Site icon BhaloBhasa

ফ্লেমিঙ্গো কথা

গ্রেট ফ্লেমিঙ্গো। ‘Flamingo’, এই শব্দটা এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘Flamengo’ থেকে, অর্থাৎ flame colored… আগুন রঙা।

হ্যাঁ… উজ্জ্বল আকর্ষণীয় লালচে গোলাপি রঙের পালক আর কমনীয় লম্বা গলা, অতীব লম্বা পা, লোকালয় থেকে দূরে নির্জন এলাকায় অগভীর জলের ধারে দলবদ্ধভাবে বাস… সব মিলে পক্ষীকূলে যেন এক স্বতন্ত্র অভিজাত পরিবার। এরা সবসময় বিশাল দলে, কয়েক হাজার পাখি একত্রে বাস করে। এরা strictly একগামী (monogamous)। পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, এক জোড়া পুরুষ ও স্ত্রী ফ্লেমিঙ্গো সারা জীবন (এদের গড় আয়ু ২০-৩০ বছর) একসঙ্গে থাকে। এরা একসঙ্গে বাসা বানায়। স্ত্রী ফ্লেমিঙ্গো ডিম পাড়বার পরে মা পাখি আর বাবা পাখি দুজনেই ভাগাভাগি করে সমানভাবে ডিমে তা দেয়। এরপর ডিম ফুটে বাচ্চার জন্মের পরও যতদিন পর্যন্ত বাচ্চারা স্বাবলম্বী না হয়, মা ও বাবা ফ্লেমিঙ্গো সমানভাবে তাদের বাচ্চাদের পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।

ফ্লেমিঙ্গোর পালকের আকর্ষণীয় উজ্জ্বল গোলাপি রং… এ কিন্তু জন্মসূত্রে পাওয়া অথবা কোনও জিনগত কারণের ফলে নয়। বস্তুত সদ্যোজাত ফ্লেমিঙ্গো শিশুর গায়ের রং থাকে ধূসর (dull grey)। এরপর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রঙের পরিবর্তন হতে থাকে। কীভাবে? এই রং পরিবর্তনের কারণ হল ফ্লেমিঙ্গোদের খাদ্যাভ্যাস। এই যে উজ্জ্বল গোলাপি রং… এর উৎস হল বিটা ক্যারোটিন নামে একটি রাসায়নিক যৌগ। এই বিটা ক্যারোটিন যৌগ হল কমলা রঙের একটি পিগমেন্ট।

পালকের উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ব্যাপারেও এরা খুব সচেতন এবং যত্নশীল।

ফ্লেমিঙ্গো পরিযায়ী পাখি নয়। এরা মোটামুটি স্থায়ীভাবে বাস করে সমুদ্রের কাছাকাছি নোনাজলের হ্রদ বা উপহ্রদ (lagoon) সংলগ্ন জলাভূমি অথবা সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থিত ম্যানগ্রোভ জলাভূমিতে। আর এইরকম জলাভূমির অগভীর নোনাজলে থাকা প্রচুর পরিমাণ কুচো চিংড়ি (brine shrinps), বিশেষ ধরনের অ্যালগি, মশার লার্ভা ও নানা রকমের জলজ পোকা… যা হল ফ্লেমিঙ্গোদের অতি প্রিয় খাদ্য।

নোনাজলে থাকা এই চিংড়ি, পোকামাকড় আর অ্যালগিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যারোটিন থাকে, যা ফ্লেমিঙ্গোর পাকস্থলিতে প্রবেশ করে। পাকস্থলিতে পরিপাক প্রক্রিয়ার সময় একটি বিশেষ এনজাইম, bita-carotine oxygenase1 (BCO1) ক্যারোটিনকে ভেঙে ফেলে… কমলা/ লালচে গোলাপি রঙের এক পিগমেন্ট তৈরি করে। এই পিগমেন্ট লিভারে থাকা ফ্যাট দ্বারা শোষিত হয় এবং পরবর্তী ধাপে এই ক্যারোটিনয়েড পিগমেন্ট ফ্লেমিঙ্গোর দেহের চামড়া (skin) ও পালকে জমা (deposited) হয়। এভাবেই বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লেমিঙ্গোর দেহ আর পালকের রং ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।

মিলনের ঋতুতে ফ্লেমিঙ্গোরা তাদের সুন্দর উজ্জ্বল কমলা-গোলাপি পালক প্রদর্শন করে সঙ্গী/ সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করে।

এবার আসি ফ্লেমিঙ্গোর রূপচর্চা প্রসঙ্গে। পাখির আবার রূপচর্চা? হাঁ ঠিকই পড়ছেন। ফ্লেমিঙ্গো পাখিরা, তাদের পালকে জমে থাকা নানান অবাঞ্ছিত প্যারাসাইট আর ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করে তাদের বিশেষ ধরনের লম্বা ঠোঁটের সাহায্যে। এছাড়াও এদের পালকের উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ব্যাপারেও এরা খুব সচেতন এবং যত্নশীল (sensitive & caring)। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ফ্লেমিঙ্গোর পালকের ক্যারোটিনয়েড যৌগগুলি খুব ধীরে ধীরে ভেঙে (slow decomposition) যেতে থাকে। এর ফলে পালকের রঙিন ঔজ্জ্বল্য কমতে থাকে। তবে এই ব্যাপারেও ফ্লেমিঙ্গোরা যথেষ্ট সচেতন। সম্প্রতি Ecology and Evolution Journal, October সংখ্যায় একদল গবেষক-বিজ্ঞানী এমনই এক পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন।

ফ্লেমিঙ্গো তার পালকের সাহায্যে শুধুই যে উড়তে পারে তা নয়, ঘন পালক তার দেহকে শুষ্ক রাখতে সাহায্য করে। আর এই উজ্জ্বল ঘন রঙিন পালকের আরও একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। মিলনের ঋতুতে (mating season) ফ্লেমিঙ্গোরা তাদের সুন্দর উজ্জ্বল কমলা-গোলাপি পালক প্রদর্শন করে সঙ্গী/ সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করে।

মিলনের ঋতুতে পালকের রঙিন উজ্জ্বলতা বাড়াতে ফ্লেমিঙ্গো তার গাল ঘষতে থাকে তার সারা দেহের পালকের ওপরে।

গবেষকরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করেছেন… আসন্ন মিলনের ঋতুতে পালকের রঙিন উজ্জ্বলতা বাড়াতে ফ্লেমিঙ্গো তার গাল ঘষতে থাকে তার সারা দেহের পালকের ওপরে। এর ফলে পাখির গালে অবস্থিত ইউরোপিজিয়াল গ্ল্যান্ড (uropygial gland) থেকে একরকমের রঙিন সিরাম (serum) নিঃসৃত হয়। এরপর ফ্লেমিঙ্গো তার লম্বা গলা দিয়ে বুলিয়ে বুলিয়ে নিঃসৃত সিরামকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয় পালকে আবৃত তার সারা দেহে। আর এভাবেই উজ্জ্বল রঙিন পালকে সজ্জিত হয়ে মিলনসঙ্গীকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে নিজেকে প্রস্তুত করে ফ্লেমিঙ্গো।

ফ্লেমিঙ্গোর এই যে সজ্জা পর্ব… এ কিন্তু শুধুমাত্র তাদের মিলন ঋতুতেই (mating season) চলে। পছন্দমত সঙ্গী নির্বাচন, মিলন, প্রজনন, প্রসব ও তার পরে পক্ষীশাবকের রক্ষণাবেক্ষণ… এই দীর্ঘ সময়কাল কিন্তু ফ্লেমিঙ্গো পুরুষ ও স্ত্রী… উভয়েই নিজেদেরকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত রাখে সন্তান প্রতিপালনে।

পুরুষ ও স্ত্রী ফ্লেমিঙ্গো সারা জীবন (এদের গড় আয়ু ২০-৩০ বছর) একসঙ্গে থাকে।

গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এই সময়ে এদের ইউরোপিজিয়াল গ্ল্যান্ড নিঃসৃত সিরামে ক্যারোটিনয়েড যৌগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। আর পরবর্তী মিলন ঋতুর ঠিক আগে ছাড়া মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ে আর একবারও তারা রূপচর্চার জন্য সিরাম নিঃসৃত করে না। এই সময় এরা তাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে তাদের সন্তান প্রতিপালনে।

প্রকৃতির বুকে নির্জনে নিরালায় এভাবেই সুন্দর নিয়ম নিগড়ে বাঁধা ফ্লেমিঙ্গোদের জীবনচক্র আবর্তিত হয়ে চলেছে কোন সেই সুদূর অতীত হতে!

Ref.: Ecology and Evolution. Vol.11, October 2021, p- 13773. doi: 10.1002/ece 3.8041.

চিত্র: গুগল