Search
Generic filters
Search
Generic filters

কবি ও বিজ্ঞানী মিরোস্লাভ হোলুব

‘কিছু কি আছে যা কবিতায় থাকা উচিত নয়? কবিতার কি কোনও সীমারেখা হয়?’। কোনও একটি সাক্ষাৎকারে যখন তাঁকে এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল, তিনি এর উত্তরে বলেন— ‘‘কবিতা তো একটা সাধারণ প্রক্রিয়া, যেখানে সব কিছুই থাকতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা প্রতিনিধিত্বমূলক আর ‘কবিতা’ হয়েই থাকছে। কবিতার ক্ষেত্রেই একটাই মাত্র সীমারেখা— তা হল ‘কবিতা’। আর অন্য কোনও সীমারেখা নেই। … আমি মনে করি, সবই ধারণ করতে পারে কবিতা, যদি তা একটি অ্যালজাবরিক ফাংশান হয়, তাও।’’

“আমার কাছে খুব অপছন্দের একটি প্রশ্ন হল, ‘তোমার কবিতা কী বিষয়ের?’ কবিতা তো যে কোনও বিষয়েরই হতে পারে। কবিতা তো তোমার চোখ থেকে মহা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অবধি। বিশাল ও বিস্তৃত। There is poetry in everything, that is the biggest argument against poetry.”

ওপরে উদ্ধৃত সাক্ষাৎকারের উত্তর এবং উদ্ধৃতিটি যাঁর, তিনি একজন সমাদৃত কবি হিসেবেই পরিচিত। চেকোস্লোভাকিয়ায় জন্ম স্বনামধন্য কবি ও গদ্যকার মিরোস্লাভ হোলুব (Miroslav Holub, ১৯২৩–১৯৯৮)।

মিরোস্লাভ হোলুবের নামটি সম্ভবত অনেকেরই জানা। বাংলা ভাষায় হোলুবের কবিতা অনুবাদ করে তাঁর কবিতার সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়েছেন বিশিষ্ট কবি ও গদ্যকার মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। মিরোস্লাভ হোলুবের শ্রেষ্ঠ কবিতা [প্রথম প্রকাশ ১৯৮৫, দে’জ পাবলিশিং] বই হিসেবে প্রকাশের আগে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের হোলুবের লেখাগুলির অনুবাদ ‘পরিচয়’, ‘বিভাব’ প্রমুখ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। এছাড়াও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কবি আনন্দ ঘোষ হাজরাও হোলুবের কবিতা অনুবাদ করেছেন এবং হোলুবকে নিয়ে তাঁর কয়েকটি রচনাও রয়েছে। হোলুবের কবিতা সম্পর্কে অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন— ‘প্রায় শল্যবিদের মতো শ্লেষ-পরিহাসের ছুরি বসানো হোলুব কবিতার বিষয়ের মধ্যে, কিংবা হয়ত অণুবীক্ষণের মধ্যে বীজাণু যেমন তেমনি ভাবেই শব্দগুলোকে তন্ন তন্ন করে হাতড়ে হাতড়ে দেখেছেন এই কবি’।

টেড হিউজেস (Ted Hughes), যিনি একজন স্বনামধন্য, বন্দিত ইংরেজ কবি, অনুবাদক ও সমালোচক, যাকে তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এই টেড হিউজেস সম্পর্কে ‘দ্য টাইমস’ জার্নাল লিখেছেন, ‘১৯৪৫ পরবর্তী পঞ্চাশজন কবিদের তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকবে তাঁর নাম’। তিনি মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতা সম্পর্কে কী বলেছেন শোনা যাক, ‘‘পৃথিবীর যে কোনও স্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘হাফ ডজন’ কবিদের নাম বলতে হলে হোলুবের নাম তার মধ্যে থাকবে।’’

উল্লেখ্য যে, হোলুবের নাম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্যেও নমিনেটেড হয়েছিল। তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি, সে অন্য কথা।

কোনও কবিকে পড়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট কবির পরিচয় জানার দরকার নেই, কবিতা-ই চিনিয়ে দেবে কবিকে। এমন কথার সত্যতা থাকলেও আমার মনে হয়, সব ক্ষেত্রে এ কথা সম্পূর্ণ সত্য হতে পারে না। অন্তত মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতার ক্ষেত্রে নয়। কেন না, তাঁর কবিতা পড়ার পাশাপাশি যদি কবির পরিচয়টুকু জানা থাকে, তাহলে বলা বাহুল্য যে, কবিতার প্রতিটি শব্দ ও পঙ্‌ক্তির আরও অন্যতর স্তরগুলির কিছু কিছু ধরা দেবে পাঠকের অনুভবে।

মিরোস্লাভ হোলুব চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমডি ডিগ্রি এবং ইমিউনোলজি ক্ষেত্রে গবেষণা করে PhD ডিগ্রি পান। বস্তুত তিনি ছিলেন ‘ইমিউনোলজি’ ক্ষেত্রে একজন বিশিষ্ট গবেষক বিজ্ঞানী। তা বোঝা যায় সহজেই, কারণ ১৫০টিরও বেশি গবেষণাপত্রের রচয়িতা তিনি। বিভিন্ন হাসপাতাল এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মাইক্রোবায়োলজি ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তিনি বলতেন, ‘কবিতা’ তাঁর কাছে ছিল বিজ্ঞানের জগৎ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ার একটি অন্য ঠিকানা। তিনি বলতেন, তাঁর কাছে ‘বিজ্ঞান’ প্রথম, দ্বিতীয় হল কবিতা।

কুড়িটি কাব্যগ্রন্থ তাঁর। এছাড়াও সাহিত্য ও কবিতার ওপর লেখা বেশ কিছু নিবন্ধের রচয়িতা। উল্লেখ করা দরকার যে, ‘চেকোস্লোভোকিয়া লেখক ইউনিয়ন’ একবার তাঁকে দু-বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখার জন্যে সুযোগ দিয়েছিল। আর এর জন্যে তাঁকে ‘রিসার্চ সায়েন্টিস্ট’ হিসেবে বেতনের সমান ‘স্টাইপেন্ড’ দিয়েছে।

স্বনামধন্য আইরিশ কবি, নাট্যকার এবং অনুবাদক সাহিত্যে নোবেলজয়ী সিমাস হ্যেনে মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতার প্রশংসা করে লিখেছেন— “Holub as a poet who could lay things bare, not so much the skull beneath the skin, more the brain beneath the skull; the shape of relationships, politics, history; the rhythms of affections and disaffection; the ebb and flow of faith, hope, violence, art.”

তাঁর ভেতরের বিজ্ঞানী সত্তা, তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কবিতার ভাঁজে ভাঁজে ফুটে উঠতে দেখা যেত। ফুটে উঠত— মানবিকতা, যা কখনও শ্লেষাত্মক, কখনও সরাসরি ও সংবেদনশীল।

কবিতা ও বিজ্ঞানের সহযোগের কথায় অনিবার্যভাবে যাঁর নাম আসবে তিনি মিরোস্লাভ হোলুব। হোলুব বলেছেন— ‘বিজ্ঞানে আসলে আমরা কিছু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন করতে শিখি, আর শিল্প ও মানবীয়বিদ্যায় আমি কখনওই নিশ্চিত নই, কী সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি। তাই এভাবে বলা যায়— শিল্পকলা ও মানবীয়বিদ্যায় প্রশ্নের তুলনায় অনেক উত্তর আগে থেকেই রয়েছে।’ সম্ভবত হোলুব-ই একজন সার্থক কবি, যিনি কবিতার দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটাতে সক্ষম হন।

গবেষণার কাজে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানো এই বিজ্ঞানীই চল্লিশ বছর ধরে কবিতা লিখেছেন। তাঁর অধিকাংশ কবিতার বই অনুবাদ হয়েছে ইংরেজিতে। ইংরেজি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে হোলুবের কবিতা। এমনকি গুজরাতি ও বাংলা ভাষাতেও অনুবাদ হয়েছে হোলুবের কবিতা। তিরিশটির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে হোলুবের কবিতা। যার মধ্যে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত কবিতাগুলি বেশি জনপ্রিয়। তাঁর কবিতা বুদ্ধিদীপ্ত, বিশ্লেষণমূলক, মেধা, মনন, শ্লেষ ও প্রহসনের বুননে অসাধারণ রচনা।

তাঁর নামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি আউটার মেইন বেল্ট অ্যাসট্র্যয়েডের নাম রাখা হয়— minor planet 7496 Miroslavholub

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, এই বিজ্ঞানী-কবির জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, সব শেষে রাখলাম ১৯৬২ সালে লেখা তাঁর একটি কবিতা ‘দ্য ডোর’।

The Door

Go and open the door.
.             Maybe outside there’s
.             a tree, or a wood,
.             a garden,
.             or a magic city.

Go and open the door.
.             Maybe a dog’s rummaging.
.             Maybe you’ll see a face,
or an eye,
or the picture
.            of a picture.

Go and open the door.
.             If there’s a fog
.             it will clear.

Go and open the door.
.             Even if there’s only
.             the darkness ticking,
.             even if there’s only
.             the hollow wind,
.             even if
.                         nothing
.                                       is there,
go and open the door.

At least
there’ll be
a draught.

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + 4 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »