১. চেতনার উৎপত্তি: ব্যাখ্যার বিভ্রম
ইতিহাসে শ্রম বিভাজনের সূচনা থেকেই আমরা মানুষের দুটি রূপ দেখতে পাই— একদিকে কায়িক শ্রম, অন্যদিকে মানসিক শ্রম। এই প্রথম যখন মানসিক শ্রমের আলাদা একটি শ্রেণি তৈরি হল, তখন সেই শ্রমের প্রতিনিধিত্বকারী মানুষটি প্রথম অনুভব করলেন যে, তিনি এমন কিছুর প্রতিনিধিত্ব করছেন যার অস্তিত্ব আছে কিন্তু তাকে চোখে দেখা যায় না। কার্ল মার্ক্সের দৃষ্টিতে, চেতনাকে একটি স্বাধীন ও পৃথক সত্ত্বা হিসেবে উপলব্ধি করার বোধটি এখান থেকেই অঙ্কুরিত হয়।
শরীরবিহীন অবস্তুগত চেতনার এই তত্ত্বটি চিন্তার দারুণ খোরাক জোগালেও, এর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। আদিম মানুষ পশুর স্তর থেকে উঠে এসে হাতিয়ার ব্যবহার শুরু করেছিল এবং শ্রম বিভাজন ঘটিয়েছিল— এটি নিঃসন্দেহে সমাজ ও চিন্তার জগতের এক যুগান্তকারী বিপ্লব। কিন্তু এটি এমন কোনও জাদুকরি ঘটনা ছিল না যা মানুষকে রাতারাতি এতটাই বুদ্ধিমান করে তুলবে যে, সে চেতনার বিমূর্ত রূপ উপলব্ধি করে ফেলবে।
২. ডারউইনীয় ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: অবোধের দৃষ্টিতে প্রকৃতি
চেতনার এই রহস্য উন্মোচনে আমরা বরং স্টিফেন হকিং এবং চার্লস ডারউইনের মতবাদের দিকে তাকাতে পারি। আদিমকালে মানুষ ভেবেছিল প্রকৃতি স্থির, কারণ আপেক্ষিকভাবে তাদের চোখে এটিই সত্য মনে হত। জীবের স্তরে থাকা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সঙ্গে এই স্থবিরতার হিসাব মিলে যেত। তাই প্রকৃতিতে কোনও আকস্মিক পরিবর্তন দেখলে তারা ভাবত, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনও অদৃশ্য ‘কর্তা’ বা চালিকাশক্তি রয়েছে।
ডারউইন তাঁর ‘দ্য ডিসেন্ট অব ম্যান’ বইয়ের শেষাংশে নিজের পোষা কুকুরের একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। দূর থেকে যখন বাতাসের তোড়ে গাছের পাতা বা ঘরের পর্দা নড়ছিল, কুকুরটি তখন অচেনা ভয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠছিল। কুকুরের মনস্তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সে ভেবেছিল কোনও এক অদৃশ্য সত্ত্বা পর্দাটি নাড়াচ্ছে, যাকে দেখা যাচ্ছে না। আদিম মানুষের জ্ঞানের সীমিত সীমানার সাথে এই মনস্তত্ত্ব হুবহু মিলে যায়। এভাবেই মানুষের মনে প্রথম ‘শরীরহীন স্বতন্ত্র চেতনার’ ধারণা জন্ম নেয়।
ডারউইন দাবি করেন, আজকেও পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা আধুনিক সভ্যতা থেকে দূরে আদিমতার মাঝে বাস করছেন এবং স্বপ্ন ও বাস্তবের পার্থক্য করতে পারেন না। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘দ্য ফিউচার অব অ্যান ইলিউশন’ (একটি দৃষ্টিভ্রমের ভবিষ্যৎ) এবং ‘ইন্ট্রোডাকশন টু সাইকোঅ্যানালাইসিস’ (মনোসমীক্ষণের ভূমিকা) বইয়ে স্বপ্নের যে বিকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তার সাথে ডেভিড হিউমের ‘অ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বইয়ের ‘যৌগিক ভাব’ (Complex Ideas)-এর সমন্বয় করলে এই তত্ত্বটি আরও সমৃদ্ধ হয়।
মানুষ যখন ঘুমায়, তখন তার স্ব-চেতনা লোপ পায়। জেগে উঠলে সে আবার সচেতন। মাঝখানের এই সময়টায় শরীরটা বিছানায় পড়ে থাকে, কিন্তু চেতনা কই যায়? দেহ থেকে বেরিয়ে সে কি অন্য কোথাও ঘুরে বেড়ায়? আবার মৃত্যুর পর যখন চেতনা চিরতরে হারিয়ে যায়, তখন তার অবস্থান কোথায়? এই আদিম প্রশ্নগুলোই মানুষের মনে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘স্বতন্ত্র আত্মার’ ধারণা আরও পোক্ত করেছিল।
৩. আধুনিক পদার্থবিদ্যা ও চেতনার বিজ্ঞান
আজকের আধুনিক পদার্থবিদ্যার সাথে হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ (Dialectics), বিবর্তনের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির নৃবিজ্ঞান, হাইড্রোকার্বন জৈব-যৌগ ও প্রোটোপ্লাজমের বিকাশ, ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞান, কার্ল পপারের বিবর্তনবাদী জ্ঞানতত্ত্ব এবং ইমানুয়েল কান্টের নীতিদর্শন সমন্বয় করলে আমরা এই আদিম রহস্যের বৈজ্ঞানিক উত্তর খুঁজে পাই।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের আলোকে আমরা জানি, এই সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বে পদার্থের পরিমাণগত রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে দীর্ঘ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় (Colloidal Solution) একদিন ‘জীবন’ এবং ‘কামনা বা আকাঙ্ক্ষা’ (Desire) নামক এক জটিল বিভ্রমের সৃষ্টি হয়েছিল। চেতনার কোয়ান্টাম জগৎ আর আমাদের বিস্তৃত সৌরজগৎ একই নিয়মে চলে। তাই আজ আমরা সহজেই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে— চেতনার ক্রিয়া মূলত এক জটিল জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Reaction), এটি অলৌকিক কিছু নয়। চেতনা এমন কোনও বিষয় নয় যার সৃষ্টির জন্য কোনও ‘সচেতন মহাজাগতিক শক্তির’ প্রয়োজন ছিল, কিংবা যা পদার্থের প্রাকৃতিক আচরণের বিরোধী।
চতুর্মাত্রিক জগতের উচ্চতর গাণিতিক সমীকরণের সঙ্গে যদি আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দেখি, তবে স্পষ্ট হয় যে— অতীতের একটি ‘ভুল প্রশ্ন’ জন্ম দিয়েছিল একটি ‘ভুল উত্তরের’। ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ (Butterfly Effect) দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, আদিম মানুষের সেই ছোট্ট দৃষ্টিভ্রম ও ‘স্বতন্ত্র ঈশ্বর-সত্ত্বার’ কাল্পনিক ধারণা গোটা মানবজাতির ইতিহাসে কত সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
৪. কার্য-কারণ সূত্র ও ঈশ্বরের সংকট
কার্য-কারণের (Cause and Effect) এই বাস্তব জগতে হঠাৎ করে শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার ধারণাটি চরম সুসংগত নয় (Paradoxical)। এই ধাঁধার সহজ সমাধান করতেই অনেকে ‘পরম চেতনা’ বা ঈশ্বরের ধারণাটি হাজির করেন। হেগেলও তাঁর ‘ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিট’ গ্রন্থে এই প্রশ্নে বারবার হোঁচট খেয়েছেন। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁর ‘ডায়ালেক্টিকস অব ন্যাচার’ এবং ‘অ্যান্টি-ডুরিং’ গ্রন্থেও মূল উত্তরটি সরাসরি দেননি। তবে কান্টের কার্য-কারণ উপলব্ধি তত্ত্বে আমরা জগৎ সৃষ্টির আদি কারণ খুঁজে না পেলেও, এটা অন্তত বুঝতে পারি যে— আমাদের এই ঈশ্বর খোঁজার প্রশ্নটি কতটা গণিত-বিচ্ছিন্ন এবং আদিম সহজাত সংস্কার দ্বারা আক্রান্ত।
আমরা যুগ যুগ ধরে এমন এক রহস্যের উত্তর খুঁজেছি যা যুক্তিবাদী মন মেনে নিতে পারে না। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের ধারণাটি আসলে একটি রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে উল্টো আরেকটি নতুন রহস্যের জন্ম দেয়। প্রয়াত ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ তাই যথার্থই বলেছিলেন: ‘আদিম সৃষ্টিতত্ত্ব জগতের রহস্যের বিরহস্যীকরণ করার বিপরীতে সবকিছুকে রহস্যের ঘন চাদরে ঢেকে দিয়েছে।’
যাইহোক, শত শতাব্দীর কষ্টকর বৈজ্ঞানিক সাধনার মাধ্যমে মানুষ আজ প্রকৃতির সেই ‘অলৌকিক আকস্মিকতা’-কে কার্য-কারণ সূত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে। আমরা জেনেছি, ‘কর্তা’ বা মানুষ নিজেই প্রকৃতির কার্য-কারণের এক অনন্য ফসল। ফলে ঈশ্বরের পক্ষে ওকালতি করা তাত্ত্বিকদের পথ আজ রুদ্ধ। বিশেষ করে, যখন জড় পদার্থের সাথে জৈব জগৎ এবং অবশেষে চেতনার বস্তুগত সম্পর্ক বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রমাণিত হয়ে গেছে, তখন ‘পরম-কর্তা’ হিসেবে ঈশ্বরের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে গেছে।
অথচ এক অদ্ভুত পরিহাসের বিষয় হল— ঈশ্বরের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা ফুরিয়ে গেলেও তাঁর নামে রচিত ধর্মগ্রন্থগুলো দিব্যি টিকে আছে। টিকে আছে আদিম সৃষ্টিতত্ত্ব আর ‘টোটেমীয়’ (Totemic) গোত্রীয় নৈতিকতা। অথচ এগুলোর উৎপত্তির ঐতিহাসিক উৎসও আজ আমাদের জানা।
৫. ধর্মের বিবর্তন: ভয়, কৃষি ও সমাজতত্ত্ব
আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজের মানুষের ব্যাপক জাগতিক জ্ঞান ছিল না। ফসলের জন্য তাদের প্রধান প্রয়োজন ছিল বৃষ্টি। আকাশ থেকে আকস্মিক বজ্রপাত কিংবা বৃষ্টি পড়তে দেখে সেই আদিম অজ্ঞ মানুষের মনে কী প্রতিক্রিয়া হত? তারা ভাবত, এই বিপুল ঘটনার পেছনে নিশ্চয়ই কোনও প্রচণ্ড শক্তি এবং তাদের প্রতি কারও করুণা কাজ করছে। কিন্তু এই শক্তি আর করুণা কার? উত্তর মিলল— যাকে দেখা যায় না, কিন্তু যিনি ওই দূর আকাশে বসে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন, তিনিই পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা! যাঁর ইচ্ছা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না।
শোষক ও পুরোহিত শ্রেণি বা সৃষ্টিকর্তার এই ‘ধরিত্রীপুত্ররা’ ধীরে ধীরে ঈশ্বরের ওপর নানা মানবিক ও অতিপ্রাকৃতিক গুণাবলি আরোপ করতে শুরু করলেন। এভাবেই জন্ম নিল প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক ঈশ্বর, যাঁর অনুশাসনে মোড়ানো বই আমরা আজও পড়ে চলি।
অন্যদিকে, পশুপালক সমাজ জানত পশুকে কীভাবে বশ করতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে তারা মনে করত ঈশ্বরের রাগের বহিঃপ্রকাশ। ফলে, ঈশ্বরকে শান্ত করতে এবং নিজেদের রক্ষা করতে তারা নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠান শুরু করল, যা কালক্রমে ‘ধর্ম’ নামে আত্মপ্রকাশ করল। ‘ধর্ম’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থই হল— যা ধারণ করে বা রক্ষা করে। মহাভারতের কর্ণপর্বেও শ্রীকৃষ্ণ একই কথা বলেছেন।
একইভাবে ইংরেজি ‘Religion’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘Religare’ থেকে, যার অর্থ ‘পুনরায় যুক্ত করা’। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা সৃষ্টির ফলে মানুষ সমাজ ও নিজের থেকে যে মানবিক গুণগুলো— সহানুভূতি, ক্ষমা, দয়া ও প্রেম— হারাতে শুরু করেছিল, ধর্ম যেন পুনরায় মানুষকে তার সাথে যুক্ত করতে চাইল।
আরবিতে একে বলা হয় ‘দ্বীন’। সহীহ মুসলিমের ‘কিতাবুল ঈমান’-এ মহানবীর দাবি অনুসারে, ‘দ্বীন’ হল মানুষের জন্য সদুপদেশ। ‘নবী’ শব্দের অর্থ পথপ্রদর্শক। ঘোর নৈতিক সংকটের যুগে মানুষকে শান্তির পথ দেখাতে এসেছিলেন মহামানব মুহাম্মদ (সা.)— যিনি কোরআনের বাহক। কোরআনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি আব্রাহামিক ঐতিহ্যের বাইবেলেরই একটি সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত রূপ। তিনি মানবজাতিকে চাইলেন আকাশের উদারতা ও প্রেমের পথ দেখাতে, কিন্তু মানুষ আলোকবর্তীর দিকে না তাকিয়ে চেয়ে রইল তাঁর আঙুলের দিকে! আমরা তাঁর দেখানো প্রেম, বিশ্বাস আর সহানুভূতির দর্শনকে বাদ দিয়ে মেতে উঠলাম তাঁর পোশাকের ধরন, হাঁটার পদ্ধতি কিংবা বসার ভঙ্গি নিয়ে। ফলে সমাজে বাহ্যিক আচার বাড়লেও প্রকৃত শান্তি আর এল না।
একইভাবে চতুর্বেদের ভাষ্যে কৃষ্ণ মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য ঋষিদের ধ্যানের মাধ্যমে ধর্ম-জ্ঞান দান করেন। ‘বেদ’ শব্দের অর্থই জ্ঞান। পরবর্তীতে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন (বেদব্যাস) মানুষের হিতার্থে এই বিশাল জ্ঞানকে চার খণ্ডে বিভক্ত করেন। প্রাচীন পারস্যের ‘আবেস্তা’ এবং ভারতীয় ‘ঋগ্বেদ’-এর দর্শনেও একই ধারার মিল পাওয়া যায়। (এই বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে, যা হয়তো পরবর্তীতে বিশদভাবে লেখা যাবে)। তবে আজ আমাদের শুধু এটি বুঝতে হবে যে, বেদ বা বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব সাহিত্য বা গল্প হিসেবে চমৎকার হলেও, অন্ধবিশ্বাস হিসেবে তা ভয়ংকর এবং জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক ভুল বোঝাবুঝি।
৬. সতীত্ব, সম্পত্তি এবং ঈশ্বরের ভবিষ্যৎ
প্রাকৃতিক নিয়ম ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সামনে যখন প্রাচীন আদিম টোটেমীয় বিশ্বাসগুলো টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল, মানুষ তখন নিজের সহজাত প্রবৃত্তির বশে আদিম সামাজিক আইনগুলো ভাঙতে শুরু করল। শাসকেরা একে দেখল ‘ব্যভিচার’ বা পাপ হিসেবে। ফলে জন্ম নিল কঠোর শাস্তির বিধান। কিন্তু কেবল জাগতিক শাস্তি দিয়ে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি দমন করা গেল না; তাই শেষ ভরসা হিসেবে হাজির করা হলো ‘ঈশ্বর’ ও ‘পরকাল’-কে। বলা হল— তুমি যদি পাপ করো, তবে তোমার আত্মা শান্তি পাবে না, ঈশ্বর তাকে নরকে শাস্তি দেবেন। দেহ নশ্বর হলেও আত্মা অবিনশ্বর।
এখানে লক্ষণীয় যে, ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত পরকালের বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ সামন্ততান্ত্রিক আমলের বিচার ব্যবস্থার অনুরূপ। কারণ, যারা এই গল্পগুলো তৈরি করেছিলেন, তারা নিজেরা সামন্ততান্ত্রিক যুগে বাস করতেন এবং রাজকীয় বা সামন্তীয় বিচার ব্যবস্থার বাইরে অন্য কোনও আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারণা তাদের ছিল না। তাই তারা ঈশ্বরের গুণের সাথে কোনও নতুন যুগের বিচারের বৈশিষ্ট্য যুক্ত করতে পারেননি।
শুধু পরকালেই নয়, ইহকালের দুঃখ-কষ্টের কারণ হিসেবেও এই ‘পাপ’ বা ব্যভিচারকে দায়ী করা হত। খেতে ফসল হচ্ছে না, খরা দেখা দিয়েছে— অতএব ধরে নেওয়া হত ঈশ্বর আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ! সুতরাং, ঈশ্বরকে শান্ত করো, বলি দাও, প্রায়শ্চিত্ত করো। ‘লাইফ অব ব্রায়ান’ (Life of Brian) সিনেমাটি নবীদের উৎপত্তির এই মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস বুঝতে দারুণ সাহায্য করে।
ঈশ্বর রাগান্বিত, তাই মানুষের এই অনুতাপের আকুতি থেকেই জন্ম নিয়েছে সওম (রোজা), কোরবানি কিংবা প্রাচীনকালের ‘নরবলি’র মতো প্রথাগুলো। নরবলির পেছনের ইতিহাস কী? চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক কারণ না জানা আদিম মানুষ ভাবত, আস্ত একটা সূর্যকে কোনও রাক্ষস গিলে খাচ্ছে! সূর্য নিশ্চয়ই মানুষের কোনও পাপে রুষ্ট হয়েছে। (মেল গিবসনের ‘অ্যাপোক্যালিপ্টো’ সিনেমাটি এই আদিম নৃবিজ্ঞানকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে)। এই কাল্পনিক ক্রোধ শান্ত করার নামে শুরু হল আদিম এক অনাচার— হত্যা, হত্যা আর হত্যা! সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার এই অন্ধ ধারণা একসময় পৃথিবীকে পরিণত করেছিল কসাইখানায়, যেখানে বলি দেওয়া হয়েছে নিষ্পাপ নবজাতক থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষকে। বিশ্বাসের কী চরম সর্বনাশ!
নারীর সতীত্বের ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে সামাজিক অনুশাসন গড়ে উঠেছিল, তার পেছনেও ছিল শ্রেণি-বিভক্ত সমাজের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার তাগিদেই একপত্নী-একপতি প্রথা এবং নারীর সতীত্বের ওপর এত জোর দেওয়া হয়েছিল। আর এই সম্পত্তির অধিকার রক্ষা আর ঈশ্বরের অদৃশ্য ভয়— এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই জন্ম নিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক ধর্ম।
অতএব, মানুষের অজ্ঞানতা ও ভুলের গর্ভেই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল; আর মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার ঐতিহাসিক অগ্রগতিই একদিন ঈশ্বরের কবরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। জ্ঞানতাত্ত্বিক আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে বিনাশ করবে অলৌকিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা, আর সম্পদের সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদ (Communism) বিলুপ্ত করবে প্রাচীন টোটেমীয় কুসংস্কারকে। একদিন ধর্মের এই অন্ধ খোলস ভেদ করে স্থান করে নেবে উচ্চতর গণিত, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত মানবিক কর্তব্যবোধ।





