কার্লোস ফুয়েন্তেস
[উৎসর্গ: মারিয়া পিলার ও হোসে দোনোসো]
ভাষান্তর: গৌতম চক্রবর্তী
১
আমি গিয়েছিলাম, কারণ সেই কার্ডটি— অদ্ভুত এক কার্ড— আমাকে হঠাৎ তার অস্তিত্বের কথা মনে করিয়ে দিল। ভুলে-যাওয়া এক বইয়ের পাতার ভেতর আমি সেটি খুঁজে পেলাম; সেই পাতাগুলো আবার জাগিয়ে তুলেছিল শিশুসুলভ হস্তলিপির ভূতুড়ে ছায়া। বহুদিন পর আমি বইগুলো নতুন করে সাজাচ্ছিলাম। আর বিস্ময়ের পর বিস্ময়। কারণ যেসব বই সবচেয়ে উঁচু তাকে রাখা ছিল বহুদিন পড়া হয়নি। এতদিনে বইয়ের পাতার ধারগুলো দানাদার হয়ে উঠেছিল। ধরলেই হাতের তালুর উপর ঝরে পড়ছিল সোনালি গুঁড়ো আর ধূসর আঁশের মিশ্রণ। যেন স্বপ্নে প্রথম দেখা দেহের উপর বার্নিশের আস্তরণ। পরে প্রতারণাময় বাস্তবে, সেই প্রথম ব্যালের আসরে, যেখানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সে ছিল আমার শৈশবের বই— হয়তো বহু শিশুর মত— যেখানে বলা হয়েছিল ভয়াল অথচ শিক্ষামূলক নানান কাহিনি। আমরা বড়দের হাঁটু ধরে ঝুলে পড়তাম। বারবার প্রশ্ন করতাম: কেন? মা-বাবার প্রতি কেন অকৃতজ্ঞ সন্তানেরা; দীপ্তিমান অশ্বারোহীদের হাতে অপহৃত কুমারী মেয়েরা কেন একরাশ লজ্জা নিয়ে ঘরে ফেরে নয়তো আনন্দের সাথে চিরদিনের মতো ছেড়ে যায় সংসার; বৃদ্ধ লোকেরা কেন অনাদায়ী ঋণের বিনিময়ে কোনও আতঙ্কিত পরিবারের সবচেয়ে স্নিগ্ধ, সহনশীলা কন্যার হাত ধরতে চায়… কেন? তাদের জবাব আজ আর মনে নেই। শুধু জানি, দাগধরা পাতাগুলো থেকে উড়ে এসে পড়েছিল এক সাদা কার্ড, আমিলামিয়ার জঘন্য হস্তাক্ষরে লেখা:
আমিলামিয়া তার ভাল বন্ধুকে ভুলবে না— এখানে এসে আমায় দেখো, যেখানে আমি এঁকেছি।
আর অপর পাশে ছিল পথের সেই নকশা যেখানে পথ শুরু হয়েছে একটি X চিহ্ন থেকে— নিঃসন্দেহে তা ইঙ্গিত করছিল উদ্যানের সেই বেঞ্চটির দিকে, যেখানে আমি, নির্ধারিত ও একঘেয়ে শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী এক কিশোর, শ্রেণিকক্ষের সময়সূচি ভুলে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম বই পড়ে। সেসব বই আদপেই আমার না লেখা হলেও, মনে হত যেন আমিই লিখেছি। কে-ই বা সন্দেহ করতে পারে যে আমার কল্পনা থেকেই জন্মেছিল সেই জলদস্যুরা, সেই জারের দূতেরা, সেই ছেলেরা যারা আমার থেকে সামান্য ছোট, অথচ সারা দিন ভেলায় চেপে আমেরিকায় একটি বিশাল নদীর বুকে ভেসে বেড়াত। উদ্যানের বেঞ্চের ধার আঁকড়ে ধরে, যেন তা এক যাদু-আসনের ধনু , প্রথমে আমি টের পাইনি পায়ের হালকা শব্দ, যা নুড়ি-বিছানো বাগানের পথে দৌড়ে আমার পেছনে এসে থেমেছিল। সে ছিল আমিলামিয়া। আমি জানি না কতক্ষণ শিশুটি আমার সঙ্গী হয়ে নীরবে বসে থাকত। তবে কোন কোন বিকেলে তার দুষ্টু স্বভাব তাকে প্রলুব্ধ করত ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে আমার কানে ঘাসফুলের তুলো ছুঁইয়ে দিতে। তখন ওর ফুলো ফুলো ঠোঁট আর কপালে গাম্ভীর্যের ভাঁজ।
সে আমার নাম জানতে চাইল, আর খুব মনোযোগ দিয়ে ভেবে একটু হেসে নিজের নাম বলল। হাসি পুরোপুরি সরল না হলেও খুব কৃত্রিমও ছিল না। দ্রুত বুঝলাম, আমিলামিয়া একটি প্রকাশভঙ্গি আবিষ্কার করেছে— যদি ‘আবিষ্কার’ কথাটি আদৌ ব্যবহার করা যায়— যা তার বয়সোচিত সরলতা এবং ভদ্রসমাজে বেড়ে ওঠা শিশুদের জ্ঞাতব্য প্রাপ্তবয়স্ক ভঙ্গির মাঝামাঝি, বিশেষ করে পরিচয় দেওয়া কিংবা বিদায় নেওয়ার মত গুরুগম্ভীর মুহূর্তে। আমিলামিয়ার গাম্ভীর্য ছিল প্রকৃতির দান, অথচ তার স্বতঃস্ফূর্ত মুহূর্তগুলো বরং মনে হত কৃত্রিম। প্রত্যেক বিকেলে আমি ওকে নানান মুহূর্তের ছবিতে মনে করতে ভালবাসতাম। সেই সব ছবি মিলে গড়ে উঠেছিল সমগ্ৰ আমিলামিয়া। আর আমাকে আজও অবাক করে যে, আমি ওকে যেমন ছিল তেমন করে মনে করতে পারি না, কিংবা ওর চলাফেরার আসল ভঙ্গি মনে করতে পারি না— হালকা, অনুসন্ধিৎসু, সবসময় ইতিউতি দৃষ্টি। ওকে মনে রাখতে হয় একেবারে সময়ের মধ্যে স্থির হয়ে থাকা অবস্থায়, কোন অ্যালবামের ছবির মত। আমিলামিয়া দূরে দাঁড়িয়ে যেখানে ক্লোভার হ্রদ থেকে পাহাড় নেমে এসে মিশেছে সমতল প্রান্তরে। সেখানে আমি বেঞ্চে বসে বই পড়তে অভ্যস্ত। দূরে সেই বিন্দুতে, আলো-ছায়ার হ্রাসবৃদ্ধির মধ্যে হাত নেড়ে ডাকছে আমায় পাহাড়ের ওপর থেকে। আবার, পাহাড় বেয়ে উড়তে উড়তে নেমে আসার মুহূর্তে আমিলামিয়া স্থির হয়ে আছে— তার সাদা স্কার্ট বেলুনের মত ফুলে উঠেছে, ফুলকাটা প্যান্টি পায়ে চেপে বসে আছে, মুখ খোলা, হাওয়ার দাপটে চোখ আধবোজা, আনন্দে চিৎকার করছে শিশুটি। ইউক্যালিপটাস গাছের নীচে বসে কান্নার ভান করছে আমিলিমিয়া যাতে আমি তার কাছে যাই। উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, হাতে ফুল— পরে জানলাম এই বাগানের নয়, হয়তো ওর বাড়ির বাগানের, কারণ ওর নীল-চেক অ্যাপ্রনের পকেট প্রায়ই ভরা থাকত সেই সাদা ফুলে। আমিলামিয়া আমাকে বই পড়তে দেখছে, দুই হাতে সবুজ বেঞ্চের কাঠি ধরে, ধূসর চোখে প্রশ্ন করছে: মনে আছে, সে কখনো আমাকে জিজ্ঞাসা করেনি আমি কী পড়ছি— যেন আমার চোখেই দেখতে পেত পাতার ভেতর জন্ম নেওয়া সব ছবি। কোমর ধরে তুলে মাথার পাশে ঘোরালে ও আনন্দে হেসে উঠত; মনে হত, সে যেন সেই ধীর উড়ানে আবিষ্কার করছে পৃথিবীর এক নতুন দিগন্ত। মুখ ফিরিয়ে বিদায় জানাচ্ছে, হাত উঁচু করে নাড়ছে, আঙুলগুলো উত্তেজিত ভঙ্গিতে নাড়ছে। আমিলামিয়া এখন অসংখ্য ভঙ্গিতে আমার বেঞ্চের চারপাশে— উল্টে ঝুলছে, ফ্রক ফুলে উঠেছে; নুড়িপাথরে পা গুটিয়ে বসে আছে, থুতনি মুঠোয় ঠেকিয়ে; ঘাসের ওপর শুয়ে, নাভি সূর্যের নীচে উন্মুক্ত; গাছের ডাল দিয়ে কিছু বুনছে; কাঠি দিয়ে কাদায় পশুর ছবি আঁকছে; বেঞ্চের কাঠ চাটছে; বেঞ্চের নিচে লুকোচ্ছে; পুরোনো গাছের গুঁড়ি থেকে আলগা বাকল তুলে ফেলছে; পাহাড়ের ওপারে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে; চোখ বুজে গুনগুন করছে; পাখি, কুকুর, বিড়াল, মুরগি, ঘোড়ার ডাক অনুকরণ করছে। সবই আমার জন্য, অথচ কিছুই নয়। এটাই ছিল ওর সঙ্গে আমার থাকার ভঙ্গি— মনে আছে সব। একইসঙ্গে এটাই ছিল পার্কের মধ্যে ওর একলা থাকার ভঙ্গি। হ্যাঁ, হয়তো আমার স্মৃতি খণ্ডিত, কারণ পড়াশোনার ফাঁকেই দেখতাম গোলগাল গালের মেয়ে, মসৃণ চুলের, যার রঙ আলোয় বদলে যেত— কখনও গমের মতো, কখনও পোড়া বাদামের মতো। আর আজ শুধু মনে হয়, সেই মুহূর্তেই আমিলামিয়া স্থাপন করেছিল আমার জীবনের অন্য দিকচিহ্ন। আমার দোদুল্যমান শৈশব আর সেই বিস্তীর্ণ পৃথিবীর মধ্যে এক টানাপোড়েন। প্রতিশ্রুত সেই ভূমি আমার হতে শুরু করেছিল পাঠের মাধ্যমে।
তখন নয়। সেই সময়ে আমি স্বপ্ন দেখতাম আমার বইয়ের নারীদের নিয়ে, সেই নিখাদ নারীকে নিয়ে—যদিও এই শব্দটি আমার বিরক্তির উদ্রেক করত— যিনি রানির ছদ্মবেশে গোপনে হার কিনতে যেতেন; কল্পনার সেইসব পৌরাণিক সত্তাদের নিয়ে— আধচেনা, অর্ধেক সাদা বুক আর স্যাঁতসেঁতে পেটের সালামান্ডার— যারা রাজাদের বিছানায় অপেক্ষা করত। আর এইভাবেই, অজান্তে, আমি আমার শৈশবসঙ্গীর প্রতি উদাসীনতা থেকে ওর শিশুসুলভ সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্যকে গ্রহণের দিকে এগিয়ে গেলাম। আর সেখান থেকে উপস্থিতির এমন এক অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখ্যানে পৌঁছলাম, যা আমার কাছে নিরর্থক হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত সে আমাকে বিরক্ত করে যেত। আমি চোদ্দ বছরের হলেও সেই সাত বছরের শিশু আমায় বিরক্ত করত। সে তখনও স্মৃতি বা নস্টালজিয়া নয়, বরং অতীত এবং তার বাস্তবতা। আমি দুর্বলতার কাছে হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমরা একসঙ্গে দৌড়েছি, হাত ধরে, মাঠের ওপারে। একসাথে আমরা পাইন গাছ ঝাঁকিয়েছি, ফল কুড়িয়েছি। আমিলামিয়া তার অ্যাপ্রনের পকেটে উৎসাহভরে তা রেখে দিত। একসঙ্গে আমরা কাগজের নৌকা বানাতাম আর আনন্দে, হাসিতে, সেগুলো নর্দমায় ভাসিয়ে কিনারা ধরে তা অনুসরণ করতাম। আর সেই বিকেলে, সোল্লাসে চিৎকার করতে করতে, যখন আমরা একসঙ্গে পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে নিচে নেমে এসেছিলাম, আমিলামিয়া এসে পড়েছিল আমার বুকে, ওর চুল আমার ঠোঁটের মাঝে। কিন্তু আমি যখন ওর হাঁফ-ধরা শ্বাস কানে শুনলাম আর ও ছোট্ট আঠালো হাতে আমার গলা আঁকড়ে ধরল, আমি রাগ করে ওর হাত সরিয়ে দিলাম, আর ও পড়ে গেল। কনুই আর হাঁটু ঘষে গিয়ে ব্যথা পেয়ে ও খুব কাঁদল আর আমি আমার বসার জায়গায় ফিরে গেলাম। তারপর আমিলামিয়া চলে গেল। পরের দিন ফিরে কিছু না বলে, আমাকে একটি কার্ড দিল। তারপর গুনগুন করতে করতে বনে হারিয়ে গেল। আমি দ্বিধায় ছিলাম কার্ডটা ছিঁড়ে ফেলব নাকি বইয়ের ভেতর রাখব: আফটারনুনস অন দ্য ফার্ম। আমিলামিয়ার কারণে আমার পড়াশোনাও শিশুসুলভ হয়ে উঠেছিল। সে আর ফিরে আসেনি উদ্যানে। কয়েক দিন পর আমি ছুটিতে চলে গেলাম, আর ফিরে এসে প্রেপ স্কুলের প্রথম বর্ষের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। পরে আমি আর কখনও তাকে দেখিনি।
২
আর এখন, প্রায় অপরিচিত হলেও আজগুবি নয় এমন একটি ছবিকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে— যা বাস্তব বলেই আরও বেশি বেদনাদায়ক— আমি ফিরে যাই সেই বিস্মৃত পার্কে। এবং পাইন ও ইউক্যালিপটাস গাছের ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে আমি চিনে ফেলি সেই ছায়াময় ঘেরাটোপের ক্ষুদ্রতা। সেটিকে আমার স্মৃতি এতদিন ধরে এত বড় করে এঁকেছে যেন সেখানে আমার কল্পনাকে যথাসাধ্য ছড়িয়ে দেওয়ার যথেষ্ট জায়গা ছিল। শেষ পর্যন্ত, মিশেল স্ত্রোগোফ আর হাকলবেরি ফিন, মিলাডি দ্য উইন্টার আর জেনেভিয়েভ দ্য ব্রাবান্ট— এদের সকলের জন্ম, বসবাস আর মৃত্যু হয়েছে এখানেই: এই একটুকু বাগানে, যা ঘিরে রেখেছে শৈবালের আবরণে ঢাকা লোহার বেড়া, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু পুরনো, অবহেলিত গাছ, যার সাজসজ্জা বলতে একটি কংক্রিটের বেঞ্চ যেটি কাঠের মতো দেখতে রঙ করা হয়েছে। এই সব আমাকে বাধ্য করে ভাবতে, আমার সেই সুন্দর নকশাকরা সবুজ রঙের লোহার বেঞ্চটি আদৌ কখনও ছিল কিনা, অথবা হতে পারে তা ছিল আমার সাজানো, স্মৃতিমেদুর বিভ্রমের অংশ। আর সেই টিলাটি… কীভাবে বিশ্বাস করব, যে খাড়াই টিলা বেয়ে আমিলামিয়া প্রতিদিন ওঠানামা করত, আমরা একসাথে গড়িয়ে পড়তাম, সেটাই কি এই টিলা। একটা সামান্য উঁচু, ঘন ঘাসে ঢাকা ফালি জমি, হারিয়েছে সেই উচ্চতা আর গভীরতা, যা রয়ে গেছে কেবল আমার স্মৃতিতে।
এখানে এসো, আমাকে দেখো, যেখানে বসে আমি এটা আঁকছি। বাগানটা আমাকে পেরোতে হবে, বনজঙ্গল পেছনে ফেলে, তিন পা লাফিয়ে টিলা বেয়ে নামতে হবে, তারপর সেই চেস্টনাট গাছের ঘন ঝোপটা পার হয়ে যেতে হবে— নিশ্চিতভাবে এটাই সেই জায়গা, যেখানে শিশুটি সাদা পাপড়ি কুড়িয়ে নিত, পার্কের সরব ফটকটা খুলে দিত, আর মুহূর্তেই মনে পড়ত… জানত… নিজেকে খুঁজে পেত রাস্তায়, বুঝত যে নিজের কৈশোরের প্রতিটি বিকেলে, যেন কোনো অলৌকিক উপায়ে কেউ চারপাশের শহরের ধ্বনির স্পন্দন থামিয়ে রেখেছে। সেই সব বাঁশি, ঘণ্টা, কণ্ঠস্বর, হাহাকার, ইঞ্জিন, রেডিও আর অভিশাপের জোয়ারকে রোধ করতে পেরেছে। আসল আকর্ষণ ছিল কোনটি? সেই নিঃশব্দ বাগান, না কি উন্মত্ত শহর?
আমি সাংকেতিক আলো বদলানোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি, তারপর রাস্তা পার হয়ে অন্য পাশে যাই— আমার চোখ একটিবারের জন্যও যানবাহন আটকে-রাখা সংকেতের রক্তচক্ষু থেকে সরে না। আমি আমিলামিয়ার কার্ডটা দেখি। শেষ পর্যন্ত, এই সাধারণ মানচিত্রটাই তো আমার বর্তমান মুহূর্তের আসল আকর্ষণ। আর শুধু এটা ভাবলেই আমি অস্থির হয়ে উঠি। আমার চতুর্দশ বছরের হারানো বিকেলগুলোর পর, আমাকে শৃঙ্খলার পথে চলতে বাধ্য করা হয়েছিল; এখন, উনত্রিশ বছর বয়সে, আমি একটি ডিপ্লোমাধারী, অফিসের মালিক, নিশ্চিত একটি মাঝারি আয়ের মানুষ— অবিবাহিত, কারও ওপর দায় নেই। মাঝে মাঝে কোন সেক্রেটারির সঙ্গে রাত কাটানোতে কিছুটা বিরক্ত, গ্রামে বা সমুদ্রতীরে ছোটখাট বেড়ানোতেও আর তেমন উত্তেজনা পাই না। আমার জীবনে কেন্দ্রীয় কোনো আকর্ষণ নেই— যেমন ছিল একসময় আমার বই, আমার পার্ক, আর আমিলামিয়া। আমি এই ধূসর শহরতলির রাস্তায় হাঁটতে থাকি। একতলা ঘরগুলো, রঙচটা দরজা নিয়ে, একের পর এক সামনে আসে একঘেয়ে ছন্দে। পাড়ার ক্ষীণ শব্দগুলো কেবলমাত্র সেই একঘেয়েমি ভাঙে— কোথাও ছুরি ধার দেওয়ার কর্কশ শব্দ, কোথাও মুচির হাতুড়ির টোকা। বাচ্চারা বন্ধ রাস্তার ভিতরে খেলছে। শিশুদের ছড়া কাটার সঙ্গে মিলেমিশে এক অর্গান বাজিয়ের সুর কানে আসে। আমি একটু থেমে গিয়ে ওদের দেখি— আমার মনে হয়, আমিলামিয়া যেন এই দলের মধ্যে আছে। অশালীনভাবে দেখা যাচ্ছে ওর ফুলকাটা প্যান্টি, হাঁটু ভাঁজ করে ঝুলে আছে কোন বারান্দা থেকে, ওর অ্যাপ্রনের পকেট ভর্তি সাদা ফুলের পাপড়িতে। আমি হাসি। প্রথমবারের মতো আমি কল্পনা করতে পারি সেই বাইশ বছরের তরুণীটিকে, যে— ধরা যাক এখনও এই ঠিকানায় থাকে— আমার স্মৃতিকথা শুনে হয়তো হেসে উঠবে, বা হয়তো পুরোপুরি ভুলেই গেছে বাগানের সেই বিকেলগুলোর কথা।
ঘরটা বাকি সব ঘরগুলোর মতই। ভারী প্রবেশদ্বার, জালি-দেওয়া দু’টি জানালা, শাটারে ঢাকা। একতলা ঘর, ওপরের দিকে নতুন ধরনের রেলিং— যা হয়তো ছাদের কাজের অংশগুলো ঘিরে রেখেছে: কাপড় শুকোনর দড়ি, জলভরা পাত্র, দাস-দাসীদের ঘর, মুরগির খাঁচাও। বেল বাজানোর আগে আমি আমার ভ্রম দূর করতে চাই। আমিলামিয়া হয়তো আর এখানে থাকে না। কেনই বা সে পনেরো বছর ধরে একই বাড়িতে থাকবে? তাছাড়া, সে ছিল অল্প বয়সেই স্বাধীনচেতা, ভদ্র ও শালীন। এই পাড়া এখন আর অভিজাত নয়; নিশ্চয়ই ওদের পরিবার অন্য কোথাও চলে গেছে। তবে নতুন ভাড়াটেরা হয়তো জানবে ওরা কোথায় গেছে।
আমি ঘণ্টি বাজিয়ে অপেক্ষা করি। আবার বাজাই। আরেকটা সম্ভাবনা আছে— বাড়িতে কেউ নেই। আমি কি আবার আমার শৈশবের বন্ধুকে খুঁজব? না। কারণ, দ্বিতীয়বার আর এমন হবে না যে, আমি আমার কৈশোরের কোনো বই খুলে দেখব, আর সেখানে আমিলামিয়ার কার্ড খুঁজে পাব। আমি ফিরে যাব আমার দৈনন্দিনতায়, ভুলে যাব এই মুহূর্ত— গুরুত্বপূর্ণ কেবল তার ক্ষণিক বিস্ময়।
আমি আবার ঘণ্টি বাজাই। দরজায় কান পেতে চমকে উঠি— ওপাশে কর্কশ, অনিয়মিত শ্বাসের শব্দ, যেন পরিশ্রান্ত নিঃশ্বাস, আর তার সঙ্গে মিশে বাসি তামাকের বিরক্তিকর গন্ধ, দরজার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসে ক্রমাগত।
“শুভ অপরাহ্ণ। আপনি কি আমায় বলতে পারেন…?”
আমার কণ্ঠস্বর শুনে লোকটি ভারী ও অনিশ্চিত পদক্ষেপে সরে যায়। আমি আবার ঘণ্টা টিপি, আর চিৎকার করে বলি, “এই যে! দরজা খুলুন! কী হয়েছে? আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না?”
কোনো উত্তর নেই। আমি ঘণ্টা বাজিয়েই যাই, কিন্তু কোন ফল হয় না। দরজা থেকে সরে এসে ছোট ফাঁকফোকরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি, যেন এই দূরত্ব আমাকে বিশেষ কোনো দৃষ্টিভঙ্গি বা দরজা ভেদ করে দেখার শক্তি দেবে। অভিশপ্ত দরজাটির দিকে চোখ স্থির রেখে আমি পিছন দিকে হেঁটে রাস্তা পার হই। হঠাৎ এক তীক্ষ্ণ চিৎকার, তারপর দীর্ঘ ও প্রচণ্ড এক বাঁশির শব্দ— সময়মতো আমাকে রক্ষা করে। হতভম্ব হয়ে আমি সেই মানুষটিকে খুঁজি যার কণ্ঠ আমাকে বাঁচাল। দেখি কেবল একটি মোটরগাড়ি রাস্তা ধরে চলে যাচ্ছে, আর আমি একটি ল্যাম্পপোস্ট আঁকড়ে ধরি— নিরাপত্তার চেয়েও বেশি সেটি আমার অবলম্বন, কারণ বরফশীতল রক্ত আমার জ্বলন্ত, ঘামে ভেজা ত্বকের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে। আমি সেই বাড়িটার দিকে তাকাই— যেটা ছিল, আছে, অবশ্যই আছে— আমিলামিয়ার। সেখানে, বারান্দার রেলিংয়ের আড়ালে, যেমনটা আমি জানতাম থাকবে, শুকোতে দেওয়া কাপড় দুলছে। আর কী কী ঝুলছে সেখানে— স্কার্ট, পায়জামা, ব্লাউজ— আমি জানি না। আমি শুধু দেখি সেই কড়া করে মাড় দেওয়া ছোট নীল-চেক অ্যাপ্রনটি, ক্লিপ আটকানো অবস্থায়, লোহার দণ্ড আর সাদা দেয়ালের একটি পেরেকের মধ্যে টানানো লম্বা দড়িতে দুলছে।
৩
রেকর্ড অফিসে আমাকে বলা হয়েছে যে সম্পত্তিটি শ্রী আর. ভালদিভিয়ার নামে, যিনি বাড়িটি ভাড়া দেন। কাকে? তারা জানে না। ভালদিভিয়া কে? তাকে ব্যবসায়ী হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তিনি কোথায় থাকেন? আপনি কে? —এক তরুণী উদ্ধত কৌতূহলে আমার কাছে জানতে চাইল। আমাকে দেখে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়নি। ঘুম আমার স্নায়বিক ক্লান্তি দূর করতে পারেনি। ভালদিভিয়া। অফিস থেকে বেরিয়ে আসতেই সূর্য আমার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মেঘের ফাঁক দিয়ে ঝাপসা সূর্যালোকের কারণে যে বিরক্তি— বরং আরও তীব্র—তা আমাকে স্যাঁতসেঁতে, ছায়াময় পার্কে ফিরে যেতে প্রলুব্ধ করে। না। সেটা কেবল এই জানার আকাঙ্ক্ষা যে আমিলামিয়া কি ওই বাড়িতে থাকে, আর কেন তারা আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। কিন্তু যা আমাকে বাদ দিতে হবে, তা হলো সেই হাস্যকর ধারণা, যা আমাকে সারা রাত জাগিয়ে রেখেছিল। ছাদের উপর শুকোতে দেওয়া অ্যাপ্রনটি দেখে— যে অ্যাপ্রনে সে ফুল রাখত— আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে সেই বাড়িতে বাস করে সাত বছরের একটি মেয়ে, যাকে আমি চৌদ্দ বা পনেরো বছর আগে চিনতাম… তার নিশ্চয়ই একটি ছোট মেয়ে আছে! হ্যাঁ। বাইশ বছর বয়সী আমিলামিয়া এক কন্যাসন্তানের মা, যে হয়তো একইভাবে পোশাক পরে, একইরকম দেখতে, একই রকমের খেলা খেলে, আর— কে জানে— হয়তো একই পার্কেও যায়। গভীর চিন্তায় ডুবে আমি আবার সেই বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছাই। ঘণ্টা বাজাই এবং দরজার ওপাশে সেই কষ্টসাধ্য শ্বাসের অপেক্ষা করি। ভুল হয়েছে আমার। দরজা খোলেন এক মহিলা, যার বয়স পঞ্চাশের বেশি নয়। কিন্তু গায়ে শাল জড়ানো, কালো পোশাক ও চ্যাপ্টা কালো জুতো পায়ে, মুখে কোনো প্রসাধন নেই, নুন-মরিচ চুল খোঁপা করে বাঁধা— তাকে মনে হয় যেন তিনি যৌবনের সব ভ্রম বা ভান ত্যাগ করেছেন। তিনি এমন নির্লিপ্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন, যা প্রায় নিষ্ঠুরতার সামিল।
“কী চাই আপনার?”
“শ্রী ভালদিভিয়া আমাকে পাঠিয়েছেন।” একটু কেশে আমি চুলে হাত বুলোই। অফিস থেকে আমার ব্রিফকেসটা নিয়ে আসা উচিত ছিল। বুঝতে পারি যে ওটা ছাড়া আমার ভূমিকাটা ঠিকমতো পালন করা কঠিন হবে।
“ভালদিভিয়া?” মহিলা জিজ্ঞেস করেন, না কোনো উৎকণ্ঠা, না কোনো আগ্রহ।
“হ্যাঁ, এই বাড়ির মালিক।”
একটা বিষয় স্পষ্ট— মহিলার মুখ দেখে কিছুই বোঝা যাবে না। তিনি নির্বিকার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
“ওহ, হ্যাঁ। বাড়ির মালিক।”
“আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”
খারাপ কৌতুকনাট্যে ফেরিওয়ালা দরজার ফাঁকে পা গলিয়ে দেয় যাতে মুখের ওপর কেউ দরজা বন্ধ করে না দিতে পারে— আমি ঠিক তেমনটাই করি। কিন্তু মহিলা এক পা সরে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় আমাকে ভেতরে আসতে বলেন। জায়গাটা বোধহয় আগে একটা গ্যারেজ ছিল। এক পাশে কাচের একটা দরজা, রং অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। হলদে টাইলস বসানো প্রবেশপথ পেরিয়ে আমি দরজার দিকে এগোই এবং পেছনে ছোট ছোট পা ফেলে আসা মহিলার দিকে ঘুরে আবার জিজ্ঞেস করি— “এই দিক দিয়ে?”
আর এই প্রথম আমি লক্ষ করি, তাঁর ফ্যাকাশে হাতে একটি জপমালা, যেটা তিনি অবিরাম আঙুলে ঘোরাচ্ছেন। শৈশবের পর এমন পুরোনো ধাঁচের জপমালা আর দেখিনি। এ নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে হলেও, দরজাটা রুক্ষ, দৃঢ় ভঙ্গিতে খুলতে দেখে অপ্রয়োজনীয় আলাপ বর্জন করতে হয়। আমরা ঢুকি লম্বা, সরু একটি ঘরে। মহিলা দ্রুত জানালার পাল্লা খুলে দেন। তবু কাচলাগানো চীনামাটির টবে রাখা চারটি বড় চিরসবুজ গাছের জন্য ঘরটা ছায়াময়। ঘরে আর যা আছে, তা হলো একটি উঁচু পিঠওয়ালা বেতের সোফা এবং একটি দোলনা চেয়ার। কিন্তু গাছগুলো বা আসবাবের এই স্বল্পতা কিছুই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে না।
মহিলা আমাকে সোফায় বসতে বলে নিজে দোলনা চেয়ারে বসেন। আমার পাশে, সোফার বেতের হাতলের ওপর, একটি খোলা পত্রিকা পড়ে আছে।
“শ্রী ভালদিভিয়া নিজে আসতে না পারায় ক্ষমা চেয়েছেন।” মহিলা নির্নিমেষ দৃষ্টিতে দুলতে থাকেন। আমি চোখের কোণ দিয়ে কমিক বইটার দিকে তাকাই।
“তিনি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং…”
আমি থেমে যাই, মহিলার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়। তিনি দুলতেই থাকেন। পত্রিকাটা লাল আঁকিবুঁকিতে ভরা।
“…এবং আপনাকে জানাতে বলেছেন যে কয়েক দিনের জন্য আপনাকে একটু বিরক্ত করতে হবে…”
আমার চোখ দ্রুত ঘরের ইতিউতি খুঁজে বেড়ায়।
“…কর সংক্রান্ত কারণে বাড়িটির পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। মনে হচ্ছে অনেক দিন ধরে তা করা হয়নি… তা কদ্দিন আপনি এখানে বসবাস করছেন…?”
হ্যাঁ। ওটা এক টুকরো লিপস্টিক, চেয়ারের নিচে পড়ে আছে। মহিলা যখন হাসেন তখন তার আঙুলগুলো ধীরগতিতে জপমালার দানাগুলো স্পর্শ করে। আমি মুহূর্তের জন্য এক ঝলক তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের আভাস টের পাই। যদিও তাঁর মুখাবয়বে তা পুরোপুরি প্রকাশ পায় না। কোন উত্তর আসে না তাঁর কাছ থেকে।
“…অন্তত পনেরো বছর ধরে— তাই না?”
তাঁর সম্মতি বলে কিছু নেই। অসম্মতিও নেই। আর তাঁর ফ্যাকাশে, সরু ঠোঁটে লিপস্টিকের সামান্যতম চিহ্নও নেই…
“…আপনি, আপনার স্বামী, আর…”
স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, মুখের অভিব্যক্তি একটুও বদলায় না— বাকিটা বলতে আমাকে প্রায় যেন চ্যালেঞ্জ করছেন। আমরা কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকি— তিনি জপমালা নিয়ে খেলা করছেন, আমি সামনের দিকে ঝুঁকে, দুই হাত হাঁটুর ওপর। আমি উঠে দাঁড়াই।
“ঠিক আছে, তাহলে আজ বিকেলে কাগজপত্র নিয়ে আবার আসব…”
তিনি মাথা নাড়েন। তারপর নীরবে লিপস্টিক আর কমিক বইটি তুলে নিয়ে শালের ভাঁজে লুকিয়ে ফেলেন।
৪
দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই বিকেলে, আমি যখন আমার নোটবুকে ভুয়ো অঙ্ক কষছি এবং নিষ্প্রাণ মেঝের তক্তাগুলোর দাম ও বসার ঘরের দৈর্ঘ্য নির্ধারণে আগ্রহ দেখানোর ভান করছি, তখন মহিলাটি দোলনা চেয়ারে বসে দুলছেন— জপমালার তিন দশকের দানা তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে নীরবে ঘুরে যাচ্ছে। বসার ঘরের তথাকথিত তালিকা শেষ করে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। তারপর বাড়ির বাকি অংশ দেখার অনুমতি চাই। মহিলাটি উঠে দাঁড়ান— দোলনা চেয়ারে তাঁর দীর্ঘ, কালো পোশাকঢাকা বাহু ঠেকিয়ে ভর দিয়ে সরু, হাড়জিরজিরে কাঁধে শালটি ঠিক করে নেন।
তিনি ঝাপসা কাচের দরজাটি খুলে দেন। আমরা ঢুকি এক খাবার ঘরে, যেখানে অতিরিক্ত আসবাব প্রায় নেই বললেই চলে। অ্যালুমিনিয়ামের পায়াওয়ালা একটি টেবিল এবং চারটি অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের চেয়ার। আসবাবময় বসার ঘরের সামান্যতম বৈশিষ্ট্যও বহন করে না। অন্য জানালায় লোহার জাল ও বন্ধ শাটার। কোনো একসময় হয়তো এই ফাঁকা দেয়ালের খাবার ঘরে আলো দিত। সেখানে না আছে তাক, না কোনো নিচু ক্যাবিনেট।
টেবিলের ওপর একমাত্র বস্তু একটি প্লাস্টিকের ফলের পাত্র— তাতে একগুচ্ছ কালো আঙুর, দু’টি পিচফল, আর চারপাশে ভনভনে মাছির ঝাঁক। মহিলাটি— হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করে, অভিব্যক্তিহীন মুখে, আমার পেছনে এসে থামলেন। আমি নিয়ম ভাঙার ঝুঁকি নিলাম: স্পষ্টতই, এই ঘরগুলো আমাকে এমন কিছু জানাবে না যা আমি সত্যিই জানতে চাই।
“আমরা কি ছাদে যেতে পারি?” আমি জিজ্ঞেস করি।
“মোট ক্ষেত্রফল মাপার জন্য সেটাই হয়তো সবচেয়ে ভাল উপায়।”
মহিলাটি আমার দিকে তাকান, তার চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে— অথবা হয়তো তা শুধু খাবার ঘরের আলোছায়ার বৈপরীত্যের ফল।
“কেন?” তিনি অবশেষে বলেন। “শ্রী… ভালদিভিয়া… তো মাপগুলো খুব ভাল করেই জানেন।”
আর মালিকের নামের আগে ও পরে তার সেই সংক্ষিপ্ত বিরতি হল প্রথম ইঙ্গিত যে অবশেষে তিনি বিচলিত বোধ করতে শুরু করেছেন, এবং আত্মরক্ষার জন্য তিনি বিদ্রূপাত্মক আচরণের আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
“আমি জানি না”, আমি জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করি। “হয়তো আমি ওপর থেকে নিচের দিকে যেতে চাইব, আর”— আমার মেকি হাসিটা মিলিয়ে যায়— “নিচ থেকে ওপরে নয়।”
“তুমি সেই পথেই যাবে যেটা আমি দেখাব”, মহিলা বলেন। হাত তাঁর বুকের ওপর গোটানো। গাঢ় পেটের ওপর রুপোর ক্রুশটা ঝুলছে।
মৃদু হেসে ওঠার আগে আমি নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করি যে এই অন্ধকারে আমার অঙ্গভঙ্গির কোনো মূল্য নেই, প্রতীকী অর্থও নেই। আমি মচমচ শব্দ করে নোটবইয়ের কার্ডবোর্ডের মলাটটা খুললাম এবং যত দ্রুত সম্ভব নোট নিতে শুরু করলাম। একবারও মাথা তুলে তাকালাম না— সংখ্যা আর আনুমানিক হিসেব লিখে চললাম এমন এক কাজের জন্য, যা নিছক কল্পনা— গালে আলোর ঝলক, আর বোধগম্য জিভের শুষ্কতা আমায় বলছে— কাউকে বোকা বানানো হচ্ছে না। গ্রাফ কাগজে আমি উদ্ভট সব চিহ্ন, বর্গমূল আর বীজগাণিতিক সূত্র লিখে চলি, আর নিজেকে প্রশ্ন করি কী আমাকে কাজের কথায় আসতে বাধা দিচ্ছে— আমিলামিয়ার কথা জিজ্ঞেস করে এখান থেকে সন্তোষজনক উত্তর নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এমন কিছু নয়। তবে আমি নিশ্চিত, উত্তর পেলেও সত্যটা পেতাম না। আমার কৃশকায়া, নীরব সঙ্গিনী— রাস্তার ভিড়ে তাকে হয়তো আমি দ্বিতীয়বার তাকিয়েও দেখতাম না— কিন্তু এই প্রায় জনশূন্য বাড়িতে, রুক্ষ আসবাবপত্রের মধ্যে, সে আর ভিড়ের অচেনা মুখ নয়; বরং এক রহস্যময় চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এটাই সেই বৈপরীত্য। আর যদি আমিলামিয়ার স্মৃতি আবার আমার কল্পনার ক্ষুধা জাগিয়ে তোলে, তবে আমি খেলাটার নিয়ম মেনে চলব— দেখনদারি শেষ পর্যন্ত খতিয়ে দেখব, যতক্ষণ না সেই উত্তর পাই— হয়তো সহজ, স্পষ্ট, সরাসরি— যা লুকিয়ে আছে জপমালা হাতে সেই মহিলার আবরণের অন্তরালে, যা দিয়ে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে আড়াল করেছেন আমার পথ। আমি কি আমার অনিচ্ছুক গৃহকর্ত্রীকে অকারণে রহস্যময় করে তুলছি? যদি তাই হয়, তবে নিজের কল্পনার গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়াতে আমার আনন্দই হবে বেশি। ফলের থালার চারপাশে এখনও মাছিগুলো ভনভন করছে, মাঝেমধ্যে থেমে যাচ্ছে পিচফলের নষ্ট দিকটায়— একটা কাটা দাগে— আমি নোট নেওয়ার অজুহাতে আরও কাছে ঝুঁকে পড়ি— যেখানে ছোট ছোট দাঁত মখমলের মতো খোসা আর হলদেটে শাঁসে কিছু চিহ্ন রেখে গেছে। আমি গৃহকর্ত্রীর দিকে তাকাই না। আমি ভান করি যেন আমি নোট নিচ্ছি। ফলটা যেন কামড়ানো হয়েছে, কিন্তু ছোঁয়া হয়নি। আমি ভালো করে দেখার জন্য নিচু হয়ে বসি, টেবিলের ওপর হাত রাখি, ঠোঁট আরও কাছে নিয়ে যাই— যেন না ছুঁয়ে আবার কামড় দেওয়ার কাজটা করতে চাই। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার পায়ের কাছে আরেকটা চিহ্ন: দুটি টায়ারের দাগ— মনে হয় সাইকেলের টায়ার— রাবারের ছাপ টেবিলের কিনারা পর্যন্ত এসেছে, তারপর মিলিয়ে যেতে যেতে পুরো ঘর পেরিয়ে সেই গৃহকর্ত্রীর দিকে গেছে…
আমি নোটবই বন্ধ করি।
“চলুন, ম্যাডাম।”
তাঁর দিকে ফিরে দেখি তিনি একটি চেয়ারের পিঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। তার সামনে বসে আছেন একজন লোক— কালো সিগারেটের ধোঁয়ায় কাশছেন— চওড়া কাঁধ, আর কোটরগত চোখ। চোখ দুটো— ফোলা, কোঁচকানো পাতার আড়ালে প্রায় অদৃশ্য, যেন প্রাচীন কচ্ছপের ঘাড়ের মতো মোটা আর ঝুলে পড়া— তবু মনে হয় আমার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করছেন।
অর্ধেক কামানো গাল জুড়ে হাজারো ধূসর ভাঁজ, উঁচু হয়ে থাকা গালের হাড় থেকে ঝুলে পড়েছে। তাঁর সবুজাভ হাত দুটো ভাঁজ করে বগলের নিচে রাখা। তিনি একটি খসখসে নীল শার্ট পরেছেন। এলোমেলো চুল এতটাই কোঁকড়ানো যে দেখলে মনে হয় যেন গুগলি-শামুকে ঢাকা কোন জাহাজের নীচের অংশ। তিনি স্থির; তাঁর অস্তিত্বের একমাত্র চিহ্ন হল সেই কঠিন শিসের মতো শ্বাসপ্রশ্বাস (যেন প্রতিটি শ্বাসকে কফ, জ্বালা আর অবহেলার কোনও দরজা ভেঙে বেরোতে হচ্ছে)। আমি তা আগেই দরজার ফাঁক দিয়ে শুনতে পেয়েছিলাম।
অদ্ভুতভাবে তিনি বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, “শুভ অপরাহ্ণ।” আমি যেন সবকিছু ভুলে যেতে চাই: রহস্য, আমিলামিয়া, তদন্ত, সাইকেলের চিহ্ন। এই হেঁপো বুড়োর ভালুকের মতো আবির্ভাব দ্রুত সরে পড়ার পক্ষে যথেষ্ট কারণ। আমিও “শুভ অপরাহ্ণ” বলি, তবে বিদায়ের সুরে। কচ্ছপের মত মুখোশটি হঠাৎ ভয়ংকর এক হাসিতে গলে যায়। সেই মুখে মাংসের প্রতিটি ছিদ্র যেন ভঙ্গুর রাবার, রঙ করা, খোসার মত তেলকাপড় দিয়ে তৈরি। দু’হাত বাড়িয়ে আটকে দেয় আমার পথ।
লোকটি এক দূরবর্তী, চাপা কণ্ঠে বলে— “ভালদিভিয়া চার বছর আগে মারা গেছে।” সেই দুর্বল, তীক্ষ্ণ স্বর যেন গলা থেকে নয়, পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। তার শক্ত ব্যথাদায়ক থাবার মধ্যে আমি নিজেকে বলি, ভান করে লাভ নেই। কিন্তু সেই মোমের মতো, রাবারের মতো মুখগুলো আমার দিকে তাকিয়ে থেকেও কিছু বলে না। তাই সবকিছুর পরেও আমি আর একবার ভান করতে পারি। যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছি এমন ভান করে বলি: “আমিলামিয়া…”
হ্যাঁ; আর কারও ভান করার দরকার নেই। যে মুঠো আমার বাহু আঁকড়ে ধরেছিল, এক মুহূর্তের জন্যই তার শক্তি দেখায়; সঙ্গে সঙ্গেই সেই আকর্ষণ ঢিলে হয়ে যায়, তারপর দুর্বল কাঁপা হাত পড়ে গিয়ে আবার উঠে সেই মোমের মতো হাতটি ধরে— যে হাতটি তার কাঁধে রাখা ছিল। শ্রীমতী, এই প্রথম খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে আমার দিকে অপমানিত পাখির মত তাকান। আর নীরস গোঙানির মতো কেঁদে ওঠেন— তার মুখের কঠিন বিস্ময়ের একটুও হেরফের হয় না। হঠাৎ আমার কল্পনার দৈত্যরা আর দৈত্য থাকে না— হয়ে ওঠে দু’জন একাকী, পরিত্যক্ত, আহত বৃদ্ধ মানুষ। কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরে সামান্য সান্ত্বনা খুঁজছে। আর সেই দৃশ্য আমাকে লজ্জায় ভরিয়ে দেয়। আমার কল্পনা আমাকে এই নির্জন খাবার ঘরে এনে দাঁড় করিয়েছে— দু’জন মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও গোপনীয়তা ভেঙে দিতে। ওঁরা জীবনের বাইরে নির্বাসিত হয়ে আছে এমন কিছুর জন্য, যার সঙ্গে নিজেকে আর যুক্ত করার অধিকার আমার নেই। নিজেকে আমি কখনও এত ঘৃণা করিনি। কখনও কথাগুলো এরকম বেখাপ্পাভাবে আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়নি। আমার যাবতীয় অঙ্গভঙ্গিই এখন অর্থহীন। আমি কি এগিয়ে গিয়ে ওঁদের ছোঁব? মহিলার মাথায় হাত বুলিয়ে দেব? নাকি আমার এই অনধিকার প্রবেশের জন্য ক্ষমা চাইব? আমি খাতাটা আবার জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে দিই। আমার গোয়েন্দা গল্পের সব সূত্র— কমিক বই, লিপস্টিক, কামড়ানো ফল, সাইকেলের চিহ্ন, নীল-চেকের অ্যাপ্রন— সব বিস্মৃতির অন্ধকারে ছুড়ে ফেলি। সিদ্ধান্ত নিই আর কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব। বুড়ো মানুষটি তার ভারী চোখের পাপড়ির আড়াল থেকে হয়তো তা লক্ষ করেছিলেন।
এক গভীর শ্বাস নিয়ে তিনি বলে ওঠেন—
“তুমি কি তাকে চিনতে?”
তাদের কাছে অতীত এত স্বাভাবিক— প্রতিদিন ব্যবহৃত— যে তা শেষ পর্যন্ত আমার সব ভ্রম ভেঙে দেয়। এই তো উত্তর। তুমি কি তাকে চিনতে? কতদিন ধরে? কতদিন ধরে এই পৃথিবী আমিলামিয়াকে ছাড়া বেঁচে আছে— প্রথমে আমার বিস্মৃতির হাতে খুন হয়েছে। তারপর সবেমাত্র গতকালই আবার জীবিত হয়েছে এক বিষণ্ণ, অসহায় স্মৃতির মাধ্যমে।
কখন থেকে সেই গুরুগম্ভীর ধূসর চোখদুটি আর বিস্ময় বোধ করত না সেই চিরনিঃসঙ্গ বাগানের আনন্দে? ঠোঁট দুটি আর ফুলে উঠত না বা পাতলা হয়ে একসাথে চেপে বসত না— সেই আনুষ্ঠানিক গাম্ভীর্যে? যার মাধ্যমে, এখন আমি বুঝতে পারি, আমিলামিয়া হয়তো জীবনের নানা বস্তু আর ঘটনাকে আবিষ্কার করত এবং পবিত্র করে তুলত। সে হয়তো অন্তর্দৃষ্টিতে জানত যে জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী।
“হ্যাঁ, আমরা পার্কে একসঙ্গে খেলতাম। অনেক দিন আগে।”
“ওর বয়স কত ছিল?” বৃদ্ধ লোকটি বলে, তার কণ্ঠ আরও মৃদু হয়ে আসে।
“ওর বয়স নিশ্চয়ই সাতের কাছাকাছি। তার বেশি নয়।”
মহিলা-কণ্ঠ উচ্চকিত হয়ে ওঠে, যেন হাত তুলে অনুনয় করছে: “ও কেমন ছিল, মশায়? দয়া করে বলুন, ও কেমন ছিল।”
আমি চোখ বন্ধ করি। “আমিলামিয়া আমার কাছেও এখন কেবলই স্মৃতি। আমি তাকে শুধু সেইসব জিনিসের মধ্য দিয়েই কল্পনা করতে পারি, যেগুলো সে ছুঁয়েছিল, যেগুলো সে নিয়ে এসেছিল, যেগুলো সে পার্কে আবিষ্কার করেছিল। হ্যাঁ… এখন আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি— সে পাহাড় বেয়ে নিচে নামছে। না, এটা সত্যি নয় যে ওটা কেবল সামান্য উঁচু একটা খড়ে ঢাকা জমি ছিল। আসলে ওটা ছিল একটা ঘাসে ঢাকা পাহাড়। আর আমিলামিয়ার বারবার আসা-যাওয়ায় সেখানে একটা পথ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। নামার আগে সে পাহাড়ের চূড়া থেকে আমাকে হাত নেড়ে ডাকত— সুরেলা সেই ডাক… হ্যাঁ, সেই ডাক যা আমি দেখেছিলাম, সেই ছবি যার ঘ্রাণ আমি পেয়েছিলাম, সেই স্বাদ যা আমি শুনেছিলাম, সেই গন্ধ যা আমি স্পর্শ করেছিলাম… আমার বিভ্রম…” ওরা কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছে?
“সে হাত নাড়তে নাড়তে আসত, সাদা পোশাকে, নীল চেকের অ্যাপ্রন পরে— ওটাই, যা এখন তোমাদের ছাদবারান্দায় ঝুলছে।”
ওরা আমার হাত চেপে ধরেন, তবু আমি চোখ খুলি না।
“ও কেমন ছিল, মশায়?”
“ওর চোখ ছিল ধূসর, সূর্যের আলো আর গাছের ছায়ায় ওর চুলের রং বদলে যেত।”
ওরা দু’জনে আমাকে ধীরে ধীরে নিয়ে গেল। কানে আসছে বৃদ্ধ লোকটির কষ্টকর শ্বাস, আর মহিলার শরীরে জপমালার ক্রুশটি ঠকঠক করে লাগার শব্দ।
“দয়া করে বলুন…”
“দৌড়লে হাওয়ার ঝাপটে তার চোখে জল এসে যেত; আমার বেঞ্চের কাছে পৌঁছলে আনন্দের অশ্রুতে তার গাল রূপোলি হয়ে উঠত…”
আমি চোখ খুললাম না। এখন আমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছি। দুই, পাঁচ, আট, নয়, বারো ধাপ। চারটি হাত আমার শরীরকে পথ দেখাচ্ছে।
“সে কেমন ছিল, কেমন ছিল সে?”
“সে ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে বসে ডাল দিয়ে মালা গাঁথত, আর ভান করে কাঁদত— যেন আমি পড়া বন্ধ করে তার কাছে যাই…”
কপাটের কবজা কেঁপে ওঠে। গন্ধটি অন্য সবকিছুকে ঢেকে ফেলে— অন্য ইন্দ্রিয়গুলোকে সরিয়ে দেয়, আমার বিভ্রমের সিংহাসনে বসে পড়ে যেন হলুদ মঙ্গোল সম্রাটের মতো; কফিনের মতো ভারী, ঝুলে থাকা রেশমের সাপের মতো ধূর্ত, তুর্কি রাজদণ্ডের মতো অলংকৃত, হারানো আকরিকের শিরার মতো অস্বচ্ছ, মৃত নক্ষত্রের মতো দীপ্ত। হাতগুলো আমাকে আর ধরে নেই। ফোঁপানির চেয়েও বেশি, বৃদ্ধ দম্পতির কাঁপন আমাকে ঘিরে ধরে।
ধীরে ধীরে আমি চোখ খুলি— প্রথমে কর্নিয়ার ঘূর্ণায়মান তরলের ভেতর দিয়ে, তারপর চোখের পাতার জালের ফাঁক দিয়ে। নানাবিধ খুশবুর বিরাট লড়াইয়ে দমবন্ধকরা সেই ঘরটি— কটুগন্ধ, হিমশীতল, প্রায় মাংসের মতো পাপড়ি— আমার সামনে উন্মোচিত হল…।
ফুলের উপস্থিতি এখানে এতই তীব্র যে মনে হয় সব ফুল জীবন্ত মাংসের মতো হয়ে উঠেছে— জুঁইয়ের মিষ্টি গন্ধ, লিলির গন্ধে বমনেচ্ছা, কবরস্থানে রজনীগন্ধা, গার্ডেনিয়ার মন্দির-আশ্রিত সুবাস। ভারী, ছটফটে মোমবাতির শিখায় আলোকিত ছোট, জানালাবিহীন শোবার ঘরটি— মোম আর ভেজা ফুলের গন্ধে ভরা— আমার বুকের গভীর কেন্দ্রটিকে যেন আঘাত করে। সেখান থেকেই, জীবনের সেই সূর্যকেন্দ্র থেকেই, আমি সচেতন হয়ে উঠি। মোমবাতির ওপারে, ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলোর মাঝখানে দেখতে পাই অসংখ্য ব্যবহৃত খেলনা। রঙিন চক্র আর কোঁচকানো বেলুন, স্বচ্ছ শুকনো চেরি, এলোমেলো কেশরের কাঠের ঘোড়া, স্কুটার, অন্ধ কেশহীন পুতুল, কাঠের গুঁড়ো বেরিয়ে পড়া ভালুক, ছিদ্রবহুল তেলকাপড়ের হাঁস, পোকায় খাওয়া কুকুর, ছেঁড়া লাফানোর দড়ি, শুকনো মিষ্টিতে ভরা কাচের জার, জীর্ণ জুতো, ট্রাইসাইকেল— তিন চাকা? না, দুই, কিন্তু সাইকেলের মতো নয়— নীচে দু’টি সমান্তরাল চাকা), ছোট উলের আর চামড়ার জুতো। আর আমার সামনে, হাতছোঁয়া দূরত্বে, ছোট একটি কফিন। নীল বাক্সের ওপর সেটি রাখা, কাগজের ফুল দিয়ে সাজানো, জীবনের ফুল এবার, কার্নেশন, সূর্যমুখী, পপি, টিউলিপ। কিন্তু অন্য ফুলগুলোর মতোই— যেগুলো মরণের ফুল— সবই যেন মিলে গেছে এই অন্ত্যেষ্টির উষ্ণ কাচঘরের আবহে। সেখানে, রূপোলি কফিনের ভেতরে, কালো রেশমের চাদরের মাঝে, সাদা শাটিনের বালিশে শুয়ে আছে সেই স্থির, শান্ত মুখটি— লেসে ঘেরা, হালকা গোলাপি আভায় উজ্জ্বল, সূক্ষ্ম পেন্সিলে আঁকা ভ্রু, বন্ধ চোখের পাতা, ঘন সত্যিকারের পাতা যা গালে মৃদু ছায়া ফেলেছে— সেই গালগুলো ঠিক পার্কে খেলার দিনের মতোই সুস্থ। গম্ভীর লাল ঠোঁট, যেন একটু অভিমানী ভঙ্গিতে চেপে আছে— যেমনটা আমিলামিয়া ভান করত যাতে আমি খেলতে আসি। তার হাত দুটো বুকের ওপর জোড় করা। একটি জপমালা তার মোমের মতো ঘাড়কে জড়িয়ে আছে— ঠিক মায়েরটার মতো। পরিষ্কার, কৈশোরপূর্বের শান্ত শরীরটিকে ঢেকে আছে এক ছোট সাদা কাফন।
বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা হাঁটু গেড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
আমি হাত বাড়িয়ে আমার ছোট বন্ধুর পোরসেলিনের মুখে আঙুল বুলিয়ে দিই। সেই রঙ করা মুখের ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করি— পুতুল রানির, যে মৃত্যুর এই রাজকীয় কক্ষের জাঁকজমকের ওপর রাজত্ব করছে। পোরসেলিন, মোম, তুলো। আমিলামিয়া তার প্রিয় বন্ধুকে ভুলবে না— এসো, আমাকে এখানে দেখতে এসো, যেখানে আমি এটা এঁকেছি।
মিথ্যা এই মৃতদেহ থেকে আমি আঙুল সরিয়ে নিই। যেখানে আমি ছুঁয়েছিলাম সেখানে আমার আঙুলের ছাপ রয়ে যায়।
বমিভাব পাক খেতে থাকে আমার পেটে— মোমবাতির ধোঁয়া আর ঘরের ভেতর আটকে থাকা লিলির মিষ্টি অথচ পচা গন্ধে। আমি আমিলামিয়ার সমাধির দিক থেকে পিঠ ফিরিয়ে নিই। বৃদ্ধার হাত আমার বাহু ছুঁয়ে যায়। তার উন্মত্ত চোখের সঙ্গে তার শান্ত, স্থির কণ্ঠের বড় অমিল।
“আর ফিরে আসবেন না, মশায়। যদি সত্যিই ওকে ভালবেসে থাকেন, তবে আর কখনও ফিরে আসবেন না।”
আমি আমিলামিয়ার মায়ের হাত ছুঁয়ে দিই। বমিভাবে ভরা চোখে দেখি বৃদ্ধ মানুষটির মাথা হাঁটুর মাঝে গোঁজা। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যাই— সিঁড়ি বেয়ে নেমে বসার ঘর, উঠোন, আর শেষে রাস্তায়।
৫
এক বছর না হলেও ন’-দশ মাস কেটে গেছে। সেই মূর্তিপূজার স্মৃতি আর আমাকে ভয় দেখায় না। ফুলের গন্ধ আর পাথর হয়ে যাওয়া পুতুলের সেই ছবিটাও আমি ভুলে গেছি। সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি। এক কোনা দাঁতে কামড়ে ধরি, মনে মনে ভাবি— যাই হোক, বেচারা বুড়ো-বুড়ি হয়তো এই উপহারটা গ্রহণ করবেন।
শিস দিতে দিতে আমি জ্যাকেট পরে নিই, টাই ঠিক করি। কেন যাব না তাদের দেখতে, আর তাদের দিয়ে আসব না শিশুটির নিজের হাতের লেখা এই কার্ড?
আমি প্রায় দৌড়ে পৌঁছে যাই সেই একতলা বাড়ির কাছে। বৃষ্টি বড় বড় ফোঁটায় পড়তে শুরু করেছে— মাটির ভেতর থেকে যেন জাদুর মতো উঠে আসে সজীব আশীর্বাদের সোঁদা গন্ধ, যা জৈব মাটিকে নাড়া দেয় আর ধুলোর ভেতর শিকড়ের সাথে থাকা সব প্রাণকে নতুন করে সজীব করে তোলে।
আমি ঘন্টি বাজাই। বৃষ্টি আরও জোরে পড়তে থাকে, আর আমি বারবার বাজিয়ে যাই। এক তীক্ষ্ণ কণ্ঠ চিৎকার করে ওঠে, “আসছি!” আমি অপেক্ষা করি— মা নিশ্চয়ই তার চিরন্তন জপমালা হাতে দরজা খুলতে আসবেন। আমি জ্যাকেটের কলার তুলে দিই। বৃষ্টিতে আমার জামাকাপড়, আমার শরীর— সবকিছুর গন্ধই যেন আলাদা হয়ে যায়। দরজা খুলে যায়।
“কী চান? ভাল হয়েছে যে আপনি এসেছেন!”
হুইলচেয়ারে বসা বিকৃতদেহী মেয়েটি এক হাত দিয়ে দরজার হাতল ধরে আমার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত, দুর্বোধ্য হাসি হাসে। তার বুকের কুঁজটা পোশাকটাকে শরীরের ওপর পর্দার মতো টেনে রেখেছে— সাদা কাপড়ের একটা টুকরো, তবু নীল-চেক অ্যাপ্রনের ওপর সেটা যেন এক ধরনের সাজগোজের আভা এনে দিয়েছে। ছোটখাটো সেই নারীটি অ্যাপ্রনের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে দ্রুত একটা সিগারেট ধরায়, কমলা রঙে রাঙানো ঠোঁটে আগুনের দাগ লাগে। ধোঁয়ায় তার সুন্দর ধূসর চোখ কুঁচকে আসে। সে তার তামাটে-গমরঙা, পার্ম করা চুল ঠিক করে, আর একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে— একটা নিরাশ, কৌতূহলী, আশাবাদী অথচ একই সঙ্গে ভীত অভিব্যক্তি নিয়ে।
“না, কার্লোস। চলে যাও। আর ফিরে এসো না।”
আর ঠিক সেই সময় বাড়ির ভেতর থেকে আমি শুনতে পাই বৃদ্ধ লোকটার কষ্টসাধ্য হাঁফানোর শব্দ— ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে।
“কোথায় তুমি? জানো না দরজা খুলে সাড়া দেওয়া তোমার কাজ নয়? সরে যাও! শয়তানের গুষ্টি! আবার কি তোমায় মারধর করতে হবে?”
আর বৃষ্টির জল আমার কপাল বেয়ে গাল দিয়ে নেমে মুখে ঢুকে পড়ে, আর ছোট ছোট ভীরু হাতদুটো ভিজে পাথরের পথের ওপর ফেলে দেয় সেই কমিক বইটা।
চিত্র: মনিকা সাহা
লেখক পরিচিতি
কার্লোস ফুয়েন্তেস মাচাস (Carlos Fuentes Macías, ১১ নভেম্বর, ১৯২৮ — ১৫ মে, ২০১২) মেক্সিকান কথাসাহিত্যিক এবং বিংশ শতাব্দীর লাতিন-আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা। তিনি একই সঙ্গে সাংবাদিক, নাট্যকার, বুদ্ধিজীবী এবং পেশাদার কূটনীতিক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। যদিও তিনি স্প্যানিশ ভাষায় লিখতেন, তবু ইংরেজি-সহ বহু ভাষায় অনূদিত হওয়ার কারণে তাঁর রচনাবলি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছে। গার্সিয়া মার্কেস, ওক্তাভিও পাস, বার্গাস ইয়োসা প্রমুখের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়ে থাকে। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: ‘হোয়্যার দি এয়ার ইজ ক্লিনার’ (১৯৫৮), ‘দ্য ডেথ অফ আর্তেমো ক্রুজ’ (১৯৬২), ‘আ চেইঞ্জ অব স্কিন’ (১৯৬৭), ‘তেরা নোস্ত্রা’ (১৯৭৫), ‘দ্য হাইড্রা হেড’ (১৯৭৮), ‘দি ওল্ড গ্রিঙ্গো’ (১৯৮৫), ‘দ্য ক্যামপেইন’ (১৯৯০) ইত্যাদি।






