Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

ভাষা কেবল কণ্ঠনালির কম্পন নয়, কেবল বর্ণের সারি নয়— ভাষা হল সেই অদৃশ্য নাড়ি, যা একটি জাতিকে তার শিকড়ের সাথে বেঁধে রাখে জন্মজন্মান্তরে। নদী যেমন তার উৎসের টানে বারবার ফিরতে চায়, মানুষও তেমনই তার মাতৃভাষার কাছে ফিরে আসে— ক্লান্তিতে, আনন্দে, বেদনায়। এমনকী মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও সে যে ভাষায় শেষ প্রার্থনা করে, সেটাও তার মাতৃভাষা। তাই মাতৃভাষার সাথে মিশে আছে আত্মার স্পন্দন।
ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম মাত্র নয়— সে বহন করে একটি জাতির স্বপ্ন, তার ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস, তার বিজয়ের উল্লাস, তার প্রেমের কোমল স্পর্শ এবং বিচ্ছেদের তীব্র যন্ত্রণা। কোনও অনুবাদ পারে না একটি ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকা সেই সংবেদনকে সম্পূর্ণরূপে অন্য ভাষায় রূপান্তরিত করতে।
মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ইতিহাস আজকের নয়। মধ্যযুগের ইওরোপের ইতিহাসে বেশ কিছু স্পষ্ট উদাহরণ আছে। সেকালের ইওরোপ ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের জগৎ। একদিকে গির্জার শিখর স্পর্শ করছে আকাশ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভাষা পড়ে আছে ধুলায়। লাতিন তখন কেবল ভাষা নয়— সে ক্ষমতার দুর্ভেদ্য প্রাচীর, অভিজাতদের অহংকারের মুকুট, ঈশ্বরের একমাত্র গ্রহণযোগ্য মুখপাত্র। এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে মানুষটি একা বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিলেন, তিনি দান্তে আলিগিয়েরি।
দান্তে কেবল কবি ছিলেন না— তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী। তাঁর একমাত্র অস্ত্র ছিল কলম, আর মনে ছিল মাতৃভাষার প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর যদি সত্যিই সকলের পিতা হন, তবে তিনি কেবল লাতিনে কথা বলতে পারেন না— তিনি কথা বলেন সেই মায়ের ভাষায়, যে ভাষায় শিশু প্রথম কাঁদে, প্রথম হাসে, প্রথম ডাক পাঠায় নিজের মাকে। এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিল তাঁর অমর কীর্তি ‘দ্য ডিভাইন কমেডি’— লোকমুখের তাসকান ভাষায় রচিত এক স্বর্গীয় মহাকাব্য।
তাঁর তাত্ত্বিক গ্রন্থ ‘দ্য ভুলগারি এলোকুয়েনশিয়া’ যেন আর একটি ইশতেহার— যেখানে তিনি ঘোষণা করলেন যে, মাতৃভাষা কৃত্রিম নয়, তা প্রাকৃতিক ও ঐশ্বরিক। লাতিনের মার্বেল প্রাসাদে তিনি যখন তাসকানের মাটির সোঁদা গন্ধ নিয়ে এলেন, তখন সেই প্রাসাদের দেয়ালে ফাটল ধরল— এবং সেই ফাটলের মধ্যে থেকে যে আলোর আলোর ছটা বেরিয়ে এল, তাতে দীপ্ত হয়ে উঠল ইওরোপীয় রেনেসাঁর ভোর।
বিশ্বসাহিত্যের অলিন্দে মাতৃভাষার ঝঙ্কারে দান্তে যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তা নিভে যায়নি— বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ছড়িয়ে পড়েছে মশালের মতো।
ইংল্যান্ডে জিওফ্রে চসার যখন ‘ক্যান্টারবেরি টেলস’ লিখলেন তীর্থযাত্রীদের মুখের ইংরেজিতে, তখন সেই ভাষা পেল প্রথম তার সাহিত্যিক মর্যাদা। পরে শেক্সপিয়র যখন তাঁর নাটকে রাজার ভাষা আর ভিখারির ভাষাকে একই মঞ্চে দাঁড় করালেন, তখন ইংরেজি হয়ে উঠল সর্বজনীন। সেই ভাষায় হ্যামলেটের দার্শনিক দীর্ঘশ্বাস এবং ফলস্টাফের অট্টহাসি একই সুরে বাজে।
রাশিয়ায় আলেকজান্ডার পুশকিন যখন অভিজাত মহলের ফরাসি ভাষার মোহ ত্যাগ করলেন, তখন তিনি শুধু একটি ভাষাই বেছে নেননি— তিনি বেছে নিয়েছিলেন একটি পরিচয়, একটি মাটি, একটি জাতির হৃদয়। তাঁর কবিতায় রুশ স্তেপের বিস্তার, বার্চ গাছের সাদা ছাল, শীতের নিষ্ঠুর সৌন্দর্য— সব কিছু পেল অমরত্ব। গ্যেটে জার্মান ভাষাকে দিলেন দার্শনিক গাম্ভীর্য। আর তলস্তয় রুশ গদ্যে ঢাললেন মানবজীবনের সমগ্র বেদনা এবং মহত্ব।
এই সকল লেখকের জীবন একটি সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে— মহৎ সাহিত্য কখনও অনুবাদের পাটাতনে দাঁড়িয়ে জন্ম নেয় না। সে জন্ম নেয় সেই মাটিতে, যেখানে লেখকের শৈশব লুটিয়ে পড়েছিল, যেখানে তিনি প্রথম রোদ্দুর দেখেছিলেন, প্রথম কেঁদেছিলেন, প্রথম প্রেমে পড়েছিলেন। সেই অনুভবের একমাত্র যথার্থ পাত্র হল মাতৃভাষা।
ইওরোপ থেকে এবার ফিরে আসি স্বদেশে। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক সংগ্রামের কথা লেখা আছে যেখানে মানুষ অস্ত্র হাতে লড়েছে, সিংহাসনের জন্য লড়েছে, অর্থের জন্য, ক্ষমতার জন্য লড়েছে। কিন্তু ঢাকার রাজপথে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির সেই দুপুরবেলা যে রক্ত ঝরেছিল— সে রক্ত ঝরেছিল একটি মায়ের মুখের ভাষার জন্য। পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার— এই নামগুলো আজ কেবল নাম নয়, এগুলো হয়ে উঠেছে এক-একটি প্রতীক। তাঁরা জানতেন না হয়তো তাঁরা ইতিহাস লিখছেন। তাঁরা জানতেন শুধু একটি কথা— মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া মানে মানুষকে তার সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। সেই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে তাঁরা বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে।
ফেব্রুয়ারির কৃষ্ণচূড়া প্রতি বছর যখন রক্তলাল হয়ে ফোটে, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই স্মরণ করছে সেই অকুতোভয় তরুণদের। তাঁদের রক্তে রাঙা সেই ইতিহাস ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়ে আজ বিশ্বজনীন— একুশে ফেব্রুয়ারি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র পৃথিবীর প্রতিটি বিপণ্ণ ভাষার জন্য এক জীবন্ত প্রেরণা।
উপসংহার পর্বে বলি, প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
কারণ সেই সমস্ত ভাষাও আমার না হোক, আর কারও মাতৃভাষা বৈ তো নয়।

চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী

Advertisement

6 Responses

  1. “ভালভাষা” একটি ভাল উদ্যোগ ।
    ব্যতিক্রমী , প্রয়োজনীয় ধারনা নিয়ে লিখতে চাই এখানে ।
    কোথায় – কি ভাবে পাঠাবো লেখা ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 4 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

যুদ্ধ: বৈশ্বিক কসাইখানা, পুঁজির সংকট ও শ্রমের মুক্তি

অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য। এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

বিশ্বকাপ জৌলুসে আর্জেন্টিনা গণহত্যার বধ্যভূমি

বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।

Read More »