারতেন।
এমন গানজানা উত্তম তাঁর কোনও ছবিতে নিজে গান করেছিলেন? আমাদের একটু অবাক লাগে, কোনও পরিচালক-ই তাঁকে তাঁদের ছবিতে নিজের গলায় গান গাইতে দেননি ভেবে। অথচ তিনি ছিলেন ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক। কলকাতা বেতারে প্রতি মাসে যে ‘এমাসের গান’ পরিবেশিত হয়, সেখানে একবার তিনি কবি কবিতা সিংহ-রচিত একটি গানে সুর করেন। গানটি পরিবেশন করেন দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়।
ছবিতে গান তিনি করেছিলেন। একটি-দুটি নয়, সাতটি। নিজ কণ্ঠে। তাঁর অভিনীত ‘নবজন্ম’ ছায়াছবিতে। সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষের সুরে।
‘উত্তমকুমার’ তিনি একবারে হননি। ১৯৪৯-এ মুক্তি পাওয়া ‘কামনা’ ছবিতে তাঁর নাম ছিল অরুণকুমার। ১৯৫০-এ বেরল ‘মর্যাদা’। তার নায়ক অরূপকুমার। অবশেষে ১৯৫১-তে উত্তমকুমার, রাজেন চৌধুরী পরিচালিত ‘ওরে যাত্রী’ থেকে।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক শওকত ওসমানের যে সরাসরি ছাত্র ছিলেন উত্তম, তা আমরা কতজন জানি? উত্তম যখন কলকাতার কমার্স কলেজে পড়তেন, সে সময় শওকত সাহেব সেই কলেজের শিক্ষক বিধায় উত্তমের পাঠগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল তাঁর কাছে।
চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার কিন্তু পেশাদারী নাটকেও অভিনয় করেছিলেন। স্টার থিয়েটারে ১৯৫৩-তে তিনি ‘শ্যামলী’ নাটকে অনিলের চরিত্রে নামেন। এ নাটকে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। নাটকটি ৪৮৪ রজনী ধরে অভিনীত হয়। পরে এটির চিত্ররূপেও ছিলেন তিনি। নায়িকা হন কাবেরী বসু। মজার কথা, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় দেখেছিলেন নাটকটি। এর পর যখন-ই নানা সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে উত্তমকুমারের দেখা হয়েছে, উত্তমকে তিনি ‘অনিল’ নামেই ডাকতেন!
বাংলা ছায়াছবির প্রায় সব নায়ক-নায়িকা পেশাদারী যাত্রাতে অভিনয় করলেও উত্তম তা করেননি। কিন্তু যাত্রাকে অসম্ভব ভালবাসা থেকে তিনি বছরে একবার নিজের উদ্যেগে নিজের পাড়ায় যাত্রাভিনয় করাতেন।
বেশ কয়েকটি ছবিতে তিনি দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। প্রথম করেন ‘তাসের ঘর’ (১৯৫৭)-এ। তাঁর অভিনীত প্রথম রঙিন ছবি ‘পথে হলো দেরী’। প্রযোজক রূপেও পাই তাঁকে, যার সূচনা ‘হারানো সুর’ থেকে। আর পরিচালকের ভূমিকাও ছিল তাঁর। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘শুধু একটি বছর’ (১৯৬৬)।
তাঁর সম্পর্কে আরও একটি অজানা তথ্য হল, ১৯৭৩-এ নির্মিত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কন্যা অপর্ণা রায়ের (তখনকার মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মা) ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রে ভয়েসওভার (ধারাভাষ্য) ছিল তাঁর। ১৯৬৭-তে ভারত সরকার দেশের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাকে ‘ভরত’ পুরস্কারে ভূষিত করা শুরু করলে উত্তম ছিলেন তার প্রথম প্রাপক।
মহানায়ক উত্তম প্লেনে চড়তে ভয় পেতেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মহাভীরু!






