
আর্জেন্টিনার গল্প: ২৫-এ অগাস্ট ১৯৮৩
হোর্হে লুইস বোর্হেস অনুবাদ: মানবসাধন বিশ্বাস ছোট্ট স্টেশনের ঘড়িতে দেখি, এর মধ্যে এগারোটা বেজে কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে গেলাম। আগে বহুবার

হোর্হে লুইস বোর্হেস অনুবাদ: মানবসাধন বিশ্বাস ছোট্ট স্টেশনের ঘড়িতে দেখি, এর মধ্যে এগারোটা বেজে কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে গেলাম। আগে বহুবার

ভালভাষা উৎসব সংখ্যা ২০২৩। আমেরিকান সাহিত্যিক রবার্ট অলেন বাটলার ১৯৯৩ সালের বিশ্বখ্যাত পুলিৎজার সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী। তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প ‘আ গুড সেন্ট ফ্রম আ স্ট্রেইঞ্জ মাউন্টেইন’-এর (গল্পটির নামেই সংকলনের নাম) অনুবাদ করেছেন মানব সাধন বিশ্বাস।

India’s First Bengali Daily Journal. হিন্দুস্থান-পাকিস্তানের এই পুরো মামলার গোড়া থেকেই তাকে এক অদ্ভুত বাতিকে পেল : সে বাকিদের কাছে বারবার ব্যাকুলভাবে জানতে চাইত— টোবা টেক সিং জায়গাটা আসলে ঠিক কোথায়। এই প্রশ্নের মনের মত জবাব সে পায়নি, কেননা জবাবটা কারওরই জানা ছিল না। মেয়ের যাওয়া-আসা হঠাৎই একসময় বন্ধ হয়ে গেল। তার অস্থিরভাব বাড়ছিল, তবে সব ছাপিয়ে বেড়ে উঠল উৎকণ্ঠা। সেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের জাদু, যা তাকে পরিবার আসার আগাম সঙ্কেত দিত, সেটাও সময়ে ক্ষয়ে মিলিয়ে গেল।

India’s First Bengali Daily Journal. এবার শেষ পর্যন্ত সে এসে পৌঁছল। সেটা ছিল এক শনিবার। আমার স্কুল নেই, মায়ের সঙ্গে নিড়ানি দিয়ে কুমড়ো ভুট্টা-র গাছগুলোর গোড়ার আগাছা সাফাইয়ের কাজ করছিলাম। আমার চুল খোঁপা বেঁধে সবসময় পরিপাটি রাখার চেষ্টা করি, কিন্তু সেদিন পুরনো একটামাত্র ক্লিপ দিয়ে চুল বেঁধেছিলাম। এক সময় দেখি, ঘাসজমির দিক থেকে একটা কমবি গাড়ি আমাদের কাছাকাছি এসে থেমে গেল। কমরেডরা তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এল। আমি ছুটে গিয়ে হাত ধুয়ে নিতে এগোতেই দেখি, সে পা বাড়িয়ে একবারে আমার সামনে— মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সে বলে উঠল, আরে আরে হল কী!

India’s First Bengali Daily Journal. দারুণ খুশিতে ছুটে আমি ব্যালকনিতে চলে গেলাম। উল্লাসে-উত্তেজনায় যথাশক্তি চিলচিৎকার করে বলতে চাইছিলাম— ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে! প্রাণে বেঁচে ফিরেছে আফগানিস্তান থেকে! আমার কাছে অন্তত সেই ভয়ংকর যুদ্ধ এবার তাহলে শেষ হল!’ আমি সেদিন আনন্দে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। বলতেই হবে, আমাদের দেরি হয়েছিল। প্লেন অনেক আগেই এসে পড়েছিল। আমরা ছেলেকে পাবলিক গার্ডেনে পেলাম। বেচারা ঘাস আঁকড়ে মাটিতে শুয়েছিল।

India’s First Bengali Daily Magazine. মা অ্যাপ্রন পরেনি, ঠোঁটে কিন্তু লিপস্টিক ছিল। টেবিলের পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিল। আমার কাঁধে হাত রেখে মা হামি দেওয়ার জন্যে মুখখানা বাড়িয়ে দিল। তারপরই ছুড়তে আরম্ভ করল হাজারো প্রশ্ন: কীভাবে এলাম, বাচ্চারা কেমন আছে, কুকুরটা ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি। মা কিন্তু আমার কোনও প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। মায়ের ভয়, সর্বক্ষণ নিজের কথা বলে গেলে হয়তো আমার মোটেও শুনতে ভাল লাগবে না— একঘেয়ে লাগতে পারে।

India’s First Bengali Daily Magazine. মূকাভিনেতা এবার একটি প্রেস কনফারেন্স ডেকে ঘোষণা করলেন, এরপর আর কোনও কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে না। তাঁকে নিতান্ত ক্ষুদ্রকায় এবং ভিনদেশি মনে হল— তাঁর শরীর জুড়ে এখন রসুনের কটুগন্ধ। তাঁকে নিয়ে প্রেসের লোকদের আর তেমন উৎসাহ রইল না। দক্ষতা-বিচার এখন জনতার হেফাজতে; তারাই মর্জিমাফিক ঠিক করবে, তাঁকে কোন সময়ে কোন উদ্দেশ্যে তারা তাঁর সেবা নেওয়ার অনুরোধ করবে।

India’s First Bengali Daily Magazine. ঘন ঝোপজঙ্গলের মধ্যেও সে একইভাবে এগোতে লাগল। মহিলার গায়ে রংচটা কালো আলখাল্লা আর একটা ছাইরঙা আলোয়ান, মাথায় মুখ-ঢেকে-রাখা কালো ঘোমটা। তার মাথায় চাপানো একটা লাল ঝুড়ি। মহিলার কোনও ছায়া কোথাও পড়ছে কিনা, কিংবা তার পা মাটিতে আদৌ পড়ল কিনা সেটা খেয়াল করতে ওমোভো পুরোপুরি ভুলে গেল।

India’s First Bengali Daily Magazine. মাসুদকে অতি ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলাম। মনে হল সে এমন একজন মানুষ যে পিছিয়ে আসতে চায়, কিন্তু তার পা তাকে সামনে এগিয়ে দিচ্ছে। খেজুরের বস্তাগুলোকে মাঝে রেখে তারা গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়াল। কেউ কেউ দুটো-একটা খেজুর তুলে মুখে নিয়ে পরখ করতে লাগল। ঠাকুরদা সেখান থেকে একমুঠো তুলে নিয়ে আমার হাতে দিলেন, আমিও চিবোতে লাগলাম। তখন নজরে এল, মাসুদ দু’হাতের তেলোয় কয়েকটা খেজুর নিয়ে নাকের কাছে তুলে নিয়ে পরক্ষণেই ফেরত করে দিল।

India’s First Bengali Daily Magazine. শেষে এমন একটা ঘরের দরজা খুললেন যেখানে প্রচুর বই আর কাগজপত্রে ঠাসা। সেখানে ফুলদানিতে ফুল আছে, দেয়ালে ছবি আছে। আমার নজর পড়ল ঘরের কোণে রাখা একটা নিচু টেবিলে। আমি তার কাছাকাছি চলে এলাম; দেখি প্লাস্টিকে তৈরি ছাই রঙের একটা যুদ্ধজাহাজের মডেল।

India’s First Bengali Story Portal. সে কথা বলত বড় একঘেঁয়েভাবে এবং মাঝে মাঝেই শেষমেশ কান্নায় ভেঙে পড়ত। আর তখন লোকটিই তার হয়ে তাদের গল্প শোনাত। লোকটি একদিকে বসত, আর সে বসত উলটোদিকে— হাত দিয়ে তাকে দেখাত আর আউড়ে যেত তার গল্প: ‘যে দুর্ভাগা প্রাণীটিকে তোমরা সামনে দেখতে পাচ্ছ,— যার চেহারা তোমাদের নির্দোষ চোখে এত মারাত্মক ভয়ংকর, তার মা ব্ল্যাক ফরেস্টের ধার-ঘেঁষে থাকা একটি গ্রামে বাস করত। সেখানে, এক গ্রীষ্মের দিনে যখন সে জঙ্গলে জাম কুড়োচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে, এক বুনোশুয়োর তাকে আক্রমণ করে। সে তার উন্মত্ত জান্তব শয়তানির শিকার হয়ে পড়ে।’

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।