বুড়ীমা: দেশে আতশবাজি সাম্রাজ্যের একমাত্র সম্রাজ্ঞী
রূ প ম চ ট্টো পা ধ্যা য়
পুজো এখন তার সাবেকি রূপ হারিয়েছে বটে, কিন্তু অনেক নতুন বৈশিষ্ট্য হাজির হয়েছে বঙ্গজীবনে। পুজোর বেড়ানো, পুজোর পত্রিকা, নিত্যনতুন পুজোর থিম, পুজোর পার্টি— সব মিলিয়ে পুজো বাঙালিকে এখনও অন্যভাবে নাড়া দেয়। বিশ্বকর্মাপুজো— পুজোর হলুদ সিগন্যাল, পুজো আসছে। মহালয়া— পুজোর গ্রিন সিগন্যাল, দেবীপক্ষের শুরু। আর যষ্ঠী থেকে শুরু হয়ে যায় পুজো। পুজো মানে বাঙালির পুজো রেঞ্জ। দুর্গাপুজো টু কালীপুজো ভায়া লক্ষ্মীপুজো।
পুজোর অন্যতম অনুষঙ্গ ঢাক ও আতশবাজি। একটা সময় ছিল, যখন গ্রামীণ পুজোর অন্যতম প্রধান উপাচার ছিল ঢাক। দিনের বেলায় দূর থেকে ভেসে আসত ঢাকের আওয়াজ। জানান দিত কোনও গ্রামে পুজো হচ্ছে। রাতে ছুঁচোবাজি দেখে পুজোর গ্রামকে চিনতে হত। তবে বাজি বলতে, তখন বাঙালির সম্বল ছিল ঢিলপটকা আর ছুঁচোবাজি। কিন্তু আশির দশক থেকে শব্দবাজি আর আলোর বাজির যুগলবন্দী অন্য আবহ তৈরি করল।
আমাদের ছোটবেলায় ছিল পটকার যুগ, কালি আর ধানি। সঙ্গে নিরীহ চরকি ও তারাবাতি। তবে বাজির মধ্যে সবচেয়ে উঁচু আসন ছিল তুবড়ির। ষাটের দশকের শেষ অবধি এভাবেই কেটেছে। সত্তরের শেষ থেকে বাঙালির বিপ্লব-চিন্তার হাত ধরে এল বোমা ও পাইপগান। তখন বোমার ডাকনাম ছিল পেটো। এগুলি ছিল এলাকা দখল বা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার। আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করার জন্য এ-সবের ব্যবহার ছিল না। ভোটে জিতলে বা অস্তিত্ব জাহির করতে পার্টির ছেলেরা বা পাড়ার মস্তানরা এ-সব ব্যবহার করত। তপন সিনহার ‘আপনজন’ এবং পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের ‘মেমসাহেব’ ছবিতে সে-সময়কার হাতবোমা বা পেটোর ব্যবহার দেখা গিয়েছে।
সত্তর দশকের স্বপ্নভঙ্গের পর পেটো-প্রযুক্তিকে কব্জা করল বাজিশিল্প। যদিও এ-রাজ্যের হাওড়া জেলার বাঁকড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটি ও বজবজের নুঙ্গিতে বহুদিন থেকে কুটির শিল্প হিসাবে বাজিশিল্পের অস্তিত্ব ছিল। যা আজও টিকে আছে। তবে বাংলায় আতশবাজিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন বেলুড়ের বুড়ীমা। (বাজির প্যাকেটে লেখা ‘বুড়ীমা’ শব্দটি আমরা অনুরূপ রাখব)। একসময় অনেকের ধারণা ছিল, জোকার মার্কা দেশলাইয়ের মতই বুড়ীমা একটা ট্রেডমার্ক মাত্র। আর সব ব্যবসার মতই বাজি ব্যবসাতেও পুরুষদেরই আধিপত্য। তাই মনে হত, বুড়ীমার ছবি, নাম, সব নেহাতই ব্যবসার অনুষঙ্গ। বুড়ীমা একজন রক্তমাংসের মানুষ এবং তাঁর হাত ধরেই এই ব্র্যান্ডের এত রমরমা, এটা বিশ্বাস করাতে বেগ পেতে হয়েছে।
দেশের আতশবাজি সাম্রাজ্যের একমাত্র সম্রাজ্ঞী বুড়ীমা। শুধু এ রাজ্যে নয়, বিহার, ওড়িশা, অসম পর্যন্ত বুড়ীমার মার্কেট। এমনকী বুড়ীমার কাছে বাজি তৈরির কৌশল শিখে কারিগররা দক্ষিণ ভারতের শিবকাশীর বুকের ওপর বসে বুড়ীমা ব্র্যান্ড নিয়ে রমরমিয়ে ব্যবসা করছেন। কীভাবে বুড়ীমা ভারতের বাজিবাজারে এভাবে বাজিমাত করলেন, তা সকলের কাছেই এক বিস্ময়। স্বভাবত জানতে ইচ্ছে করে, বুড়ীমার শুরুর দিনগুলির কথা। ব্যতিক্রমী মানুষের এই ব্যতিক্রমী জীবনচর্চা সমাজকে বাঁচতে বাড়তে সাহায্য করে। সেই তাগিদ থেকেই এই জানতে চাওয়া।
বুড়ীমার আসল নাম অন্নপূর্ণা দাস। একদা থাকতেন অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুরে। স্বামী সুরেন্দ্রনাথ দাস। ফরিদপুরে ছিল তাঁদের সচ্ছল পরিবার। এঁদের তিন মেয়ে, এক ছেলে। বড়মেয়ে কৈলাসীর বিয়ে হয় ফরিদপুরে কাসিয়ানী থানার দেবেন্দ্র রায়ের সঙ্গে। ছেলের মুদিমালের জমাটি ব্যবসা। ১৯৪৬ সালের মাঘে মেজমেয়ের বিয়ে হয় ফরিদপুরের দিগনগরের বাসিন্দা মনোরঞ্জন দাসের সঙ্গে। স্বাস্থ্যবান খাটিয়ে মনোরঞ্জনের ছিল লোহার তৈরি নানা জিনিসের ব্যবসা। মেজমেয়ে ব্রজেশ্বরীর বিয়ের মাস আটেকের মাথায় দেশ জুড়ে শুরু হয়ে গেল রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এর ঠিক একবছর পর এল স্বাধীনতা। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট। দেশভাগ হল। পূর্ব ও পশ্চিমে টুকরো হল বাংলা। সুরেন্দ্রনাথ-অন্নপূর্ণাদের ফরিদপুর চলে গেল পূর্ব পাকিস্তানের আওতায়। দেশ ছেড়ে হিন্দুরা চলে যাচ্ছে পশ্চিমে। নিরাপত্তা কথাটা ক্রমশ দামি হয়ে উঠছে। দুই মেয়ের শ্বশুরকুল দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। সুরেন্দ্রনাথ তখনও জন্মভিটে আঁকড়ে থাকতে চাইছেন। স্ত্রী অন্নপূর্ণা স্বামীকে বোঝান, প্রাণে বাঁচলে ধন হবে। সুরেন্দ্রনাথ স্মৃতিভারে নুয়ে পড়লেন। একমাত্র ছেলে সুধীরচন্দ্রের বয়স তখন বছর পাঁচ আর ছোট মেয়ে গন্ধেশ্বরী সবে জন্মেছে।
দেশ ছেড়ে বড়মেয়ে-জামাই এপারের নবদ্বীপে আর মেজমেয়ে-জামাই রানাঘাটের কাছে গাংনাপুরে চলে এলেন। অন্নপূর্ণার কথায় কাজ হল না। নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিলেন সুরেন্দ্রনাথ। সজল চোখে বাড়ির বাগানে ঘুরে বেড়ান। এদিকে দাঙ্গা ছড়াচ্ছে, হচ্ছে জবরদখল, খুন-লুটতরাজের খবর আসছে প্রতিদিন। বাইরের অন্ধকার গ্রাস করল সুরেন্দ্রনাথকে। গ্রামের নামী চিকিৎসক ভারতে চলে গিয়েছেন। পড়ে থাকা হাতুড়ে ডাক্তাররাও যাব যাব করছেন। সুরেন্দ্রনাথের রোগ ধরা গেল না। ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির একবছর পর সুরেন্দ্রনাথ মারা গেলেন। অসহায় অন্নপূর্ণা কোলে ছোটমেয়ে এবং একহাতে ছেলেকে নিয়ে দেশ ছাড়লেন ভাঙা হৃদয়ে। ততদিনে হিন্দুদের এক বড় অংশই দেশ ছেড়ে ভারতে পাড়ি দিয়েছেন। অন্নপূর্ণা রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছাড়লেন অজানা ভবিষ্যতের পথে। সীমান্তের যাবতীয় বিপদ অতিক্রম করে পশ্চিম দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুরের ধলদিঘির পাড়ে সরকারি শরণার্থী শিবিরে এসে উঠলেন। এখন অন্নপূর্ণা দাস পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এসে ভারতের নাগরিক।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার সময় শুকনো-লঙ্কার বস্তার মধ্যে কিছু সোনাদানা, কয়েকশো টাকা এনেছিলেন। তিনটি প্রাণের বিনিময়ে সোনাটুকু শকুনদের হাতে তুলে দিতে হয়েছিল। বেঁচে ছিল পরনের কাপড় আর কিছু টাকা। এদিকে সরকারি ডোলে পেট চলে না। কখনও গম, কখনও ছোলাকড়াই। তাও অনিয়মিত। একচিলতে জায়গায় তিনজনের মাথা গোঁজা। অন্নপূর্ণা এভাবে ক্যাম্পে পড়ে থাকবেন না বলে ঠিক করলেন। বিকল্পের সন্ধানে মাঝেমধ্যে শিশুদু’টিকে ক্যাম্পে রেখে বেরিয়ে পড়তেন। লক্ষ্য, পরিশ্রমের বিনিময়ে কিছু বাড়তি উপার্জন। যে ক’টা টাকা সম্বল ছিল, তা খাটিয়ে ছোট করে ব্যবসা করা। জমি থেকে সবজি কিনে বাজারে বিক্রি।
কর্মকারের বাড়ি থেকে হাতা, খুন্তি, চাটু কিনে হাটে বা লোকের দোরে দোরে ফিরি করা। সরকারি চালের কৃপায় বেঁচে থাকার চেয়ে এটা ছিল ঢের বেশি সম্মানের। গঙ্গারামপুর বাজারে এ সময়ই অন্নপূর্ণার সঙ্গে পরিচয় হয় সনাতন মণ্ডলের। সনাতনের মুদির দোকানের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসা। তিন-চারজন লোক সনাতনের দোকানে ফুরনে বিড়ি বাঁধতেন। অন্নপূর্ণাদেবী দেখলেন, ব্যাপারটা মন্দ নয়। বিনে পয়সায় বিড়ির মশলা-পাতা নিয়ে, বিড়ি বেঁধে দিতে পারলেই টাকা। সনাতনের কাছে বিড়ি বাঁধা শিখে অন্নপূর্ণা শুরু করে দিলেন সেই কাজ। অন্নপূর্ণার বয়স তখন ৩৭। সনাতন অন্নপূর্ণাকে ‘মা’ ডাকতেন। অন্নপূর্ণাও তা খুশি মনেই মেনে নিয়েছিলেন। ছেলে সুধীরচন্দ্র ওই অল্পবয়সেই মায়ের কাছ থেকে বিড়ি বাঁধা রপ্ত করল। তিন বছরের মধ্যে অন্নপূর্ণা গঙ্গারামপুরে ছোটখাট একটা বিড়ি কারখানা করে ফেললেন।
রিফিউজি ক্যাম্প, ডোলের রেশন ছেড়ে গঙ্গারামপুরের এক কৃষকের পোড়োবাড়িকে অস্থায়ী ঠেক বানিয়ে ফেললেন অন্নপূর্ণা। বেশ কয়েক বছর এভাবেই কেটে গেল। ছেলে পাঠশালায় ভর্তি হলেও সংসারের চাপে পড়া বন্ধ হল। সনাতন বিয়ে করে শ্বশুরের ব্যবসার প্রস্তাবে সায় দিয়ে শিলিগুড়ি চলে গেলেন। তবে যাবার আগে সনাতনের আনা পাত্রের সঙ্গে মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেল ছোটমেয়ে গন্ধেশ্বরীর। জামাই ছোটখাটো ব্যবসা করত, বাড়ি বরানগরে। বিয়ের কিছুদিন পরে এই ছোট জামাই অতুল চাকরি পেয়ে যায় বেলুড়ের ক্রাউন অ্যালুমিনিয়ম কারখানাতে। অন্নপূর্ণার আর গঙ্গারামপুরে মন টেকে না। সনাতন নেই, ছোটমেয়েও শ্বশুরবাড়ি, বরানগরে। তিন মেয়ে-জামাই আর নাতিনাতনিরা সকলেই দূরে দূরে থাকে। মনে মনে ভাবেন, যদি একটু ওদের কাছাকাছি থাকা যেত, সুখেদুঃখে ওদের সঙ্গে দিন কাটাতে পারতেন। অথচ এরকম একটা চালু ব্যবসা ছেড়ে যাবেন কী করে? জামাইরা প্রশ্ন তোলেন। অন্নপূর্ণা বলেন, ‘বুদ্ধি থাকলে আবার ব্যবসার অভাব? আমাকে তোমাদের কাছাকাছি একটা জায়গা ঠিক করে দাও, ব্যবসা কেমন করে করতে হয়, সে ভাবনা আমার।’
স্বামীর অকালমৃত্যু, দেশভাগ, রিফিউজি ক্যাম্পের কষ্টকর জীবন— তবু সনাতনের কল্যাণে আজ দু’মুঠো খেয়ে আছেন। তখনও মাথা গোঁজার স্থায়ী ব্যবস্থা হয়নি। এমন সময় একদিন ছোটমেয়ে-জামাই এসে হাজির। কাজের সূত্রে বেলুড় গিয়ে ছোটজামাই একটি দোকান বিক্রির খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন। যদি অন্নপূর্ণা সেটি কিনে বেলুড়ে এসে ব্যবসা শুরু করেন। প্রস্তাব শুনে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন অন্নপূর্ণা। ন’শো টাকায় দোকানঘর ও সঙ্গে লাগোয়া একচিলতে থাকার জায়গা। সেই প্রথম বেলুড়ের শিবচন্দ্র চ্যাটার্জি স্ট্রিটে বসবাস শুরু করলেন ছেলে সুধীরচন্দ্রকে নিয়ে।
মেয়ে-জামাই, নাতিনাতনিদের আপ্যায়ন, যাতায়াত, দোকান কেনা— এসব করতেই সব পুঁজি প্রায় শেষ। তার মধ্যেই লজেন্স, বিস্কুট, আর সস্তা খেলনা দিয়ে দোকান সাজান অন্নপূর্ণা। স্কুলের পথে ছোট ছেলেমেয়েরা আসে টুকিটাকি কিনতে। ছাত্রছাত্রীদের বাবামায়েরাও দোকানে আসে। কিনে নিয়ে যায় ধারাপাত, বর্ণপরিচয়। তবে অন্নপূর্ণা বোঝেন, এভাবে ব্যবসা মানে দিন আনা দিন খাওয়া। মরসুমি ব্যবসায় বরং লাভ আছে। তাই ছেলেকে নিয়ে নেমে পড়লেন নতুন ব্যবসায়। যা ছিল, তার পাশাপাশি সরস্বতীপুজোর সময় মাটির প্রতিমা, বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি-লাটাই, দোলের সময় রঙ-আবির, কালীপুজোয় বাজি বিক্রি শুরু করে দিলেন। দু’পয়সা লাভের মুখ দেখলেন। হাতে সামান্য পুঁজি এল। দোকানের হাল একটু ফিরল। স্কুলের বাচ্চাদের ভরসায় দুপুরেও দোকান খোলা রাখেন। সুধীর ভিতরে দুপুরে বিশ্রাম নেয়। অন্নপূর্ণা কষ্ট করে চোখ খোলা রেখে দোকান চালান।
একদিন বয়সে অন্যদের চেয়ে একটু বড় স্কুলফেরতা একটি বাচ্চা ডেকে বলল, ‘বুড়িমা, আমায় দশ পয়সার চানাচুর দাও না।’ ছেলেটির কথায় অন্নপূর্ণার বুকে যেন ধাক্কা লাগল। নিজেকে সামলে নিলেন। বাচ্চারা চলে যেতেই বিক্রির জন্য রাখা একটা আয়না তুলে আবিষ্কার করলেন তাঁর সব চুল সাদা। মুখের আদলেও বয়সের ছাপ। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সেই কষ্টকর দিনযাপনের বুড়োটে ছাপ শরীরে। বয়সের সূর্য যেন একটু আগেই ঢলতে শুরু করেছে। তারই স্বীকৃতি যেন এই ‘বুড়িমা’ ডাক। এরপর হরগঞ্জ বাজারে একজন হকারের কাজ থেকে আলতা-সিঁদুর তৈরির ফর্মুলা শিখে তার ব্যবসা শুরু করলেন দোকানের সঙ্গেই। একবার কালীপুজোয় একটু বেশি লাভের আশায় বাজি নিয়ে বসেছেন। হঠাৎ পুলিশ। বাজি বিক্রির অনুমতিপত্র না থাকায় পুলিশ সব তুলে নিয়ে গেল। সেদিন ভীষণ অপমানিত বোধ করেছিলেন বুড়ীমা।
ইতিমধ্যে ছেলের একটি চাকরি জুটল বেলঘরিয়ার শ্রীকৃষ্ণ রাবার ফ্যাক্টরিতে। ছোটজামাই অতুলের পছন্দ করা মেয়ের সঙ্গে বিয়েও দিয়ে দিলেন ছেলের। তখন ছেলের বয়স বাইশ আর মেয়েটির পনেরো। ছেলের বিয়ে তো হল, কিন্তু থাকার ঘর নেই। ছেলেকে ওই একচিলতে ঘর ছেড়ে দিয়ে নিজে থাকতে লাগলেন বরানগরে ছোটমেয়ের বাড়িতে। রোজ রাত ন’টায় দোকান বন্ধের পর নৌকাতে গঙ্গা পেরিয়ে বরানগর। আবার ভোরবেলা এসে দোকান খোলা। ঘরের অভাবে এভাবেই চলতে লাগল।
এরই মধ্যে একদিন এক সুবেশী ভদ্রমহিলা দোকানে কিছু একটা কিনতে এসে অন্নপূর্ণাকে আবার ‘বুড়িমা’ বলে ডাকলেন। কিন্তু এবার আর অন্নপূর্ণা চমকে ওঠেননি। কালের স্রোতে তাঁর একমাথা কালো চুল আজ ধুয়ে সাদা। কঠোর পরিশ্রম আর অভাব মুখেচোখে ফেলে দিয়েছে বলিরেখা। নতুন করে আর আয়নায় মুখ দেখার প্রয়োজন নেই। এখন মানুষ তথা খদ্দেরদের চোখেই ধরা পড়ছে সময়ের হিসাব।
সন্তোষ দত্ত তাঁর ‘নামটি তার বুড়িমা’ গ্রন্থে বলেছেন— ‘অন্নপূর্ণাদেবী আস্তে আস্তে কখন যে বুড়িমায় পরিণত হয়েছেন, সময় ছাড়া কেউ তার হিসাব রাখেনি। সময়ের আবর্তে ‘অন্নপূর্ণা’ নামটা একদিন হারিয়ে গেল। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হল একটা নতুন নাম। অন্নপূর্ণাদেবী হলেন বুড়িমা। যেন, অন্নপূর্ণাদেবীরই স্মৃতি এবং সত্তা খুঁড়ে, মনুষ্যত্ব তার ভালবাসা উজাড় করে গড়ে দিল একটা জলজ্যান্ত শরীরী প্রতিমা। যার নাম ‘বুড়িমা’।’
পুলিশ বাজি বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর বুড়িমা নিজের চেষ্টায় শুধু বাজি বিক্রি নয়, বাজি তৈরির প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্রও যোগাড় করে ফেললেন। এই পর্বে তাঁকে টাকাপয়সা দিয়ে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন প্রতিবেশী বেলুড়ের নমিতা গাঙ্গুলি ও তার স্বামী বিশ্বনাথ গাঙ্গুলি। লাইসেন্স হল, পুঁজি যোগাড় হল, কিন্তু বাজি তৈরি করবে কে? কে বুড়িমাকে বাজি তৈরি শিখিয়ে দেবে? সুধীরচন্দ্র কাজ করে রাবার ফ্যাক্টরিতে। ছুটির দিন। তাকে দোকানে বসিয়ে বুড়ীমা চলে যান নুঙ্গি, বাঁকড়া, চম্পাহাটি। অবশেষে বাঁকড়ার আকবর আলি নিজে থেকেই বাজি বানানো শিখিয়ে দিলেন। আকবর আলির সঙ্গে বুড়িমার দিদি-ভাইয়ের সম্পর্ক। সোরা, ব্যারাটা, গন্ধক কীরকম দেখতে বুড়িমা জানতেন না। আকবর আলি তাকে হাতে ধরে সব শেখালেন। বুড়িমার চোখের জ্যোতি কমে গেলেও মনের জেদ এতটুকু কমেনি। তাঁর অদম্য উৎসাহ এবং নিরলস অনুসন্ধানকে মর্যাদা দিতেই আকবর আলি সব উজাড় করে দিলেন। কারখানা করার জায়গা নেই। আকবরের বাড়িতেই বাজি তৈরি করে তা বুড়ীমার দোকানে বিক্রি হতে লাগল। এই সময়ে নমিতা ও বিশ্বনাথ গাঙ্গুলি বুড়িমাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে প্রাথমিক পুঁজি যুগিয়েছিলেন। বুড়িমার ব্যবহার এবং বিচক্ষণতাই মানুষকে মুগ্ধ করত। সেই গুণমুগ্ধরাই বারবার বুড়িমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেই পুঁজি নিয়ে আকবরের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বাজার থেকে কাঁচামাল কিনতেন। খুব অল্পদিনের মধ্যেই বাজি তৈরি করার ভাগ শিখে নিয়েছিলেন। আকবরও তাঁকে শিখিয়েছিলেন সামান্য একটু মশলায় কেমন করে গগনভেদী আওয়াজের ‘চকলেট বোম’ তৈরি করতে হয়।
প্রথম মরসুমেই অভাবনীয় সাফল্য। দোকানে পড়তে না পড়তেই শেষ। আকবরের কারখানা থেকে দোকানে পৌঁছনোমাত্রই সব ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেল বুড়ীমার চকলেট বোম। শুরু হয়েছিল চকলেট বোম দিয়ে। আস্তে আস্তে দোদোমা, রংমশাল, তুবড়ি— আরও কত কী যোগ হল বুড়ীমার সাফল্যের তালিকায়।

একদিকে মণিহারি দোকানের কেনাবেচা। ওদিকে বাজির ব্যবসা। বাজি তৈরি করা, বাজির কারখানা সামলানো সবই একার হাতে। বাজি কারখানায় মাঝেমধ্যেই হানা দিত পুলিশ ও ইনকাম ট্যাক্স। যে-কোনও মূল্যে কারখানা বাঁচাতে মরিয়া বুড়ীমা অনন্য দক্ষতায় সে সব সামলেছেন।
ব্যবসা বাড়ছে। মাকে সাহায্য করতে ছেলে চাকরি ছেড়ে মায়ের পাশে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে সব কাজ শিখে নিয়ে মায়ের সবচেয়ে বড় সাহারা তখন সুধীর। ছেলের দিকে তাকিয়েই তখন মায়ের সব পরিকল্পনা। সুধীরও ক্রমশ মায়ের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। তেমন কোনও অসুখবিসুখ ছিল না সুধীরের। তবু অকালে চলে গেল, মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে। ১৯৮৮ সালের ২৩ এপ্রিল বুড়ি মাকে রেখে চলে গেল একমাত্র ছেলে। এতদিন সুধীর দোকান সামলাত, ঘরে বসে ব্যবসা দেখত। বুড়ীমা বাইরেটা সামলাতেন। এবার নাতিদের হাতে ব্যবসা সামলাবার দায়িত্ব দিয়ে বুড়ীমা তাঁর সাম্রাজ্যের নিরাসক্ত অধিশ্বরী হয়ে রইলেন। ইতিমধ্যে পিয়ারীমোহন স্ট্রিটের বর্তমান জায়গাটা সুরদের কাছ থেকে লিজ নেওয়া হয়েছে। শুধু এই বাড়িই নয়, তালবান্দা, ডানকুনিতেও তৈরি হয়েছে কারখানা। শিবকাশীতে জায়গা লিজ নিয়ে বাজি তৈরির ব্যবস্থা হয়েছে। এ ছাড়া শিবকাশীতে বুড়ীমার নামে জোকার মার্কা দেশলাই তৈরি হচ্ছে। তবে যে পথ হেঁটে এই মসনদে পৌঁছনো, সেই পথ তিনি কখনও ভোলেননি। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন সনাতন মণ্ডলকে, যিনি বিড়ি বাঁধা শিখিয়েছিলেন। ভোলেননি হরগঞ্জ বাজারের হকার হরকুসুম গাঙ্গুলিকে; যিনি আলতা-সিঁদুর তৈরি করতে শিখিয়েছিলেন। বাজি বানানোর মূল শিক্ষা যাঁর কাছে, সেই আকবর আলির প্রতিও বুড়ীমার ছিল সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা। বলতেন— ‘আকবরভাই বেঁচে থাকলে, ওকেই আমার কোম্পানির ম্যানেজার করে দিতাম।’
যে জীবন তিনি পার করে এসেছিলেন, সেই জীবন থেকে সাফল্যের উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তাই সেই জীবনের প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম কৃতজ্ঞতা। ডানকুনির জমিতে তিনি পঞ্চাশটি গৃহহীন পরিবারকে স্বত্বদান করে বসিয়েছিলেন। তাঁর ঈশ্বরভক্তি ছিল অবিচল। তবে মানবধর্মের আধারেই তিনি ঈশ্বরচর্চা করেছেন। তাই তাঁর সন্ধ্যার নামগানের নিত্যসঙ্গীদের মধ্যে ছিল শিবু ডোম, বাহাদুর, সাবিত্রী মেথরানি। এদের জন্য বুড়ীমার একটা আলাদা টান ছিল, যা তিনি কখনও গোপন করেননি। ছবিতে বাঁধানো নারায়ণের চাইতেও নরনারায়ণের সেবায় তাঁর উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
বুড়ীমার ঘুরে দাঁড়ানোর মূলে ছিল মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছিল অকুণ্ঠ ভালবাসা। তাই একমাত্র পুত্রের অকালপ্রয়াণের পর বালি মিউনিসিপালিটি পরিচালিত বেলুড় চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিতে ছেলে সুধীরচন্দ্রের স্মৃতির উদ্দেশে একটা দন্ত চিকিৎসা কেন্দ্রের উদ্বোধন করেছিলেন বুড়ীমা। মানুষের প্রতি অদম্য ভালবাসা এবং আত্মবিশ্বাসই ছিল তাঁর শক্তির উৎস। যে পুঁজিকে সম্বল করে তিনি ব্যবসায়িক পুঁজি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন জীবনভর।
দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর নিরলস লড়াইয়ের সমাপ্তি হয় ১৯৯৫ সালের ২ জুন রাত ১০-৪৫ মিনিটে। বুড়ীমার তখন বয়স হয়েছিল বিরাশি বছর। পরিণত বয়সে মৃত্যু হলেও প্রিয়জন বিয়োগের ব্যথায় কাতর হয়ে বহু মানুষ ছুটে গিয়েছিলেন বুড়ীমা ফায়ার ওয়ার্কসের আঙিনায়। বুড়ীমা ফায়ার ওয়ার্কসের সাফল্যে ভর করে তাঁর উত্তরসূরিদের হাতে গড়ে উঠেছে বেলুড়ে একটি গেস্ট হাউস, মদের কারবার, অন্য ব্যবসার সঙ্গে টিভি সিরিয়াল ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যবসা। সে ব্যবসাগুলি জনপ্রিয় হলেও জনমুখী নয়, কারণ বুড়িমা নেই। তাঁর না থাকাটা ব্যবসার চরিত্র নির্ধারণেও বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। এটাই তাঁর না থাকাটাকে আরও অর্থবহ করেছে।
ধলদিঘির সরকারি ক্যাম্প থেকে এক সহায় সম্বলহীন নারী অসাধারণ জীবন-পরিক্রমায় আশি বছর পেরিয়েও যেন বুড়ি হন না। শক্ত চোয়াল, মাথা উঁচু। একদা রিফিউজি ক্যাম্পের একমুঠো চালের করুণাপ্রার্থী সেই মানুষটি গ্রামগঞ্জ, জনপথ, রাজপথ অতিক্রম করতে করতে আজ অধিষ্ঠিত পিয়ারীমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের রাজসিংহাসনে। এই আসনটি নিজের হাতে গড়া। নিরলস চেষ্টায় ভর করে সামান্য নারী অন্নপূর্ণা দাস রূপান্তরিত হয়েছিলেন অনন্যা এক নারীতে। কালক্রমে তিনিই সর্বভারতীয় বুড়ীমা। এ দেশে ব্যবসার ইতিহাস যদি কোনও দিন ঠিকমতো লেখা হয়, তবে মহিলা ব্যবসায়ী হিসেবে বুড়িমার জন্য একটি বিশেষ আসন অবশ্যই থাকবে। কারণ, এখনও পর্যন্ত এ দেশে বুড়ীমার তুলনা শুধু বুড়ীমা-ই।
চিত্র: নিজস্ব






