দুনিয়া কারও ইচ্ছে মতো চলে না। দুনিয়া চলে তার নিজের ইচ্ছে মতো। আমি যতই যা কিছু ভাবি না কেন, ক্ষমতা নেই যে সে সবগুলো করি। যা হবার তাই হয়। আমার কাছে জিজ্ঞাসা করলে আমি কি বলব? বলার আমার কিছুই নেই।
তোমরা নাছোড় হলে যত দূর মনে করতে পারি বলছি। বহু দিন কেটে গেছে, হয়তো অনেক কিছুই অবচেতনে চলে গেছে, তাদের খুঁচিয়ে টেনে বের করে আনা খুব সহজ নয়, তবে চেষ্টা করা যায়।
এক অদ্ভুতুড়ে গ্রাম — নাম তার ভাতুড়ে — সেই গ্রামে বাড়ি ছিল এককালে। অবশ্য আমার জন্ম অন্য জায়গায়। জন্ম আমার মামাবাড়িতে — খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে। এগুলো আমার পরে শোনা কথা, মায়ের কাছে, অন্য গুরুজনদের কাছে। যাই হোক আমার জন্ম খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে ১৩২৮ সালের (বঙ্গাব্দ) ১৬ই কার্তিক বুধবার রাত আড়াইটের সময়।
আমাদের আদি বাড়ি ছিল খুলনা জেলারই বাগেরহাট মহকুমার খানকা গ্রামে। সেখানে খানকার চাটুজ্যেরা এককালে খুব নামকরা বিত্তশালী ছিল। এই বংশেরই আধমনি কৈলাস বিখ্যাত খাইয়ে। সেই খানকায় আমাদের আদি-বাড়ি ছিল।
সেনহাটিতে জন্ম হলে কি হবে আমার অন্নপ্রাশন হয়েছিল সেই খানকা গ্রামে। আমাদের বাড়িটা ছিল ভৈরবের পাড়ে। সেই ভৈরব নদী মাঝেমাঝেই পাড়, বাড়ি-ঘর — সব ভেঙে চুরমার করে দিত। এখন আর সেই চাটুজ্যে বাড়ির কিছু আছে কিনা তা আমি জানি না, বহু বছর আর ওদিকে যাতায়াত নেই।
আমার ঠাকুর্দার যে বাড়ি ছিল সে বাড়ি পরপর তিনবার ভৈরব ভেঙে দেয়। ফলে ঠাকুর্দা ভয়ানক ক্রুদ্ধ হন, পণ করলেন যে এমন দেশে গিয়ে বাড়ি করবেন যেখানে নদীই নেই। ভাঙনের কোনো প্রশ্নই থাকবে না। এই ঠিক করে তিনি এলেন তাঁর শ্বশুরবাড়ির দেশে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল যশোর জেলার কোতোয়ালি থানার ভেতরেই ভাতুড়িয়া নামে একটি গ্রামে। গ্রামের লোকের মুখে মুখে নাম হয়ে গেছিল ভাতুড়ে। আশে পাশে যারা ছিল তারা ভাতুড়েকে ভূতুড়ে বলতো।
কিন্তু পাশের গ্রাম ছিল চাঁচড়া। সেই চাঁচড়া খুব নামকরা গ্রাম। সেখানে দশ-মহাবিদ্যার মন্দির ছিল। সেখানকার রাজারা (জমিদার আর কি। জমিদাররা ‘রাজা’ উপাধি পেয়েছিলেন। তা সেই জমিদাররা) ছিল খুব বিখ্যাত।
সেই চাঁচড়ার পাশে ভাতুড়িয়া গ্রামে আমার ছোটবেলা কাটে। তবে ছোটবেলার কথা আমার এই বুড়ো বয়সে আর বেশি মনে পড়ে না।
আমার মনে পড়ে আমার যখন খুব অল্প বয়স, আমাদের গ্রামে তখন ছিল ভীষণ কাদা। বর্ষাকালে তো সেখান দিয়ে হাঁটাচলা করাই ছিল দুর্ঘট এবং সে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার ফলে আমি ছোট্টবেলা থেকেই যে অসুখে ভুগতাম তা আর কহতব্য নয়। এবং তার ফল হতো এই যে বর্ষার কয়েকমাস আমাকে গ্রাম থেকে আমার কাকার যে দোকান ছিল পুলেরহাটে সেই দোকানে এসে থাকতে হতো। কাকা বাড়িতে খেতে যেতেন। খেয়ে ফিরে আসবার সময় আমার জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। আমি ওইখানেই খেতাম, ওইখানেই পড়াশুনো করতাম আর ওইখানেই ঘুমোতাম। বর্ষার কয়েকমাস আমার আর বাড়ি যাওয়া হতোই না। শেষ পর্যন্ত আমাকে ভর্তি করেছিলেন যশোহর জিলা স্কুলে। যশোর-জেলা-ইস্কুল, সাংঘাতিক! খুব নামডাক ছিল।
আচ্ছা, এর মাঝে আর একটু কথা বলে নেবার আছে। কাকার দোকানে আমি কাকার পাশে বসে থাকতাম। তিনি জিনিসপত্র বিক্রি করতেন, দাম-টাম নিতেন, তবিল-টবিল মেলাতেন, বাড়ি চলে যেতেন। আমি ওই দোকানেই থাকতাম। দোকানের এক কর্মচারীও থাকত। নাম সীতানাথ। আমরা দুজন দোকানেই রাত কাটাতাম।
তখন আমি দেখেছি, আমার মনে আছে এক পয়সার নুন বিক্রি হত। দুই পয়সায় মোটা চালের সের ছিল এবং ভাল চাল তিন পয়সা সের ছিল। এক পয়সায় পাওয়া যেত আটখানা বিস্কুট — সেসব দিনগুলোর কথা মনে হলে মনে হয় সে যেন গল্প। গল্প না হলে পাগলের প্রলাপ, আর কিছুই তো বলবে না কেউ।
তা যাই হোক, যে কথা বলছিলাম — যশোর জেলা স্কুলে আমায় ভর্তি করে দেওয়া হলো। স্কুলে যাওয়া ছিল দুষ্কর। স্কুল ছিল বাড়ি থেকে এক মাইল দূরে।
ভর্তি হবার দিন একবার গেছি, আর তারপর সারা বছরের মধ্যে পাঁচ দিন কি সাত দিন স্কুলে গেছি আর স্কুল থেকে ফিরে এসেছি। খুব কষ্ট হত। তার ফলে আর পরীক্ষা-টরিক্ষা দেওয়াই হয় না।
প্রস্তুতি নেই তবু জোর করে সে বছর আমায় বসানো হলো। আমিও মহানন্দে গিয়ে বসলাম। বসে-টসে কি যে দিলাম তা আমিই জানি। তারপরে……যখন ফল বেরল……বাংলায় এক, ইংরেজিতে এক আর অঙ্কে রসগোল্লা — শূণ্য।
এই সব দেখে-শুনে তো বোঝা গেল আমার বিদ্যে ওই পর্যন্তই। তা এই যখন অবস্থা ঠিক সেই সময় কার মাথায় এল — আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক মামাবাড়িতে। সেখানে থেকে গ্রামের স্কুলে পড়ব।
তা গেলাম সেনহাটি গ্রামে, মামাবাড়িতে। সঙ্গে করে মা-ই নিয়ে গেলেন। নিয়ে গিয়ে দাদামশাইকে, হ্যাঁ দাদামশাই তখনও বেঁচে ছিলেন — তা দাদামশাইকে বললেন, “বাবা! এই একটা পাঁঠা জন্মেছে আমার পেটে — বিদ্যে-বুদ্ধি কিছুই নেই। এই পেয়েছে পরীক্ষায়…(আমার দুর্দান্ত সব নম্বর আগাগোড়া বললেন।) তুমি এটাকে একটু ভর্তি-টর্তি করে দেবার ব্যবস্থা করো।”
দাদামশাই পাড়ার একটি ছেলেকে বলে দিলেন, “এই এরে নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিস তো।”
ভর্তি হয়ে গেলাম, পড়াশুনো করতে লাগলাম। অবশেষে পরীক্ষায় দেখা গেল আমি সব বিষয়ে পুরো নম্বর। বাংলায় একশতে একশ, অঙ্কে একশতে একশ, ইংরেজিতে একশয় একশ, ইতিহাসে একশয় একশ — সব বিষয়ে একশতে একশ। হাতের লেখায় পঁচিশে পঁচিশ, এবং……আমি ফা-র্স্ট!! ‘ফার্স্ট’! সে আবার কি?
যাই হোক, সে সময় থেকে আমার পড়াশুনোয় খুব মন লেগে গেল। আমি তখন যেখানে যা পেয়েছি প্রাণপণে পড়েছি।
স্কুলের বই-টই দু-তিন মাসের মধ্যেই পড়ে শেষ করে ফেলতাম। তখন আমি বাইরের বই — গল্পের বই পড়তাম। মামাবাড়িতে ছিল একখানা ‘রামায়ন’ আর একখানা ‘মহাভারত’। রামায়নখানা ওই বাল্যকাল থেকেই আমি অন্তত দু-শ বার পড়ে শেষ করেছি। মহাভারতখানা সেই বাল্যেই স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় অন্তত পঁচিশ-তিরিশ বার পড়েছি। পড়ার ওপরে আমার সেই একটা প্রচণ্ড লোভ ছিল। এবং হঠাৎ দেখা গেল যে লোকটা, থুড়ি যে ছেলেটা প্রথমে সব জায়গায় গিয়ে শূণ্য পেয়ে এসেছে, সে ছেলেটা এখন সমস্ত পরীক্ষাতে পুরো পুরো নম্বর পাচ্ছে — শুধু তাই নয় সে যে বই একবার ধরেছে, সেই বইয়েরই আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত তার ঝরঝরে মুখস্ত। ক্লাসের ছেলেদের ডেকে ডেকে সে শোনাতো এবং ক্লাসের ছেলেরাও খুব মুগ্ধ হয়ে তার কাছ থেকে শুনতো, মাস্টারমশাইরাও ছেলেটাকে ভালই বাসতেন, সবাই যত্ন করে পড়াতেন। তা এরকমভাবেই স্কুলের জীবন কেটে গেছে।
স্কুলের অবশ্য অনেক কীর্তি আছে, পাড়ারও কীর্তি আছে। সব বলা যাবে না এখন।
কি বললি, শুনতেই হবে। আমিও বলছি, বলব আমি, এক কাপ চা করে দিবি — তাও না। কি বললি? দার্জিলিং টী — ওরেব্বাবা — তবে তো না বলে উপায় নেই।
না শুনে ছাড়লিই না। কই দেখি চায়ের কাপটা দে। আহ্, কি গন্ধ! শুনেই ছাড়লি তো। এমন নাছোড়বান্দা দুটো দেখিনি। শুনেই বা তোর কি মোক্ষলাভ হবে। তবু শুনতে চাস, শোন তবে।

আস্তে আস্তে যত বয়স বেড়েছে ততই কাজের ভার এসে পড়েছে — এই বাজারটা করে আনা — এই গরুটাকে একটু চরিয়ে নিয়ে আসা — এই ওবাড়ি থেকে একটু এই জিনিসটা আনা, সেই বাড়ি থেকে সেই জিনিসটা আনা — খুব ইয়ে হতো, মানে আমার খুব অসুবিধা হতো……আমি পড়ছি তখন বলে — এই জিনিসটা করে দে — ওই জিনিসটা করে দে। এইরকম লাগাতার ফরমাস করলে — পড়ার সময় ফরমাস করলে আমার মেজাজ যেত বিগড়ে।
যাই হোক, এই রকম বয়সে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। বন্ধুদের নিয়ে একটা লাইব্রেরী করলাম আমরা। নাম দিলাম আ-ন-ন্দ পা-ঠা-গা-র। সেটা আমার মামাদের চণ্ডীমণ্ডপেই প্রথম বসল। স্কুলে যেসব বই প্রাইজ-টাইজ পেতাম আর বন্ধুরাও যেসব প্রাইজ পেত সেইসব বই, তারপর এবাড়ি ওবাড়ি চেয়ে-চিন্তে যোগাড় করে আমরা আনন্দ লাইব্রেরী তৈরি করলাম। সেই আনন্দ লাইব্রেরী সেখানে কিছুদিন চলল।
তারপর আমাদের খেলা করা দরকার, তাই আমাদের কয়েকজন ছেলে মিলে ক্লাব তৈরি করতে হবে। কোথায় করা যায়? — অমুক জায়গায় — ওই জায়গাটা পড়ে আছে, তা যাদের জায়গা তারা বললেন, “ওই তো
ওখানে জঙ্গল হয়ে আছে, তা যদি তোমরা জঙ্গল-টঙ্গল পরিষ্কার-ঝরিষ্কার করে ক্লাব তৈরি করতে পার তো করো।” আমাদের আর পায় কে — আমরা মহাবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সেই জঙ্গলে। উদ্ধার করলাম। উদ্ধার-টুদ্ধার করে এর বাড়ি থকে চারটে বাঁশ, ওর বাড়ি থেকে তিনটে হোগলা এভাবে যোগাড়-যন্ত্র করে-টরে একটা চালাঘর তৈরি করা হলো। সেই চালাঘরকেই বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে সেখানে আমাদের নতুন লাইব্রেরী তৈরি হলো। ক্লাবের নাম হলো ‘সেনহাটি অ্যাথলেটিক ক্লাব’। তা সেই ক্লাবে ফুটবল খেলা হতো। গোল্লাছুট খেলা হতো। দড়িবাঁধা খেলা হতো। তখন তো হাডুডুকে আমরা হাডুডু বলতাম না, বলতাম যেন কি একটা — বোধ হয় গোল্লাছুট।
ছেলেবেলার কিছু ঘটনা এখনও আমাকে পীড়া দেয় — তখন দাদামশাই অসুস্থ, দিদিমা বললেন — “নন্দ যা তো মালার বাড়ি থেকে দু-টো ডাব এনে দে, খেলে লোকটা একটু শান্তি পাবে” — আমি বললাম, “আমি এখন পড়ছি — এখন পারব না।” আমি তখন রামায়ণের অনুচ্ছেদ বারবার পড়ছি “হিতোপদেশ কি বুঝিবি শোন রে বেটা গরু, তুই বাঁচিলে আমার বাপের কীর্তিকল্পতরু, নইলে তোরে বেঁচে থাকতে সাধ করে কি বলি, লোকে বলবে এই বেটাকে বেঁধেছিল বালি।” পড়া ছেড়ে আমি উঠলাম না। আধ ঘন্টা বাদে মালা দু-টো ডাব নিয়ে হাজির।
প্রসঙ্গত এমনি আর একটা গুরুতর ত্রুটির কথা বলে রাখি; বহুদিন পরে মায়ের মৃত্যুর আগে আমি নিয়মিত একদিন করে বাড়ি যেতাম মাকে প্রণামী দিতে। তেমনি একবার বাড়ি গিয়ে দুপুরে খাবার পর শুয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি — হঠাৎ মা জিজ্ঞাসা করলেন, “নন্দ, বৈদেহী বলতে সীতার কথা বলেছেন তো?” প্রশ্ন শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম, আমার মা বাংলায় খুবই জ্ঞানী ছিলেন, তাঁর এই সংশয়ের কারণ কী আমি চিন্তা করলাম আবিল তন্দ্রায় — বিদেহ শব্দের উত্তর ষ্ণিক প্রত্যয় করে পাওয়া যায় বৈদেহি — কিছুতেই মনে করতে পারলাম না — যে স্ত্রীয়াম ঈপ প্রত্যয়ে সীতাই বৈদেহী — সেদিন থেকে এখনও রোজ মায়ের কাছে ভুল বলার অপরাধের ভারে আমি ভুগছি। রোজ বহুবার করে ভুল স্বীকার করে যাচ্ছি, যতদিন বেঁচে থাকব করে যাব।
ভুল তো অনেক করেছি; কিন্তু ন্যায় কাজও কিছু যে করিনি তাও নয়। যেমন একবার হেড্মাস্টার গিরিজা প্রসন্ন দাশগুপ্ত মশাইয়ের প্রচণ্ড জ্বর হলো, আমি টিফিনে দেখা করতে গিয়ে দেখি তিনি জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে কেবল মাথা নাড়াচ্ছেন। গায়ে দেখি প্রচণ্ড জ্বর, হাঁসফাস করছেন; আমি শশীদাকে (দপ্তরী) বললাম টিউবওয়েল থেকে জল আনতে। তিনি-চার বালতি জল মাথায় ধারানি করতে দেখলাম কাঁপুনি একটু কমেছে। কিন্তু মাথায় তখনও গরম আগুন। শশীদাকে বললাম, গরম দুধ হোক বা বার্লি হোক যোগাড় করতে। শশীদা গরম বার্লি (তখন ছিল রবিন্সন বার্লি) আনতে ওই গরম বার্লি আর দুধ খাওয়াতে কাঁপুনি থামল — তারপর ঘন্টাখানেক মাথা টিপে দিতে একটু হুঁস হলো। বললেন, “তুই ক্লাসে যা। যাবার সময় একবার দেখে যাস।” ছুটির পর গেলে বললেন, “আমি ডাক্তারের কাছে শশীকে পাঠিয়েছি — কিন্তু খবর পেলাম, বীরেনবাবু এমনি জ্বরে পড়েছেন। একা সেনেদের একখানা ঘরে পড়ে আছেন। ওকে একটু দেখে যাস, তোদের বাড়ির কাছেই তো।”
গিয়ে দেখি বীরেনবাবুরও একই অবস্থা। মাথায় কয়েক বালতি জল ঢেলে গরম বার্লি খাইয়ে তাঁকেও তাউত করলাম। খুকু, বুবুদের বাড়ি থেকে তাঁকে দেখাশোনার ব্যবস্থা করে ডাক্তারকে খবর পাঠালাম।
বাংলার শিক্ষক শ্যামাপদ সেন, তাঁর দুই মেয়ে অঞ্জলি আর বীরু; তাঁর দাদা কালীপদ সেনের এক মেয়ে — তিনজন একই সঙ্গে কলেরায় পড়ল। ততদিনে সেবক হিসাবে আমার নাম একটু হয়েছে সম্ভবত মাস্টারমশাইদের প্রচারের গুণে। সুতরাং দে ওকে খবর — পেলাম রোগী তিনটি একই বিছানায় পড়ে, পায়খানা করে তার মধ্যেই পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। চেষ্টা করলাম তাদের তাউত করতে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা, কোনো ফল হলো না। সন্ধ্যা নাগাদ তিনটিই গত হলো। হিন্দু পাড়ার দেবেন ভট্টাচার্যের বৌয়ের কলেরা হলো। গিয়ে দেখি বাড়ির বাইরে গোয়াল ঘরে তাকে মেঝের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে — দেখেই মনে হলো — কাল ঘনিয়েছে — সন্ধ্যায় মারা গেল। এমনি অনেক তখন আমার নাম, কারো কোনো অসুখ হলেই — খবর দে ঐ ব্যাটাকে; তারাপদ, জ্যোতিষ ওরা এড়িয়ে থাকত, একমাত্র নিরঞ্জন ছিল সবসময় সঙ্গী। ডাকাবুকো কোনোকিছুতে পরোয়া ছিল না।
সবচেয়ে বড় বেহাল হলো ছোটমামীর অসুখ হলে, মামা গেলেন মামীকে নিয়ে হাওয়া বদলাতে পুরীতে। সেখানেই তাকে বিসর্জন দিয়ে ফিরে তিন মাসের মাথায় আবার নতুন মামী নিয়ে এলেন। মামার ছেলে সিদ্ধেশ্বর আক্রান্ত হলো বসন্তে, তিন-চার দিন ছট্ফট্ করে বেচারি নেতিয়ে পড়ল, মামা বললেন — “যা আজ একটু বাজার করে নিয়ে আয়, সিধু আজ একটু ঘুমোচ্ছে।” আমি বাজারে গিয়ে মাছ-তরকারি কিনে ফিরছি — রাস্তায় শ্যামদার সঙ্গে দেখা, খবর দিলো — “সিধে এক্সপায়ার্ড” — দৌড়ে এলাম বাড়ি।
আচ্ছন্ন সিধুকে বিছানাপত্র সমেত কোলে করে এক মাইল হেঁটে গেলাম তালতলা শ্মশানঘাটে। সঙ্গে দু-চারটি বন্ধু। পুড়িয়ে ফিরলাম বটে, সব সময় কানে বাজতে লাগল তার কচি গলার আধো আধো ডাক — “ছোড়দা গো বড় কষ্ট”। মাসখানেক শ্মশানঘাটে গভীর রাতে একা একা যেতাম। টের পেয়ে নিরঞ্জন জোর করে সঙ্গ নিল।
সময় সব ভুলিয়ে দেয় — “Time is the best healer” — পুরাতন প্রবচন কিন্তু সত্যিই তাই। আবার পড়াশুনায় ডুবে গেলাম।

কথায় আছে না — “সুকার্যে হইলে ইচ্ছা, সাধিও সত্বর, কুকার্যে করিও কাল বিলম্ব বিস্তর।” রাবণ মৃত্যুশয্যায়, তখন রাম তাঁর কাছে গেলেন — কিছু উপদেশের জন্যে। উপদেশ দিতে গিয়ে রাবণ বললেন, “আমি ভেবেছিলাম স্বর্গের সিঁড়ি গড়ে দেবো যাতে সকলেই সশরীরে স্বর্গে যেতে পারে। যেদিন ইচ্ছা যখন খুশি করলেই হবে; করছি করব করে গড়িমসি করে সে কাজ আর আমার করাই হলো না — কিন্তু যখনি সূর্পনখার নালিশে জ্বলে উঠে সীতাহরণ করলাম — যার ফলে এক লক্ষ পুত্র যার, সোয়া লক্ষ নাতি একজনও না রহিল বংশে দিতে বাতি।” এই ফাঁকে একটা প্রক্ষেপ শুনাই — আমার মেজভাই আমাকে একদিন বলল — “দাদা, আমার একটা গল্প আছে, আমাকে একটু এটা লিখে দেবে — আমার কাছে আমার এক যজমান চেয়েছে — সে কোনো কাগজে দেবে।” আমারও হলো রাবণের দশা — হলে তো হয়েই গেল — কিন্তু সেই হওয়াটা গত পাঁচ বছরেও হয়নি। তার গল্পটাই বলে নি — আমাদের বাড়ি থেকে স্টেশনে যাবার পথে কয়েকটা গেরো আছে — প্রথমে শিববাড়ি, একটা ঢিপি তখন অবশিষ্ট ছিল — তারপরে পুলেরহাট — ওইখান থেকেই টানা যশোর রোড — খানিক দূর গেলে বাজনদার পাড়া (মা বেরিয়ে গেলেন — তাকে বিদায় দিতে গিয়ে লেখার প্রবাহটা কেতরে গেল)।
এই বাজনদার পাড়ার বেশ নাম ছিল — কোনো লোক আসতে দেখলেই তারা জোর বাজনা বাজাতো — কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেই তারা মওকা পেয়ে আরও জোরে বাজাতে শুরু করতো যাতে শিকারের আর্তনাদ কেউ শুনতে না পায় — তারপর বিবস্ত্র দেহটাকে মরগায় ঠেসে দিত। মরগাকে এখন বলা হয় কালভার্ট। হঠাৎই ওরা বাজনা বন্ধ করে দিলো — “ওরে থাম, থাম। পরণাম রাজাবাবু পরণাম।”
হঠাৎই আমার পাশে একমাথা সাদা চুলের এক বুড়ো একটা এক্কাগাড়ি চালিয়ে এসে আমার আর ওদের মাঝখানে এসে গেল — তারপর আমার সঙ্গে সঙ্গেই চলতে লাগল।
সামনেই দশ-মহাবিদ্যার মোড় — যশোর রোড সোজা চলে গেছে, বাঁ-দিকে মোড় নিয়ে স্টেশনে যাবার রাস্তা গেছে। এক্কাটা আমার সাথে সাথেই চলছে। আমি জোরে হাঁটলে সেও জোরে চলছে — আস্তে চললে সেও আস্তে হয়ে যাচ্ছে। বাঁ-দিকে মোড় ঘুরেই একটা রাস্তা বেরিয়ে গিয়ে রাজবাড়ির পাশ দিয়ে গিয়ে আবার যশোর রোডে মিশেছে। এখান থেকে স্টেশনের রাস্তা সোজা বাঁ-দিকে গেছে। ওখানে এসেই এক্কাগাড়িটা আমার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বৃদ্ধ বললেন — “বাপু হে তোমার পেছনে ফেউ লেগেছে — তুমি এক কাজ করো — আমার ঘোড়াটার পেছনে গিয়ে তোমার জামা-কাপড় সব খুলে ফেলে ঝেড়ে ঝুড়ে আবার পরে নাও — চোখের ঘোর কেটে যাবে।” তাঁর কথামতো জামা-কাপড় ঝেড়ে পরে নিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি স্টেশনের আলো দেখা যাচ্ছে — গেটের আলো। গা ঝাড়া দিয়ে সোজা গেট পেরিয়ে বাঁ-দিকের চায়ের দোকানে বসে পরপর দু-কাপ চা গিলে ধড়ে প্রাণ এল। গাড়ির বাঁশি শুনতে প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়ালাম, গাড়ি এলে উঠব।
জীবানন্দ এগল্প অনেকের কাছে করেছেন, তাদের কেউ কেউ বলেছিলেন — “গল্পটি লিখে দিন — কাগজে ছাপিয়ে দেবো।” কেউ দিয়েছে কিনা জানি না। কিন্তু আমি গল্পটাকে লিখে ফেলে এত দিনে দায়মুক্ত হলাম।

প্রতিবেশিনী রমা বাগচী — খুবই হাঁকডাক তার — সেদিন দেখি তাকে একজন হাত ধরে এনে বাড়ি নিয়ে এলেন — লাইন পার হতে গিয়ে গাড়ি আসছে দেখে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে পায়ে লেগেছে — লেংচে হাঁটছেন, মরবার ভয়ে লাফ দিতে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়েছেন — মরবার ভয়ে লাফ দিয়েছিলেন। মরণ কী এতো সোজা জিনিস! আমি মরণকে প্রত্যক্ষ করেছি বেশ কয়েকবার — একবার নাতিকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে তিনটি সিঁড়ি টপকে পড়লাম হুমড়ি খেয়ে — নাতি আমার বগলদাবায় — তার কিছুই লাগেনি — আমার গোড়ালিতে একটু চোট লাগল — ও জায়গাটা আগেই চোট ছিল। সেও এক ইতিহাস — সকালে গাড়ি-ঘোড়ার ভিড় — অফিসে ঠিক সময়ে পৌঁছতে হবে — ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির কাছে চলন্ত ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে লাফ দিলাম, পায়ে বেশ লাগল — ঐ পা নিয়েই নেংচাতে নেংচাতে অফিসে গেলাম — অফিসে ডাক্তার এলেন এগারটায়। তিনি গুলার্ড লোশন তৈরি করে দিলেন — গোড়ালিতে পটি বেঁধে দিলেন — ব্যবস্থা দিলেন পটি শুকিয়ে গেলেই যেন ভিজিয়ে দিই। সারাদিন পটি ভিজিয়ে বিকেলের দিকে ব্যথা বেশ কমে গেল — কিন্তু আজও মাঝে মাঝে টের পাই। পরেও মাঝে মাঝে ওই ব্যথা চাগাড় দেয়।
এরপরে মরণকে মুখোমুখি করেছি আরও অন্তত তিন তিন বার। তখন আমার নাতি বেশ বড় হচ্ছে। নাতির কথাই হবে সাতকাহন। ও তখন একদম বাচ্চা — একদিন রাত বারোটার সময় ওর বাপ আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলল — “তুমি একবার ওবাড়ি [নাতির মামাবাড়ি, তখন সে সেখানে ছিল] যাও — ওরা কান্নাকাটি করছে” — আমি ছুটতে ছুটতে গেলাম। গিয়ে দেখি নাতি ঘুমাচ্ছে — নাড়ি দেখলাম বেশ স্বাভাবিক — নাড়া দিলাম — হাসল, বুক ওঠানামা করছে। আমি ওদের জানালাম ভয়ের কিছু নেই — ওকে ঘুমাতে দিন। লম্বা ঘুম দিয়ে পরদিন দুপুরে তার ঘুম ভাঙল। আর একবার এক রাত্রে উনি পরিত্রাহি কান্না ছুড়ে দিলেন — মা-বাবা কোলে করে হয়রান হয়ে আমাকে ডাকল। আমি বললাম — “বোধহয় পেট ব্যথা করছে — গ্রাইপ ওয়াটার খাইয়ে দাও” — ওরা জানাল খাইয়েছে তবু থামছে না। আমি কোলে নিয়ে বার-দুই পায়চারি করে আসি। সোফা-কাম-বেডে শুয়ে আমার কোলের কাছে খাঁজে ওকে চেপে দিলাম — উডওয়ার্ডস গ্রাইপ ওয়াটারের জন্যেই হোক বা আমার গায়ের গরমেই হোক ও ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল পরদিন দুপুরে। ওর যত খুনসুটি আমার সঙ্গে। এর পরে প্রথম যেবার আমরা দার্জিলিং গেলাম। প্রকাণ্ড বোঝা পিঠে নিয়ে ও তরতর করে চড়াই ওঠা-নামা করে। একটা গাড়ি নিয়ে আমরা গেলাম সূর্য ওঠা দেখতে টাইগার হিল — সেখানে গিয়ে দেখি যেখানে তিনি উঠবেন সেখানে এক প্রকাণ্ড মেঘ — যাঃ কপালে নেই। শুনলাম অনেকেই দু-তিন দিনেও দেখতে পায় না। ওদিকে নাতি কান্না জুড়েছে কিছুতে থামে না — আমি ওকে কোলে নিয়ে ভি-আই-পি কামরার মুখে এসে ঘোরাঘুরি করছি — দারোয়ানের মর্জি হলো ঘর খুলে দিয়ে বলল “ওকে নিয়ে ভেতরে গিয়ে দাঁড়ান — যদি কপালে থাকে — দেখতে পাবেন।” ঘরের ভেতরে ঠাণ্ডা অনেক কম। নাতির কান্না থামল বটে — আশঙ্কা কাটল না। হঠাৎ পেছনে ফিরে দেখি কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরে শিখরে লাফিয়ে ছুটছে সূর্যের আলো — আমরা হাঁ করে ওই নাচন দেখছি — হঠাৎ হইচই শুনে পেছনে ফিরে দেখি মেঘের চিহ্নমাত্র নেই — এক লাফে দিনমণি উঠে পড়েছেন। কপালের জোর ছিল — না হলে সেদিনের প্রথম প্রয়াসেই দুর্লভ দর্শন ঘটতো না। সেদিন ওখান থেকে নেমে কাঞ্চীদের কাছ থেকে পরপর দুই ভাঁড় চা খেয়ে খানিকটা গরম হলাম।
আসল চমক ছিল পরদিন। টাইগার হিল থেকে ফিরে সারাদিন হোমেই কাটালাম। ড্রাইভারকে বলা হলো পরদিন ভোরে আসতে যাতে সিকিম পর্যন্ত ঘুরে আসা যায়। ছেলের ছুটি শেষ হয়ে যাবে। তাকে সেদিন বাসে করেই ফিরতে হবে অফিস করতে।
প্রথম চমকঃ- ভোরে অন্ধকার কাটবার আগেই চালক হর্ণ বাজাল — আমরাও সাজ-পোষাক পরে তৈরি ছিলাম, নেমে এলাম — চালক তাড়া দিলো — “চট করে উঠে পড়ুন।” যথারীতি উঠে পড়লাম। চালক গাড়ি ঘোরাবার জন্য চেষ্টা করতেই বাঁ-দিকের সামনের চাকাটা পথ থেকে বেরিয়ে গেল। নাতিকে বগলে নিয়ে মনে মনে দুর্গানাম জপছি — চালক ব্যাকগিয়ার দিয়ে সামনের ডানদিকের চাকা আর পেছনের চাকায় ভর করে গাড়ি পেছিয়ে নিল — দেওয়ালের পাথরে ধাক্কা খেয়ে গাড়ি গড়গড়িয়ে নামতে লাগল — খুবই ধীর গতিতে গড়িয়ে এসে ম্যালের রাস্তায় পড়ল। চৌরাস্তায় যেতে হবে ঘোড়ায় চড়ে ছবি তুলতে, সে কাজের পরেই দৌড় সিকিমের উদ্দেশ্যে। গাড়ি খানিকটা এগোতেই পেছনে হইচই শোনা গেল — ঘাড় ফিরিয়ে দেখা গেল একখানা গাড়ি…
দ্বিতীয় চমকঃ- মরি-বাঁচি করে ছুটে এসে আমাদের গাড়ির গা ঘেঁষে বেগে বেরিয়ে গেল। ধাক্কাটা একটু জোর হলেই ফুট তিরিশেক নীচে গাড়ি সমেত পড়তে হতো।
তৃতীয় চমকঃ- সেদিন দিনটা ছিল গাঢ় কুয়াশায় ঢাকা। লাইন পার হতে গিয়ে তিন নম্বর লাইনে উঠে দেখছি এক দুই নম্বর লাইন খালি। ভাবছি আপ ডাউন দুটিই এক আর দুইয়ে যাবে। হঠাৎ দেখি একটি মহিলা চিৎকার করছেন — “গাড়ি আসছে, চলে আসুন শিগ্গির” বলতে বলতেই তিনি ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে লাইন থেকে বের করে নিলেন একেবারে বুকের মধ্যে — কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়ি তিন নম্বর লাইন দিয়ে চলে গেল, প্ল্যাটফর্মে উঠে ভাবতে লাগলাম — কী কেলেঙ্কারিটাই না হতে যাচ্ছিল।
চতুর্থ চমকঃ- তখন আমি বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে নিউ ব্যারাকপুর যেতাম মাসে অন্তত একবার করে। এখানে [দমদম ক্যান্টনমেন্টে] যেমন মাইকে বলে দেয় কোন গাড়ি কত নম্বরে আসবে নিউ ব্যারাকপুরে সে ব্যাবস্থা ছিল না — এখনও বোধহয় নেই। যাই হোক, আমি একদিন দুই নম্বরে নেমে অভ্যাস মতো লাফিয়ে উঠলাম — বোধহয় দশ সেকেন্ডের মধ্যে নিঃশব্দে ডাউন ট্রেন এসে হাজির — আমি লাফিয়ে উঠতেই এক মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন — “দাদুর কী সাহস” বলেই তিনি আমার হাত ধরে টেনে তুলে নিলেন একেবারে তার বুকের মধ্যে — “দাদু, এমন সাহস আর করবেন না।” সেই থেকে লাইন পারাপার করা ছেড়ে দিয়েছি — ওভারব্রিজ থাকলে তাই ব্যবহার করি।
তাই ভেবে দেখলাম সময় না হলে কিছুই ঘটে না।
না হলে আমার নাতিকে নিয়ে দু-আড়াই মাইল হেঁটে মতিঝিলে কে কে হিন্দু একাডেমিতে দিয়ে আসতাম — আবার দুপুরে খেয়ে গিয়ে নিয়ে আসতাম। নাতি বলতো, “পা ব্যথা করে — ঠাকুর্দা, চল রিক্সা করে যাই” — আমি বলতাম — “ভাই — ব্যথাকে প্রশ্রয় দিলে সে চেপে বসবে — ওকে অস্বীকার করে হারিয়ে দিতে হবে।” দু-তিন দিনে তার রপ্ত হয়ে গেল।
একবার বড় মজা হলো — এখন বলছি মজা, সেদিন কিন্তু মজা ছিল না। তখন নাতি হিন্দু স্কুলে পড়ে। লোকালে [ডাউন দমদম ক্যান্টনমেন্ট লোকাল] যাতায়াত করি। একদিন গাড়ির মধ্যে ঝিমুনি এসেছিল। নেমে ঘুম চোখে গেটের দিকে না গিয়ে আমি উল্টোদিকে যেতে শুরু করি — শেষে প্ল্যাটফর্মের মাথায় পৌঁছে চটকা ভাঙে। ফিরে এসে নাতির হদিস পাই না। বাধ্য হয়ে বাড়িতে ফোন করি — মায়ের মুখে শুনলাম এক পড়শীর ছেলে নাতিকে একলা দেখে ওকে শুধু যে স্কুলে পৌঁছেই দিয়েছে তাই নয় ফোন করে মাকে জানিয়েও দিয়েছে। আমি ছুটে বাড়ি এসে ওর টিফিন নিয়ে আবার ছুটলাম। স্কুলে গিয়ে দেখি শ্রীমান তেতলা থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখে তাড়াতাড়ি নেমে এল।
এবার একটা মজার কথা বলা যাক। নাতি তখন বড় হয়েছে — আমি সঙ্গী হয়ে তার অসুবিধা ঘটাচ্ছি — সে হয়তো দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠতে পারে — আমি সঙ্গে থাকায় তাকে একটা গাড়ি ছেড়ে দিতে হচ্ছে। নাতিই তখন আমাকে নিয়ে যায় — নিয়ে আসে। মাধ্যমিক পরীক্ষা ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত এই ভাবে চলল। পরে ভেবে দেখলাম নাতি ঠিকই বলে। একদিন গাড়ির জন্যে প্ল্যাটফর্মে বসে আছি — হঠাৎ একজন এসে প্রশ্ন করলেন — “দিনে কতক্ষণ আসন করেন? অন্তত তিন ঘন্টা নিশ্চয়ই।” প্রাণায়াম আহ্নিক করতে আমাকে ওই রকম সময়ই দিতে হয়। সেদিন দুধের লাইনে দাঁড়িয়ে আছি — একজন যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করলেন — “দাদু, আপনি এখনও গেলেন না?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম “কোথায়?” তিনি বললেন — “ওপরে।” জবাব দিলাম — “সময় হলে ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে যাবে — যেতে না চাইলেও ছাড়বে না।”
ছয়/দুই/পাঁচ তারিখে আমি প্ল্যাটফর্মে না গিয়ে সোজা ভেতর দিয়ে দুধের ডিপোতে গিয়ে লাইন দিয়েছি। দেখি দশরথ মণ্ডল আর গোপাল দে এসে হাজির। দুধের লাইনে আমি আছি কিনা?
একটা প্রাসঙ্গিক কথা বলা যাক। প্রথম চমকের পর আমরা ফিরে এলাম বাগডোগরা। এসে হা হতোস্মি — প্লেন খারাপ হয়েছে সকালে। শিলং থেকে পার্টস এবং কর্মী এসে ঠিক করে দিলে তারপর ফেরার প্রশ্ন। কর্তারা ওদের গাড়ি করে আমাদের পৌঁছে দিলেন পাঁচ তারা হোটেল সিনক্লিয়ার্সে। জন্ম সার্থক হলো, ঠাণ্ডা এবং গরম জলের শাওয়ার — বাথরুমের সঙ্গেই পায়খানা আর পোষাকের ঘর। রাতে কম্বলের নীচে শুয়ে গজালি। ছেলে বলল — সে রাতেই বাসে করে চলে আসবে যাতে মাঝপথে নেমে অফিস ধরতে পারে। আলোচনায় আমি প্রথম চমকের কথা বলতেই বৌমা একটি আপ্তবাক্য ছাড়লেন — “বাবা, অত চিন্তার কী ছিল — আমরা সবাই তো একসঙ্গে ছিলাম।” আমি তর্কের মধ্যে গেলাম না।
একসঙ্গে ছিলাম বলে যে সবারই একই গতি হবে এমন না ভাবলেও চলতো — বিশেষ করে আমার নাতিটি। ওর যে একটা দিকপাল দিগ্বিজয়ী ছেলে হবার কথা। আমি বিশ্বাস করি —
“মন্ত্রে তীর্থে দ্বিজে দেবে দৈবজ্ঞে ভেষজে গুরৌ
যাদৃশীর্ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী।”

যাকগে, একটু ছেলেবেলার কথায় যাওয়া যাক। তখন আমি খুব খোস-পাঁচড়ায় ভুগতাম। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে একটি বেদের ছেলে আমাকে ছুঁয়ে দেবে বলে ভয় দেখায় — আমি ছোঁয়াচ এড়াতে গিয়ে পাশের জোলের মধ্যে পড়ে গিয়ে পাঁচড়ায় ঘষা লেগে রক্তপাত হয় — অগতির গতি বন্ধু নিরঞ্জন আমার হাত ধরে জোল থেকে টেনে তোলে। ফেরবার পথে আমাকে বোঝায় “এমন দুর্বল শরীরে তো কিছুই করতে পারবি না।” আমি বললাম “কী করে শরীর ভাল করা যায়?” সে বলল “কুস্তি করলে খুব তাড়াতাড়ি উন্নতি হয়।” ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই কাজে নেমে গেলাম। তারাপদদের বাগানের একপাশে জায়গা কুপিয়ে মাটি চৌরস করে নিম পাতা আর খোল ঢেলে তার ওপরে গিয়ে দাঁড়ালাম — নিরঞ্জনের সঙ্গে — সে বলল — “আগে হ্যান্ডশেক করতে হয়” — বলেই আচমকা তার গোড়ালি আমার হাঁটুর নীচের গুলে এমন গোত্তা দিলো যে আমি ছিটকে গিয়ে পড়লাম — অবশ্য আমাকে টেনে খাড়া করল সে-ই। বলল — “ওঠ, ব্যথাকে প্রশ্রয় দিতে নেই। প্রশ্রয় পেলে সারতে লাগবে আট-দশ দিন — কেয়ার না করলে তিন-চার দিনেই ঠিক হয়ে যাবে।” আমার থেকে বয়সে খুব বড় না হলেও অভিজ্ঞতা তার অনেক বেশি। নাতিকে আমি পরে তাই শেখাবার চেষ্টা করেছি। যাক, পুরানো কথা আর একটু বলে নি। পাড়ার মাটির রাস্তা, দুপাশেই গভীর আড়া (জোল) — তার পাড়ে বসে কোঁথ দিয়ে দিয়ে পায়খানা, উল্টোদিকের পুকুরে শৌচকর্ম সেরে চলে যেতাম আখড়ায় — বন্ধুরা কেউই নিয়মিত যেত না। ঘন্টাখানেক কোস্তাকুস্তি করে আধ ঘন্টা জিরিয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম হাটখোলায়। ভৈরব নদীতে চান করে উঠে এলেই ঘোষরা এক তাল মাখন আর একটু মিছরি দিয়ে দিত। তাই মুখে ফেলে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরতাম। এসেই রাতে ভিজিয়ে রাখা ছোলা (গুণে গুণে চল্লিশটা দিয়ে আরম্ভ করেছিলাম) ক্রমে পরিমান বেড়ে একমুঠ হয়ে গেল।
তাই খেয়েও খিদে মিটত না। এদিকে নিম পাতা আর খোল ঢালার গুণ কোথায় যাবে? ঘা-পাঁচড়া আর দুর্বলতা কোথায় উবে গেল। নিয়মিত কুস্তি করার ফলে যেমন স্বাস্থ্য ভাল হলো তেমনি বেড়ে গেল মনের জোর। আমার চেয়ে যারা বয়সে বড় তারাও আমার কাছে হেরে যেত। তারপদদের বাড়িতে আখড়া হওয়া সত্বেও ওর কোনোদিন গা ব্যথা — কোনোদিন ঘুম থেকে উঠতে আলস্য — সেই থেকে বুঝলাম — আলস্যকে লাই দিলে সে চেপে বসে। বুঝলাম আরাম সত্যিই হারাম। আগেই বলেছি ক-টা ছোলা খেয়ে খিদে মিটত না।
কোমরে একখানা চাকু গুঁজে গিয়ে উঠতাম নারকেল গাছে। গোটাপাঁচেক ডাবের জলে যেমন শরীর ঠাণ্ডা হতো পেটটাও ভরতো।
এইখানে আর একটা ভুলের কথা বলতে হবে। পেছনের বাড়িতে আদিত্য ভট্টাচার্য বলে এক অধ্যাপকের বাস ছিল। তাঁর মা ছিলেন এক খাণ্ডারনি। তাঁর মেয়ে একদিন মামাদের বাড়ির উপর দিয়ে ডাকবাক্সে চিঠি ফেলতে যাচ্ছিল। তাকে আমি গেট আটকে বললাম — “এবাড়ির ওপর দিয়ে যাওয়া যাবে না — বড়রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে হবে।” কেন, কেন? তার খাণ্ডারনি ঠাকুমা সুধামামীকে যে খোয়ার করেছে তার দায় তাকেই পোয়াতে হবে।
আগেই বলেছি কুস্তি করার ফলে আমার শরীরের ঘা-পাঁচড়া কোথায় মিলিয়ে গেল — গায়ে রীতিমতো জোর বেড়ে গেল — আর বাড়ল ক্ষুধা (খিদে) — একমুঠ ছোলা আর এক ডেলা মাখনে তা মিটতো না — কী খাব কী খাব ভাবতে ভাবতে একখানা চাকু পকেটে নিয়ে রাস্তায় যেতে যেতে পরমেশ্বর মুখুজ্যের নারকেল গাছে উঠে পড়লাম। ছুরি দিয়ে নারকেলের মুখটা ছাড়িয়ে মানানসই ফুটো করে — জল খেয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেললাম — আরও গোটা কতক না খেলে পেট ভরবে না — কিন্তু কপালের ফের কোথায় যাবে — পরমেশ্বর মুখুজ্যে এসে হাজির — “এই গাছে কেডা রে?” জবাব দিলাম — “আমি খড়কির ছেলে নন্দ।” — “ও, তুই বাণীদার দুইত্তুর। তা খাচ্ছ খাও, কিন্তু দাদা আমার শিবকে চান করাবার জন্যে দু-টো ডাব পাড়ে দিও।” আমি কলাম — “ডাব যদি নীচে ফেলি জল সব মাটিতেই যাবে। একখানা দা আর দড়ি যদি দিতি পারেন তালি ডাব পাড়ে দিতি পারি।”
সঙ্গে সঙ্গে তিনি কলেন — “দাঁড়াও দাদা, আনে দিচ্ছি।” গোয়ালের গোরুর দড়ি আর দা নিয়ে খানিক বাদে হাজির। ততক্ষণে আমার পেট ভরেছে। ওর ডাব পেড়ে দিয়ে এসেই জামা-কাপড় পরে স্কুলে যাব বেরোচ্ছি — পেছন থেকে হাঁক — “ওরে খেয়ে যাবি তো” — তখন সময়ও নেই আর পেটেও জায়গা নেই। দাদামশাই একটা আনি দিয়ে বললেন — “এক পয়সার মুড়ি-বাতাসা খেয়ে নিস।” সেই দিন থেকেই আমার টিফিন খরচ বরাদ্দ হলো এক আনা করে। ক-দিন পর দাদু বললেন — “আমার একটা কাজ করিস তো। বাজারের মুখেই উপেন কুরির দোকান। বছর দুই হলো উপেন আমার কাছে কিছু টাকা ধার চাইল। আমি ওকে বললাম — “আমার তো সংসার খরচের বাইরে বাড়তি টাকা নেই —
“তবে আমার মেয়ের কিছু টাকা আমার কাছে গচ্ছিত আছে। তাই দিয়ে তোমার যদি উপকার হয় নিতে পার, কিন্তু মাসে এক পয়সা করে সুদ দিতে হবে।” দাদু আমাকে বললেন — “ওর কাছে তোর মায়ের কিছু টাকা আছে — তাগাদা দিয়ে যদি কিছু আদায় করতে পারিস।”
গালদা পর্বঃ আমি বাজারের মুখে উপেন কুরির দোকানে গিয়ে বললাম — “দাদু বলেছেন তার কী টাকা পাওনা আছে তা দিয়ে দিতে।” উপেন বলল — “ও, তুমি মাস্টারমশায়ের নাতি — তা এখন তো টাকা দিতে পারছি না — তুমি এই নাও, খাও।” এক ঠোঙা মুড়িতে এক হাতা বুঁদে মিশিয়ে গোটা আষ্টেক আঠা-কদমা মিশিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। আমি বললাম — “আমার তো পয়সা নেই — দাম দেবো কী করে?” উপেন বলল — “পয়সা কে চায় — উলটে তো তোমাকে দেবার কথা — তুমি মাস্টারমশায়ের নাতি — তোমার কাছ থেকে আমি পয়সা নেব ভাবলে কী করে — যাও, দাদুকে বোলো এখন হাতে টাকা নেই — সুযোগ হলেই কিছু দিয়ে হালকা হব।”
সেই আমার শুরু হলো মিষ্টি খাওয়া — কোনোদিন দুটো রসগোল্লা — কোনোদিন এক হাতা ঘি-মাখা কাঁচাগোল্লা আমার বরাদ্দ হয়ে গেল। দাদামশাই যে এক আনা দিতেন তা দিয়ে নিমরের বাজার থেকে এক পয়সার পাটালি কিনে খেতে খেতে স্কুলে যেতাম — আবার টিফিনের সময় শেষ বাজারে আর এক পয়সার পাটালি নিয়ে খেতে খেতে বাড়ি ফিরতাম। দুপুরে দোকান বন্ধ করবার সময় একটু বেশিই পাওয়া যেত।
বাবা কদাচিৎ সেনহাটি এলে ছোটমামী রঙ্গ করে বলতেন — “তোমার তো হাত দিয়ে জল গলে না — কোঁথ পেড়ে পেট খালি করো না — পাছে খাবার খরচ বাড়ে।”
শুনতে শুনতে দাদামশাইয়ের মনে বোধহয় ক্ষোভ হতো। একদিন তিনি বাবাকে বললেন ছাত্র ঠেঙান গলায় জোরে জোরেই সবাইকে শুনিয়ে — “কেষ্ট, তোমাকে তো আমি কিছুই দিইনি খড়কিকে শাখা-শাড়ি ছাড়া — তা তুমি এক কাজ করো — আমার একটা ছোট জোত আছে গালদায় — এখন তো আমার বয়স হয়েছে — আর দৌড়ঝাঁপ করতে পারি না — তোমার বাড়ির কাছে — আমি খড়কির নামে ওটা লিখে দিচ্ছি — তুমিই এখন থেকে আদায়-উশুল কোরো।” বাবা তখন পেটজোড়া পিলে আর বাতে ভোগেন — এমন ভোগেন যে কোলে করে চ্যাংদোলা করে তাঁকে নিয়ে যেতে হয় বক্রেশ্বরে উষ্ণকুণ্ডে চান করাতে। আস্তে আস্তে জলে নামিয়ে দিলে বাবা নিজেই চান করে উঠে আসেন। ধর্মরাজতলায় সেবাইত তাঁকে বলেন — “শিঙি মাছ, মুসুর ডাল খাবেন না, আর এই এক শিশি তেল দিলাম নিয়মিত মালিশ করবেন, পুরো সুস্থ হয়ে যাবেন।”
যাই হোক, বাবা আমাকে গালদা পাঠালেন দাদুর দেওয়া জোতের আদায় উশুল করতে, তখনও এক পয়সার পোস্টকার্ড ঠিকানায় পৌঁছে যেত — বাবা আমার হাতেও একটা হাত-চিঠি দিয়ে দিলেন, বলে দিলেন — “সকাল সকাল যাও রোদ চড়ার আগেই যাতে ফিরতে পার।”
সকালে চিড়ে নারকেল-কোরা আর গুড় খেয়ে আমি সাইকেলে চেপে ছুটিয়ে দিলাম — আট মাইল রাস্তা ঠেঙিয়ে যখন পৌঁছালাম — তখন গণগণে রোদ্দুর তেষ্টায় গলা কাঠ। ঘন্টাখানেক গাড়ি চালিয়ে একটা বাড়ি দেখে সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম যদি একটু জল খাওয়া যায়। বাড়ির বারান্দায় একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি বসেছিলেন — তার কাছে উদ্দিষ্ট ঠিকানার কথা প্রশ্ন করতেই তিনি উঠে এসে আমার হাত ধরে আমাকে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে একটা পাটি পেতে বসতে দিলেন। আমি আবার জল চাইলে বললেন, “দাদাঠাকুর ব্যস্ত হবেন না — ঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন।” বাড়ির ভেতরে হাঁক দিয়ে বললেন — “কোথায় গেলে সব — শিগগির এক ঘটি জল নিয়ে এস” — মাঝবয়সী এক প্রৌঢ়া এক ঘটি জল এনে আমার পায়ে ঢেলে পা ধুয়ে দিলেন — আঁচল দিয়ে পা মুছিয়ে দিয়ে বললেন — “দাদুঠাকুর ভাল হয়ে বসুন — জল এনে দিচ্ছি। ওরে বিজয়, গাছ থেকে দু-টো ডাব পেড়ে দে তো বাবা। দাদুঠাকুর এই রোদ্দুরে পুড়ে এসে জল খেতে চেয়েছেন — আমরা তো ওঁকে জল দিতে পারব না — উনি গাছের জলই খাবেন।” পা দু-খানা ধুয়ে দু-টো ডাব খেয়ে আমি বললাম — “টাকা পয়সা কী দেবেন দিন — আমি সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়ি।” আঁৎকে উঠে প্রৌঢ় বললেন — “তা কী হয় দাদুঠাকুর — আপনি এই ঠা ঠা রোদ্দুরে বেরুলে নিজে তো কষ্ট পাবেনই — আমার গুষ্টিও। বসুন, রান্নাবান্না করে খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম করে বেলাবেলি বেরিয়ে বিকাল বেলায় বাড়ি পৌঁছে যাবেন। তাছাড়া আমাকে তো সবার কাছ থেকে টাকাকড়ি যোগাড় করতে হবে।”
পা ধুয়ে আমি খুব আরাম পেলাম। মনে পড়ল — মা বলতেন “পাদয়োর্ভিদ্যেৎ ক্রোশান্তরম্।” অগত্যা — কথাটা তো বেঠিক নয়। আমি তো দিনক্ষণ জানিয়ে ওদের দিইনি। যোগাড়ের সময় চাইই।
বিজয়ের বৌ দু-টো উনুন জ্বালিয়ে একটাতে প্রকাণ্ড এক হাড়ি — আর একটাতে এক কড়াই চাপিয়ে দিলো। প্রৌঢ় বললেন — “দাদুঠাকুর, ওই পুকুর থেকে এক কলসি জল আপনাকে আনতে হবে রান্নার জন্যে। ভাবতে হবে না — বৌমা আপনাকে সব দেখিয়ে দেবেন।”
বুঝে ফেললাম — বাক্য ব্যয় বৃথা — পড়েছি যবনের হাতে। হাড়ি ভরতি জল দিয়ে চাল চাইলাম। বিজয়ের বৌ দেখলাম মিটি মিটি হাসছে, বলল — “হাড়ির অর্ধেকটা জল এই কড়ায় ঢালুন — এইবারে হাড়িতে চাল দিন। ক্ষেতের কোটা তরকারি কলসির জলে ধুয়ে কড়াইতে দিন। এই খুন্তিখানা ধুয়ে কড়াইতে নাড়বেন।”
যাই হোক বিজয়ের বৌয়ের কথামতো রান্না তো করলাম।
দু-খানা কলাপাতা জুড়ে তার ওপর ওই হাড়ি ভর্তি ভাত ঢেলে দিলো — তরকারির কড়াইটা এনে পাতার সঙ্গে জুড়ে দিলো — “এবার ভোজন শুরু করুন।” আমি বললাম — “এত ভাত তো আমি ক-দিনে খাব?” প্রৌঢ় বললেন — “আপনি একা খাবেন আর আমরা গুষ্টিশুদ্ধ উপোষ দেবো নাকি? কপালে আজ বাহ্মণের প্রসাদ আছে — ঠেকাবে কে? কত দিনে এমন ভাগ্য হয়?”
যাই হোক, কিছু ভাত আর তরকারি হাতায় করে তুলে নিলাম। খাওয়া হতেই বিজয়ের বৌ একটা নতুন পাটি পেতে দিলো। বিজয়ের বাবা বললেন — “ঠাকুরদাদু, এবার আপনি বিশ্রাম করুন। আমরা প্রসাদ পাব। তারপর বেলাবেলি আপনার রওনা হওয়ার আয়োজন করা আছে।” রওনা হয়ে মাইল ছয়েক এসে এক গরুর গাড়িকে পাশ দিয়ে দাঁড়িয়েছি — গরুর ঢাউস পেটটা আমাকে একটু ঘেঁষে দিয়ে চলে গেল আর আমি গড়গড়িয়ে নেমে গেলাম ঢালে — গাড়ি চলে গেলে উঠে দেখলাম যিনি এতক্ষণ আমাকে বয়ে নিয়ে এসেছেন এখন তিনিই আমাকে তার বাহন করলেন। যাই হোক সাইকেল বয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল — বাবা বললেন — “টাকা কত এনেছিস আগে হিসেব দে।” “ছেলেটা এল একটু হাতে-মুখে জল দিক” বলে মা আমাকে এক ঘটি জল এনে দিলেন। আমি চোখে-মুখে জল দিয়ে ঢক ঢক বাকি জলটা গিলে নিলাম। মা বললেন — “খালি পেটে এক ঘটি জল খেয়ে নিলি? আমি তো খাবার আনতে গেছি?”
বললাম — “মা, আমি বিজয়ের দুই ছেলেকে এক টাকা করে জলপানি দিয়েছি।” বাবা চটে গিয়ে বললেন — “আমাকে আদায় উশুলের হিসাব মেলাতে হবে না? ওর নামে দু-টাকা খরচা লিখে দেবো। তা ছাড়া সাইকেল মেরামত করতে হবে তো — সকালে গিয়ে যেন সাইকেল সারিয়ে আনে।”

কথা তো অনেক আছে। কিন্তু পারম্পর্য রেখে বলা মুশকিল।
বড় হয়ে সেনহাটি স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করে এসে দৌলতপুর কলেজে ভর্তি হলাম।
ততদিনে আমি বদলাতে শুরু করেছি। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সিট পড়েছিল খুলনা সদরে। শ্রীযুক্ত চুনীলাল ব্যানার্জির খুলনায় একটা বাড়ি ছিল — কলকাতাতেও ক্রীক রোডে আর একটা বাড়ি ছিল। এর উপযোগিতা ছিল দেশ থেকে কেউ এসে যেন রাস্তায় পড়ে না থাকে।
পরীক্ষার সময় মামার সুপারিশে চুনীবাবুর ওই বাড়িতে জায়গা পেলাম। আমার বরাবরের অভ্যাস পরীক্ষার আগের রাতে সব পড়াটা একবার ঝালিতে নেওয়া। চুনীবাবুর একটি মেয়েও সেবার পরীক্ষা দেবে। তাছাড়া চন্দনীমহলের জনা পাঁচেক ছাত্র ছিল।
দো-তলায় মেয়েটি আর এক তলায় একটা ফালি বারান্দায় আমি প্রায় সারারাতই পড়তাম। অন্যরা সকাল সকাল খেয়ে বেড়িয়ে এসে হাওয়া খেয়ে এসে সকাল সকাল শুয়ে পড়তো। এইভাবে শেষ পরীক্ষার দিন এসে গেল। ঠিক হলো সেই রাতটাও ওইখানে কাটিয়ে — সকালের প্রাতরাশ সেরে যার যার বাড়ি যাওয়া।
সেই রাতে ন-টা নাগাদ খাওয়ার পর চার বন্ধু এসে ধরল — “চল একটু ঘুরে আসি — বেশি দূর যাব না, গান্ধী পার্ক, করোনেশন হল পর্যন্তই — তারপরই এসে শুয়ে পড়ব।” রাস্তায় বেরিয়েই চার জন স্বমূর্তি ধারণ করল — “শালা ভাল ছেলে আর আমরা বখা — তোর সতীপনা আজ ঘুচাবই; এই নে” বলে এক প্যাকেট পাশিং শো সিগারেট খুলে চারজনে চারটে ধরিয়ে আমার দিকে প্যাকেট এগিয়ে দিলো — আমি বললাম — “যদি খেতেই হয় — ওই চার পয়সা প্যাকেটের সিগারেটে কুলোবে না, অন্তত ক্যাপস্টান ম্যাগনাম চাই।” ওরা বলল — “দে তাই দে।” দুই আনা দিয়ে এক প্যাকেট কিনে একটা আমাকে দিলো — প্যাকেটের বাকিগুলো ওদের রইল — সিগারেটে টান দিয়ে ফু করে ধোঁয়া উড়িয়ে দিলাম — “ওতে হবে না — ধোঁয়া গেল।” ওদের নেতা অমরেশ — সে বলল — “ওরে চল, ছোট এলাচ আর মৌরি দিয়ে পান খা।” এই অমরেশের ছোট ভাই এখানে ইঁট, বালি, চুন-সুরকির ব্যবসা করে।

১৯৩৮ সাল। খবর পাওয়া গেল সুভাষবাবু দৌলতপুর কলেজে আসছেন — আমরা উল্লসিত — দল বেঁধে ছুটলাম তাঁকে দেখতে, গান্ধীকে হারিয়ে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন।
বেটে মানুষ তো আমি — কারও বগলের নীচ দিয়ে গলে কাউকে কাঁধ দিয়ে ঠেলে একেবারে সুভাষবাবুর পেছনে গিয়ে তাঁর পাঞ্জাবির কোনটা ধরে হোস্টেল পর্যন্ত গেলাম। ফেডারেশনের সঙ্গে মিনিট পনের আলোচনা করে তিনি খুলনায় চলে গেলেন — করোনেশন হলে উঠে পার্কে আর সভা করা হলো না — কারণ থই থই পা রাখবার জায়গা নেই। মিনিট পনের ছোট্ট বক্তৃতা করে তিনি গাড়িতে চড়ে বসলেন।
ছুটে গেলেন সেই গান্ধীর কাছেই। গান্ধী তাঁকে বললেন “তোমার পছন্দমতো কমিটি তুমি গড়ে নাও — তুমি নির্বাচিত সভাপতি — এটা তোমারই অধিকার।” সুভাষ যাঁকেই ডাকেন তিনি কমিটিতে আসতে রাজি হন না। বারদৌলির সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, বিহারের রাজেন্দ্র প্রসাদ, তামিলনাড়ুর রাজা গোপালাচারি, দিল্লির আবুল কালাম আজাদ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু সবারই এক কথা “তুমি গান্ধীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এস।”
সুভাষচন্দ্র আবার গেলেন গান্ধীর কাছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “তুমি কী চাও?” সুভাষ বললেন “ইংরাজকে বলো তারা ভারত ছেড়ে যাক — আমাদের দায় আমরাই বুঝে নেব।”
গান্ধী বললেন — “না, ইয়োরোপের অবস্থা এখন অত্যন্ত জটিল — সম্ভবত আর একটা যুদ্ধ আসন্ন। এখন রাজভক্তি দেখিয়ে তাদের মন জয় করতে হবে।” তিনি গেলেন লন্ডনে নিয়ে এলেন সাইমন কমিশন । আর স্ট্যাফোর্ড ক্রিপ্স প্রস্তাব। [সাইমন কমিশন ১৯২৮ সালে ভারতে আসে, ক্রিপ্স প্রস্তাব এসেছিল ১৯৪২-এ]
এদিকে ১৯৩৮-এ হরিপুরা কংগ্রেস কার্যকরী না হওয়ায় ১৯৩৯-এ আবার ত্রিপুরী কংগ্রেসের নির্বাচন হলো — এবারও সুভাষ জিতলেন কিন্তু কমিটি তৈরি করতে গিয়ে আবারও আগের মতো অচল অবস্থা।
এদিকে দেশে তুমুল হট্টগোল। দলে দলে জনতা ধ্বনি দিচ্ছে — “কমিশন হঠ যাও — ইংরেজ ভারত ছাড়ো।” এই টাল-মাটালে সুভাষ কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ঘোষণা করলেন ‘অগ্রগামী দল’। তৈরি হলো ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’। কিন্তু ইংরেজ সরকার সুভাষকে আটকে রাখলেন। তিনি আমরণ অনশনের ঘোষণা করলেন। জনগণের আন্দোলনের চাপে প্রথমে সরকার তাঁকে হাসপাতালে পাঠালেন, পরে তাঁকে স্বগৃহে অন্তরীণ করে রাখলেন। তিনি মৌনব্রত ঘোষণা করলেন।
তখন দেশ-জুড়ে বামপন্থী হাওয়া। উত্তাল জনগণ মিছিলের পর মিছিল করে চিৎকার করছে — “ইংরেজ ভারত ছাড়ো।” শেষ পর্যন্ত গান্ধী বিয়াল্লিশ সালে বোম্বাই কংগ্রেসে ‘ভারত ছাড়ো প্রস্তাব’ গ্রহণ করতে বাধ্য হলেন।
সুনুর [লেখকের পুত্র] মা সরোজ নলিনীতে মন্তেসরি ট্রেনিং নিতেন। সেখানে তার পরিচয় হয় শান্তি, সুখ ও বিজয়ার সঙ্গে। তখন বামপন্থী হাওয়ার প্রচণ্ড দাপাদাপি। ওদের টাকা দরকার কী সব পরামর্শ করে একদিন ওরা গেলেন বিধান রায়ের বাড়ি। বিধান রায়ের দরজার দারোয়ান তাকে আটকে দিলো। বিধান রায় পর্দা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে তাকে ভেতরে ডেকে নিলেন — বললেন “আঁচলের আড়ালে কী আছে দেখি।” ওই মানুষের কথা অমান্য করতে পারলেন না। তার হাত তখন ঠক ঠক করে কাঁপছে। বিধান রায় বললেন “ওটা আমাকে দাও।” হাতে নিয়ে বললেন “যাক, সেফটি ক্যাচ খোলা নেই। থাকলে একটা কাণ্ড হতে পারতো।” সহকারীকে বললেন — “ওরে এক গেলাস দুধ, দু-টো কলা, দু-স্লাইস রুটি ডিমের পোচে ভেজে এনে দে তো” — “তা তোমার সাথীরা কোথায় — তারা আবার গোল পাকাবে না তো?” সুনুর মা বললেন — “না, ওরা শুধু খবর দেবে।” ডাক্তার বললেন “টাকা নিতে এসেছিলে — এই আমার ব্যাগ নাও — যা আছে সব নিয়ে নাও।”
সুনুর মা বললেন “না, আপনার ব্যাগ আমি নেব না, টাকাগুলো আঁচলে বেঁধে নিয়ে যাব।” ডাক্তার হেসে বললেন — “তোমাদের কথা আমি জানি, যাকে যা দেবার, আমি ঠিক দিয়ে দেবো — ভেব না। তুমি এখান থেকে সোজা মেডিক্যাল কলেজে যাবে। ওখানে গিয়ে অমূল্য উকিল বা কে-এন দে যাকে পাবে এই স্লিপটা দেবে। তোমার ওপর আমার নজর থাকবে। তোমার ভালমন্দের দায় আমার — সোজা চলে যাও।”
ওই দিনের খবরের কাগজ টেবিলের ওপর ছিল। সেই কাগজের একটা কোনা ছিঁড়ে নিয়ে ওই নাম দু-টো লিখে দিয়ে দিলেন। সুনুর মা সোজা মেডিকেল কলেজে চলে গেলেন — কোথাও কোনো বাধা পেলেন না। উকিল এবং দে, দুই ডাক্তারই হাজির ছিলেন। ডাঃ দে বললেন — “কাল সকালে রাধানাথ মল্লিক লেনে আমার বাড়িতে যেও — এখানকার যন্ত্রটা আজ খারাপ আছে — কাল সকালে তোমাকে দেখব — তারপরে তোমার চিকিৎসা হবে। সকাল করে যেও।” পরদিন সকালে যন্ত্রে দেখে বললেন — “চল আমার সঙ্গেই হাসপাতালে।
“হাসপাতালে গিয়ে সোজা অপারেশন থিয়েটারে ফ্যানিক্স অপারেশন হবে — আর হবে গোল্ড ইনজেকশন সপ্তাহে একটা করে।” এক মাস পরে বললেন “এবার ছুটি। কিন্তু নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে।”

রাতে ঘুমাচ্ছি — হঠাৎ প্রায় বারোটার সময় সুনু এসে ডেকে বলল — “বাবা, শিগগির ও বাড়ি যাও। ওরা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে — রিভু [লেখকের পৌত্র, ঘটনাটির উল্লেখ আগেও আছে] দুপুর থেকে ঘুমুচ্ছে — খাচ্ছেও না, নড়ছেও না — তুমি যাও গোপাকে সামলাও গিয়ে।”
শুনে হন্ত দন্ত হয়ে লাফিয়ে উঠে ছুটলাম। গিয়ে প্রথমেই রিভুর নাড়ি দেখলাম — বেশ টঙ্ক। আমার ছোঁয়া পেয়ে রিভু ফিক করে হেসে দিলো — পরক্ষণেই ফুঁপিয়ে উঠল — বুঝলাম দেয়ালা করছে। বাড়ি ফিরলাম।
রাত আটটা নাগাদ রিভুর দিদান এসে হাজির। বললেন, “দাদা, আপনি একবার চলুন — গোঁয়ারটা সন্ধ্যা বেলায় ঘুম থেকে জেগে বেদম চিৎকার শুরু করেছে — মেয়েটা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেছে — তবুও থামাতে পারছে না — আপনি চলুন।”
গেলাম। অনেক আশার ধন — বংশের উত্তরসুরী। বোধহয় পেট কামড়াচ্ছে — নাইকুণ্ডলে সেঁক দিন — উডওয়ার্ডস কম্পাউন্ড খাইয়েছেন?” “কিছুতেই — কিছু হচ্ছে না।”
আমি বললাম — “আমি নিয়ে যাচ্ছি।” ওরা বললেন — “এখনও তো ষষ্টিপূজা হয়নি — নিয়ে যাবেন কী করে?” আমি বললাম “ওই দিন দুপুরে আমি ওকে নিয়ে আসব — পুজো সেরে আবার নিয়ে যাব।” ওরা বললেন “ওর মার কষ্ট হবে না?”
আমি বললাম “ওর মার সহ্যক্ষমতা আমার মায়ের মতো — আমি জানি।” এই আমার জানাটাও একটা ঘটনা।
রিভু তখন হয়নি — প্রসবদিনের দিন দশেক বোধহয় বাকি। নিয়মিত ডাক্তার দেখান হচ্ছিল। একদিন রাত এগারটা হবে সুনু আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল — “বাবা, গোপার পেট থেকে বালতি খানেক জল বেরিয়ে গেল।” আমি তো বুঝলাম পানিমুচি ভেঙেছে। জামা পরে বললাম “চল — হাসপাতালে যেতে হবে।” চাদর গায়ে তিনজনে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের রাস্তায় তখনও পিচ হয়নি, এবড়ো খেবড়ো রাস্তা। রিক্সা খুঁজে আনা তারপরে সেই রিক্সায় যাওয়া সময়সাপেক্ষ। গোপা [গোপা রিভুর মা, লেখকের পুত্রবধূ] বলল “বাবা আমি আস্তে আস্তে হেঁটেই যাব।” [রেললাইনের] ওপারে গিয়ে গোপা বলল “বাবা, আমি হেঁটেই যাব — বেশি পথ তো এসেই গেছি।” তাই হলো — হেঁটেই ওপারের হাসপাতালে যাওয়া গেল। যেতেই ধাই এসে গোপাকে নিয়ে গেল ওপরে দো-তলায় — আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি। রোগী আসছে — পর পর প্রসব হচ্ছে, কাতরানি, গোঙানি চলছে আর তাড়াতাড়ি প্রসব হয়ে বেডে চলে যাচ্ছে।
যখন সবাই চলে গেল সেই একটু ফাঁক পেয়ে গোপাকে ওটিতে তুলে নিল। রাত একটা থেকে বেলা দশটা পর্যন্ত গোপা দাঁত চেপে ব্যথা ভোগ করল — না একটু কাতরানো — না কিছু কাউকে বলা। শেষ পর্যন্ত দশটা চল্লিশ মিনিটে ধাত্রী এসে বলল — “এই ওষুধগুলো এনে দিন আর তারপরে বাড়ি থেকে বাড়তি তালিকার জিনিসগুলো নিয়ে আসবেন। আর শুনুন, আপনার নাতি হয়েছে, মুখ দেখতে সোনা লাগবে। সুনুকে ওখানে থাকতে বলে আমি বাড়ি এসে কাপড়-চোপড়, কাঁথা, ছোট তোয়ালে আর শ্রীদুর্গা জুয়েলার্স থেকে একটা আংটি কিনে নিয়ে ফিরে গেলাম — ততক্ষণে বাচ্চাকে ধুয়ে মুছে মায়ের কোলে দিয়ে দিয়েছে। দেখি গোপার গায়ে মিশে আছে একতাল ধপধপে সাদা বরফ। আঙুল খুঁজে বের করে ওর আঙুলে আংটিটা পরাতে গেলাম — কোনো আঙুলেই লাগে না, বড় হয় — তা হলে কী হবে — হাত মুঠ করে আছে — আর খুলছে না। গোপা বলল — “বাবা — অন্য জিনিসগুলো এনে দাও যত শিগগির হয়, আমার কাপড়-চোপড় বদলাতে হবে। একটা বড় অয়েল ক্লথ আনবে।”
আমি ওখান থেকে সুনুকে পাঠিয়ে দিলাম তালিকার বাকি জিনিসগুলোর জন্যে। আমি ধাইকে বললাম — “বাচ্চাকে একটু দেখাবেন না — ওর স্বরও শুনবো না?” ধাই এসে গোপার কোল থেকে তুলে নিল — এ কী এ যে একেবারে সাহেব, ধপধপে — সাদা যেন এক টুকরো বরফ!
মায়ের সহ্যশক্তিঃ মায়ের তখনও চোখ অপারেশন হয়নি। চোখে খুবই কম দেখেন। গোপা তখনও বাপের বাড়িতে। মা রান্না করতে গিয়ে ভাতের ফ্যান ঢালতে গিয়ে বাঁ-হাতখানা কনুই থেকে পোছা পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেললেন। মুখ থেকে টু-শব্দটুকু বেরয় নি, রান্না শেষ হলে বললেন — “ওরে বাড়িতে স্পিরিট আছে?” এক শিশি স্পিরিট এনে দিলাম। তখন আঁচল সরিয়ে ওই দগদগে ঘায়ের ওপর শিশিটা ঢেলে দিলেন। ওই দেখে আমার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। ছুটলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে বললেন, দু-দিন পর পালটাতে। একুশ দিন গেলে গোপা এসে রান্নার দায়িত্ব নিল।
রিভুর ঠাকুমার পুনর্জন্মঃ সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত মস্ত বড় ডাক্তার। তাঁর ভাইপো বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত প্রফেসর। সাতষট্টির এক বিডন স্ট্রীটে ওদের বাড়ি ছিল। এক রাতে রিভুর ঠাকুমা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রাতে গিয়ে (ছোটকা) বীরেন সেনগুপ্তকে খবর দিলাম — উনি আমার সঙ্গে এলেন রোগী দেখলেন — আমাদের বাসায় রইলেন ওষুধ খাওয়ালেন — কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না। সকাল হলে তিনি বললেন — “আমাকে তো যেতে হচ্ছে — ছাত্রদের ক্লাস নিতে হবে — তবে আর মাত্র ঘন্টা দুই মেয়াদ। যদি কিছু করবার থাকে এরমধ্যেই করতে হবে।”
আমার তো মাথায় হাত। তখন তপন — বাপি [লেখকের কন্যা], সুনু ওরা বলতো কাকুজী — সে বলল “চল, একবার পশুপতি ডাক্তারকে ডেকে আনি।” পশুপতি এলেন দেখলেন — বললেন — “যান আমার কম্পাউন্ডার প্রফুল্লর কাছ থেকে এই ওষুধ দু-টো নিয়ে আসুন।” এক ঘন্টা বসে থেকে পটাপট দু-টো ইনজেকশন দিলেন — বললেন “এবার খেতে দিন।”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম — “এত পায়খানা হচ্ছে এর মধ্যে কি খেতে দেবো ডাক্তার বাবু?” ডাক্তার বললেন, “গলাটা কাঠ হয়ে আছে — আগে এক গ্লাস জলে এক চিমটে নুন দুই চামচ চিনি গুলে সেই জলটা দিন — তারপর নরম ভাত ‘জুস’ দিয়ে খেতে দিন। সন্ধ্যা বেলা আমাকে খবর দেবেন।” সন্ধ্যা বেলায় গেলে বললেন — “পায়খানা ধরেছে তো, আর এই বইটা নিয়ে যান — এটা পড়ুন। উনিই আমাকে বললেন “রোজ মুরগির জুস খাওয়াবেন সে তো অনেক খরচ। বরং এক কাজ করুন হাতিবাগান থেকে পায়রা কিনে এনে তার জুস দেবেন।”
তিনি যে বইটা দিলেন তার নাম ‘যক্ষাও সারে’ তাঁরই লেখা। তাঁর উপদেশে এবং চিকিৎসায় সেবার রিভুর ঠাকুমা ফিরে এলেন।
রিভুর মার পুনর্জন্মঃ রিভুর জন্মের কথা আগেই বলেছি। বছর দুই বাদে গোপার পেট থেকে থেকেই একটা ব্যথা করে — মাঝে মাঝেই উঃ-আঃ করে। আমরা বুঝতে পারি ওর কত কষ্ট হচ্ছে। শেষে গোবিন্দ দেবনাথ — গোপাল দেবনাথের ভাই এসে বললেন — “চলুন এন-আর-এসে আমার প্রফেসরকে দেখিয়ে দেবো।”
প্রফেসর শোভনলাল চ্যাটার্জি ছবিতে দেখে বললেন “প্রিন্সেপ স্ট্রীটের এই নার্সিং হোমে নিয়ে যান — কালই অপারেশন করতে হবে।”
পরদিন অস্ত্রোপচার হলো। পেটের কষ্ট কমল — তখন রিভুর চিন্তা। রিভুকে নিয়ে যেতাম ওই নার্সিং হোমে। পেটে একটু গরম সেঁক দেবেন। তাড়াতাড়ি ব্যথা কমবে। সুনু তাড়না করে “গরম সেঁক দিতে বলেছে।” তাড়ায় এমন সেঁক দিলো যে অপারেশনের চিহ্ণ বরাবর ঘা হয়ে গেল — এমন ক্ষত যে আবার অপারেশন করতে হলো। ডাক্তার বললেন — “চান যদি প্লাস্টিক সার্জারি করে ক্ষতচিহ্ণ সারিয়ে দিতে পারি।” গোপা রাজি হলো না। বাজারে যত রকম অ্যান্টিবায়োটিক ছিল সব রকম দিয়ে পরীক্ষা করতে করতে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যভেদ হলো।

এতক্ষণ বাড়ির কথা নিয়ে কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে এর মধ্যে ঘটে গেছে বিরাট তোলপাড়। ঘরে বন্দী সুভাষ পুলিশের বেড়াজাল এবং গোয়েন্দাদের বোকা বানিয়ে হাওয়া হয়েছেন। মেজদার দুই ছেলে শিশির আর অশোক বোস, বিনয় সেনের সাহায্যে। নানা পথ ঘুরে নানা লোকের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত পৌঁছলেন পেশোয়ারে — আকবর শার কাছে পেলেন সাদর অভ্যর্থনা। ভারত সরকার চেষ্টা করেও খবর চেপে রাখতে পারেননি। আকবর শা লোক দিয়ে সুভাষকে কাবুল পৌঁছে দিলেন। আড্ডা শরিফে যাবার অজুহাতে পাহাড় পার হয়ে পৌঁছে গেলেন কাবুলে — সেখান থেকে চেষ্টা করলেন রাশিয়া যাবার। কিন্তু স্তালিন সময় দিতে পারলেন না — তিনি ব্যস্ত ইঙ্গ-মার্কিন কর্তাদের সঙ্গে ইয়াল্টায় শীর্ষ সম্মেলনে। অগত্যা সুভাষ গেলেন জার্মানিতে — হিটলার তখন রাশিয়া আক্রমনের পায়তারা কষছেন। তিনি অনেক রকম বাহানা করে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন সুভাষকে অক্ষশক্তির আর এক শরিক জাপানে পাঠাতে। [ইয়াল্টা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৫-এ, সুভাষের নিষ্ক্রমণের পাঁচ বছর পরে]
ওদিকে কয়েক বছর ধরে জাপানে আর এক নির্বাসিত রাসবিহারী বসু ভারতীয়দের মধ্যে সংগঠন গড়ে অপেক্ষা করছিলেন কবে সুযোগ আসে — ইন্দোচীন, মালয়েশিয়া, শ্যাম, ভিয়েতনাম দেশের ভারতীয়দের নিয়ে এক মুক্তি ফৌজ তৈরি করতে। তিনি সুভাষকে খবর পাঠালেন শিগগির চলে যেতে — জমি তৈরি — তিনি বুড়ো হয়েছেন দৌড়ঝাঁপ আর পারেন না — উপযুক্ত পাত্রের অপেক্ষায় আছেন — পেলেই নিশ্চিন্তে অবসর নেবেন।
শেষ পর্যন্ত সুভাষ জাপানে পৌঁছলেন। চীন তখন চিয়াং কাইশেকের সঙ্গে গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত। শেষ হয়েছে লঙ মার্চ।
যাই হোক, সুভাষকে পেয়ে ভারতীয় জাতীয় সৈন্যদের উদ্দেশ্যে রাসবিহারী বললেন — “সাথিগণ, আপনাদের সর্বাধিনায়ক এসে গেছেন — আপনাদের পুরো দায়িত্ব এখন থেকে তাঁর হাতে — তিনিই নেতাজি।” সৈন্যরা ধ্বনি দিলেন — “নেতাজি জিন্দাবাদ।”
এখান থেকেই আমরা ‘নেতাজি’ বলব। তিনি নতুন ব্রিগেড গড়লেন। ব্রিগেডের দায়িত্ব দিলেন যথাক্রমে শাহনওয়াজ, সায়গল ও ধীলনকে। মহিলাদের ব্রিগেড গড়লেন — ঝান্সি রাণী লক্ষীবাই ব্রিগেড, এরাও যোদ্ধা। সিঙ্গাপুরে এক সাধারণ সভায় তিনি উদাত্ত আহ্বান জানালেন “যুদ্ধের জন্য বিপুল পরিমান অর্থ চাই।” যার যা ছিল মহিলারাও ভারে ভারে গহনা দিয়ে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ভাণ্ডার পূর্ণ করলেন। নেতাজি বললেন — “তোমরা আমাকে রক্ত দাও — আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো”। মার্চ পাস্টের জন্য গান রচনা হলো — “কদম কদম বাঢ়ায়ে যা, খুশিকে গীত গাহে যা ইয়ে জিন্দেগী হ্যায় কৌম কী তো কৌম পে লুটায়ে যা।”
কোনো এক কবি লিখলেন — “শাহনওয়াজ, সায়গল, ধীলন — মিলিয়াছে অপরূপ মিলন।”
কিন্তু হলে কী হবে? জাপান হঠকারী হয়ে পার্ল হারবার বোমায় ধ্বংস করে দিলো — ফলে ফল হলো সুদূরপ্রসারী যেটা শেষ হলো হিরোসিমা, নাগাসাকি ধ্বংসে। জাপানকে তার সমস্ত সৈন্যকে ফিরিয়ে নিতে হলো। ততদিনে আন্দামানের নাম হয়েছে স্বরাজ দ্বীপ। নেতাজি তার বাহিনী নিয়ে মৌলামিন, মান্দালয় যেখানে তিনি জেলে আটক ছিলেন সেই সব অতিক্রম করে ভারতের ভূমিতে ইম্ফলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন। তিনি আশা করেছিলেন ভারতবাসীরা ভেতর থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ করবে — কিন্তু এটলির পরে, ওয়াভেল ও মাউণ্টব্যাটনের সঙ্গে সমঝোতা করে জওহরলাল বললেন — তিনি রাইফেল হাতে সুভাষের মোকাবিলা করবেন। [১৯৪১-এ জাপান পার্ল হারবার আক্রমন করেছিল, সুভাষের আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠার দুই বছর আগে]
হতাশ না হয়ে নেতাজি বললেন “আমার যা কিছু আছে সব আপনারা নিয়ে যান — যত দিন বাঁচব দেশের স্বার্থেই কাজ করে যাব। আপনাদের যুদ্ধবন্দী হিসাবেই ধরা দিতে হবে। আশা করা যায় — বিচার পাবেন।”
সারা দেশ জুড়ে ততদিনে শুরু হয়ে গেছে বিরাট তোলপাড়। ভারতীয় নৌসেনারা একের পর এক জাহাজে বিদ্রোহ করল। ইংরেজ ভয় দেখাল বোমা মেরে সব জাহাজ ধ্বংস করে দেবে — দরকার হলে আমেরিকাকে ডেকে আনবে। দিয়েগো গারসিয়াতে আমেরিকা এসে ঘাঁটি গাড়ার ভয় দেখাল। জওহরলাল মাউণ্টব্যাটনের সঙ্গে পরামর্শ করে চার্চিলের কাছে দরবার করে মার্কিন হস্তক্ষেপ সামাল দিলেন।
এদিকে ততদিনে সাংস্কৃতিক জগতেও বিরাট তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। বামপন্থী নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা উৎপল দত্ত টিনের তলোয়ার, কল্লোল, অঙ্গার প্রভৃতি নাটকের মাধ্যমে শহরের মানুষদের উদ্বেল করে তুললেন। মিনার্ভা থিয়েটার ছিল তাঁর পীঠস্থান। রাজরোষে বাড়িওয়ালা বাড়ি বিক্রি করবেন জানালেন। উৎপল দত্ত সঙ্গীদের নিয়ে সমবায় তৈরি করে সাধারণের কাছে অংশ নিতে বললেন — অবিলম্বে টাকা উঠে এল, এমনকি বাড়িওয়ালাও এগিয়ে এলেন টাকা নিয়ে — উৎপল রাজি হলেন না — “তোমার শ্রেনীচরিত্র তো পাল্টাবে না — তুমি সূঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরবে। ওতে দরকার নেই।” [আই-পি-টি-এ নৌ বিদ্রোহের সমর্থনে জনমত গড়েছিল; ‘কল্লোল’-এর কাহিনি নৌবিদ্রোহকে ভিত্তি করে লেখা হয়; এখানে কল্লোল সহ যে নাটকগুলির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলি অনেক পরে ১৯৫৯-১৯৭১ সালের মধ্যে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল]
রবীন্দ্রনাথ লিখলেন — “ইংরেজ যখনই এ দেশ ত্যাগ করিবে, তখনই কৃত্রিম ঐক্যসূত্রটি তো এক মুহূর্তে ছিন্ন হইয়া যাইবে। রক্তপিপাসু বিদ্বেষবুদ্ধির দ্বারা আমরা পরস্পরকে ক্ষতবিক্ষত করিতে থাকিব।” [সামান্য পরিবর্তিতভাবে এই উদ্ধৃতিটি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের হলেও এখানে ১৯৪০ পরবর্তী সময়ের প্রসঙ্গে এসেছে]
গান্ধী বললেন — “আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে দেশ ভাগ করতে হবে।” মাউন্টব্যাটেন জওহরলালের সঙ্গে আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত বললেন “আমি চার্চিলের কাছে রিপোর্ট করব।” এই খবরে চটে গেলেন মহম্মদ আলি জিন্না — “না আমার পাকিস্তান চাইই চাই।” রটে গেল “হাতমে বিড়ি, মুহমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।” জিন্না বললেন — “পঞ্জাব, সিন্ধ, বঙ্গাল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থান — পাকিস্তানেই চাই।” তিনি হুকুম জারি করলেন “যাও সবাই মিলে সংগঠন তৈরি করে লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুতি নাও।” সুরাবর্দি, ইস্পাহানি এঁরা এলেন — প্রচার করলেন “লড়াই দেখবে তো কলকাতা চল।” এঁদের পরে এলেন জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
(The Direct Action day — The Great Calcutta Killing) ১৬ই আগস্ট ১৯৪৬ সাল। দুপুরে ভাতের রসে একটু ঝিমুনি এসেছিল, বিরাট হট্টগোলে ধড়মড় করে উঠে — ধুতিটা ভাজ করে লুঙ্গির মতো পরা ছিল — কোনরকমে একটি গেঞ্জি গলিয়ে বেরিয়ে গেলাম — শুনলাম, দ্বারিক ঘোষের দোকানের ছাত থেকে মিছিলে ইঁট পাটকেল ছুঁড়েছে। আমি ভাবলাম রাজপথে মিছিল করার অধিকার তো গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অঙ্গ।
হঠাৎ দেখলাম — মারমুখী জনতা দোকান খোলা দেখলেই পেটাচ্ছে ভাঙচুর করছে। হঠাৎ একজন লাঠি তুলেছে আমার মাথার ওপর — আমি তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি — আশঙ্কাহীন — কী ভেবে সে আমার মাথায় না ফেলে পাশের প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোকের মাথায় — সঙ্গে সঙ্গে মাথা ফেটে ঝরঝরিয়ে রক্তের ধারা। বুঝলাম আর থাকা নিরাপদ নয়। ভদ্রলোকের একখানা হাত আমার কাঁধের ওপর দিয়ে ওকে এনে বসালাম আমাদের রকে। উল্টোদিকের বাড়ি ডাক্তার বিষ্ণু মুখার্জির — তিনি তখন ট্রপিক্যাল স্কুল অব মেডিসিনের ডীন — তাঁকে বললাম “এই একজন আহত ব্যক্তি — কিছু ব্যবস্থা করুন।” তিনি বললেন “আমার রকে এনে বসান।” ছেলেকে ডেকে ব্যাগটা দিতে বললেন, চাকরকে বললেন এক গ্লাস গরম দুধ দিতে।
দুধ খাইয়ে বললেন — “চলুন আমার সঙ্গে — আমার ছাত্রেরা বসে থাকবে — আমাকে এখুনি বেরোতে হবে।” আহত ভদ্রলোক বললেন — “আমাকে যে বাড়িতে একটা খবর দিতে হবে।” ডাক্তার বললেন “হ্যাঁ, হবে। চলুন আমার সঙ্গে হাসপাতাল থেকে ফোনে বলে দেবো আপনি দু-দিন বাড়ি যাবেন না। ব্যান্ডেজ খুলে আবার ড্রেস করতে হবে।” ডাক্তার ওকে নিয়ে চলে গেলেন।
ওদিকে খবর শুনলাম দ্বারিক ঘোষের দোকান থেকে এমনি এমনি ইঁট মারেনি। যারা “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” তারা আশেপাশের সব দোকান যা খোলা পেয়েছে ঝপাঝপ লাঠি চালিয়ে ভাঙচুর করেছে।
বাগবাজার স্ট্রীট আর কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের মোড়ের আদি দোকান এখনও আছে বটে সেদিনের সে জিনিস আর নেই। তখন গাওয়া ঘিয়ে ভাজা একখানা লুচি নিলে পাওয়া যেত এক হাতা ছোলার ডাল — সে ডালের স্বাদই আলাদা। ওই ডালের লোভেই আমরা একখানা একখানা করে চার খানা লুচি তার সাথে চার-পাঁচ হাতা ডাল নিতাম। অর্ধেক লুচিতে ডাল শেষ করে আবার ডাল চাইতাম। চার আনার চারখানা লুচি কেউ খেলে সে আবার বাড়তি পেত একটা মিষ্টি। এখন তো সে সব মনে হবে গল্প। সম্ভবত দ্বারিক ঘোষ তার সুনাম বজায় রেখেছে। এখন বোধহয় একখানা লুচির দাম হবে এক টাকা।
গোপীমোহন দত্ত লেনের পাথুরে গলির উল্টোদিকে সরু ফালি চৈতন সেন লেন। বড় রাস্তায় কোঠাবাড়ি হলেও পেছনে এক বস্তি। বাপি তখন দুধ খায়। যোগান দেয় হামিদা বানু — বর রুস্তম। বাপিকে বলতো ছাগলখাকি। সেদিন দুধ দেয়নি। তপনকে সঙ্গে করে গেলাম দুধ আনতে গেলাস হাতে নিয়ে। বলল “দাদা — যাও, যাও আজ আর দুধ হবে না।”
তপন বলল — “চল দেখে আসি — কালীপ্রসাদ স্ট্রীটের খাটালে দুধ পাওয়া যায় নাকি” — কাটাপুকুর লেন দিয়ে ঢুকলাম দুজনে — মুখোমুখি এক বীরের দল — তারা সার্বজনীন [বাগবাজার সার্বজনীন] মাঠের পাশের বস্তি ধ্বংস করে এসে চলেছেন — কোথায় মোল্লা পাওয়া যায় খুঁজতে। লুঙ্গির মতো করে ধুতিপরা দাড়িওয়ালা আমাকে দেখে তারা সড়কি বাগিয়ে এগিয়ে এল — একজন বলল “ছোড় দো ভাইয়া — এক আদমি ক্যা করেগা?” দু-চারজন বলল — “নেহি — কোই শালেকো ছোড়না নেহি চাহিয়ে।”
তপন এগিয়ে এসে গেঞ্জির ভেতর থেকে পৈতেটা বের করে দেখিয়ে বলল — “দেখ ব্রাহ্মণ হ্যায়” — সঙ্গে সঙ্গে হাত জোড় করে “পরণাম বাবা — মাপ কর দো — সাবধানিসে চলেগা।” দুধ নিয়ে এলাম।
তখনও গোপীমোহন দত্ত লেনের বাড়িতে ইলেকট্রিক আসেনি। ওই সন্ধ্যায় তপন হ্যারিকেন জ্বেলে — তার বাড়ির থেকে ব্লেড এনে দাড়ি কামিয়ে দিলো।
ওই দাড়ির জন্যে দুপুরে জিহাদীদের হাত থেকে রেহাই পেলাম আর সন্ধ্যায় ওই দাড়ির জন্যে সড়কির শিকার হচ্ছিলাম। স্থান কাল পাত্র ভেদের কী অপরূপ পার্থক্য!

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় চলে এলাম — এসে ভর্তি হলাম বিদ্যাসাগর কলেজে। তখন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের কাল — বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ঘোষণা করলেন — “আমাকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে সাম্রাজ্য ভাঙার জন্যে নয় আরো বড় করার জন্যে, অতএব পীড়ন চালাও।” অলিতে গলিতে বৃটিশ এবং ট্যাঁশ সার্জেন্টরা ব্যাটাম হাতে তদারকি করছে। সর্বত্রই মিছিল আর ধ্বনি — “বন্দেমাতরম।” ঠনঠনে কালীবাড়ির সামনে বেচু চ্যাটার্জী স্ট্রীটের মোড়ে এক সার্জেন্ট এসে আমাকে পেটাল — হাত ধরে টেনে বলল “ফুটপাথ সে চল — রাস্তামে নেহি।”
বিয়াল্লিশ সালে আই-এ পরীক্ষা দিয়ে চলে আসি কলকাতায়। এসেই ঢুকে গেলাম এ-আর-পিতে ওয়ার্ডেন হিসাবে। কাজ হলো সাইরেন বাজলে সবাই যখন আশ্রয়ে তখন ওয়ার্ডেনরা রাস্তায় — কোন বাড়িতে আলো দেখা যাচ্ছে — কোথায় জানালা দরজা খোলা তার তদারকে। আমাদের তখনও পোষাক আসেনি বাঁশি পাইনি — ঢাল নেই তলোয়ার নেই — নিধিরাম সর্দার। বিরক্ত হয়ে গেলাম স্টাফ-আফিসারের বাড়িতে দরবার করতে। নলিনী চ্যাটার্জি বড় উকিল — তার ছেলে সরোজ চ্যাটার্জি স্টাফ-অফিসার — গেলাম আমি আর তপন দাস। বৃদ্ধ আমাদের দু-জনকে দু-খানা প্যাড দিয়ে বললেন — “ডিকটেশন লেখ।” দিলাম লিখে বড় বড় করে — পরের দেওয়া প্যাড তো — মায়া দয়া নেই। ভদ্রলোক পড়লেন, মনে হলো খুশি হয়েছেন। বললেন “সরোজ এখন বাড়ি নেই, এলে আমি তোমাদের কথা বলব। কিছু একটা হবেই। চিন্তা কোরো না।” ক্ষুণ্ণ মনে ফিরে এলাম।
রাসবিহারী ঘোষ তখন পোস্ট-ওয়ার্ডেন। ভবনাথ সেন লেনের চাটুজ্যে বাড়িতে তার এক নম্বর পোস্ট। ওই বাড়ির ভাগনে ফনে তখন সিনিয়র-ওয়ার্ডেন। দু-দিন পর পোস্ট-ওয়ার্ডেন আমাকে ডেকে বললেন — “তোমার ডিউটি কাল থেকে বদলে গেল — তুমি হবে সিনিয়র-ওয়ার্ডেন, অন্য ওয়ার্ডেনদের কাজের তদারকি করবে।
চার দিনের দিন হাতিবাগানে আর মার্টিন বার্ণ অফিসে বোমা পড়ল। কম্বল জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হুকুম এল “তোমাদের পোস্টে হাজির থাক — দরকার হলেই ডাকব।”
এর মধ্যে খবর পাওয়া গেল পোলক হাউসে লোক নেওয়া হচ্ছে। সেখানে গিয়ে লাইন দিলাম। কপালক্রমে বোধহয় দরখাস্ত দেখেই আই-এ-এস সেথ ড্রুকার নামের ইহুদি জার্মান সাহেব আমাকেও পছন্দ করে ফেললেন। আমার পোস্টিং হলো শ্যামপুকুরে — শ্যাম পার্কের গায়ে বাড়ি। দপ্তরের নাম পালটে হলো পি-আর-আই-এস (অর্থাৎ পোস্ট রেইড ইনফর্মেশন সার্ভিস)। অর্থাৎ শত্রুর আক্রমন হবার পরে সাধারণকে সংবাদ সরবরাহ করতে হবে।
আক্রমনের সম্ভাবনা যখন রইল না তখন সাহেবের মাথায় এল এক-একটা দল নিয়ে ইন্সপেকশন স্কোয়াড তৈরি করে বিভিন্ন অফিসে পাঠানো।
ড্রুকার সাহেব জাতিতে জার্মান ইহুদি। তাকে দিল্লি ডেকে পাঠাল। সাহেব যাবার আগে আমাকে নিয়ে ঘন্টা খানেক কথা বলল। কেন জানিনা আমার নাড়ি-নক্ষত্র সব খবর নিল। যাবার আগে বলল — “আমি দিল্লি যাচ্ছি — যদি তোমাকে ডাকি — তুমি যাবে?” আমি জানালাম — “পরে কথা হবে।” যাবার পথেই সাহেব প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত হলেন। আমার দিল্লি গমন ভেস্তে গেল।
ওই অফিসে একজন আমেরিকান সাহেব ছিলেন — মিস্টার গ্রোভস — ‘ফাও’-এর লোক, ফুড এইড-এর লোক। তিনি আমাকে তার চেম্বারে নিয়ে দরজা বন্ধ করে পরীক্ষা চালালেন — জিজ্ঞাসা করলেন “তুমি ব্যায়াম করো?” কষ্ট করে তাকে বোঝালাম — “আমি ছাত্র অবস্থায় কুস্তি করতাম — তাই এত পাকা শরীর।” আরেকজন ছিলেন মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের কর্মকর্তাদের একজন — শাহজাহান। তিনি তার মাঠে স্পোর্টসের ব্যবস্থা করলেন। সেখানে আমি ফ্ল্যাট রেসে নাম দিলাম। শুরু করলাম দৌড়তে — এক মাইল দৌড় মানে আট পাক ঘুরতে হবে। এক দুই তিন পাক আমি সবার আগে — শ্যামপুকুরের কর্তা তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আমাকে খুব তাতাচ্ছেন — কিন্তু আমার তো দম বেরিয়ে যাচ্ছে। ছয়পাক যখন শেষ হলো দেখি আস্তে আস্তে আরও দুইজন তাদের গতি বাড়াচ্ছে। আমার পৃষ্ঠপোষকরা ক্রমাগত আমাকে আর কত তাতাবেন। আটপাক পুরো করে আমি দড়িটা ছিঁড়ে দিয়েই সটান চিৎপটাং। যে দুই নম্বরে এল — সে এসে আমার হাত ধরে টেনে তুলে বলল “গোড়া থেকেই সবটুকু দম বের করে দিতে হয় নাকি! আর একটু আগে থেকে বেগ বাড়ালে আমি তো প্রথম হয়ে যেতাম।” যাই হোক প্রথম পুরস্কার হলো একমন চাল, দ্বিতীয় পুরস্কার আধমন চিনি আর তৃতীয় হলো আধমন ডাল।
১৯৪৩ সাল, তখন সরকার ফুড ড্রাইভ দিলেন। পি-আর-আই-এসের সব কর্মীদের নিযুক্ত করলেন কার ঘরে কত চাল আছে খুঁজে বের করতে। আমার কাজ পড়ল হরিরাম গোয়েঙ্কা স্ট্রীটে। ওখানে এক বাড়িতে ঢুকে ঘরের পর ঘর দেখতে দেখতে হদিস পেলাম গোটা বাড়িটা বস্তাবন্দী চালে ভর্তি। পুলিশ ডেকে মোতায়েন করে এগিয়ে গিয়ে বের হলাম কটন স্ট্রীটের এক দরজা দিয়ে। কর্তাদের পিঠ চাপড়ানি খুব পেলাম বটে — পরে জানলাম যিনি পিঠ চাপড়ালেন ওটা তারই একটি গুদাম।
রেশনিং চালু করবার প্রস্তুতি হিসাবেই নাকি এই ফুড ড্রাইভ।
পঞ্চাশের মন্বন্তর — দিনরাত কাতরানি “একটু ফ্যান দাও মা” — ফুটপাথ জুড়ে অভুক্ত কঙ্কালের সারি। ঠেলায় করে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন।
চালু হলো রেশনিং। তপন আমার থেকে আলাদা হয়ে গেল — রয়ে গেল রেশনিং ডিপার্টমেন্টে।
বাল্যবন্ধু তারাপদ নিউ ব্যারাকপুরে থাকে, আমাকে ডাকল — “চাকরি করবি তো আয় — গেলাম সি-সি-এফ-এ (চীফ কন্ট্রোলার অফ ফ্যাকটরি একাউন্টস)। পোস্টিং হলো ম্যাডান স্ট্রীটে। সেখানে মাস তিনেক রেখে যখন সরকার বুঝল যে আর প্রয়োজন হবে না — তখন লোক ভাগাবার কৌশল অবলম্বন করল। আমাকে বদলি করল এ-ও-বি-টি (অডিট অফিস ব্রিটিশ ট্রুপস), ওদের মিরাট অফিসে। ওখানে বেশ বড় একটা বাঙালি সমাজ ছিল, ছিল কালীবাড়ি, দুর্গাবাড়ি। সেখানে পেলাম কলেজের সহপাঠী মনোজের দেখা। মনোজ আমার লেখার বাতিক জানতো। ও আমাকে ধরে ওদের পত্রিকাতে একটা লেখা চাই — বিমুখ না করে দিলাম একটা কবিতা লিখে —
“আমি যা দেখেছি ভাই
তোমরা কেহ তো দেখনি বন্ধু
তাই তা বলিতে চাই।
দেখেছি শুভ্র পাষাণ বাঁধানো পথে
শক্তিমত্ত রাজপুরুষেরা চলিয়াছে জয় রথে।”

নিউ সিনেমার পাশে ম্যাডান স্ট্রীটের মোড়ে বিরাট ভিড় — ঘোড়সওয়ার পুলিশ পথ অবরোধ করে দাঁড়িয়ে। মিছিল পথে বসে পড়ল — স্লোগানের পর স্লোগান “বন্দেমাতরম, নারায়ে তকদির — সাম্রাজ্যবাদ ভারত ছাড়ো” — সেদিন ছিল ‘রশিদ আলি ডে’ — আজাদ হিন্দ বাহিনির বীর ক্যাপ্টেন রশিদ আলির মুক্তির দাবিতে আইন-অমান্য আন্দোলন। একশ চুয়াল্লিশ ধারা ভেঙে মহাকরণ অভিযান। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোড়সওয়ার বাহিনী পথ আটকে রইল — তারপরই সেই মিছিলের উপর ঘোড়া চালিয়ে দিলো। বহু আহত হলো। পুলিশ তাদের সরিয়ে হয় হাসপাতালে নয় মর্গে বা গঙ্গায় ঠাঁই দিলো। কিছু লোক পুলিশ চলে যাবার পরে আবার এসে পথে বসল। নেতারা রাতে ওদের সাথে রইলেন। সতীশচন্দ্র সামন্ত, সুরাবর্দি, সোমনাথ লাহিড়ী ভাষণ দিলেন। পরদিন আরো বড় মিছিলের ডাক দিলেন — “অভিনব রূপ কিবা হেরিলাম পরদিন প্রাতে — লীগ, কংগ্রেস, কম্যুনিস্ট যত মিলায়েছে হাতে হাতে — মুখে এক বুলি লাল দীঘি যাওয়া চাই — গিয়াছে তাহারা কেহ তাহাদের রুধিবারে পারে নাই।”
সেদিন রাইটার্স বিল্ডিং ঘেরা ছিল। নেতারা বললেন — আইন অমান্য হয়েছে — এবার লড়াই অন্য জায়গায়। নেতারা দিল্লি চলে গেলেন। এই নতুন কায়দা প্রশাসন তখন থেকেই অনুসরণ করতে শুরু করেছে। পদস্থ পুলিশ কর্তারা এসে বলেন “আপনারা কত জন” — উত্তর “দুইশ, পাঁচশ, হাজার, দশ হাজার” — “সবাই কি জামিন নেবেন?” অধিকাংশই জামিন নিয়ে জনা কয়েক যায় লালবাজারে দাবি জানাতে।
ইংরেজ দেখল ভারত ছাড়তেই হবে — তাই যতখানি পারা যায় স্বার্থ বজায় রাখতে হবে। অতএব এটলি লেবার পার্টির প্রতিনিধি হয়ে ভোটে জিতে চার্চিলকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন।
ভারতে পরপর তিনজন ভাইসরয় এলেন — লিনলিথগো, ওয়াভেল আর মাউন্টব্যাটেন।
তখন গান্ধী বললেন “আমাকে দুভাগ না করে দেশভাগ হবে না।” বাংলায় সুরেশ বোস, ফজলুল হকরা বললেন বাংলা স্বনিয়ন্ত্রিত রাজ্য থাক।
মহম্মদ আলি জিন্না কোট করে বসে রইলেন — “পাকিস্তান চাই-ই চাই — না হলে আবার রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে।” র্যাডক্লিফ এলেন এটলির প্রস্তাব নিয়ে। তিনি তদন্ত করে দেশ ভাগ করবেন। ভাগ হলো পাঞ্জাব আর বাংলা। পাঞ্জাবীরা দিল্লি এসে পাওনা-গন্ডা বুঝে নিয়ে যোগ্য পুনর্বাসন পেল কিন্তু বাংলার কপালে ক্ষতিপূরণ জুটল না। ওগুলো তো আমরা এমনিই পাব — ও আবার কিনতে কে যাবে।

জগদীশ গুপ্ত তখন সাব জজ। প্রচণ্ড সাহসী — রাতে হাতে হ্যাজাক পাহারা ছাড়া চলেন না। তিনি এসে হিন্দুস্থান পার্কে বাসা করলেন। তার দুই ছেলে ব্রহ্মজিৎ আর বিশ্বজিৎ। রণজিৎ গুপ্ত শর্মা তার খুড়তুতো ভাই। তিনি বোন গায়ত্রী আর মাকে নিয়ে এসে উঠলেন গোপী মোহন দত্ত লেন। দিন পাঁচেক থেকে তিনি গেলেন শ্রীগোপাল মল্লিক লেনে বৌবাজারে, তার বড়জামাই বঙ্গলক্ষ্মী আয়ুর্বেদ ভবনের চিকিৎসক ননীলাল সেনের বাসায়। তার বড়-নাতি শঙ্কর সেন এখনও মাঝে মাঝে এসে জ্বালায়। তার খুড়তুতো বোন বকু উমাপদ চ্যাটার্জিকে বিয়ে করেছে — পাশের গলিতে থাকে।
মিরাটে যখন ছিলাম তিন দিনের একটা ছুটি পাওয়া গেল। কয়েকজন মিলে বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। দিল্লি হয়ে আগ্রা তাজমহল দেখে ফতেপুর সিক্রি, দয়ালবাগ, বুলন্দশহর। পাঁচ বছর আগে শুরু হয়ে তখনও বিড়লা মন্দিরের গঠন চলছে। মনে হচ্ছে বছর পনের আগে তার দ্বারোদঘাটন হয়েছে। [১৯৩৮-৩৯ সালে দিল্লির লক্ষীনারায়ন মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন হয়েছিল]
ওখান থেকে মথুরা বৃন্দাবন হয়ে মুঘলসরাই এক্সপ্রেসে কলকাতা। রিভুর ঠাকুমা তখন একমাত্র তপনের ভরসায় বোন গায়ত্রীকে নিয়ে গোপীমোহন দত্ত লেনে। রণজিৎ প্রথমে বরানগরে — পরে বালিগঞ্জে একডালিয়া প্লেসে বাসা করে। রণজিতের এক মেয়ে ভাস্বতী ছেলে বাবুজি।
সরোজ নলিনীর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ওইখানে রিভুর ঠাকুমার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয় রমাদির সঙ্গে।

মাঝখানে একটু ব্যবসার কথা বলে নি। তখন ফুড ড্রাইভ হয়ে গেছে। ফিলিপ্স কোম্পানির তখন রমরমা। তারা স্টাফ ক্যান্টিনের জন্যে চাল কিনবে। আমাকে বলাই দত্ত খবর দিলো — “চাল যোগাড় করে দিতে পারবি? ভাল লাভ হবে।”
খোঁজ করে সুরেশ ঘোষের কাছে চালের হদিস পাওয়া গেল। এক লরি চাল দেবে। কুড়ি টাকা মন। বলাইদা বলল “ওটাকে ত্রিশ টাকা মন দরে করে নিবি। সকাল আটটায় কারখানা খুলবে — তখন এলেই হবে।” রাতে সকাল সকাল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ভোরে উঠে বেরোতে হবে। বেরোব কি হঠাৎ রাত বারোটা নাগাদ ঠিক হার্টের ওপরে সূঁচ বেধানোর মত দমবন্ধ করা ব্যথা। সুধীরের মা গিয়ে তপনকে ডেকে নিয়ে এল। তপন ওই রাতে পশুপতিকে ডেকে নিয়ে এল। ডাক্তার এসে বলে গেল “আমি ঘুমের ওষুধ দিলাম। দু-দিনের মধ্যে ডাকবে না — ঘুমুতে দেবে। তরল ছাড়া কিছু খেতে দেবে না।” হয়ে গেল আমার ব্যবসার বারোটা। সেই থেকে বুঝে গেলাম আমার ব্যবসা করা সইবে না। আর ব্যবসার মধ্যে যাইনি — যাবও না।
কিন্তু কাজ তো কিছু চাই। সেনহাটিতে তো টাকা পাঠাতেই হবে। শুরু হলো ঘোরাঘুরি। র্যাডিক্যাল বুক ক্লাবের অখিল দাশগুপ্ত, বিমল মিত্র, বর্মন পাবলিশিং হাউসের ব্রজবিহারী বর্মন এদের কাছে হাঁটাহাঁটি করা — কারণ ছিল রিভুর ঠাকুমার কিছু বইয়ের স্বত্ব ছিল — যেমন র্যাডিক্যালের প্রকাশিত ‘গল্পের ছলে পলাতক’ আর বর্মনের ‘মাদার’ গ্রন্থের অনুবাদ। প্রথম প্রথম বইগুলি বেশ বিক্রি হয়েছে কিন্তু ক্রমে মন্দা এসে পড়ল।
রমাদিদের বাসা তখন গ্রে স্ট্রীটে। হঠাৎ একদিন রাত্রি নয়টায় কালীশচন্দ্র সেনগুপ্ত এসে হাজির। কাল সকাল নয়টার সময় তার অফিসে যেতে হবে — বাইশ নম্বর চিত্তরঞ্জন এভেনিউতে ইউনাইটেড ইন্ডিয়া লাইফ কোম্পানির দোতলায়। [এই ঠিকানায় ক্যালটেক্স নামে আমেরিকান তেল কোম্পানির অফিস ছিল; এই অফিসে লেখক বেশ কিছুদিন কর্মরত ছিলেন] যথারীতি সাজগোজ করে তো দুরু দুরু বুকে হাজির হলাম। কালীশবাবু আমাকে জনসন সাহেবের হাতে দিয়ে নিজের কাজে গেলেন। সাহেব আমাকে এস-এন-ডির হাতে দিয়ে বললেন “তোমার স্ট্যাটিস্টিক্সে একজন লোক চেয়েছিলে — হিয়ার ইজ় দি ম্যান। হি ইজ় এন-ডি-সি।” মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। ওখানে পুরো নাম কারও বলে না — বোধহয় নামের বিশ্বায়নি-করণ।
(সেদিন এক মজা হয়েছে। শেষ রাতে আমি মশারির মধ্যে বসে জপ করছি — দেখি এক ব্যাটা টিকটিকি এক গান্ধিপোকা ধরে আছড়াতে লেগেছে। আমি জপ বন্ধ করে মশারি তুলে যত তাকে তাড়াতে যাই সে তার শিকার নিয়ে তত খাঁজে দৌড়তে থাকে। বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি আমার দৈনন্দিন পরিক্রমায় বেরিয়ে যাই — যদি পারে নিজেই বেরিয়ে যাক এই ভেবে। পরদিন ভোরের আগে আর খেয়াল হয়নি। জপ করতে বসে বিকট গন্ধে বমি আসবার যোগাড়। অনেক করে খুঁজে-পেতে খাঁজের মধ্যে আটকে থাকা মরা-পচা দুই প্রাণীর হদিশ হলো। কাগজের টুকরো ছিঁড়ে তাদের দূরে ছুড়ে ফেললাম। কিন্তু গন্ধ তো ছাড়ে না — অগত্যা সর্বরোগহর ডেটলের খানিকটা ঢেলে মশারির ওই অঞ্চলটা ভিজিয়ে দিলাম। মাকে ঘটনাটা জানালাম। মা বলল কেচে দেবে। এ ক-দিন রোদ্দুরের বাড়বাড়ন্ত ছিল — আজ সকাল থেকেই মেঘলা — আজই তার কাচার সময় হলো।)
এস-এন-ডি আমাকে নিয়ে পি-কে-বির হাতে চালান দিলেন। তিনি এক ঢাউস খাতা ফেলে বললেন — “এটা হলো comperative statement। প্রত্যেক নামের পাশে দু-টো করে লাইন টানা আছে। ওপরের ঘরটা হলো current আর নীচেরটা হলো accumulated — করা শেষ হলে যন্ত্রে যোগ করে মিলিয়ে দিতে হবে।”
এসব আজে বাজে কী বকছি! এর পরের কাজ হলো কস্টিং এফ-ও-বি ফ্রী অন বোর্ড বাল্ক অয়েল প্লাস সি-আই-এফ cost of insurance packed। আঠার লিটার টিন, পঁয়তাল্লিশ লিটার ড্রাম, আঠার লিটার জেরিক্যান — একটা ড্রাম এ বাড়িতেও এসেছিল। পরে সেটা কেটে মাথার আচ্ছাদন করা হয়েছিল।
আমাকে একখানা রেলওয়ে ব্রাডশ ফেলে দিয়ে বলা হলো এফ-ও-বি রেটের সঙ্গে রেল ফেয়ার যোগ করে বিভিন্ন স্টেশনের কস্টিং করা। ওই সূত্রেই আমার সব রেলওয়ে স্টেশনের নামের সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

একদিকের কথা বলতে গেলে অন্য দিকগুলো উপেক্ষিত হয়।
রিভুর পিসিমণি ততদিনে সাবিত্রী শিক্ষালয়ে মাধ্যমিক পড়ছে। রিভুর ঠাকুমা বললেন “ওই সকালে স্কুলে যাবে ওকে টিফিন করে দেওয়া — তারপর তোমার অফিসের ভাত কখন কী করব?” ওকে বরং এক আনা করে পয়সা দিও কিছু কিনে খাবে। দরকারের সময় এক আনা খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি অগত্যা বললাম — “চল তোর টিফিনের ব্যবস্থা করে আসি।” ওকে নিয়ে শিশির কুমার ইনস্টিট্যুটের সামনে শৈল ঘোষের মিষ্টির দোকান — সেখানে গিয়ে শৈলকে বললাম — “এই আমার মেয়ে ওই স্কুলে পড়ে — তোমার দোকান থেকে টিফিন খাবে। বিকেলে আমি দাম মিটিয়ে দেবো। শৈল খুশি, রিভুর পিসি খুশি। সন্ধ্যার সময় শৈলকে জিজ্ঞাসা করলে শৈল বলতো — “এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? একসঙ্গে মাসকাবারে পেলে আমার একটু সুবিধা হয়।” রিভুর পিসির এক বন্ধু অপর্ণা নাম করে, পাশেই বাড়ি, দু-জনে গভীর বন্ধুত্ব। দু-জনে শাড়ি কিনতে বেরিয়ে পাঁচ-মাথার মোড় থেকে হাতিবাগান পর্যন্ত সমস্ত দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত হয়তো প্রথম দোকান থেকেই শাড়ি নিয়ে আসতো। সে ‘জনতা বস্ত্রালয়’ আজও আছে। অথচ যার জন্যে আমাদের জনতা বস্ত্রালয়ে যাওয়া সেই মদনবাবু পরে আলাদা দোকান করলেন — ‘জনপ্রিয় বস্ত্রালয়’ নাম দিয়ে।
গুড়াসক্তির খেসারতঃ রিভুর যে ঠাকুমা রিভলবার নিয়ে বিধান রায়ের কাছে টাকা আদায় করতে যায় তার নতুন কীর্তি। তখন আমি ঘুম থেকে উঠে শ্যামবাজার থেকে বাজার ফেলে দিয়ে চান করতে যাই — চান করে খেয়ে গ্যালিফ স্ট্রীটের ডিপো থেকে ট্রাম ধরে ন-টা পনের মিনিটে অফিস পৌঁছাই। অধিকাংশ সকালেই খাদ্য হয় দুধ-ভাত আর গুড়। সেদিন বাজার থেকে গুড় আনতে বলেনি। চান করে দেখি রিভুর ঠাকুমা বাড়ি নেই কারণ তিনি ফর্দে গুড়ের কথা লেখেন নি — আমিও আনিনি — আমি জামা কাপড় পরে বেরব তখন তিনি ফিরে বললেন “আমি এক পোয়া গুড় আনতে পাঁচ টাকা নিয়ে গেছিলাম? দোকানি মকবুলের কাছে ভাঙানি ছিল না। হঠাৎ একজন ছো মেরে আমার হাত থেকে নোটটা টেনে নিয়ে ভিড়ের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেল। মকবুল আমাকে গুড় দিয়ে বলল তোমার কাছ থেকে দাম চেয়ে নেবে।”
আমি অবশ্য চাল-জল খেয়েও বেরিয়ে যেতে পারতাম, অফিসে পৌঁছে টিফিন খেয়ে নিতাম। মুকুন্দ বলে একটা ছেলে বাক্স ভর্তি করে সাত সকালেই হাজির হত বাবুদের জলখাবার খাওয়াতে।
দরবেশ অবশ্য অনেক খেয়েছি কিন্তু মুকুন্দর দরবেশ এক চিজ — তার চাইতেও বড়িয়া ছিল বিপিন কুণ্ডুর শ্রাদ্ধে গোপাল যে দরবেশ খাইয়েছিল। এক দরবেশই খেলাম বাইশটা।
বাইশ নম্বর চিত্তরঞ্জন এভেনিউ — ইউনাইটেড ইন্ডিয়া লাইফ বিল্ডিংঃ চাকুরিজীবনের উচ্চতম কাল। ওই বাড়ির ছাদ থেকেই দেখেছি বুলগানিন, ক্রুশ্চভের কলকাতা সফরের মিছিল। ওঁদের গাড়ি যাবার পথ পায় না। দুই রাশিয়ান নেতা হাত জোড় করে আর ছুঁড়ে দেওয়া মালা কুড়িয়েই কুল পায় না।
এই রকম আর একটা মিছিল দেখেছিলাম ১৯৫৯ সালে কেরলের সাম্যবাদী সরকারকে খারিজ করার পরে। ইন্দিরা গান্ধী সেদিন দোহাই দিলেন “পার কালাম, পার কালাম — ব্যালট বুসিল পার কালাম।” গণ-অভ্যুত্থান চালালেন কায়েমি স্বার্থের রক্ষক ও গির্জার সাহায্যে। সি-আই-এর হাত দিয়ে কত কোটি ডলার আমদানি হয়েছিল — তার হিসেব পাওয়া যায়নি। ওই সরকার ভাঙার প্রতিবাদে গোটা কলকাতায় সেদিন সমস্ত রাস্তা জুড়ে, সংলগ্ন ফুটপাথ জুড়ে মানুষের ঢল — মানুষের স্বতস্ফূর্ত ধ্বনি শহরের আকাশ ভরে দিয়েছিল — “গণ-অভ্যুত্থান কাকে বলে, দেখে যাও, শিখে নাও।” এই সবই ওই ২২ নম্বরের ছাদ থেকে দর্শনমাত্র।
একটা মজার কথা মনে পড়ে গেল। এস-এম-ওগারা নামে একটি সি-আই-এ র লোক এসে সব কর্মীদের সঙ্গে ইয়ার্কি ফাজলামি করত — সাম্যবাদীদের একদম দেখতে পারত না — সবার সঙ্গে তার কলহের সম্পর্ক। একদিন আমাকে বলল “কাল রবিবার সকাল নয়টার সময় ক্যালকাটা চার্চে আমার সঙ্গে দেখা করবে — স্টক টেকিং-এ যেতে হবে বজবজে।” কথামতো সকাল ন-টায় ক্যালকাটা চার্চে গিয়ে দেখি মদ্দরাম এক হাফপ্যান্ট পরে ঘুরছেন। আমাকে দেখে বলল “পাঁচ মিনিট দাঁড়াও আমি আসছি।” ঠিক তিন মিনিটেই গাড়ি নিয়ে হাজির — “চল।” সাড়ে নয়টায় বজবজ গুদামে পৌঁছে গেলাম। বিরাট গুদামে থাকে থাকে সাজানো সব ড্রাম। আমি গোড়া থেকে থাক বেয়ে উঠে গিয়ে হিসেব নিলাম — সঙ্গে নোটবইতে লিখে রাখলাম।
তখন ক্যালটেক্স কোম্পানি চারটি অঞ্চলে গোটা ভারত ভাগ করা ছিল। প্রথম ভাগ কাশ্মীর, গুজরাট, রাজস্থান উত্তরাঞ্চল। দ্বিতীয় ভাগ বোম্বাই, কর্ণাটক, অন্ধ্র। তৃতীয় ভাগ কলকাতা, রায়পুর বিলাসপুর, দণ্ডকারণ্য। আর চতুর্থভাগ মাদ্রাজ, কেরল, কোচিন, কোজিকোড, আমনদিভি, মিনিকয় লাক্ষাদ্বীপ পর্যন্ত।
সেদিন সব স্টক গুনে গেঁথে ফিরতে হয়ে গেল বেলা একটা। তাতেও রেহাই নেই। গাড়ি করে সটান হাজির ফিরপোতে। নিজে নিল এক বোতল বিয়ার — আমাকে দিলো একটা আইসক্রীম। ওই ঠা ঠা রোদ্দুরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে — আইসক্রীম যেন মরুভূমিতে মরুদ্যান।
ওগারা সাহেব যে নোট দিয়েছিল পরে জেনেছি — সে লিখেছে “এন-ডি তো একটা পাঁড় মার্কসবাদী। এই যদি তার কাজের নমুনা হয় — তাহলে তাদের ঠেকাবে কে?”
যাক ওসব বাজে কথা। ইউনিয়নের কাজকর্মের কথা বলা যাক। আগেই বলেছি আমাদের এলাকা ছিল দণ্ডকারণ্য পর্যন্ত। ওই এলাকার সমস্ত ডিপোগুলো আমাকে ঘুরতে হবে। সেই অনুযায়ী যাতায়াতের দিনক্ষণ-সূচী তৈরি করে সব ডিপোতে জানিয়ে দিয়ে যাত্রার ব্যবস্থা করা হলো। কলকাতা অফিসে আমার সহকারী ছিল অসিত ভট্টাচার্য্য — বজবজে ছিল মল্লিক। স্কুটার চালিয়ে যাবার কালে মল্লিক ডবল ডেকার বাসে চাপা পড়ে মারা গেল। একজন বুদ্ধিমান বিচক্ষণ সহকারী হারালাম। তার জায়গায় এল অনিমেষ। আমি তো পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ধমান, আসানসোল, কিউল, বারাউনি, মোকামা, মুজফফরপুর হয়ে ঘুরছি — যেখানে যাচ্ছি — শ্রমিকরা আপনা থেকেই অভ্যর্থনায় এগিয়ে আসছে।
ততদিনে আমরা বোম্বাইয়ের জি সুন্দরম এবং দিল্লির আর-এন কাউল এদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুম করে সারা ভারত ধর্মঘট ডেকে দিলাম। আমাকে ফিরে আসতে হলো — কলকাতাকে সংগঠিত করতে। এই সময়ে অসিত জানাল কলকাতার ম্যানেজার — এরিক সোফার অসিতের কাছে সব শুনে রায়পুরের স্যানাটেরিয়ামে সিট বুক করেছে — রিভুর ঠাকুমার চিকিৎসার জন্যে। এখবরে অফিসে তুমুল শোর — মালিক — বিশেষ করে মাল্টিন্যাশনাল অর্থে ক্যালিফোর্নিয়া-টেক্সাস কোম্পানি কবে থেকে শ্রমিকদরদি হোলো যে আজ তাদের অনুগ্রহ নিতে হবে!
রিভুর ঠাকুমাকে সব বললাম। তিনি আমাকে ডেকে বললেন — “আমার মতো একটা মরা বহন করে কতদিন চলবে — তোমার কাজ তুমি করে যাও। মানুষ তো মরবেই। তোমার ডান হাত লোকেন মল্লিক দুর্ঘটনায় মারা গেল — তাতে পৃথিবী কি থেমে গেছে? মানুষ তো মরবেই — আমাকে যদি মরতে হয় তোমার বাড়িতেই শান্তিতে মরব। তোমার কাজ তুমি মন দিয়ে করে যাও।”
এদিকে ফেডারেশন দাবি করল তেল কোম্পানিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করতে হবে। এ সম্পর্কে পরে বলছি।
রিভুর ঠাকুমার কথাটা শেষ করে নি। তিনি যা বলেছিলেন সে কথা সর্বত্রই আছে — কৃষ্ণ বলছেন “জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ — তস্মাদপরিহার্যেহর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।”
শেষ পর্যন্ত তিনি বাড়িতেই দেহরক্ষা করলেন — অবশ্য তার মামাতো বোন মেডিক্যাল কলেজের মেট্রন, তিনি শেষ চেষ্টা করতে ছাড়লেন না — লাম্বার পাঙ্কচার করে রস সংগ্রহের চেষ্টা করলেন — কিন্তু ফল হলো না। অপারেশন টেবিলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। রিভুর মতো তার বাপও মাকে অনেক যন্ত্রনা দিত। একদিন আমি তাকে বললাম — তার মায়ের দিনগুলি সীমিত। শুনে সে একটু থমকে গেল।
কাউকে কিছু না জানিয়েই কাগজ দেখে দরখাস্ত কবে করেছে কিছুই জানতে পারিনি — একেবারে নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে আমাকে জানাল ইউ-বি-আইয়ের মালিয়াড়া শাখায় যোগদান করতে হবে।
রিভুর ঠাকুমা আমাকে বললেন — “বেটা ছেলে তো — তুমি যেমন হিল্লি দিল্লি করে বেড়াও — তোমার ছেলেকেও তো চাকরি করতে গেলে তাইই করতে হবে। ছেলে কি ঘরে বসে থাকবে? চাকরি পাবে কোথায়?”
ছেলেকে নিয়ে তো গেলাম মালিয়াড়া, সেখানে ম্যানেজার পবিত্র সেনগুপ্ত। খুব সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন আত্মীয়তা বেরিয়ে যাবে। ওখানে স্কুলের হেড মিসট্রেস ছেলের বন্ধুর দিদি — সুতরাং ছেলেরও দিদি — নিজের ভাইকে না পেয়ে ভাইয়ের বন্ধুকেই পরম স্নেহে আপন করে নিলেন। তার স্বামী বড়জোড়া স্কুলে মাস্টারি করতেন। এতদিন পরে অবসর নিয়ে কোন্নগর না কোথায় বাড়ি করে আছেন। এখনও যোগাযোগ রাখেন।
যোগাযোগ আরও একজন রাখেন। তিনি হলেন রিভুর মামীঠাকুমা। তিনি এখনও সেই একডালিয়া প্লেসের বাড়িতেই আছেন।
ফোন করে মাঝে মাঝে খবর নেন — বিশেষ করে নববর্ষ ও বিজয়ার পরে। একদিন হঠাৎ বললেন একদিন আসবেন কিন্তু সে একদিন এখনও আসেনি। কবে আসবে জানিনা।
[বানান ও যতিচিহ্ন অপরিবর্তিত]
চিত্রণ: মনিকা সাহা







