এখানে কোনওদিন ‘নাম বলতে নেই’ ছিল না
‘কী ওটা বাবা?’
‘চুপ করো খোকা। ওটার নাম বলতে নেই।’
‘নাম আছে তার মানে। শুধু বলতে নেই। আমাকে বলো না বাবা। আমি কাউকে বলব না। ঋষভ, কৌসাম্বী, ডোডো, বুচকুন— কাউকে বলব না। আমাকে বলো প্লিজ।’
বাবা ইশারায় কিছু কহিবার চেষ্টা করে। খোকা মজা পায়। বাবাটা যেন কী। কেমন জাবড়জংভাবে হাত পা নাড়ছে!
‘ও বাবা, তুমি ডাম্ব শ্যারাড জানো? সত্যি! কী মজা। আর বোর হতে হবে না। তোমার সঙ্গে আমি ডাম্ব শ্যারাড খেলব। লেটস স্টার্ট।’
বাবা প্রথমে মাথায় হাত দিয়া কী যেন দেখাইবার চেষ্টা করে। খোকা বলে, ‘আরে ওরকম নয়, প্রথমে তো আঙুল দিয়ে বোঝাতে হবে, এটা বাংলা না ইংরেজি না হিন্দি। একদম ডিফাইনড সাইন কোড আছে।’
বাংলা না হিন্দি না ইংরেজি? বাবা বিমূঢ় হয়ে ভাবে। যাহা হারাইয়া গিয়াছে, তাহাকে কোন ভাষায় বুঝানো যাইবে? হারিয়ে যাওয়া জিনিসের জন্যে একটা নূতন ভাষা, আর সেই ভাষা ইশারায় বুঝানোর জন্যে একটা নূতন সাইন কোড চাই।
তারপর থুতনিতে হাত দিয়া কী বোঝাইবার চেষ্টা করে, তারপর হাত দিয়া একটা আড়াই প্যাঁচ বাতাসে আঁকিবার চেষ্টা করে। কিন্তু সব বৃথা যায়। ছেলে কিছুই বুঝতে পারে না। বাবার মনে হয় তাহাদের আমলের ভাষা থেকে এ আমলের ভাষাই শুধু বদলায় নাই, ইশারাও বদলাইয়া গেছে। না হলে ছোটবেলায় এই ইশারাই তাহার বন্ধুরা সবাই বুঝিয়া যাইত, আর তাহার ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া এত দিগগজ ছেলে বুঝিতেছে না কেন?
সে হাল ছাড়িয়া দিয়া বলে, ‘সব কিছু তোমার বোঝার দরকার কী? শার্লক হোমস কি বলেছেন জানো তো? মাথাটা একটা ছোট ঘরের মতো, তাতে একগাদা জিনিস দিয়ে ক্লাটার করে লাভ নেই। হোমস তো সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, না পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে— এটা নিয়েও আগ্রহী ছিলেন না।’
বাবার মুখে কেমন গর্ব ঝিলিক দেয়, আর সেটা দেখে ছেলের মুখে অবাক ভাব ফুটে ওঠে।
‘হু ইজ দিজ গাই? শার্লক হোমস? মাঙ্গা বা অ্যানিমেতে পাইনি তো।’
‘এক থাপ্পড় মারব, হোমসকে চেনো না? ইয়ার্কি হচ্ছে। ছাড়ো, তোমাকে আর কিছু জানতে হবে না। ক্লাসের পড়াই পারো না আবার…’
ছেলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, ‘ইটস ওকে। বোঝাতে হবে না। আমি বইয়ে পড়ে নেব।’
বাবার মুখে হাসি খেলিয়া যায়। আগে তাহারা বইয়ের কোনও কিছু শক্ত লাগিলে কাটিয়া গিলিয়া ফেলিত, এখন কিছু জিনিস ছাপার আগেই কাটিয়া গিলিয়া ফেলা হয়। ছেলে কোনওদিন জানিতে পারিবে না ওটা কী ছিল।
ছেলে বাবার মুখে ফিচেল হাসি দেখে বুঝে যায়।
‘ওকে ওকে, আমি গুগল করে নেব। গুগল সব জানে।’
এইবার বাপ একটু টেনশনে পড়িয়া যায়। গুগল হইতে বাদ দেওয়া হইয়াছে কী? তা হলে আর কী লাভ? এইসব ডেঁপো বাচ্চারা কি আর বই পড়ে, তারা ভূমিষ্ঠ হইয়াই গুগল করিতে শিখিয়া যায়। এদের সঙ্গে আঁটিয়া ওঠা শক্ত। নাহ এইসব মাথামোটাদের লইয়া কী যে করে! সে কিছু বলিতে চায়। কিন্তু কথা বলিতে পারে না। ইশারা করিতে করিতে সে ইশারাই শিখিয়া ফেলিয়াছে। হায় রে। ইশারা ছাড়া কিছুই পারিতেছে না। তার কথা বলার যন্ত্র বিকল করিয়া দেওয়া হইয়াছে। শালারা গুগলের কিছু ছিঁড়িতে পারে নাই, তাহার কথা কাড়িয়া লইয়াছে!
‘বাবা, ও বাবা, তুমি কথা বলছ না কেন? শুধু হাত নাড়ছ, কেন?’
ছেলের বারবার আকুল প্রশ্নের উত্তরে বাবা পুত্তলিবৎ দাঁড়াইয়া থাকে। শুধু তার অঙ্গুলিগুলি প্রাণপণে কী যেন বুঝাইতে চায়। হায়, কেহ কিছুই বুঝে না।
২
সে সব কিছুর অন্য নাম দিত। বৌয়ের নাম দিল লাড্ডু, লাড্ডুর নাম দিল কনডোম। বাড়ির নাম দিল ভাই। ভাইয়ের নাম দিল বন্দে ভারত। এরকমভাবে একদিন একটা অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। একদিন সে নিজেই বাড়ি পৌঁছতে পারল না, কারণ উবের ড্রাইভারকে বলেছিল ভাইয়ের কাছে যাবে। আর বসকে দেওয়ালিতে লাড্ডুর বাক্স দিয়ে বলেছিল এই নিন কনডোম। আর কী, চাকরি চলে গেল। এবার সে রাস্তার রাস্তায় ঘোরে আর আরও বড় বড় জিনিসের নাম বদলাতে শুরু করে। ধরা যাক, একটা রাস্তা ছিল অক্রুর মুদি লেন। সে তার নাম দিল, ববি বিশ্বাস সরণি। সব মেট্রো স্টেশনের নাম মনীষীদের সঙ্গে জুড়ে দিল। তাদের স্থানাংক গেল ঘুচে। টালার নাম রবীন্দ্র, টালিগঞ্জের নামও তাই। কোনও তফাত রইল না। কিছু কিছু নামকরণের বেলায় সে অবশ্য বেশ বুদ্ধির পরিচয় দিল। কালীঘাটের নাম দিল হাতকাটা কাত্তিক, শোভাবাজারের নাম সোনাগাছি জংশন, গড়িয়া বাজারের নাম আদিগঙ্গা ও খইমালার কিস্যা। একটুআধটু পড়াশোনা যে করেছিল, তা বোঝা যাচ্ছিল তার কাজের ধরনে। সবাই তার জন্য প্রশংসাই করতে শুরু করেছিল। তাতে তার মাথা ঘুরে গেল। সে গান গাইতে শুরু করল, নাচতে লাগল, ছবি আঁকল, উর্দুতে গজল, অলচিকিতে জোহার গাইল, ভোজপুরি সিনেমাও করে ফেলল একটা, আর সিনেমা করার পর তার মনে হল আইফেল টাওয়ারের মাথায় উঠে ভাংরা নাচবে। সেটা হয়েও যেত, কিন্তু তখুনি আবার আর একটা নতুন মেট্রো স্টেশন চালু হয়ে যেতে সে কাজে বাধা পড়ল। নামকরণ করার ডাক পড়ল। এতদিন শুধু নামকরণেই তার ব্যুৎপত্তি ছিল কিন্তু ইদানীং তার বহুবিধ প্রতিভা দেখা যাচ্ছে, দেশে দেশে দিশে দিশে তার কর্মধারা বয়ে চলেছে, ফলে মূল কাজটিতে একটু ভাটা পড়েছে। সোজা কথা, তার ওদিকে আর মনই নেই। তাই সে নাম দেবার কাজটি এড়িয়ে যেতে চাইল, শেষে যখন একদম সময় নেই, তখন সে বলল একদম উদ্বোধনের দিন দেব। সেকী! নামফলক, ভিত্তিপ্রস্তর, প্রেস রিলিজ— এসবের কী হবে? সবাই তো নাম চায়।
সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সে তোমরা ম্যানেজ করে নিয়ো, আমি ওখানে গিয়েই নাম দেব। এখন মেলা গোল কোরো না। ইউকেলেলে রপ্ত করছি, সেটায় মন দিতে দাও।’
লোকজন চুপসে চলে গেল। সে সুরটাকে পাকড়ে ধরার চেষ্টা করছিল। পারছিল না। এই না পারতে পারতে, না পারতে পারতে তার মাথায় একটা নাম খেলে গেল। সে ভাবল ফোন করে তখুনি নামটা দিয়ে দেয়। বেচারারা কেমন ফ্যাকাসে মুখে চলে গেল। কিন্তু কী একটা ভেবে সে মুচকি হাসল। ‘রোসো, বেটাদের আর দুদিন ছটফট করতে দাও। বাছাধনরা সব হাঁ করতেই পেয়ে যায় বলে আমার মর্মই বোঝে না। ওদের জন্যে ইদিকে আমি আইফেল টাওয়ারের ইভেন্টটা পিছিয়ে দিলাম। আত্মত্যাগের একটা লিমিট আছে!’
সে আর ফোন করল না। ইউকেলেলেটাও ভাল লাগছিল না। জঘন্য বাজনা। সে বোতাম টিপল। নীল বোতাম। আলুথালুওয়ালিয়া ছুটে এল।
‘জুবিজুবিজুবিকে বুলাও। তুরন্ত।’
জুবিজুবিজুবির নাম কী ছিল সে নিজেও মনে করতে পারে না। যখন ডাক এল, তখন সে একটা এক হাত বাই এক হাত চৌবাচ্চায় মুখ ডুবিয়ে দ্রাক্ষারস চুকচুক করে পান করছিল। হঠাৎ ডাক পড়তে বিষম-টিষম খেয়ে তারপর সামলে নিয়ে হাঁচড়-পাঁচড় করে লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে এল।
তাকে এক পলক দেখে নাক কুঁচকে সে বলল, ‘হাউ রিডিকিউলাস! আবার লাল প্যান্ট আর সাদা জুতো পরেছ!’
জুবিজুবিজুবি মরমে এতদূর মরে গেল যে, আর একটু হলেই সে জামা প্যান্ট জুতো সব খুলেই ফেলত। পূর্বনামের মতো কী যেন একটা তার ভেতরে ডুবোপাহাড়ের মতো জেগে উঠে সে কাজটা সে করতে পারল না। তার বদলে লজ্জা লজ্জা মুখ করে সে লেজ নাড়তে লাগল।
‘খুব হয়েছে। একটা গান পেয়েছে। তাড়াতাড়ি টুকে নোটেশনে ফেলে দাও তো। এই গানটা স্টেশনের নামকরণের সময় আমি গাইব, তুমিও গাইবে। তুমি সেদিন আমার সঙ্গেই যাবে। আর তারপর থেকে এটা সব মোড়ে মোড়ে যেন শোনা যায়।’
জুবিজুবিজুবি পকেট থেকে আইফোন বের করল তাড়াতাড়ি।
‘আজ্ঞে ব্লুন—’
‘লেখো—
আইকম বাইকম ঝমঝম রেন
নতুন ট্রেন নতুন ট্রেন
জিঙ্গা সিঙ্গা মারাইবুরু
চুরুমুরু শেষের শুরু
আগলা বাগলা পাগলা ছাগট
ক্যাচ কট কট ল্যাচ ছট ফট।’
নাও, আজ এই অব্দি, এখন আমি ছবি আঁকব, শুভাডুবালুবাকে ডেকে দিয়ে যাও।’
৩
চারদিকে চকাচক ক্যামেরা। সে দেখে যারপরনাই প্রীত হল। ভিত্তিপ্রস্তরে, স্টেশ্নের নামফলকে সবজায়গায় স্টেশনের নাম ফাঁকা। সে বললে ওমনি চোখের পলকে লেজার আলো দিয়ে নামগুলো বসে যাবে জায়গামতো। সেই এই ইতিহাস তৈরি করল। হা হা হা।
বলুন—
স্টেশনের নাম থাক— সতত সততা।
ওমনি হুড়মুড় করে সব ভেঙে পড়ে গেল। ধবংসস্তূপের নিচ থেকে শোনা গেল, ‘জুবি, জুবি, আমি গাইব জিঙ্গা সিঙ্গা মারাইবুরু’!
খানিক পরে আর কিছু শোনা গেল না।
চিত্রণ: ধৃতিসুন্দর মণ্ডল







2 Responses
আমরা সবাই ইডিয়টের দল।হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম করি।আরে,আমরাইতো সব আপোদের কারখানা খুলে ইংলিশ মিডিয়াম নামক একটা ট্যাঁশগরুর খোঁয়াড় তৈরি করতে করতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছি,বালকের বিস্ময় আর নেই।খুঁজতে খুঁজতে চলে গেছি কতদূর।হাঁটছি তো হাঁটছি।আনন্দটি লুকিয়ে ছিল বিস্ময়ে।অ্যাটলাসের পাতায়।আর আনন্দের শব্দজব্দের সদ্যকিশোরবেলায়।কী লেখেন?কাহিনি নয়; ক্লামজি চেহারা ইরেজ না করে।আরও ফ্লাড লাইটের আলো ফেলেন।তৃষ্ণা মেটান,তৃষ্ণা বসাক🙏
Tibro byango.marmobhedi