Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ব্রিটিশ ছোটগল্প

স্ট্রোক ওয়ার্ডে বক

[বিষয়ের অন্তর্নিহিত কথা আমরা শুনতে জানি না]
২১ মে ২০২৬

হেলেন মর্ট
ভাষান্তর: গৌতম চক্রবর্তী

(বক দেখার বিবিধ উপায়: সম্ভবত ছয় নম্বর। হয়তো গুনতিতে ভুল হচ্ছে।)

যখন আমার বাবা আবার হাঁটা শেখার চেষ্টা করছিলেন, তাঁকে দেখতে লাগছিল জন অডুবন-এর আঁকা কোনো পাখির মত। অডুবন-এর অতিকায় নীল বক যেন— এক অদ্ভুত, অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান; বঙ্কিম গ্রীবা ঈষৎ আনত, উন্মুক্ত চঞ্চু, ডানাগুলো শরীর থেকে সামান্য ছড়িয়ে কিন্তু পুরো মেলে ধরা নয়। অদৃশ্য কোনও শক্তি যেন সেগুলো চেপে ধরে রেখেছে।

‘আমেরিকার পাখি’ অডুবন-এর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। ৪৩৫টি চমকপ্রদ হাতে রং করা পূর্ণাকৃতি ছাপচিত্র। আলাদা আলাদা পাখির প্রজাতি। অনেক ছবিই নাটকীয়, চলমান। কিছু প্রায় সহিংস, অসম্ভব দৃশ্য তুলে ধরে। আমি সেগুলোকে একইসঙ্গে সুন্দর ও ভয়াবহ মনে করি।

স্ট্যান্ড-এইডে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমার বাবার পিঠ বাঁকা, গলা কাত হয়ে আছে, বাম দিক নিস্তেজ। তিনি যেন ছবির ভেতর থেকে উঠে আসা এক বক; গর্বিত অথচ জবুথবু। আমি তাঁকে এমন মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম, যেভাবে আগে কখনও কোনও পাখি বা প্রাণীকে দেখিনি। আমি মনে মনে তাঁকে সোজা করে দাঁড় করাতে চাইছিলাম, চাইছিলাম তিনি যেন বকের মতো উড়তে পারেন।

শেষ পর্যন্ত স্ট্যান্ড-এইডের জায়গায় এল নিচে তিন-দাঁড়া বিশিষ্ট একটি হাঁটার লাঠি। যেন এক ধরনের ত্রিশূল।

একবার খেয়াল করো স্বচ্ছ জলের ধারে দাঁড়ানো সেই বক পাখিটিকে, দেখো তার প্রতিবিম্ব কীভাবে শান্ত জলের মধ্যে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে। জলের তলদেশে তা হয়তো পৌঁছে যেত, যদি না সেই সব চমৎকার তরুরাজির অসংখ্য শাখা-প্রশাখার সঙ্গে তাকে নিরন্তর সংঘর্ষ করতে হত।

ধীরে ধীরে বাবা তাঁর বাম পা তুলতে শুরু করলেন, শরীরের ভার সরিয়ে নিতে প্রবল কষ্ট হচ্ছিল তাঁর।

লম্বা পাখিটির পদচারণা কেউ শুনতে পাচ্ছিল না, এত সতর্কভাবে সে ভেজা মাটিতে একের পর এক পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল।

বাবাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কাদামাটি বা জলাভূমি থেকে পা টেনে তুলছেন। আমি দম বন্ধ করে দেখছিলাম। পাশে ফিজিওথেরাপিস্ট প্রস্তুত, পড়ো-পড়ো হলেই ধরবেন।

কিন্তু এখন তিনি আবার নড়েচড়ে উঠলেন; এক-একটি নিঃশব্দ পদক্ষেপ আর সমনোযোগ অগ্ৰগমন; ধীরে ধীরে নুইয়ে পড়া মাথাকে ঘাড়ের ওপর সোজা করে তুলে ধরার প্রাণপণ প্রয়াস। তারপর আচমকা আবার এক নতুন পদক্ষেপ।

বাবা প্রথমে বাঁ পা কার্পেটে রাখলেন, তারপর ডান পা এনে তার পাশে। আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। তাঁকে তখন আরও লম্বা ও মহিমান্বিত লাগছিল। তিনি থামলেন, শরীর টান টান। যেন বইয়ের পাতার সীমা ভেঙে বেরিয়ে আসা এক বক। নিজের জলাভূমির রাজ্য দেখছে।

*

সবকিছু বদলে দেওয়া ঘটনাটি ঘটল নভেম্বরের শেষ দিকে। শেফিল্ডের রাস্তাগুলো থেকে তখন বরফ গলতে শুরু করেছে। আমি উপরের তলায় ঘুমোতে গেছিলাম। হঠাৎ আমার চলভাষ কেঁপে উঠল বারবার। ফোন ধরতেই অন্য প্রান্তে মা।

—‘তোমার বাবার কথা বলার জন্য ফোন করেছি। আমরা এখন হাসপাতালে। ওনার বড় মাপের স্ট্রোক হয়েছে।’

আমি মনে করতে পারছি না কীভাবে রয়েল হাসপাতালে পৌঁছলাম। তখনও যুক্তরাজ্যে কোভিডের বিধিনিষেধ; দুর্ঘটনা ও জরুরি ওয়ার্ডে রোগী ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। সেখানে গিয়ে জানলাম। আমি ওয়ার্ডের বাইরে দাঁড়িয়ে স্টাফদের অনুরোধ করলাম। তাঁরা জানাল যে, মা বাবার সঙ্গে নিরাপদে আছেন। বাবার কথা জড়িয়ে গিয়েছিল বলেই শুধু মাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে।

আমি লবিতে ফিরে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়লাম। চেয়ারগুলো স্থিরভাবে রিসেপশনের দিকে মুখ করে দেখছে। আমাকে বলা হলো, কেবল তখনই বাবাকে দেখতে দেওয়া হবে যদি বাঁচার সম্ভাবনা আর না থাকে। আমি জানতাম না তিনি বাঁচবেন কি না। আসলে আমি কিছুই ঠিকমতো জানতাম না।

দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে লাগল। এমআরআই স্ক্যানের পর ক্ষতির পরিমাণ স্পষ্ট হল। ডাক্তাররা বললেন, এটি প্রাণঘাতী স্ট্রোক। মাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলা হল। আমি অপেক্ষাকক্ষে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। একেবারে অসহায়, যেন জলে আটকে পড়া স্থলজ প্রাণী।

*

বাবাকে পরে স্ট্রোক ওয়ার্ডে সরানো হল— ইস্টউডে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঠিক এক ঘণ্টার জন্য একজন দর্শনার্থীকে অনুমতি দেওয়া হত। প্রায় প্রতি রাতেই আমি শেফিল্ড থেকে গাড়ি চালিয়ে যেতাম। মাস্ক পরে থাকতাম, কম করে পাঁচবার হাত জীবাণুমুক্ত করতাম। তারপর গোলকধাঁধার মতো করিডর পেরিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছতাম।

তিনি আরও তিনজন পুরুষের সঙ্গে একটি বেডে ছিলেন। প্রত্যেকেই ভিন্নভাবে আক্রান্ত। বেশিরভাগই শয্যাশায়ী, তবে কেউ কেউ আশ্চর্যজনকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন।

একজন ছিলেন এডি। শারীরিকভাবে সক্ষম, কিন্তু ভীষণ বিভ্রান্ত। কখনও তিনি জানালা দিয়ে বেরিয়ে গাড়ি রাখার জায়গায় ‘কী হচ্ছে’ দেখতে বেরিয়ে পড়তেন। কখনও জিজ্ঞেস করতেন কেউ মাছ ধরতে যাবে কি না।

এডি ছিলেন সাবেক খনি শ্রমিক। নটিংহ্যামের ছেলেদের সঙ্গে মারামারির গল্প বলতেন। তাঁর হাতের গিঁটগুলো পুরনো উল্কির নীল কালিতে দাগানো ছিল।

এইসবের মাঝখানে আমার বাবা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকতেন। গলা অদ্ভুতভাবে বেঁকে, শরীরে অক্সিজেনের নল আর ক্যানুলা। খেতেও তাঁকে নলের সাহায্য নিতে হত, কারণ তিনি গিলতে পারতেন না। তিনজন স্টাফ ছাড়া তাঁকে বসানো যেত না। তাঁর বাম হাত বেজায় ভারী, আঙুলগুলো ভেতরের দিকে মোড়ানো।

আমি যখন তাঁর পাশে বসতাম, অনেক সময় তিনি আধঘুমে থাকতেন। চেতনার ভেতরে ও বাইরে চলছে তাঁর আনাগোনা। কখনও স্বচ্ছ মুহূর্ত, তারপর হঠাৎ নীরবতা। কিংবা এই ভ্রম— তিনি কোথাও বুঝি যাচ্ছেন। দু’বার তিনি আমাকে বাসের সময়সূচি দেখতে বলেছিলেন, যেন তিনি বেকওয়েল-এ হাঁটতে যাবেন।

আমি তাঁর ঘুমের সময় পাহারা দিতাম। মাস্কের আড়ালে আমার মুখ ঘামে ভিজে যেত। নার্সরা আসত, মাপামাপি করত। একবার এক নার্স দু’জন রোগীকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন।

—‘জন! নিজের বিছানায় ফিরে যান।’

—‘এটাই আমার বিছানা।’

—‘আপনি এখানে ঘুমোতে পারবেন না।’

—‘আমি জন নই।’

শেষ পর্যন্ত কব্জির ব্যান্ড দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল— তিনি সত্যিই জন নন।

প্রতিটি বিছানার পেছনে ছিল পিক জেলার দৃশ্য। বাবার বিছানার পেছন থেকে দেখা যেত ব্যামফোরড এজ-এর দৃশ্য। সেখানে আমি প্রায়ই বেলেপাহাড়ে চড়তে যেতাম।

কখনও বাবা একটু জেগে থাকলে আমরা ক্রসওয়ার্ড করতাম। আমি সূত্র পড়ে শোনাতাম, তিনি উত্তর দিতেন। আধঘুমেও তিনি আমার চেয়ে দ্রুত ছিলেন। তাঁর শরীরের অবস্থার সঙ্গে মনের তীক্ষ্ণতার এই বৈপরীত্য বিস্ময়কর ছিল।

তাঁকে এত নিষ্ক্রিয়, অসুখবন্দি, অথচ এত সচেতন দেখে আমি প্রাণীদের চেতনা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। হয়তো কোনও বিষয়ের অন্তর্নিহিত কথা আমরা শুনতে জানি না। বামফোর্ড, বারবেজ, স্ট্যানেজ এজের পাথরগুলো নিজেদের মধ্যে কোন কথা গোপন রাখে? পাখির চলন কি সেই সব রোগীদের কাছে কিছু বলে, যারা সেই ভাষা পড়তে জানে? আমরা নিজেদের সবকিছুর কেন্দ্র ভাবতে ভালবাসি। তারপর হঠাৎ ভেঙে পড়ে গাছের অবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠি।

কখনও এডি কলম ধার নিতে আসতেন। তিনি বাবার বিছানার পায়ের দিকে রেলিংয়ে ভর দিতেন তাঁর বলিরেখাময় হাতে।

—‘কবে ছাড়ছে তোমাকে?’ বাবাকে জিজ্ঞেস করতেন।

বাবা অস্পষ্টভাবে বলতেন, ‘এখনই না, হয়তো।’

এডি বলতেন, ‘যখনই যাবে, আমাকে জানিও। আমিও তোমার সঙ্গে বেরিয়ে যাব।’

তারপর ধীরে ধীরে নিজের জায়গায় ফিরে যেতেন, যেন কোনও বারে নিয়মিত এক অতিথি।

*

হাসপাতালে না এলে আমি এসবে মনোযোগ দিতে পারতাম না। শব্দগুলো কর্দমাক্ত জলে মিশে যেত— খড়, মাছ, জলপোকা আর সতর্ক বকের আশ্রয় এক জলাভূমিতে। আমি অডুবন-এর অদ্ভুত ছবিগুলোতে সান্ত্বনা খুঁজতে লাগলাম। বিশাল আকারের পাখির দৃশ্য দেখে পেঁচা আর বাজপাখির উল্কি আঁকার পরিকল্পনা করতাম।

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

জন জেমস অডুবন ছিলেন আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত বন্যপ্রাণী চিত্রকরদের একজন। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিতর্কিত ব্যক্তি। পাখিবিদ্যা, বিজ্ঞান ও শিল্পে তাঁর অবদান বিশাল, কিন্তু তাঁর চরিত্র ছিল জটিল ও ভীতিকর। তিনি প্রতারণা ও চৌর্যবৃত্তির প্রতি দায়বদ্ধ এবং এসবের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। ‘আমেরিকার পাখি’ বইতে তিনি তাঁর আবিষ্কার বলে যে সব ছবি ছেপেছিলেন তা আসলে ওয়াশিংটন-এর পাখি। কিন্তু নমুনার কোনও প্রমাণ ছিল না বা পাওয়া যায়নি। এই আবিষ্কার ছিল এক বড় আকারের মিথ্যা। ইংল্যান্ড-এর অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষ যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের নানান বিষয়ে সহানুভূতিশীল তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করার জন্য এই গল্প ফাঁদা হয়েছিল। এই ঠগবাজি তিনি কয়েক দশক ধরে চালিয়ে গিয়েছিলেন।

তবে তাঁর প্রতারণা তাঁর অকিঞ্চিৎকর রাজনীতির তুলনায় গুরুত্বে খুবই নগণ্য। অডুবন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের দাস করে রেখেছিলেন এবং তাদের মুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। এমনকি মানুষের দেহাবশেষ চুরি করে সহকর্মী স্যামুয়েল জে মর্টন-কে মাথার খুলি পাঠিয়েছিলেন। শ্বেতাঙ্গদের ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রমাণের কাজে মর্টন সেই সব খুলি ব্যবহার করেছিলেন।

সম্ভবত আমি অডুবনের আঁকা পাখিদের কাছে বিশেষত সেই বকগুলোর কাছে ফিরে গিয়েছিলাম, কারণ আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। আমি চাইছিলাম এইসব পাখিরা আমার ভিতরে কিছু অনুভূতি জাগিয়ে তুলুক— ঘৃণা, ভয়, অথবা অস্বস্তিকর মুগ্ধতা। আমি যখন তাকালাম, তখন আমার মনে গভীর দ্বিধা ও মিশ্র অনুভূতি জন্মেছিল।

অডুবনের পাখিগুলো একইসঙ্গে বাস্তব ও কল্পনাপ্রসূত বলে মনে হয়। তারা প্রায়ই চলমান অবস্থায় ধরা পড়ে— শিকার ধরছে, আক্রমণের প্রস্তুতিতে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে আমার শরীর খারাপ লাগত। তাঁর অতিকায় সাদা বক-এর ঠোঁটে ধরা গোলাপি মাছটির ছটফটানি মনে মনে অনুভব করা যায়। তাঁর অতিকায় সাদা বকটি কেমন যেন নিজের দিকেই মোচড়ানো, অরিগামির মতো নিখুঁত ভাঁজে।

তাঁর পাখিগুলোর মধ্যে এক ধরনের অন্তর্নিহিত সহিংসতা আছে। তাদের চোখে কিছু অস্বস্তিকর বিষয় লুকিয়ে থাকে। তারা যেন সেই ‘সিদ্ধান্তময় মুহূর্তের’ খোঁজে আছে, যাকে হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ বলেছিলেন এমন এক মুহূর্ত, যখন কোনও কিছু তার প্রকৃত রূপে প্রকাশিত হয়। আমার মনে হয়েছিল স্ট্রোকও তেমনই এক মুহূর্ত— ধসে পড়ার মুহূর্ত। ‘স্ট্রোক’ শব্দটির চিকিৎসাগত ব্যবহার পঞ্চদশ শতাব্দীতে। ‘ঈশ্বরের হাতের আঘাত’ বাক্যাংশ থেকে সংক্ষিপ্ত রূপ। আবার জার্মান স্ট্রেইক থেকেও এসেছে বলে মনে করা হয়— যার অর্থ আঘাত বা অভিঘাত। আমি ভাবছিলাম, যেন বিদ্যুৎ আকাশ থেকে নেমে এসে বাবার জীবন ছুঁয়ে গেছে। তারপর শাখা-প্রশাখার মতো আমাদের সবার জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। অডুবন-এর পাখিরাও প্রায়ই আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত থাকে। এই সহিংস শক্তি কী, যা এত মানুষের জীবনে নেমে আসে— আকাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের প্রাণ নিয়ে নেয়?

***

লেখক পরিচিতি

হেলেন মর্ট একজন ব্রিটিশ কবি এবং ঔপন্যাসিক। জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫, শেফিল্ডে। রয়েল সোসাইটি অফ লিটারেচার-এর অন্যতম ফেলো। তিনি পাঁচবার ফয়েল ইয়ং পোয়েটস পুরস্কার জিতেছেন, ২০০৭ সালে দ্য সোসাইটি অফ অথরস থেকে এরিক গ্রেগরি পুরস্কার পেয়েছেন এবং ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার পোয়েট্রি প্রাইজ ইয়ং রাইটার পুরস্কার জিতেছেন। ২০১০ সালে, তিনি গ্রাসমেয়ারের ওয়ার্ডসওয়ার্থ ট্রাস্টের সর্বকনিষ্ঠ পোয়েট-ইন-রেসিডেন্স হন। একই বছর তিনি পিকাডোর পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হন এবং ‘ডিয়ার’ নামক একটি কবিতার জন্য নরউইচ ক্যাফে রাইটার্স পোয়েট্রি প্রতিযোগিতা জেতেন। তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ডার্বিশায়ারের পোয়েট লরিয়েট ছিলেন। ২০১৪ সালে, তিনি ‘ডিভিশন স্ট্রিট’-এর জন্য ফেন্টন অ্যাল্ডেবার্গ ফার্স্ট কালেকশন প্রাইজ জেতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + 11 =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »