আজ নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো নিয়ে কিছু লিখব। ঢাকার অদূরবর্তী শহর, ঐতিহ্যের দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য স্থান এটি, বিশেষ করে সোনার গাঁও-এর জন্য। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার পুজো দেখেছি,– বরিশাল, যশোর, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, ঢাকা। এবার বেশ কয়েকদিন ধরেই লিজা, কবি-সাংবাদিক-বাউন্ডুলে ও আমার দোস্ত লিজা উল্টে দিচ্ছিল আমাকে, নারায়ণগঞ্জের পুজো না দেখলে একটা বড় ধরনের উৎসব মিস করা হবে। পুজোর হপ্তাখানেক আগে সে নারায়ণগঞ্জে এল, তাঁর গাড়ি করে বলধা গার্ডেনে ঘোরাল, ‘স্বপ্ন কিচেন’-এ নিয়ে গিয়ে জব্বর চাইনিজ খাওয়াল, আর প্রায় হুমকি দিয়ে বলে গেল পুজোয়…। অতএব।
এতেই ক্ষান্ত দেবার মেয়ে নয় সেই মহিমময়ী লিজাদেবী। নারায়ণগঞ্জের বিখ্যাত মানুষ, এলাকার সর্বজনশ্রদ্ধেয় নারায়ণচন্দ্র পালের নম্বর দিয়ে বলল, ওখানে এলে তিনি-ই সর্বপ্রকার মুশকিল আসান। ফোন করলাম। অত্যন্ত বিনয় ও ভদ্রতা করে তিনিও চলে আসতে বললেন।
এদিকে বহুদিন বাদে আমার প্রায় সাড়ে তিন যুগ আগেকার বন্ধু হাসান হাফিজকে ফোন করতেই ওর ওখানে চলে আসতে বললেন। মানে প্রেস ক্লাবে। হাসান এখন জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। নারায়ণগঞ্জ বিষয়ে জানতে চাইলে বললেন, হাসান ওখানকার-ই ভূমিপুত্র। ১৯৮৯-তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর জন্মস্থান বারদীতে গেলে হাসান তাঁর ইন্টারভিউ নেন। তিনিও নারায়ণগঞ্জ-যাত্রাকে উৎসাহিত করলেন। আর সম্ভব হলে মায়াদ্বীপ।
অতএব রওনা। বহুকাল আগে একবার সোনারগাঁ গিয়েছিলাম, আর বছর পাঁচ আগে বারদীতে জ্যোতি বসুর বাড়ি দেখতে, তৎসহ লোকনাথ আশ্রম। অক্টোবরের ১৬ তারিখ, শুক্রবার ঢাকার গুলিস্তান থেকে এক ঘণ্টার পথ। জিতু, আমার ভাই ও বন্ধু, গুলিস্তানে গিয়ে বাস ধরার হদিশ দেয়।
দুপুর দেড়টা নাগাদ পৌঁছলাম। লিজা লেজেগোবরে, ওর রান্নার লোক আসেনি। নিয়ে চলল আমলাতলায়। নারায়ণবাবুর নির্দেশমতো। সেখানকার পুজো-অধিকর্তা সানির হাতে গস্ত করতে। নারায়ণবাবু জরুরি কাজে ঢাকা। সানিও আউট অফ স্টেশন, যাওয়ার আগে ফোন করলাম যখন, বললেন। আর এ-ও বললেন, তাতে কোনও অসুবিধে হবে না, কেননা এক তরুণকে আমার কথা বলা আছে। সে-ই আমার কাণ্ডারি হবে।
কাণ্ডারির যে এত কাণ্ড, আগে কে তা জানত! সে আগে আমাকে ঠেলে নিয়ে তুলল তাদের বাসায়, চারতলায়। ওর মায়ের সঙ্গে গল্প জুড়তে না জুড়তে বাবা এলেন। নিমেষে খেতে বসালেন, আদেশ! পুজোর ক’দিন এদের নিরিমিষ ভোজন। কিন্তু আইটেমের পর আইটেম,– বকফুলের চপ, আলু, পটল, কুমড়ো ভাজা, লাউশাক, কাঁচা মুগের ডাল, আলু-পটলের নিটোল তরকারি, পাঁচমিশেলি তরকারি, জলপাইয়ের চাটনি। আগে একপ্রস্থ চা হয়েছিল। খাওয়ার পরেই শয্যা প্রস্তুত, দেখিয়ে দিলেন গৃহকর্তা। যাদের একঘণ্টা আগেও চিনতাম না জানতাম না, মুহূর্তে তাঁরা আমাকে আপন করে নিলেন এইভাবে!
ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই ফের চা। দেখছি প্রতিমাদর্শন ভাগ্যে নেই, অতিথি হয়েই কাটবে। এ তো কাজের কথা নয়। নারায়ণগঞ্জে পৌঁছনো ইস্তক রাস্তার লোকজন, বিশেষ করে তরুণী থেকে গিন্নিবান্নিদের নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখছি, আর মন উচাটন, কখন কোথায় কোথায় প্রতিমা দেখতে যাব! তাই দ্রুত বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
প্রথমে রামকৃষ্ণ মিশন। এখানকার পুজো একটা আলাদা শুদ্ধতা আর ভক্তির বৈভব নিয়ে আসে। বাংলাদেশের নানা জেলার রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার নয়। কেবল তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান। বললাম শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদাদেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারার মূল ভূমিকা নিয়ে। অতঃপর অন্য অনুষ্ঠান।
মহারাজের এই আশ্রমে আসা ২০০১-এ। তিনি ছাড়া এখানে আরও চারজন মহারাজ আছেন। মহারাজ জানালেন, এখানকার মিশন ঢাকার চেয়েও পুরনো। ১৯০৯ সালে স্থাপিত। আর তখন থেকেই এখানে দুর্গোৎসবের সঙ্গে কুমারীপূজাও হয়ে আসছে। গতবছরে (২০২৫) রাজশ্রী ভট্টাচার্য, ২০২৪-এ সুকন্যা চক্রবর্তী, ও ২০২৩-এ মিষ্টি চক্রবর্তীকে কুমারীপূজা করা হয়। এর প্রবক্তা স্বামীজি। ১৮৯৮-তেই তিনি কাশ্মীরে এক মুসলমান বালিকাকে কুমারীপূজা করেন। পরে ১৯০১-এ বেলুড় মঠে যখন প্রথম দুর্গাপূজা হয়, সেবার ন’জন কুমারীকে পূজা করা হয়েছিল। স্বামীজি নিজেই করেন চারজনকে।
উল্লেখ্য, স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর প্রয়াণের ঠিক আগের বছর। এখানে আসার মূলে উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর মাকে ঢাকেশ্বরী মন্দির দেখানো। তিনি নারায়ণগঞ্জ-সন্নিহিত লাঙ্গলবন্দেও যান। যান শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহী শিষ্য সাধু নাগমহাশয়ের বাড়িতেও। যদিও নাগমহাশয়, অর্থাৎ দুর্গাচরণ নাগ ১৮৯৯-তেই প্রয়াত হন।
মহারাজ জানালেন, প্রতিবছর এখানে মহাষ্টমীতে কুমারীপূজা হয়। বহুবছর ধরেই হয়ে আসছে। দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন দশহাজার ভক্ত প্রসাদ গ্রহণ করেন। প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ তো বটেই, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুজো দেখার জন্য এখানে হাজার হাজার ভক্তসমাগম হয়। প্রতিমা তৈরি হয় মণ্ডপেই।
দুর্গাপূজা ছাড়াও এখানে লক্ষ্মী, কালী ও সরস্বতীপুজো হয়ে থাকে। পালিত হয় বুদ্ধজয়ন্তী ও ক্রিসমাস। তাছাড়া শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদামায়ের জন্মতিথি, স্বামীজির জন্মতিথি ও জন্মদিন (বারোই জানুয়ারি) পালিত হয়। হয় গুরুপূর্ণিমা, দোল ও অন্যান্য কিছু উৎসব-ও।
এখানে দাতব্য চিকিৎসালয়ের মারফত বহু মানুষ প্রতিদিন স্বাস্থ্য-পরিষেবা পেয়ে থাকেন। অন্য জায়গার মতো এখানেও রয়েছে ছাত্রাবাস। বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে যারা পড়তে আসে, তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। পঞ্চাশজনের মতো ছাত্র এখানে থাকতে পারে। এরকম-ই এক ছাত্র, ব্রাহ্মণবেড়িয়া থেকে নারায়ণগগঞ্জে পড়তে আসা দুরন্তচন্দ্র সাহার সঙ্গে আলাপ হল। সে দুরন্ত তো নয়-ই, উল্টে স্বভাব-লাজুক সে। জানাল, পূজাবকাশে অধিকাংশ ছাত্র-ই বাড়ি চলে গেছে। এখানে সে বেশ ভালই আছে। রোজ সন্ধ্যায় প্রার্থনায় যোগ দেয়, আর খাওয়াদাওয়াও তৃপ্তিকর এখানে। সে মার্কেটিংয়ের ছাত্র।
সন্ধ্যা থেকে রাত গড়াচ্ছে, সুবেশা তরুণ-তরুণী, স্বামী-স্ত্রীর ভিড় বাড়ছে। হরেক পোশাক, হাস্যপরিহাস, ভক্তিভরে প্রতিমাদর্শন, এই করে পুজোপরিক্রমা তাদের। মায়ের সঙ্গে প্রতিমা দেখতে এসেছে মাত্র-ই মাস-দুই আগে চাকরি পাওয়া পর্ণা। এবার পুজোয় ছ’টা পোশাক হয়েছে জানাল। রোজ-ই মা আর বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিমা দেখতে বেরোবে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় মোট ২৪০টি, আর শহরটিতে ৪০টি পুজো হচ্ছে। নিতাইগঞ্জ ভগবান জিউর আখড়া, আমলাপাড়া শ্রীশ্রী জয়কালী, উকিলপাড়া, সাহাপাড়ার পুজো বিখ্যাত। শ্রীশ্রী জয়কালী, উকিলপাড়া, সাহাপাড়ার পুজো বিখ্যাত। প্রতিটি পূজানুষ্ঠানকারীকে সরকারের থেকে দশহাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। তাছাড়া ৫০০-৬০০ কেজি চাল।
সব অনুষ্ঠান-ই আক্ষরিকভাবে এক-দু’জনের ওপর ভর করে এগোয়। দুর্গাপুজোর মতো বিপুল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হতে কত যে মানুষের প্রয়োজন! প্রতিমাশিল্পী, ঢাকি, প্রতিমার সজ্জাকার, পুরোহিত, তন্ত্রধার, মালাকার, রাঁধুনি (জনগণের ও ঠাকুরের), জোগাড়ে, প্যান্ডেল-আলোকসজ্জা-মাইক, হিসেবে কুলোবে না! আছে প্রহরার ব্যাপার, যা সামলাচ্ছেন বিজিবি দিনরাত।
তবে এক-দু’জনের সর্বাঙ্গীণ স্বেচ্ছাশ্রম-ই উৎসবকে সার্বিক সার্থকতা দেয়। এখানে, নারায়ণগঞ্জ রামকৃষ্ণ মিশনের পুজোয় এই কাজটি করছেন রণজয়। এই তিনি ছুটছেন মহারাজের জরুরি ডাকে, এই কাউকে খাবারের তদারক করছেন, এই কেউ চাঁদা দিতে এলে রসিদ কাটছেন।
সকল কাজের কাজি বলতে যা বোঝায়, রণজয় তাই। আমার থাকবার সমস্যা মুহূর্তের মধ্যেই সমাধান করে দিলেন। এমন করিৎকর্মা লোকের কাজ কিন্তু থ্যাঙ্কলেস জব। তবু ভালবেসে করেন। নামটি সার্থক।
এবারের পুরোহিত নতুন, হবিগঞ্জ থেকে আগত। তাঁর মুখে বিশুদ্ধ দেবভাষার উচ্চারণ শুনে আমি পরম বিস্মিত! সারা বাংলাদেশের তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেও এমন কদাচিৎ দেখা যায়। তাই জিগ্যেস করতেই হল। পুরোহিত, অনূর্ধ্ব পঁয়ত্রিশ, নাম উৎপল। বেলুড় মঠ থেকে তিনবছরের কোর্স করে এসেছেন। ওখানকার অধীনে যে রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অফ কালচার, সেখানে দেশি-বিদেশি ৩৫টির মতো ভাষা শেখানো হয়।
চিত্র: গুগল






