Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রবীন্দ্রনাথের ‘হরিচরণ’ আবিষ্কার ও হরিচরণের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ নির্মাণ

হরিচরণ— হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। হ্যাঁ, এই নামেই পরিচিত তিনি। আবার ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি সমার্থক শব্দ। কীভাবে হরিচরণ হয়ে উঠলেন শব্দ-কারিগর তথা ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ সংকলনকর্তা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সে এক দীর্ঘ যাত্রা, যে যাত্রাপথ উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মামার বাড়ি যশাইকাটি গ্রাম থেকে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন পর্যন্ত লম্বা। এর মধ্যে অনেক হোঁচট খেয়ে গড়াতে গড়াতে বর্তমান বাংলাদেশের পতিসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পারিবারিক জমিদারি সেরেস্তায়। গরিব হয়েই জন্মেছিলেন মামার বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার যশাইকাটি গ্রামের বাড়িতে, ইংরেজি ১৮৬৭ সালের ২৩ জুন। পিতা নিবারণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মা জগত্তারিণী দেবী।

সেখানেই পড়াশোনা শুরু। কিন্তু গরিব বলে পদে পদে হোঁচট। এরপর কলকাতার মেট্রোপলিটন কলেজে (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) তৃতীয় বর্ষে পৌঁছে বন্ধ হয়ে গেল স্টুডেন্টস ফান্ড। আর বাবাও মারা গেলেন। এতএব যা হবার, তাই হল। থেমে গেল পড়াশোনা। অগত্যা রোজগারের চেষ্টা। আর সে চেষ্টায় জুটল গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা। কিছুকাল পর কলকাতায় মেদিনীপুর নাড়াজোলের কুমার দেবেন্দ্রলাল খাঁয়ের গৃহশিক্ষকতা। পরে ১৯০১ সালে কলকাতা টাউন স্কুল তৈরি হলে সেখানকার হেড পণ্ডিত‌। বেতন কম বলে ছেড়েও দেন। শেষে অনেক ঘাটের জল খেয়ে এক অগ্রজের চেষ্টায় অবশেষে রবীন্দ্রনাথের এই পতিসরের জমিদারিতে।

সেখানে জমিদারির সেরেস্তায় কাজ শেষে লেখালেখি, পাণ্ডুলিপি থেকে প্রেস কপি তৈরি করা। সবটাই অবশ্য সংস্কৃত ভাষায়। এই পতিসরেই একদিন জমিদারি পরিদর্শনে এলেন রবীন্দ্রনাথ। কাজের শেষে কী করেন হরিচরণ, জানতেই উত্তরে বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ। কারণ, জবাব এসেছিল, লেখালেখি ও পাণ্ডুলিপির প্রেস কপি তৈরি করতে হয় তাঁকে এবং সবটাই সংস্কৃত ভাষায়। রবীন্দ্রনাথ চিনে রাখলেন হরিচরণকে, বলতে গেলে ‘আবিষ্কার’ করলেন। এরপর রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ফিরে তাঁর পতিসর জমিদারির ম‍্যানেজার শৈলেশচন্দ্র মজুমদারকে লিখে পাঠালেন, ‘শৈলেশ, তোমার সংস্কৃতজ্ঞ কর্মচারীকে এইখানে পাঠাইয়া দাও।’

সেইমত হরিচরণ এলেন শান্তিনিকেতনে, সময়টা ইংরেজি ১৯০২ সাল। শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে হলেন সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক। এখানে পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী, ক্ষিতিমোহন সেন, জগদানন্দ রায় প্রমুখের সঙ্গে হরিচরণকেও এক সারিতে ঠাঁই দিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই শান্তিনিকেতনে অধ‍্যাপনার সময় গুরুদেব হরিচরণকে একটি ভাল বাংলা শব্দকোষ লেখার কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথের কথায় ইংরেজি ১৯০৫ সালে হরিচরণ শুরু করেন ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ সংকলনের দুরূহ কাজ। এরপর দীর্ঘ ৪০ বছরের চেষ্টায় ১৯৪৫ সালে শেষ হয় এই কাজ।

হরিচরণ বিশ্বভারতীর কর্মজীবন থেকে অবসর নেন ইংরেজি ১৯৩২ সালে। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ সংকলন প্রকাশ করার মত তখন বিশ্বভারতীর আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। কিন্তু তাতে দমলেন না হরিচরণ। ছুটলেন ‘বিশ্বকোষ’ প্রেসের নগেন্দ্রনাথ বসুর কাছে। নগেন্দ্রনাথ জানালেন, এতটা আর্থিক ব‍্যয়ভার বহনে অক্ষম তিনি। তবে কাগজের দামটা দিলে ছেপে দিতে পারেন। এরপর সেইমত নিজের টাকায় বাংলা ১৩৪০ সাল (ইংরেজি ১৯৩৩) থেকে ওই ‘বিশ্বকোষ’ প্রেস থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ ছাপা হতে থাকে। শেষ হয় ১০৫ খণ্ডে, বাংলা ১৩৫৩ সালে।

এরপর ইংরেজি ১৯৪৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ৫টি খণ্ডে প্রকাশিত হয় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’। রবীন্দ্রনাথ একে বাংলা ভাষার এক সম্পদ বলে অভিমত দেন। গান্ধীজি হরিচরণকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ‍্যাপক গিলবার্ট মারে (George Gilbert Aimé Murray: ২ জানুয়ারি ১৮৬৬-২০ মে ১৯৫৭)-র সঙ্গে তুলনা করেন। পরবর্তীতে সাহিত্য আকাদেমী থেকেও ইংরেজি ১৯৬৬-৬৭ সালে দু’খণ্ডে হরিচরণের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রকাশিত হয়।

Advertisement

অভিধান লিখতেই কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমৃত্যু শান্তিনিকেতনেই কাটিয়েছেন। ৪০ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের শেষে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-কে আলোর মুখ দেখিয়ে ইংরেজি ১৯৫৯ সালের ১৩ জানুয়ারি হরিচরণ চলে যান মৃত্যুর দেশে।

কিন্তু কেমন ছিল তাঁর সাধনা? পরবর্তীকালের আচার্য সুনীতিকুমার দেখেছিলেন তার নমুনা। সুনীতিকুমার যখন এই ‘ক্ষীণপ্রায় ব্রাহ্মণ’ হরিচরণের বাড়ি যেতেন, দেখতেন, তাঁর তক্তপোষের ওপর ছড়ানো আছে ইংরেজি, ওড়িয়া, পার্শি, উর্দু, মারাঠিসহ বিভিন্ন ভাষার অভিধান। প্রতিদিন সান্ধ‍্য আহ্নিক সেরে কুয়োর ধারে একটি খড়ের চালাঘরে পশ্চিম দিকের জানালার পাশে বসে লিখতেন হরিচরণ। তা দেখে ছড়া বেঁধেছিলেন ঠাকুরবাড়ির দ্বিজেন ঠাকুর— ‘কোথা গো মেরে রয়েছ তলে/ হরিচরণ, কোন গরতে?/ বুঝেছি, শব্দ-অবধি জলে/ মুঠাচ্ছ খুব অরথে।’

অভিধান ছাড়াও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছাত্র-পাঠ‍্য লিখেছিলেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেগুলি হল— ১. সংস্কৃত প্রবেশ, ২. পালি প্রবেশ, ৩. ব‍্যাকরণ কৌমুদী, ৪. Hints on Sanskrit Translation and Composition, ৫. কবির কথা, ৬. রবীন্দ্রনাথের কথা। এছাড়া ম‍্যাথু আর্নল্ডের ‘সোরাব রুস্তম’ ও বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র, কবিকথামঞ্জুষা প্রভৃতি অনুবাদ করেছেন অমিত্রাক্ষর ছন্দে।

তবে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ লেখার পর আর কিছু না লিখলেও চলত তাঁর। আর এই অভিধান লেখার শেষে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গিয়েছিল তাঁর। বলেছিলেন, গুরুদেবের নির্দিষ্ট কাজে চোখ দুটো উৎসর্গ করতে পেরেছি, এটাই পরম সান্ত্বনা। বাংলা ভাষার সঙ্গে চিরকাল বেঁচে থাকবেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + 15 =

Recent Posts

প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »