Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বেবী সাউয়ের দীর্ঘ কবিতা

হে শূন্য

অতঃপর শূন্যতাই নেমে আসে…
হাঁটু পেতে বসে থাকে নিশ্চুপ ঈশ্বর
বকরূপী ধর্ম…
যত নীতিবাক্য আজ নিশ্চল, একাকী…
কোথাও যে প্রলয়ের ধ্বনি বেজে ওঠে
কোথাও বা অনন্ত পায়ের শব্দ
নিহত পশুর বেশে উতানাপিষতির দেশে
এ মুহূর্তে জন্ম নিতে পারে বিচ্ছেদের জ্বালা!
উদ্ধত সান্ত্রীর মতো অতন্দ্র প্রহরে এই
কার দিকে মুখ তুলে দেখো!
কাকে দিয়ে যেতে চাও সমর্পণটুকু!
হৃদয়ের দরবার ডেকে আজ কাকে তুমি পড়াবে এ বর্ণপরিচয়!

তবে কী মৃত্যুও ভীত
তবে কী এ শাণিত তিরের ফলা এতদিন ভয় আর ক্রোধ শিখিয়েছে আমাদের…
যার ভয় ছিঁড়ে দিয়ে গেছে স্নেহ আর সন্তানের মায়া
ঈর্ষাকাতরতা বুকে নিয়ে হেঁটে গেছি মরুপ্রদেশের দিকে…
হাতে ব্যথা তবু লোহার কুঠারে লেগে মৃত্যু আর তার ভয়…
বলো, ভুল ছিল? ভুল!

ভুল করে পুষে রাখি ভ্রম
হৈ হৈ করে হেঁটে যাওয়া ভুলের সন্তান তারা
ভ্রমণেও উঠে আসে নিকেলের স্বর
দমবন্ধ অবস্থান
তাদের মাংসের গন্ধে মিটে গেছে আমাদের বুভুক্ষিত জীবনের মায়া দয়া
শোক
শুধু তৃষ্ণায় প্রাক্কালে মাটি খুঁড়ি… বেরনো জলের স্রোতে হাত ছুঁয়ে দেখি
ঢেলা ঢেলা মাংসের চুবানো দেহ, হৃদপিণ্ড, কাটা ফুসফুস

তামুজ হে! এই অবসর…
শুরু করো দীর্ঘতম চিঠি
পাঠ করো,
শ্রবণের মাঝে এইটুকু কথা, সমর্পণ
ঝড়ের আওয়াজ ভেসে আসে দূরে
দূরে আজ আশঙ্কিত চাঁদ
তার সাঙ্গোপাঙ্গ… সখীদের শাড়ি ওড়ে পাতালের দেশে
বিশ্রামের প্রয়োজন নেই
বছরের পর বছরের মায়া, প্রেম, প্রীতি
অন্ধকার আরও অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছে…

দেখো, ধৈর্যহীন হয়নি এখনও মৃত বাজ-শকুনের আত্মা
পঙ্গুত্বের দরবারে বসে আছে শেষ উপাখ্যান
রক্তহীন এই মাটি জুড়ে
বায়ু জুড়ে
এখনও অপেক্ষা করে ঘুম দীর্ঘদিন
সমস্ত প্রহর আজ জেগে আছে
বিরহী নারীর প্রেম, কাল-হীন, কাম-হীন, অনন্তের অথচ প্রথম

এখনও যে লালপায়া অষ্টাদশী সবটুকু ভেঙে যাওয়া স্বপ্নে পুষে রাখে জোড়া দেওয়া কাচ
এখনও প্রসাধনে সেজে আছে সন্ধেতারা
শৃঙ্গারেও সুখী বেনারসি
শাঁখ বাজে
পাঠ করো পাঠ করো
প্রিয় তামুজ, আমার প্রথম কৌমার্য…

দেখো ওই শহরের খাঁজ
সেখানেই যৌনপিশাচের দল
রাতভর হত্যা করেছিল প্রেম
প্রেমিকার মন
ব্লাউজের হুকে ঠোঁট কেটে গেছে
সেপটিপিনেও লেগে জ্বলন্ত মাংসের গন্ধ
তবুও সে রাতভর থামেনি’কো
রাতভর উল্লাস করেছে নৃত্য
লিঙ্গ
নারীদেহ উপাসক তারা
দুধ ঘৃত জলে এ অবগাহন নয় শুধু
নিপুণ কৌশলে তারা শিখে গেছে হন্তারক পন্থা,
বাঘনখ নিয়ে ঘোরে…

তারপর!
তারপর?

ওরা ঘুমিয়েছে রোদে
শহর নেমেছে পথে
ছদ্মবেশ প্রেমহীন চোখে ফের দহন করেছে বুক
সারাদিন পরোক্ষ এক পিশাচীয় খেলা
উউফফ!
আর না, তামুজ, প্রেম আমার
একবার শুধু পাঠ করো এই দীর্ঘতম চিঠি
ভুল বানানের আঙ্গিক আমার
কত শত ভুল ফুটে ওঠে সামান্য অক্ষর ও বর্ণমালায়
ছত্রে ছত্রে বালকের সরল চাহিদা
তাতেই ভরে যাবে এ ধর্ষিত বুক
ভেঙে যাওয়া পাহাড়ের চূড়া
আবার সংশ্লেষ হবে তাতে
আবার হয়ত জেগেও উঠবে প্রেম
সব পুরুষকে যে মেয়ে ভেবেছে প্রতারক বলে
বিশ্বাসে আঘাত করে গুরুতর জখম নিজেই
ফেরাও তামুজ আমার প্রথম কৌমার্য প্রেমিক…

তুমি তো পুরুষ নও, নারী নও
লিঙ্গভেদে দেখিনি কখনও
ভ্রম আমার? এটাও ভ্রম!
সমস্ত সত্যি ভেবে নির্দ্বিধায় তুলে দেওয়া হাত
গোলাপি পাপড়ি ঠোঁটে এগিয়ে দিয়েছি প্রথম চুম্বন
আকণ্ঠ-পিয়াসী তুমি, পান করেছ আমার স্তন
গ্রীবা, বুক…
যোনিপথ থেকে তুলে আনো ঋতুদাগ…
প্রথম সন্তান তুমি, প্রথম প্রেমিক, স্বামী…
বলো, ভুল কোথা থেকে আসে…
প্রকৃতিও চেয়েছে এমন…
চারপাশে ছড়িয়েছে পাখিদের ডাক, ফুলের মর্মর… প্রজাপতিদের মায়াময় ডানা… আকাশ এবং বাতাসের…
বলো এ কি প্রেম নয়! প্রেম নয়?
সমস্ত ছলনা তবে?
শুধু ছলনায় ভোগ করে নেওয়া এই সামান্য নারীর দেহ!
অন্য কোন পুরুষ ছুঁয়েছে বলে এই দেহপ্রান্ত
নশ্বর এ দেহ
তাতেই সব প্রেম উড়ে গেছে তরল বিশ্বাসে!
তাতেই তুমিও শ্যেন চোখ দিয়ে জরিপ করেছ বারবার
শহরের পোষমানা মতো!
ভাগাড়ের দিকে চোখ রাখা শকুনের মতো?
ধিক্কারই বা দিই কাকে!
কাকে বলি নশ্বর এ দেহভাগ ছাড়া
কোথাও যে ছুঁতেই পারেনি নিশাচর পিশাচের দল
শলাকার মতো ওই উত্তপ্ত ক্ষুধা
নিভিয়েছে স্তন্যপায়ী হয়ে
বারবার নিজের লালসা তারা লালন করেছে শলাকার মতো পুরুষাঙ্গে
উপভোগ করেছিল ওরা…
ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে চেয়েছিল তারা এই দেহ… এই স্তন, জরায়ুর ক্ষত…

তখন… তখনও

একমনে আমি তোমাকেই চেয়ে গেছি… তামুজ! ভেবেছি তোমার ওই প্রথম আলিঙ্গন
তোমার চুম্বন, ঠোঁট, পুরুষালি বুক…
কামাতুর চাহনি তোমার…
কোনও পুরুষ ঢোকেনি মনে
কেউ স্পর্শ করেনি তো মন
ছুঁতেও পারেনি ওই সতীচ্ছদের গোপন দ্বার

যা কিছু ঘটেছে শুধু ওরা চেয়েছিল বলে
আমি তো চাইনি
আমি তো চরম ইচ্ছেটুকু নিয়ে স্পর্শ করিনি সঙ্গম সুখ
আমি বারবার নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করে গেছি দিনরাত
ভেবেছি তোমার স্পর্শ প্রথম
ভেবেছি তোমার থুতু, লালা, চুম্বনের দাগ
সম্ভোগ প্রথম শিহরণ
গভীর দু’ভাগ করে দেখো বুক, স্তন
লেগে আছে শুধু তোমার ঠোঁটের দাগ, চুম্বনের দৃশ্য

তামুজ যেয়ো না…
দরজায়, চৌকাঠে দেখো মৃত আত্মারা, আশ্রয় নেই
ঘোরে শুধু ঘুরে মরে…
তার স্নেহ ভালবাসা নেই
পিতা নেই
ভাই, বন্ধু, প্রেম…
ঈশ্বরও নেই…
নারী অভিযোগে চিহ্নিত করেছে এ শহর
শুধু নারী! শুধু ভোগ্য পণ্য
নখের আঁচড়ে ভেঙে গ্যাছে প্রেম…
যেয়ো না… যেয়ো না…
তামুজ একটিবার দেখো মন
এখনও যে কারও স্থান নেই তাতে
কোনও পুরুষ স্পর্শ করেনি কৌমার্যে
পবিত্র এখানে আমি…

জলের মতো
মাটির মতো
ভূমির মতো
পবিত্র এ আগুন শিখা…

চিত্রণ: মনিকা সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 6 =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »