চলে গেলেন মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, যিনি শংকর নামেই সমধিক পরিচিত। যেমন তিনি বিপুল পরিমাণে লিখে গিয়েছেন, তেমনই জনপ্রিয়তাতেও ছিলেন সেরা। সম্ভবত তাঁর আগে জীবিতকালে কোনও বাঙালি লেখকের লেখা কোনও উপন্যাস একশো সংস্করণ পার করেনি। তাঁর প্রথম জীবনের কাহিনিভিত্তিক অবিনশ্বর উপন্যাস ‘কত অজানারে’ সেই গৌরব অর্জন করেছিল। খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক এই উপন্যাস অবলম্বনে ছবি তৈরি করা শুরু করেছিলেন। সন্ত্রাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং ঐতিহাসিকভাবে বাস্তব বারওয়েলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাসের মতো প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ছবিটি শেষ করা সম্ভব হয়নি প্রযোজকের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া না যাওয়ায়। তবে সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘জন অরণ্য’-কে অবলম্বন করে ছবি নির্মাণ করেছেন। এছাড়াও আরেকটি, ‘সীমাবদ্ধ’।
তাঁর লেখা কাহিনি নিয়ে ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ তৈরি করেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়। সবচেয়ে খ্যাতি পায় তাঁর কাহিনিনির্ভর ছবি, ‘চৌরঙ্গী’। ছবির প্রধান চরিত্রে অনবদ্য ও জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়-ক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন যেমন উত্তমকুমার, তেমনি এ-ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ে দীপ্ত হয়ে আছে শুভেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, উৎপল দত্ত, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অঞ্জনা ভৌমিকের অভিনয়।
বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার ছিলেন তিনি। ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ তাঁর অনন্য সৃষ্টি যেমন, পাশাপাশি ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল’। আবার এই লেখকের হাত দিয়েই বেরিয়েছে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’, ‘বোধোদয়’, ‘সার্থক জনম’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’।
লিখতেন ছোটদের জন্য-ও। এ পর্যায়ে তাঁর প্রথম লেখা বেরোয় ‘আনন্দমেলা’-য়। নাম ছিল ‘পিকলুর কলকাতা ভ্রমণ’। পরে আরও। এসবের এক সংকলন বেরোয় ‘এক ব্যাগ শংকর’ নামে। বিক্রি হয়েছিল রেকর্ড পরিমাণে।
জন্ম যশোরের নবগ্রামে। সে অর্থে তিনি বাংলাদেশের ভূমিপুত্র। ১৯৩৩-এর ৭-ই ডিসেম্বর জন্ম। পিতা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার ভারতের হাওড়ায় চলে যান। তাঁর পড়াশোনা সেখানেই। প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেন কিছুকাল। পরে কাজ করতেন ডানলপ নামে বিখ্যাত কোম্পানিতে। চাকরির পাশাপাশি লেখালেখি চালিয়ে গেছেন সমান্তরালভাবে।
জনপ্রিয়তার নিরিখে তাঁর লেখা আমেরিকা-ভ্রমণকাহিনি ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’-কেও বাদ দেওয়া যাবে না। যে বিষয় নিয়েই লিখুন না কেন, পাঠক শিরোধার্য করে নিয়েছে তা।
তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও অনুসন্ধানের বিষয় ছিল স্বামী বিবেকানন্দ। এ বাবদে আরও দুই হাওড়া-নিবাসী বিবেকানন্দ-অনুধ্যায়ীদের সঙ্গে তাঁর মিল দেখি,— শঙ্করীপ্রসাদ বসু এবং নিমাইসাধন বসু। ‘অজানা বিবেকানন্দ’ বইটিতে শংকর অনুসন্ধিৎসু গবেষকের মতো বিবেকানন্দ-চরিত্রের এ-যাবৎ অজানা বহু তথ্য তুলে ধরেন। বিবেকানন্দ নিয়ে তাঁর একাধিক বই আছে।
শেষবয়সে এসে আত্মজীবনীটিও লিখে রেখে গেছেন তিনি। স্বভাবতই তিনি তাঁর লেখায় ও কথাবার্তায় ছিলেন অসম্ভব রসিক। তাঁর লেখার পাঠক-বিমোহন এজন্যই।
চৌরঙ্গী পড়ে সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, বইটিতে এত মদ্যপানের কথা আছে, শংকর নিশ্চয়ই সুরাপ্রেমী? যখন তিনি শুনলেন, শংকর মদ ছোন না, মুজতবা বলেছিলেন, আমি মদ খেয়ে, মদের হালহকিকত জেনেও এমন লেখা লিখতে পারব না। শংকরের লেখক-জীবনের সত্যিকারের মূল্যায়ন হিসেবে এটাকে গ্রহণ করা যেতে পারে।
শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন। জরাসন্ধ যেমন কারাগারে চাকরিসূত্রে সেখানকার জগতের আলো-আঁধার নিয়ে লিখেছেন, বা বনফুল তাঁর বহু লেখায় এনেছেন তাঁর চিকিৎসক জীবনের ছবি, জীবনানন্দের সমূহ রচনা, তা কবিতা-ই হোক, কিংবা গল্প-উপন্যাস; আছে পূর্ববঙ্গের আত্মা, ঠিক সেভাবেই দেখি ‘কত অজানারে’-তেও কাহিনির সঙ্গে লেখকের নিবিড় নৈকট্য। আবার ‘চৌরঙ্গী’-তে তিনি এমন এক জগতের ছবি আঁকলেন, আম-বাঙালির যাতে কৌতূহল, অথচ অজ্ঞতা অসীম। পরবর্তীতে ঘোড়দৌড় নিয়ে সমরেশ মজুমদারের ‘দৌড়’, বা সার্কাস-জীবন নিয়ে সুধীররঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ‘দিনরাতের খেলা’, তৃতীয় লিঙ্গদের নিয়ে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’-এ আমরা অনুরূপ অজানাকে জানার পরিধিতে পাই। শংকরের লেখা পড়তে গেলে এসব বিবেচনায় অবকাশ আছে।
এভাবেই কর্পোরেট জীবনকে তিনি বিশ শতকের তৃতীয় সাথেই ধরেছেন, যখন এ-জীবন বাঙালি বা ভারতীয়ের মধ্যে একেবারেই অচেনা ছিল। ‘জন অরণ্য’ সাতের দশকের কলকাতা তথা পশ্চিম বাংলার অবক্ষয়িত সময়ের নির্মম দলিল।
দীর্ঘ বিরানব্বই বছর বেঁচেছিলেন তিনি। অতএব তাঁর মৃত্যুকে অকালপ্রয়াণ বলা যাবে না। তবে আমাদের আফশোস হয়, ক’মাস আগে বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান তিনি। এজন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। কোমরে অপারেশন পর্যন্ত করতে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা হয়নি আর তাঁর। ২০ ফেব্রুয়ারি মারা গেলেন তিনি। তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন, তাঁর মরদেহ যেন প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা না হয়। মৃত্যু-পরবর্তীতে তাঁর দেহ যেন হিমঘরে রাখা না হয়। তাঁর অধিকাংশ বইয়ের প্রকাশক দে’জ-এর কর্ণধার সুধাংশুশেখরকে তিনি তাঁর প্রয়াণ-পরবর্তী কর্তব্য করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন। সুধাংশুবাবুও সনিষ্ঠায় তাঁর সেই আজ্ঞা পালন করেছেন।
জীবনে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। আত্মজীবনী ‘একা একা একাশি’ তাঁকে এনে দিয়েছে দিল্লির সাহিত্য অকাদেমি (২০২২)। ১৯৭০-এ পান আনন্দ পুরস্কার, ‘কত অজানারে’ উপন্যাসের জন্য। ভারত সরকার ২০২৪ সালে তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ দিয়ে সম্মানিত করে। পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্কিম পুরস্কার, ১৯৯৩-তে, ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসের জন্য। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। স্ত্রী আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেলেন দুই কন্যা। আর দেশে ও বিদেশে তাঁর অগণিত ভক্ত পাঠককে।
চিত্র: গুগল







