সেপ্টেম্বরের এক বৃষ্টির রাত। আচমকাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম গাড়োয়াল যা্ব। হ্যাঁ, আবার গাড়োয়াল! গাড়োয়ালের গম্ভীর পাহাড় আমার বড় পছন্দের। ইচ্ছে, মায়ালী পাস অতিক্রম করে কেদারনাথ দিয়ে নামব। হাতে ঠিক ১৫ দিন বাকি। গাড়োয়ালের সহজ সরল মানুষগুলোর সঙ্গে আমার বড় আত্মিক সম্পর্ক বলে মনে হয়। তাঁদেরই একজন উত্তরকাশীর বহু পুরনো বন্ধু ‘মনোজ’। North Himalayan Holidays ওর সংস্থার নাম। বড়ই প্রাণের সম্পর্ক মনোজের সঙ্গে আমার। সোজা মনোজকে ফোন করলাম। ঘড়িতে রাত সাড়ে ন’টা বাজে। ওপার থেকে ভেসে এল সেই চেনা নমস্কার উচ্চারণ। পুরো আধ ঘণ্টা ধরে প্ল্যান ডিটেল শুনে মনোজ এককথায় রাজি। ঠিক হল শুধু তিনজন নেপালি HAP (high-altitude porters) আর কিছু বেসিক সরঞ্জাম নিয়ে জিপিএস ডিভাইস-এ নিজের বানানো ম্যাপ দেখে সেমি-অ্যালপাইন স্টাইলে পাড়ি দেব মায়ালী পাস। মনোজ শুধু খরচাটুকু নেবে। নো প্রফিট ফ্রম মি। দারুণ ব্যাপার। উত্তেজনায় ফুটছি তখন।
সকাল সকাল স্নান সেরে বাবা-মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে চন্দননগর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য ডিকাথলন, সেক্টর ফাইভ। বিপ্লবের অনলাইনে অর্ডার করা জুতোটা এ ক’দিনেও এসে পৌঁছায়নি। তাই স্টোর থেকে নিতে হবে। অগত্যা পুজোর ভিড় রাস্তায় ডিকাথলন গিয়ে জুতো কিনে হাওড়া পৌঁছাতে গিয়ে দেখি কুম্ভ এক্সপ্রেস প্লাটফর্ম ছেড়ে ছুট লাগিয়েছে। ট্রেন মিস! মনে মনে খুশিই হলাম। কারণ সেকেন্ড সিটিং-এ বসে বসে দুই দিনের জার্নি জীবন কয়লা করে দিত। সেদিন সকালেই দেখেছিলাম শিয়ালদা থেকে হরিদ্বারের একটা স্পেশাল ট্রেন দিয়েছে দুপুর তিনটের সময়। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়েই আর একবার চেক করলাম। তখনও ১১৯টা সিট খালি। সঙ্গে সঙ্গে বুক করে পাড়ি জমালাম শিয়ালদা। অবশেষে প্রায় আধ ফাঁকা বগি নিয়ে দুপুর তিনটের সময় স্পেশাল ট্রেন ছাড়ল। চললাম হরিদ্বার।
বিকেলে হরিদ্বার স্টেশনে স্বাগত জানাতে এলেন আমাদের প্রিয় অমিতাভদা আর ওঁর গুরুজি। উনি কানারি খাল ট্রেক করে ফিরছেন। সে রাতটা ওঁদের সঙ্গে দারুণ কাটল। আমরা পুরনো রীতি অনুযায়ী রাতের আশ্রয় নিলাম পরিচিত কালি কমলি-তে। তারপর রাতের খাবারের জন্য সেই দাদা-বউদির আন্ডার গ্রাউন্ড।
শারদ ষষ্ঠীর কাকভোরে বিশ্বনাথ সেবার একটি বাসে আমরা রওনা দিলাম ‘ঘনশালির’ উদ্দেশে। ক্রমেই হৃষীকেশ ছুঁয়ে গাড়ি ছুটে চলল শিবালিকের আঁকাবাঁকা পথ ধরে। সবুজমাখা শান্ত স্নিগ্ধ হিমেল শারদ প্রাত। নীল আকাশের বুকে খণ্ড খণ্ড মেঘ, বলাকার মত তেপান্তরে পাড়ি দিয়েছে। ক্রমেই চাম্বা ছাড়িয়ে গহীন হিমালয়ের পথ ধরেছে আমাদের বাস। এক সময় উত্তর দিকে বার দুয়েক উঁকি দিল তুষারমোড়া গঙ্গোত্রীর শৃঙ্গ। আনন্দে প্রাণ নেচে উঠল। নীল আকাশের বুকে আকণ্ঠ অহঙ্কার নিয়ে উদ্যত শিরে দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গোত্রীর শৃঙ্গদুটি। তেহেরি ড্যাম ধরে কয়েক ঘণ্টা পাক খেয়ে ঠিক ১২টায় ঢুকলাম ঘনশালি। সেখানেই মনোজের টিমের সঙ্গে দেখা হল। ৩ জন নেপালি হ্যাপ আর গাইড বিপিন।
সকাল ৭টা। সূর্য এখন ‘ভি’ শেপের ভ্যালিটার পিছনে। ৯টার সময় রোদ আসবে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে গোটা ভ্যালিটায়। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় গা ঝেড়ে উঠছে হিমালয়ের বনানী প্রকৃতি। আজ আমাদের ট্রেক শুরু। সকাল সকাল তল্পিতল্পা গুছিয়ে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঠিক ৯টার সময় রোদ উঠল। একদম পূর্ব হিসাবমত। আমি প্রতিটা অভিযানে এসব আগে থেকেই হিসেব করে যাই। গোটা ট্রেকটায় মাসার অবধি কোনওদিন ৫-৬ ঘণ্টার বেশি সূর্যকে পাব না এটা আগে থেকেই জানতাম। সেইমত ঠান্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচতে সতর্কতা নিয়েছি যথেষ্ট। দারুণ আবহাওয়া। মাথার উপর নির্মেঘ খোলা আকাশ। উত্তর দিকে কৈরির শৃঙ্গগুলো উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।
সাড়ে ন’টায় যাত্রা শুরু করলাম। ভিলঙ্গনাকে বহু নীচে ডান দিকে রেখে জঙ্গলে ভরা আঁকাবাঁকা চড়াই-উৎরাই পথ গিয়েছে সোজা কল্যাণী পেরিয়ে ‘ভিরোধা’। টানা দুবছর গৃহবন্দিত্বের পর আবার পাহাড় চড়া। কষ্টও হচ্ছিল ভীষণ। বড় বড় চড়াইগুলো পার করতে ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে গেছি প্রথম দিন। স্যাকটারও অনেক ওজন হয়েছে। হওয়াই তো উচিত। কী নেই ব্যাগে। ১০ দিন টিকে থাকার মত প্রয়োজনীয় সব কিছু আছে স্যাকে। একদম পরিপাটি করে গুছিয়ে নিয়েছি সব কিছু। অনেকগুলো ঝোরা পেরিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে ঝিঁঝির একঘেয়ে ডাক শুনতে শুনতে ক্রমেই ৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেলেছি। ঘড়িতে দুপুর ১২টা। একটা টানা চড়াই পেরিয়ে উঠে এলাম একটা পাহাড়ের টপে।
গরম গরম সুপে শরীর চাঙ্গা করে নিয়ে ক্যাম্প রেডি করলাম। এবার ক্রমেই সূর্য ঢলে পড়তে লাগল ‘ভি’ শেপের ভ্যালিটার ওপারে। একটু পরেই রোদ চলে গেল। শুরু হল হিমেল হাওয়ার দাপট। চারপাশের জঙ্গল মর্মর শব্দ করে উঠল। কোনও গাছের মগডাল থেকে একটা পাখি খুব কর্কশ শব্দে ডেকেই চলেছে। বুক যেন খান খান করে দিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডাও লাগছে প্রবল। আমাদের ক্যাম্পের পাশে একটা জায়গায় মেষপালকরা একটা অগ্নিকুণ্ড বানিয়েছিলেন লক্ষ করলাম। বেশ কিছু কাঠ এখনও আধপোড়া অবস্থায় পড়ে আছে। তাতে কিছু শুকনো ঝোপঝাড় আর কাঠকুটো ফেলে আবার জ্বালানো হল আগুন।
১৩ অক্টোবর, ২০২১
ঘড়িতে সকাল ৮টা। সূর্যের দেখা নেই। চারিদিকে আগাছাময় সবুজ জায়গাটা যেন ফিকে হয়ে আছে। রাতের জমা শিশির প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে সবুজ রঙে সাদা প্রলেপ দিয়েছে। ৯টার মধ্যে তাঁবু গুছিয়ে সবাই রেডি। গন্তব্য খরসলি। দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। আবার ভিলঙ্গনা বরাবর উত্তরে যাত্রা শুরু হল। এবার সূর্যমামা তার মিঠেল রোদ নিয়ে আমাদের পিছু পিছু ধাওয়া দিয়েছে। আবার জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। একটা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার তখনও জঙ্গলের ভিতর। মাঝে মাঝে পাতার ফাঁক দিয়ে ছুঁয়ে আসছে সকালের শান্ত রোদ। আলো-আঁধারির এক মায়াবী পরিবেশ তখন জঙ্গলের মধ্যে। আজ সারাদিনের চড়াই পথ, তাই লম্বা চলা আবার একটু বিশ্রাম। এইভাবেই চলেছি। কতগুলো নালা পেরলাম গোটা রাস্তাটায় তার হিসেব নেই। কোনওটা লাফিয়ে আবার কোনওটা এক গোড়ালি ঠান্ডাজল ভেঙে, আবার কোনওটা উদ্দাম স্রোতে চেন করে। এখন চারিদিকে ভোজপত্রের জঙ্গল।
দুপুর দুটো। ক্রমাগত নামতে নামতে একটা নালার ধারে এসে পৌঁছলাম। এর নাম কৈরি নালা। বাম দিকে এই ভ্যালিটার বুক চিরে আর একটা ভ্যালি ঢুকেছে। ওটা কৈরি গাদ ভ্যালি। ওই ভ্যালির অনুচ্চ শৃঙ্গগুলো আমরা গাঙ্গী থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। সেখান থেকে বয়ে আসছে এই স্রোতস্বিনী কৈরি নালা। জঙ্গলের ভাঙা দুটো ডাল পাশাপাশি ফেলে এখানে একটা পুল বানানো হয়েছে। এর ওপারটাই খরসলি। দূরে খরসলি মাতার মন্দির দেখা যাচ্ছে। তারপর পুল পেরিয়ে রাশি রাশি বোল্ডার পার হয়ে পৌঁছলাম মন্দিরে। সেখানে খরসলি মাতাকে প্রণাম জানিয়ে সুস্থ অভিযানের প্রার্থনা করলাম। তারপর নেমে এলাম ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে। ডান পাশ দিয়ে দিয়ে তীব্র স্রোতে ভিলঙ্গনা বয়ে যাচ্ছে। রিভার বেডের ওপর একটা উঁচু জায়গাতে পড়ল আমাদের আজকের ক্যাম্প।
৭টার মধ্যে রাতের খাবার সাঙ্গ করে তাঁবুতে ঢুকলাম। তারপর শুরু হল আমাদের গল্প। পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য থেকে হিমালয় সৃষ্টির ইতিহাস, ভূগোল, যোগী, যোগ সাধনা, আধ্যাত্মিকতা থেকে হিমালয় ভ্রমণের ইতিবৃত্ত নিয়ে রাত ১২টা অবধি আলোচনায় মশগুল হয়ে রইলাম সবাই। তারপর রোজের মত শোয়ার আগে শেষবার রাতের আকাশকে অনুভব করতে ঠান্ডা উপেক্ষা করে ছুটতাম বাইরে। পাগল পাগল লাগত মহাবিশ্বের রূপ দেখে। কতক্ষণ বিভোরভাবে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম জানি না। যখন সম্বিত ফিরত গিয়ে শুয়ে পড়তাম। এখনও তাই হল। অনেকক্ষণ বাইরে আছি, তাঁবুর ভিতর থেকে সনৎ ডাকছে।
সকাল সকাল আবার যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছি। আজ আমরা তাম্বাকুণ্ডের কাছাকাছি ক্যাম্প করব। দূরত্ব ৭ কিলোমিটার মত। কিন্তু গোটা রাস্তায় চড়াই অনেক। যাইহোক সূর্যের আলোর অপেক্ষা না করে সকাল সকাল নেমে পড়লাম ভিলঙ্গনার বুকে। রাশি রাশি বোল্ডার পার হয়ে নদী ধরে চলেছি উত্তরে। বাম হাতি পথ। টানা এক কিলোমিটার নদী ধরে চলতে চলতে আবার চড়াই শুরু হল। একটানা চলল সেই চড়াই। বেলা বাড়ছে ক্রমেই। অনেকটা এগিয়ে একটা খোলা জায়গা পড়ল। আবার উন্মুক্ত নীল আকাশ দেখা গেল। উত্তরে এখন খোলা গায়ে গর্জে উঠছে বিখ্যাত পর্বত কীর্তিস্তম্ভ। থালায়সাগর এখন আঁকাবাঁকা ভ্যালির অন্তরালে মুখ লুকিয়েছে। জঙ্গল পাতলা হয়ে এসেছে। উচ্চতা বাড়ছে, সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা হাওয়াটাও। তারপর অনেক চড়াই পথ উঠে একসময় বড় বড় বনস্পতির দল হারিয়ে গেল। সামনে এখন উন্মুক্ত প্রান্তর। দূরে ডান দিকে নদীর ওপারে চৌকির বাঁক দেখা যাচ্ছে। আরও দুই কিলোমিটার মত এগিয়ে চৌকির কাছাকাছি একটা জায়গায় আমাদের ক্যাম্প পড়ল।
বিপিন বলল, এই ক্যাম্পটা ওরা তাম্বাকুণ্ড বলে। কিন্তু লজিক্যালি এটা তাম্বাকুণ্ড ক্যাম্প নয়। তাম্বাকুণ্ড এখান থেকে অনেক দূর। বহু দূরে একটা মোরেন রিজ সাতলিং হিমবাহ থেকে নেমে আসছে ঠিক ধনুকের মত। তাম্বাকুণ্ড ওই লাটারাল মোরেনের ওই পাড়ে। ওখানে পৌঁছতে গেলে ভিলঙ্গনা ক্রশ করে যেতে হবে। ওই জায়গাটা হল আসল তাম্বাকুণ্ড ক্যাম্প। আর এটা হল বিফোর চৌকি। একটা ইন্টারমিডিয়েট ক্যাম্প। সেটা ওকে বুঝিয়ে বললাম। মেনেও নিল। ঘড়িতে দেড়টা বাজে। আকাশে রোদ গনগন করছে। আশপাশের আগাছা পরিষ্কার করে ম্যাটগুলো বিছিয়ে দিলাম খোলা আকাশের নীচে। তারপর উন্মুক্ত প্রকৃতির বুকে গড়াগড়ি। প্রকৃতির নীল নীলিমায় শয্যা নিয়েছি। আহা! মাথার উপর নীল আকাশের চাঁদোয়া। উত্তরে উদোম খোলা প্রান্তর। পূর্বে আকাশছোঁয়া পাথুরে পাহাড় নদীর ওপ্রান্ত থেকে খাড়া উঠে গেছে। কী অনাবিল প্রকৃতি। ঘণ্টাখানেক ওইভাবে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে লাগলাম। তারপর ক্যাম্প রেডি করে যখন বেরলাম তখন আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ জমতে শুরু করেছে।
১৫ অক্টোবর, ২০২১
ঘড়িতে সকাল ৭টা। দুর্যোগের মেঘ কেটে গিয়ে নীল আকাশ দেখা গেল। আমরা খানিকটা এগিয়ে চৌকি থেকে পায়ে হেঁটে ভিলঙ্গনা ক্রশ করে পুব দিকে মোড় নেব। তারপর ওপারে খানিকটা উঠে চৌকি ক্যাম্প। ওই মোড় পার হলেই খুলে যাবে ডান দিকের ভিউ। অর্থাৎ দুধগঙ্গা ভ্যালি। ওই ভ্যালি পার হয়ে পুব দিক ধরে আমরা পায়ে পায়ে উঠে যাব মায়ালী পাসের দিকে। একটানা পাথরের খাড়া ঢাল অপেক্ষা করে আছে মাসার তাল অবধি। এটা ক্রস করে নিতে পারলেই প্রকৃতির দ্বার খুলে যাবে। চোখের সামনে তখন ফুটে উঠবে উদোম খোলা আকাশ আর দিকচক্রবালে গাড়োয়ালের বড় বড় পিক। কেদারনাথ, ভারতিকুণ্ঠা, সুমেরু, মান্দানি, আরও কত কী। এসব ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। লোটাকম্বল গুটিয়ে আবার যাত্রা শুরু হল।
এখানে ডান দিক বরাবর আগাছাময় একটা খাড়া ঢাল বহু নীচে ভিলঙ্গনার বুকে নেমে গেছে। নীচে দিয়ে গর্জন করে নদী বইছে। এখানে নদী পার করার জন্য একটা ব্রিজ ছিল। কিন্তু সেটা প্রচণ্ড বর্ষায় ভেসে গেছে। তাই অগত্যা পায়ে হেঁটেই নদী ক্রস করতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ওই আগাছাময় ঢাল ধরে রাস্তা ছেড়ে জেড কাট নীচে নেমে যাব। বেলা বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নদীর জলও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী টপকাতে হবে। ক্রমেই খাড়া ঢাল বেয়ে নামতে লাগলাম। যত নীচে নামতে লাগলাম আগাছার জঙ্গল বাড়তে লাগল। চারিদিকে কাঁটা ঝোপ। যেখানেই লাগছে সেখানেই চিরে যাচ্ছে। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। রাস্তা নেই, ধরার জায়গা নেই, যেখানেই হাত পা পড়ে সেখানেই কাঁটা। ওই করতে করতে অতিকষ্টে এসে পৌঁছলাম স্রোতস্বিনী ভিলঙ্গনার ধারে। প্রবল স্রোতে নদী বয়ে চলেছে। এখানে পা দেওয়া মানে নিশ্চিত ভেসে যাব। অগত্যা নদীর ধার ধরে একটা প্রশস্ত জায়গা খুঁজতে খুঁজতে এগোতে লাগলাম।
রাস্তা বলে কিছু নেই। শুধু লুজ বোল্ডার। অনেকটা এগিয়ে ডান দিকে ফাটিং হিমবাহ দেখা গেল। তার শেষপ্রান্তে খাড়া উঠে গাছে থালায়সাগরের দেওয়াল। ফাটিং হিমবাহের সমান্তরালে আর একটা মোরেন রিজ নেমে এসে ভিলঙ্গনার সামনে থেকে চৌকির দিকে ধনুকের মত বাঁক নিয়েছে। ওখানেই লুকিয়ে আছে তাম্বাকুণ্ড। ওই রিজের উৎস যেখানে সেখান থেকে সাতলিং হিমবাহ শুরু হয়েছে। ফাটিং হিমবাহের বাম পাশ দিয়ে আর একটা বড় কালো পাহাড় থালায়সাগরকে ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। ওটা রুদুগয়রা। তার পাশে আরও পশ্চিমে শ্বেতশুভ্র রতনভিয়ান উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। একসময় সূর্য ঢেকে গেল বাম দিকের পাহাড়ের ঢালে। ঘড়িতে ২টোর কাছাকাছি। জিপিএস বলছে, এখনও দেড় কিলোমিটার জিরো পয়েন্ট। শরীর আর দিচ্ছে না। কাঁধগুলো যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ছে। ক্রমেই গুটি গুটি পায়ে তিনটের সময় এসে পৌঁছলাম খাটলিং জিরো পয়েন্ট। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল প্রবল হিমেল হাওয়া। যাহোক করে তাঁবু লাগিয়ে আগে গরমের পোশাক বের করে পরা হল। তারপর গরম চায়ে চুমুক দিয়ে দেখতে লাগলাম প্রকৃতির শোভা।
১৬ অক্টোবর, ২০২১
সকাল ৬টা। সূর্যের আলোর লেশমাত্র নেই। এই ফাঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী ক্রস করে ফেলতে হবে। সেইমত ৭টার মধ্যে প্রস্তুত হয়ে নেমে পড়লাম ভিলঙ্গনার বালুতটে। আশপাশে জল জমে বরফ হয়ে আছে। অসাবধানে পা পড়লেই পেছলাচ্ছে। ছোট ছোট কয়েকটা ধারা লাফিয়ে পার হলাম। তারপর এসে দাঁড়ালাম মূল নদীর ধারে। রাজকুমার কয়েক পা নেমে হাঁটু অবধি ভিজিয়ে ঠান্ডায় কুঁকড়ে আবার ফিরে এল। ভয়ংকর শীতল বরফগলা জল বইছে নদীতে। যা হোক করে পার করতেই হবে আমাদের। আর না হলে ফিরে যেতে হবে, কোনও উপায় নেই। অগত্যা জুতো খুলে হাফ প্যান্ট পরে নিলাম। তারপর সবাই হাতে হাত দিয়ে একটা চেন বানিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়লাম এককোমর বরফগলা জলে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল হাজার হাজার ছুচ একসঙ্গে বিঁধল শরীরের চামড়া ভেদ করে। সনৎ আর বিপ্লব প্রচণ্ড আর্তনাদ করে উঠল। সারা শরীরে আর কোনও সাড় রইল না। ওরা একরকম হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল আমাদের। প্রায় ৩ মিনিট ওই ঠান্ডাজলে ভিলঙ্গনার সঙ্গে লড়াই করে এক এক করে সবাইকে ওপারে পৌঁছে দিল ওরা।
আধ ঘণ্টা এখানে বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু। ঘণ্টাখানেক পর এসে পৌঁছলাম প্রপার চৌকিতে। হাতে এখনও অনেক সময় আছে। সূর্য এখন মাঝগগনে। এখানে একটুও সময় নষ্ট না করে বাম দিকে মোড় নিয়ে আমরা উঠে গেলাম দুধগঙ্গা ভ্যালির দক্ষিণ গাত্র ধরে। পথে পেরতে হল দুধগঙ্গার বিশাল রিভার বেল্ট। মাঝে দুধগঙ্গা নালার কয়েকটা ধারাও লাফিয়ে লাফিয়ে পার হতে হল। মাসার তালের দিকে খানিকটা উঠে একটা ছোট্ট বুগিয়ালের মত জায়গা পাওয়া গেল। এই জায়গাটা হল আপার চৌকি। এখানেই পড়ল আজকের ক্যাম্প। দুপুর একটার মধ্যে ক্যাম্প করে ফেলেছি। হাতে সারাদিন সময়। আবার উদোম খোলা নীল আকাশের নীচে শয্যা নিয়েছি। মাথার উপর উজ্জ্বল গাঢ় নীল রঙের শামিয়ানা। মাঝ আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে বলাকার দল। গন্তব্য কোনও গহীন হিমালয়ের তেপান্তরের মাঠ। বহু দূরে পশ্চিমে খাটলিং জিরো পয়েন্ট দেখা যাচ্ছে। তার ওপরের অনামা পিকগুলোর পিছনে যোগিন ৩ উঁকি দিচ্ছে। অনামা পিকগুলো থেকে ঝুলন্ত হিমবাহগুলো এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটা আলোছায়া মাখা রহস্যময় বিশালাকায় স্নো ফিল্ড দেখা যাচ্ছে ঠিক রতনভিয়ান আইস ফল-এর উপরে। তার ডান পাশে কালো পাথরের পাহাড় রুদুগয়রার আপাদমস্তক এখন খুলে গেছে। তার ডান দিকে ফাটিং হিমবাহ আর বুক চিতিয়ে থাকা গর্বোদ্যত থালায়সাগর। নির্মেঘ আকাশে প্রকৃতি যেন ঢেলে দিয়েছে।
১৭ অক্টোবর, ২০২১
পর্বতারোহণের ইতিহাসে একটা কালো দিন। লামখাগা-কানাকাটায় প্রকৃতির রোষে বলি হয়েছে কিছু তরতাজা প্রাণ। অথচ আমরা এসব কিছুই জানি না তখন। সকালে উঠে দেখলাম আকাশের মুখভার। বৃষ্টি কমেছে। ভাবলাম বেলা হলে মেঘও কেটে যাবে। তাই ৮টা নাগাদ ক্যাম্প গুটিয়ে পাড়ি দিলাম মাসার তালের উদ্দেশে। পথে এ রুটের ভয়ংকর চড়াই পার হতে হবে আজ। কষ্টও হবে খুব। শরীরে আস্তে আস্তে শক্তি কমে আসছে। টানা চড়াই চড়তে চড়তে বার বার ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ছি। ঘণ্টা দুয়েক ওইভাবে চড়াই চড়তে চড়তে অনেক উঁচুতে উঠে গেছি তখন। সামনে একটা বিশাল পাহাড়ের দেওয়াল দেখা গেল। এটা মাসারের পথের শেষ চড়াই। এটা ক্রস করে ফেলতে পারলেই ওপারে মাসার তাল। ঘড়িতে ঠিক দশটা কী সাড়ে দশটা হবে। আচমকা বৃষ্টি শুরু হল ঝমঝমিয়ে। আমরা পাহাড়ের ঢালে মাঝপথে দিশাহারা হয়ে পড়লাম। কিছু দূরে একটা পাথরের ওভারহ্যাং দেখে দৌড়ে গিয়ে তার নীচে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু বৃষ্টি একনাগাড়ে পড়েই চলল। এক সময় বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিতে লাগল ওভারহ্যাং-এর নিচেটা। এখানে আর বসে থাকা যায় না।
তাঁবু থেকে ক্রমাগত জল লিক করতে লাগল এবার। আমার কাছে একটা বড় রেন পঞ্চু আর কিছু প্লাস্টিক ছিল। সেগুলো দিয়ে তাঁবুর ওপরটা যাহোক করে তাপ্পিও দেওয়া হল। এইভাবে অনেকক্ষণ কাটল। ইতিমধ্যে বৃষ্টি কমে গিয়ে আর একটা নতুন জিনিস শুরু হয়েছে। আর সেটা হল তুষারপাত। প্রবল তুষারপাতের মধ্যে ফেঁসে গেলাম আমরা। মিনিট পনেরোর মধ্যে গোটা ভ্যালিটা ঢেকে দিল তুষারের চাদরে। বাইরের আকাশ ঘন কালো। অবস্থা মন্দ নয়। আবার একদিন লেট হল রুট প্ল্যানে। সারাদিনটা আমাদের ওইভাবেই কাটল। সারাদিন রান্না হল না তাঁবুতে। সবাই খুব চিন্তাগ্রস্ত। এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছে। তার সঙ্গে অঝোরধারায় নুয়ে পড়ছে প্রকৃতি। বেড়েই চলেছে তুষারপাত। কী এমন হল যে অক্টোবরের মাঝখানে এমন ভরা দুর্যোগ। একেবারে অপ্রত্যাশিত। তখনও বুঝিনি আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করে আছে। যদি বুঝতাম তবে তো নিচেই কাটাতাম।
১৮ অক্টোবর, ২০২১
বাইরে ভোর না সকাল সেটা দেখে বোঝার উপায় নেই। চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে। অবিরাম তুষারপাত চলছে তো চলছেই। একটা মুহূর্তও থামে না। চারিদিকে হাঁটুর নীচে বরফ। তাঁবুর ভিতর জল লিক করে ভিজে ঢোল। স্লিপিং ব্যাগ, স্যাক সব কিছু আধভেজা হয়ে গেছে। কী কষ্ট! তাঁবুর ভিতর আমরা তিনজন গোল হয়ে বসে মাথা নিচু করে গভীর চিন্তায় ডুবে আছি। না পারছি উঠতে, না পারছি নামতে— এমন একটা অবস্থায় ফেঁসে বসে আছি। পিছনের চেন খুলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় দেখছি পিছনের পাহাড়টা। মনোযোগ আমার ওদিকে। কতটা বরফ জমছে সেটা বার বার খেয়াল রাখছি। এই বুঝি ঝরে নেমে এল রাশি রাশি বরফের পাহাড়! উফ! বড্ড চিন্তা হচ্ছে! কীভাবে এর থেকে মুক্তি পাব! সকাল থেকে পেটে দানা পড়েনি। সকালে একবার চা আর দুপুরে এক কাপ সুপ খেয়ে আছি। আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে আবার সন্ধে নামল।
শিবুদা দুটো করে রুটি আর সবজি দিয়ে গেল দিনের শেষে। আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে গেল ‘স্যার উপার যানে সে হাম সব মর যায়েঙ্গে। উপার এক আদমি বরফ হ্যায়। তুরন্ত নিচে যানা হ্যায় স্যার। সব কুছ ভিগ গায়া অন্দর। হাম কাল রাত সো নেহি পায়ে। পুরা রাত ব্যায়েঠকে কাটা দিয়া। হাম সব মর জায়েঙ্গে স্যার। কোয়ি লটেগা নেহি আগার ইহা রহে তো।’ এই কথাগুলো আরও ভাবিয়ে তুলল আমাকে। সত্যি সবাই ফিরতে পারব তো! যদি একজন কেউ না ফিরি! বা আমার দলের গাইড, পোর্টারভাইদের যদি কোনও ক্ষতি হয়! কী উত্তর দেব বাড়িতে! কী উত্তর দেব মানুষকে! বা আদৌ উত্তর দিতে ফিরব তো কোনওদিন! উফ আর ভাবতে পারছি না এসব। আমার এক মাসের বাচ্চা, তার মুখটা বড্ড মনে পড়ছে! আমার নিষ্পাপ পুপু সোনা! আর সুলেখা! আমার স্ত্রী! আমায় বার বার বলেছিল এবার না যেতে। কত ঝগড়া করেছি। মা-বাবার কথা ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে। ইস! এসব করে মানুষকে কাঁদিয়ে কেন এলাম! হায় গুরুজি! এবারটা ফিরিয়ে দাও! এটাই শেষবার! আর কোনওদিন এভাবে আসব না! কাতর প্রার্থনা করে চললাম সারা রাত।
আমার গুরুজি শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ মহারাজ এই হিমালয়ের যোগী ছিলেন। এই হিমালয়ের অন্দর কন্দর তার তপোভূমি। এখানে নিশ্চয়ই মহারাজ সূক্ষ্ম দেহে সর্বত্র ঘুরে বেড়ান। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রার্থনা শুনবেন। এসবের মধ্যে আবার ডান দিক থেকে ঘন ঘন তুষারধসের শব্দ ভেসে আসছে। কোথায় ঝরছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না অন্ধকারে। খুব ভয় লাগছে। বার বার পিছনের চেন খুলে হেড টর্চ মেরে মেরে দেখছি পিছনের দেওয়ালটা। এই না ঝরে নেমে আসে। সেদিনও সারা রাত এইভাবে ঘুমতে পারলাম না। এবার খাদ্যভাণ্ডারে টান পড়ছে। এভাবে চলবে আর কতদিন। কয়েক দিন এভাবে চলতে থাকলে খাবার শেষ হয়ে যাবে। খাব কী!
১৯ অক্টোবর, ২০২১
এ ক’দিনে হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা অধিক উচ্চতার পর্বতারোহী দলগুলো তছনছ হয়ে গেছে। কতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে। গোটা হিমালয় জুড়ে প্রবল দুর্যোগ। গোটা উত্তরাখণ্ড বন্যায় ভেসে গেছে। কেদারনাথে কয়েক হাজার যাত্রী আটকে। এসব আমরা কিছুই জানি না। ভাগ্যিস আমরা মায়ালী ক্রস করে কেদারনাথ গিয়ে পড়িনি। তাই সমূহ বিপদ থেকে এবারের মত বেঁচে গেলাম। নইলে আর হয়তো ফেরা হত না। সকাল থেকে হঠাৎ দেখি তুষারপাত বন্ধ হয়ে গিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। টানা বৃষ্টিতে তুষার কিছুটা কমতে শুরু করল। আজ তৃতীয় দিন এখানে আটকে আছি। বেলা দশটা নাগাদ মনে হল বৃষ্টি কমছে। সাড়ে দশটায় আচমকাই তিন দিনের টানা বৃষ্টি বন্ধ হল একবার। তখনও আকাশ কালো হয়ে আছে। বিপিন বলল, এই সুযোগ, চলো নেমে যাই।
আমরাও নামার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। বেলা এগারোটার মধ্যে লোটাকম্বল গুটিয়ে নামতে শুরু করলাম। নামা বললেই তো আর নেমে আসা যায় না। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। গোটা রাস্তায় প্রচুর বরফ। প্রচণ্ড স্লিপ করতে লাগল। বার বার আছাড় খেতে খেতে বরফের ঢাল ধরে গ্রিপ করে করে নামতে লাগলাম। বেলা দুটোর সময় নেমে এলাম চৌকি-তে। ততক্ষণে পশ্চিম দিকে মেঘের ফোঁকর থেকে একফালি নীল আকাশ দেখা দিয়েছে। দুর্যোগের কালো মেঘ কাটছে। এবারটা সত্যি তাহলে প্রাণে বেঁচে গেলাম। অশেষ ধন্যবাদ তোমাকে প্রকৃতি। ধন্যবাদ তোমাকেও গুরুজি, আমাকে ক্ষমা করার জন্য।
বাড়ির লোকের কাছে আমরা চারদিন নিখোঁজ। কী ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে পরিবারের লোকজন তা ভেবেই খুব চিন্তা হচ্ছে। দুর্যোগের পর গাঙ্গী অবধি গোটা রাস্তাটা কী অবস্থায় সেটাও জানা নেই। অনেক ধস নেমেছে হয়তো। এবার নিরাপদে লোকালয়ে ফিরে যেতে হবে। আমরা যে রাস্তা দিয়ে এসেছি সেই রাস্তাতেই ফিরব। চৌকি থেকে আরও এগিয়ে চললাম। সারাদিন হেঁটে তাম্বাকুণ্ডের কাছে পড়ল আজকের ক্যাম্প। এখন সবাই অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছি। সন্ধের দিকে আকাশ একেবারে পরিষ্কার হয়ে তারারা বেরিয়ে পড়ল। শুধু তুষারে ঢেকে রইল ফেলে আসা দুধগঙ্গা ভ্যালি। স্মৃতির পাতায় কালো ছাপ ফেলে মনের মণিকোঠায় সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল ভয়ংকর দুর্যোগের প্রহরগুলি।
তারপর লম্বা লম্বা পথ হেঁটে দুই দিন ধরে নামতে নামতে এসে পৌঁছলাম গাঙ্গী গ্রামে। তাহলে আমরা বিপন্মুক্ত এ যাত্রায়। সে রাতে ঘুট্টু পৌঁছে জানতে পারলাম সব কিছু তছনছ হয়ে গেছে। লামখাগা-কানাকাটা পাসে মারা গিয়েছেন বাংলার অনেক অভিযাত্রী। কেদারনাথে সেনা নামানো হয়েছে। আমরা ৪ দিন ধরে যোগাযোগহীন। বাড়িতে সবাই ধরে নিয়েছে খারাপ খবর। কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সকলে। খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ক’টা দিন। মনোজ উত্তরকাশী থেকে হেলিকপ্টার পাঠানোর বন্দোবস্তও করে ফেলেছিল। আমাদের রেসকিউ করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। অথচ এত কিছু ঘটে গেছে তার কিছুই টের পাইনি। অবশেষে পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ। সব ক’টা পরিবারকে ভীষণ নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে এই অভিযান। পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পাহাড়ের আর পা না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জানি না তা সত্যিই কতদূর সম্ভব? কারণ, আমার জীবনের দুই শ্রেষ্ঠতম আশ্রয়, পরিবার আর পাহাড়।
চিত্র: লেখক
কেমন কেটেছে তুষারপাতের প্রহরগুলি? দেখুন ভিডিও-তে।