ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (২৬.০৯.১৮২০-২৯.০৭.১৮৯১) উনিশ শতকের এক যুগন্ধর প্রতিভা। বঙ্গীয় নবজাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ, যিনি কী সমাজসংস্কারে, কী নারীশিক্ষা ও নারীর বন্ধনমুক্তিতে, কী বাংলাভাষার উন্নতি বিধানে আজীবন ব্যয় করে গিয়েছেন। বাংলা গদ্য তাঁর হাতে অপরূপ লাবণ্য ও অনবদ্য শৈলী অর্জন করেছে। অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। একদিকে তিনি কালিদাসের ‘শকুন্তলা’-র অনুবাদক, অন্য দিকে, ভবভূতির নাটক অবলম্বনে তিনি লেখেন ‘সীতার বনবাস’ (মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বল্পশিক্ষিত মেয়েদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় রামায়ণের সীতাকাহিনি জানানো)। সোমদেবের লেখা ‘কথাসরিৎসাগর’ সংস্কৃত ভাষায় এক অনবদ্য গদ্যকাব্য। হিন্দিতে এর একটি অংশের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেন লল্লুলাল। গুজরাটি লল্লু মাতৃভাষা ছাড়াও উত্তম সংস্কৃত, ফারসি, হিন্দি ও উর্দু জানতেন। দীর্ঘ চব্বিশ বছরকাল ফোর্ট উইলিয়মে শিক্ষকতার সূত্রে বিদ্যাসাগরের পরিচিত ছিলেন। তিনি ‘কথাসরিৎসাগর’-এর সামান্য অংশের যে অনুবাদ করেন, তাকে ভিত্তি করেই বিদ্যাসাগর লেখেন ‘বেতালপচ্চিসী’-র অনুবাদ ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’। অথবা ফোর্ট উইলিয়ামের তৎকালীন অধ্যক্ষ মার্শাল হয়তো এই দু’জনকেই দুই ভাষায় এর অনুবাদ করতে বলে থাকতে পারেন। একাদশ শতকের লেখক সোমদেব ছিলেন কাশ্মীরের লোক। দীর্ঘ ১২৪ অধ্যায়ে লিখেছিলেন গ্রন্থটি, যার ২৪তম অধ্যায়কেই অনুবাদের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।
এছাড়া বিদ্যাসাগর শেকসপিয়রের হাস্যরসাত্মক নাটক ‘Comedy of Errors’ অবলম্বনে ‘ভ্রান্তিবিলাস’ লেখেন, তবে তা নাটকের আকারে নয়, গল্পের আঙ্গিকে। উল্লেখ্য, অনুবাদের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর কখনওই আক্ষরিকতার অনুসারী ছিলেন না। তাঁর অনুবাদমাত্রই ছিল সৃজনশীল (‘Transcreation’)। শেকসপিয়রের নাটকটিও আবার রোমান নাট্যকার প্লাটাস (Plautus ২৫৪-১৮৪ খৃস্টপূর্ব) রচিত নাটকের ভাবানুসারী। গ্রিক শহর ইফিসাস ছিল শেকসপিয়রের নাটকটির অনুষ্ঠানস্থল। বিদ্যাসাগর তার বঙ্গীকরণ করতে গিয়ে স্থানটির নাম ‘জয়স্থল’ রাখেন। কোথায় গ্রিস, আর কোথায় বাংলাদেশ!
বিদ্যাসাগর আরও একটি অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছিলেন, মহাভারত। কিন্তু যখন তিনি শুনলেন, কালীপ্রসন্ন সিংহ একদল পণ্ডিতের সহযোগিতায় একাজে ব্রতী হয়েছেন, তখন তিনি আর অগ্রসর হননি।
আমরা জানি, বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।
কেবল এসবের নিরিখেই নয়, ‘বর্ণপরিচয়’-এর অন্য অনেক ঐতিহাসিক যুগান্তকারী ভূমিকা আছে। এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালা সংস্কৃত বর্ণমালার দ্বারা শাসিত হত। বিদ্যাসাগর তাতে স্বাতন্ত্র্য আনলেন, যার ফল শিশু ও বয়স্ক নির্বিশেষে ভোগ করছি আমরা। তিনি বাহুল্য ও অপ্রয়োজনীয় বলে দীর্ঘ ঋ-কার ও দীর্ঘ ৯-কার তুলে দিলেন, বাংলায় তার ব্যবহার নেই বলে। ‘ক্ষ’ আসলে যুগ্ম স্বর ‘ক’ আর ‘ষ’ মিলিয়ে তৈরি (ক্+ষ্= ক্ষ্)। অতএব তাঁর বর্ণমালা থেকে আলাদা বর্ণরূপে বাদ পড়ল সেটা। বদলে নিয়ে এলেন তিনটি নতুন বর্ণ,— ‘ড়’, ‘ঢ়’, আর ‘য়’। যুক্তি হিসেবে দেখালেন, ‘ড, ঢ, য, এই তিন ব্যঞ্জনবর্ণ, পদের মধ্যে অথবা পদের অন্তে থাকিলে ড়, ঢ়, য় হয়। ইহারা অভিন্ন বর্ণ বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে।— উহাদের স্বতন্ত্র বর্ণ বলিয়া এই উল্লেখ করা উচিত।’ রবীন্দ্রাগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ আবার পদের মধ্যবর্তী এই ‘য়’-কে ‘য’-ই রেখে দিতে চেয়েছিলেন। কেননা আদিতে না বসলে তাকে ‘য়’ উচ্চারণ করলেই তো হল!
তিনি অনুস্বর আর বিসর্গকে নিয়ে এলেন ব্যঞ্জনবর্ণের আওতায়। বাক্যে উপযুক্ত স্থানে যতিচিহ্নের ব্যবহার-ও প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। দেবভাষায় পণ্ডিত বিদ্যাসাগর সেখান থেকে নয়, যতিচিহ্ন ধার করেন ইংরেজি ভাষা থেকে। এখানেই তাঁর আধুনিকতা। যেমন তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্বে অষ্টমী আর পূর্ণিমা-অমাবস্যায় যে ছুটির নিয়ম ছিল, তা পরিবর্তন করে তিনি-ই প্রথম রবিবারটিকেই ছুটির দিন রূপে নিয়ে আসেন।
বর্ণবিষয়ক এই পরিবর্তনগুলি তো কেবল শিশুদের-ই নয়, বাংলাভাষী ও বাংলা ভাষা-শিক্ষার্থীদের অদ্যাপি কাজে লাগছে। এ গ্রন্থের ব্যাপক গুরুত্ব এখানেই। তাছাড়া এই গ্রন্থ-সহ তাঁর অন্য সব গ্রন্থ ও অন্যান্যের বই ছাপা হত ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ বা ‘সংস্কৃত প্রেস অ্যান্ড ডিপোজিটরি’ নামে বিদ্যাসাগরের-ই ছাপাখানা থেকে। এর যা আয়, তা থেকেই তিনি বিধবাবিবাহের ব্যয়, দুস্থদের সাহায্য, এমনকী মধুসূদনের আর্থিক দায়িত্ব পর্যন্ত পালন করেছিলেন। অতএব ‘বর্ণপরিচয়’-এর ভূমিকা আসলে বহুবর্ণমাত্রিক।
একদিকে তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’, অন্য দিকে, বিবাহবিধবা আন্দোলনের মতো সামাজিক কল্যাণকর কাজ। প্রথমটিতে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়নি, দ্বিতীয়টিতে পাহাড়প্রমাণ। তাঁর আগে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদ করিয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসকদের মাধ্যমে ১৮২৯-এ। সতীদাহ প্রথা রদ যেমন সামাজিক এক নিদারুণ সংস্কার, তেমনই এর ফলে সমাজে বিধবাদের বর্ধিতায়তন নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল, তার-ই সংখ্যারোধ সম্ভব বিধবাবিবাহে। তাছাড়া বিধবাদের নিয়ে সমস্যা ছিল অবৈধ সন্তানধারণ ও সেকারণে ভ্রূণহত্যা, সেইসঙ্গে মায়ের জীবন-ও বহু সময়ে চলে যেত। সমাজে বেশ্যাবৃত্তির প্রাদুর্ভাব। সে সময়কার নাটকে, খবরের কাগজে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ মেলে। ‘দি হিন্দু উইন্ডোজ রিম্যারেজ অ্যাক্ট ১৮৫৬-র ২৬-এ জুলাই থেকে বিধবাবিবাহ কার্যকর হয় যখন, তার আগে শাস্ত্রসমুদ্র মন্থন করে বিদ্যাসাগর পরাশরসংহিতায় বিধবাবিবাহের সমর্থন পেলেন। ১৮৫৪-তে তিনি বিধবাবিবাহের বৈধতা নিয়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’-তে লিখলেন যখন, তখন থেকেই এ নিয়ে সমালোচনার সূত্রপাত। বিরোধীদের মুখপাত্র রাজা রাধাকান্ত দেব ৩৬,৭৬৩টি স্বাক্ষর-সম্বলিত আবেদন পেশ করলেন তখনকার গভর্নর জেনারেল ক্যানিং-এর কাছে। বিদ্যাসাগর পাঠান মাত্র একহাজারের স্বাক্ষর। তবু তিনি জয়ী হলেন। শান্তিপুরের তাঁতিরা তাঁদের কাপড়ে বুনে দিলেন নিজেদের মনের গীত, ‘বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে/ সদরে করেছ রিপোর্ট, বিধবাদের হবে বিয়ে’। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত-ও এ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। এছাড়া বিদ্যাসাগর-বিরোধীরাও ছেড়ে কথা কননি। তারা লিখলেন, ‘শুয়ে থাকুন বিদ্যাসাগর চিররোগী হয়ে’। আর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক প্রতিবাদ তো এল বঙ্কিমচন্দ্রের কাছ থেকে। ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে তিনি বিদ্যাসাগরের নাম উল্লেখ করেই বিধবাবিবাহের প্রতিবাদ জানালেন। এমন লিখতেও দ্বিধা হল না বঙ্কিমের, যিনি বিধবাদের বিয়ে দেন, তিনি ‘পণ্ডিত’ হলে দেশে মূর্খ কে?
প্রশ্নটা আসলে প্রগতিবাদিতা বনাম রক্ষণশীলতার। স্ত্রীর মৃত্যুতে বিপত্নীক বঙ্কিম পুনর্বিবাহ করেন, আর নিজ বিধবা কন্যা অন্য পুরুষের প্রেমে পড়লে তার মৃত্যুকামনা করেন। আর বিদ্যাসাগর নিজের ছেলে নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে বিধবা মেয়ের বিয়ে দেন। আর বলেন, বিধবাবিবাহের সাফল্য-ই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
তবে এই সাফল্য নানা কারণে যথার্থ হিতকর হতে পারেনি। সমাজ ও সাহিত্যে তাঁর প্রমাণ রয়েছে প্রচুর। বঙ্কিমের কুন্দ, রোহিণী, রবীন্দ্রনাথের বিনোদিনী, শরৎচন্দ্রের ‘বড়দিদি’ মাধবী, সাবিত্রী ও কিরণময়ী, রাজলক্ষ্মী— এদের জটিল জীবন যে একরৈখিক নয়, তাদের মন-মানসিকতা আর এক মহাকাব্য বিশেষ, যা বিবাহের মধ্য দিয়েই সমাধেয় নয়।
বাস্তবে পাই আর-এক চিত্র। যে তত্ত্ববোধিনী-তে বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ সমর্থিত হয়, সেই ঠাকুরবাড়িতেই যখন রবীন্দ্রনাথের এক দাদা, বীরেন্দ্রনাথের ছেলে বলেন্দ্রনাথ মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর স্ত্রী সাহানা দেবীর বাবা মেয়ের বিয়ে দেবার চেষ্টা করলে ঠাকুরবাড়ি থেকে বাধা আসে বলে সে বিয়ে হতে পারেনি। পরে আবার রবীন্দ্রনাথ উদ্যোগী হয়ে নিজপুত্র রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিধবা প্রতিমা দেবীর বিয়ে দেন, যা ছিল ঠাকুরবাড়িতে প্রথম। সে বিষয়ও তো ছিল উপন্যাসের মতোই দ্বন্দ্বমধুর। নিঃসন্তান দম্পতি এক গুজরাটি শিশুকে দত্তক নেন, কবি তাঁর সেই আদরের দত্তক নাতনিকে নিয়ে অনন্য কাব্যজগৎ নির্মাণ করেছিলেন। প্রতিমাকে ছেড়ে রথীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী মীরা দেবীকে ইলোপ করে দেরাদুন চলে যান। পুপে, ভাল নাম নন্দিনী, ছাড়া কি ‘সে’-র মতো ননসেন্স গল্প লেখা সম্ভব হত কবির?
বিদ্যাসাগর বস্তুত মানবহিতৈষণার এক অসীম সাগর। জীবনে কখনও কারও সঙ্গে আপস করেননি। শ্রীরামকৃষ্ণ পর্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এই প্রথম মানবিক ও এক-ই সঙ্গে নবজাগরণের একমাত্র নাস্তিক মহাপুরুষকে, আর জীবনের শেষে এসে যিনি ‘মিছে এ জীবনের কলরব’ উপলব্ধি করে শহর থেকে দূরে বিহারের কার্মাটারে সরল সাঁওতালদের সান্নিধ্যে কাটিয়ে গেছেন।
চিত্র: গুগল






