আইসল্যান্ড— নামেই আভাস এক অনির্দেশ্য শীতলতার, যদিও তার জন্মের গর্ভস্থানটি অকল্পনীয় উষ্ণতায় মোড়া। এখন থেকে আড়াই কোটি বছর আগে, আজকের আটলান্টিক মহাসাগরের ভূমিতলে উত্তরে গ্রিনল্যান্ড থেকে দক্ষিণে বোভেট আইল্যান্ড অব্দি বিস্তৃত ৪০০০০ মাইল লম্বা মিড-আটলান্টিক রিজ নামের শৈলশিরার কয়েক হাজার বছরব্যাপী উপর্যুপরি বিস্ফোরণ পৃথিবীর জঠর থেকে উগরে দিয়েছিল কয়েক কোটি টন সুপারহিটেড লাভা। বরফঠান্ডা আটলান্টিকের জল তাপ কমিয়েছিল লাভার, স্তরে স্তরে জমে জমে কোথাও সমুদ্রের জলতলের ওপর মাথা তুলে দ্বীপের আদলে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সে। জল আর আগুনের লড়াইয়ে আপাত পরাস্ত ঠান্ডা ভূস্তর কিন্তু তার পেটের ভেতর পুরে রেখেছিল সেই আগুনে বিদ্রোহের গান। পরবর্তী সময়কাল ধরে আজ অব্দি মাঝে মাঝেই পাহাড়ফাটানো আগুনে নদীর স্রোত, আর উষ্ণপ্রস্রবণ-নির্গত বাষ্পের শব্দে সে গানের সুর বেজে চলেছে। ৬৪ ডিগ্রি উত্তর আর ১৯ ডিগ্রি পশ্চিম অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশে মাথা তুলে থাকা এমনিই এক ভূভাগের আজকের নাম আইসল্যান্ড— দ্য ল্যান্ড অফ আইস অ্যান্ড ফায়ার।
মজার কথা, এই যে প্রি-হিস্টোরিক তো দূরস্থান, এত প্রাচীন স্থলভূমি স্পর্শ করেনি কোনও প্যালিওলিথিক, মেসোলিথিক বা আদি নিওলিথিক মানুষের পা। জনমনিষ্যি শূন্য এ দ্বীপে মানুষের প্রথম পদার্পণ আজ থেকে মোটামুটি এগারশো বছর আগে।
গল্পের শুরু দ্বীপের অনেকটা পূর্বদিকে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তর আটলান্টিক সাগর পেরিয়ে ইউরোপের উত্তরদিকের দেশ নরওয়েতে। সময়টা নবম শতাব্দীর শেষভাগ। রাজার মৃত্যুতে সিংহাসনে বসেছেন তাঁর দশ বছরের বালক পুত্র হ্যারাল্ড। রাজ অভিভাবক তার কাকা গুথারম। পরবর্তী দুবছর সময়ে প্রায় অতিমানবিক তৎপরতায় সেই বালক শিখে ফেলেছে রাজ্য পরিচালনার খুঁটিনাটি। তার কাজে দেখা যাচ্ছে এক কিংবদন্তি রাজা হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি। এর কয়েক বছর পরে যৌবনের আগমনে তার প্রয়োজন হল এক সঙ্গিনীর। কানে এসেছে পার্শ্ববর্তী তালুকের রাজকন্যা গাইদা-র কথা। ঠিক স্ত্রী নয়, নর্মসখীর মর্যাদা দিয়ে তাকে পেতে চান হ্যারাল্ড। সেই প্রস্তাব দিয়ে দূত পাঠালেন রাজা। চালে ভুল হল তাঁর। প্রখর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়ে গাইদা জানিয়ে দিলেন, উপপত্নী নয়, একমাত্র স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে যে পুরুষ তাকে আহ্বান করবে, সেই শুধু তাঁকে পাবার অধিকারী। তাচ্ছিল্যভরে আরও যোগ করলেন যে, একটা খণ্ডরাজ্য নয়, সম্পূর্ণ নরওয়ে যেদিন তাঁর পায়ের কাছে বিছিয়ে দেবেন হ্যারাল্ড, তার পরের পূর্ণিমায় বসবে তাঁদের বিবাহবাসর। দূত মুখে হ্যারাল্ড শুনলেন একথা। তাঁর মুখ কঠিন হল। দরবারের সকলে যখন তাঁর কাছ থেকে ওই তালুক আক্রমণ আর গাইদাকে ধর্ষণ করার আদেশের অপেক্ষা করছে, তখন হ্যারাল্ড দৃষ্টি ফেরালেন নিজের দিকে। সমগ্র নরওয়ের তুলনায় নিজের রাজ্যটি সেই মুহূর্তে খুব অকিঞ্চিৎকর লাগল তাঁর। গাইদার এ শর্ত তাঁর কাছে দৈববাণীর মত শোনাল। তিনি উপলব্ধি করলেন, শুধু একটা অঙ্গরাজ্য নয়, সমগ্র নরওয়ের রাজা হবার জন্যই তাঁর জন্ম। তাঁর এ কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য গাইদাকে মনে মনে কুর্নিশ জানালেন। আর সভাসদদের সামনে ঘোষণা করলেন, যতদিন না এ লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে, তিনি চুলে চিরুনি স্পর্শ করবেন না।
শুরু হল তাঁর নরওয়ের বাকি অঙ্গরাজ্য জয়ের অভিযান। উত্তরের রাজারা হ্যারাল্ডের পরাক্রমের কাছে নতিস্বীকার করলেন। অনেকেই সম্মুখসমরে নিহত হলেন। কেউ কেউ শান্তি কিনলেন তাঁদের রাজ্য আর কন্যাদের উপহার দিয়ে। আরও স্বাভিমানী কিছু রাজা তাঁদের রাজ্য সমর্পণ করলেন বটে, কিন্তু অস্বীকার করলেন তাঁর অধীনে বসবাস করতে। ধিক্কারে দেশত্যাগ করে তাঁরা তাঁদের সঙ্গীসহ সমুদ্রে পাড়ি দিলেন অজানা দেশের উদ্দেশে। উত্তর জয় করে হ্যারাল্ড ফিরলেন পশ্চিম তটের রাজ্যগুলোর দিকে। সেখানেও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। ফলশ্রুতিস্বরূপ বিজিত রাজ্যের সঙ্গে আজ তাঁর সংগ্রহে আট উপপত্নীর হারেম। শেষে সমস্ত নরওয়ে জয় করে একমাত্র অবশিষ্ট সেই রাজ্যে এসে পৌঁছলেন যার অধিপতির নাম এরিক আর রাজকন্যার নাম গাইদা। হ্যারাল্ড নিজ হাতে হত্যা করলেন রাজা এরিককে। তারপর স্নান করে আজ দশ বছর পর চিরুনি চালালেন নিজের চুলে। সেদিন থেকে ইতিহাস তাঁকে চিনল Harald Fairhair বলে। সুকেশ, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুবক হ্যারাল্ড এরপর রাজসভায় গিয়ে গাইদার পাণিপ্রার্থনা করলেন। পরাজিত নিহত রাজার কন্যার নির্বাচনের স্বাধীনতা থাকে না। গাইদা বাধ্য হলেন নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে আট উপপত্নীর সঙ্গে হ্যারাল্ডকে বাঁটোয়ারা করে নিতে। গাইদা আর হ্যারাল্ডের বিবাহিত জীবন এরপর কোন খাতে বয়েছিল, তা আর আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। আমরা বরং চোখ ফেরাব সেইসব দেশছাড়া মানুষগুলোর দিকে যাদের হাতে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়— the Viking age of expansion.
প্রলয়ঙ্কর ঝড় যদি বনভূমি উজাড় করে দেয়, তবে সেই নিঃস্ব রিক্ত ভূখণ্ডই রচনা করে নতুন অঙ্কুরোদ্গমের পরিসর। দশদিক ভাসিয়ে বন্যার জল পলি লেপে দেয় মাটির গায়ে, তাতে প্রাণ পায় নতুন ধানের চারা। সীমানা বৃদ্ধির অঙ্গীকারে বদ্ধ রাজা যে দশ বছরব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞের অবতারণা করলেন, ইতিহাসের নিয়মেই তাতে লুকিয়ে থাকল সৃষ্টির বীজ। দেখা গেল, শুধু কয়েকজন রাজা নয়, নরওয়ের অনেক সাধারণ মানুষও হ্যারাল্ডকে রাজা হিসেবে মানতে অস্বীকার করলেন। তাঁর অধীনে থাকার চেয়ে দেশত্যাগ তাঁদের কাছে শ্রেয় মনে হল। ততদিনে নরওয়ের মানুষ তৈরি করে ফেলেছেন দূর সমুদ্রযাত্রার উপযোগী সেই বিরাটকায় নৌকো, নৌবিদ্যার ছাত্ররা যাকে নৌ-কারিগরিবিদ্যার বিস্ময় বলে মেনেছে। তার নাম লং-শিপ। আর এই লং-শিপে চড়ে কিছু মানুষ পৌঁছেছেন আয়ারল্যান্ডে, ইংল্যান্ডে বা স্কটল্যান্ডে। কেউ কেউ নোঙ্গর ফেলেছেন শ্বেটল্যান্ড দ্বীপ বা ফ্যারাও আইল্যান্ডে। হ্যারাল্ডের রাজ্যবিস্তারের প্রক্রিয়ায় একঝাঁক মানুষ যোগ দিলেন এই দলে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দূরদেশে পাড়ি দেওয়া স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সেই মানুষেরা, ইতিহাসে যাঁরা পরিচিত হলেন ভাইকিং নামে, তাঁদের হাত ধরে উত্তর আটলান্টিক সাগর সংলগ্ন স্থলভাগে শুরু হল ঔপনিবেশিক বিস্তারের এক নতুন উপাখ্যান। অসমসাহসী এই মানুষগুলি আকৃতিতে ইউরোপের অন্য দেশের মানুষের থেকে অনেক বড়সড়, প্রকৃতিতেও অনেক দুর্দান্ত। একটা অমার্জিত বন্যতায় অন্যদের তাচ্ছিল্য করা, তাদের সমাজ-সংসারকে তছনছ করাতেই যেন তাদের আনন্দ। ইতিহাসের পাতায় হার্মাদ জলদস্যুদের সঙ্গে তাদের প্রায় একাসনে অবস্থান। কিন্তু এই একতরফা মূল্যায়নে মিথ্যের ভেজাল আছে। কারণ নতুন দেশ অধিকার করতে গিয়ে তাদের আবিষ্কার করার কাজটাও তাঁরাই করেছেন। শুধু লুন্ঠন নয়, নতুন মানুষদের সঙ্গে বাণিজ্য-সম্পর্ক তৈরি করেছেন তাঁরা, তাদের সামাজিক রীতিকে আত্মস্থ করে জন্ম দিয়েছেন নতুন সামাজিক সমীকরণের। তাই ‘…they were settlers as well as invaders, explorers as well as plunderers, merchants as well as conquerors, creators as well as destroyers.’
দুই তুতো ভাই ইঙ্গলফ আর লিয়েফও ছিলেন ওইরকম এক দলে। তবে তফাৎ এই, যে তাঁরা পাড়ি দিয়েছিলেন এতাবৎ অধিকৃত দেশের সীমা ছাড়িয়ে আরও অনেক দূরের এক নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের উদ্দেশে। তাঁদের পুরো নাম ইঙ্গলফ অ্যানারসন আর লিয়েফ রডমারসন। আর সেই ভূখণ্ড, যা ভবিষ্যতে আইসল্যান্ড নামে পরিচিত হবে, তাতে বসবাসের নির্দিষ্ট অভিপ্রায় নিয়ে এই প্রথম নরওয়ে থেকে কারুর পাড়ি দেওয়া। পরিচিতির সূত্র এই, যে এর আগে বেশ ক’বার সমুদ্রঝড়ে বেপথু নরওয়েজিয়ান জাহাজ তার বেলাভূমিতে এসে পড়েছিল। তার নাবিকেরা কিছু কঠিন সময় ব্যয় করে বেঁচে দেশে ফিরেছিল। ৮৬০ খ্রিস্টাব্দের এদিক-ওদিকে ঘটা সেই ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্ত এবং কখনও কখনও পরস্পরবিরোধী বিবরণ রেখে গেছিলেন নাদোদ, গারদার বা র্যাভেন ফ্লোকি। সেই অকিঞ্চিৎকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিক্ষুব্ধ আটলান্টিকে সাতশো মাইল যাত্রা করে এঁরা পৌঁছলেন আইসল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে। জাহাজ থেকে দেখলেন অসংখ্য খাঁড়ি এসে মিশছে মোহানায়, বয়ে আনছে গ্লেসিয়ারের বরফশীতল জল। তাতে খেলে বেড়াচ্ছে সিলমাছের দল, তাদের মুখে ধরা রয়েছে কড আর স্যামন মাছ। মাথার ওপরে চক্কর কাটছে শ্বেতশুভ্র সিগালের দল, পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের খোঁদলে বাসা বেঁধে আছে নানা প্রজাতির পাখি। তাদের সমবেত ডাকাডাকির শব্দে পাওয়া যাচ্ছে প্রাণের অস্তিত্বের উচ্চকিত ঘোষণা। দুই অভিযাত্রীর মন এ জায়গার সঙ্গে মাতৃভূমির সাদৃশ্য দর্শনে পুলকে ভরে উঠল। মন বলল, বসতি স্থাপনের এই উপযুক্ত স্থান।
আসলে এই অভিযান ছিল একটা ‘রেইকি’ যাত্রা। তাঁরা এসেছিলেন এখানে অল্পদিন থেকে বুঝে নিতে, সপরিবারে কয়েকশো মানুষের বসবাসের উপযোগী কিনা এ জায়গা। নরওয়ের সঙ্গে প্রাথমিক মিলটুকু তাদের আশ্বস্ত করেছিল। তারপর শীতের কয়েকমাস এখানে তাদের সফল দিনাতিপাত আশ্বাসকে পরিণত করল বিশ্বাসে। দেশে ফিরে কয়েকমাস ধরে চলল প্রস্তুতির কাজ। এ প্রস্তুতি যেন সাপের খোলস ছাড়ার পর্ব। গায়ে এঁটে বসা নির্মোকে বাসা বাঁধা অতীতের কান্না ঘাম রক্ত, তার সংস্কার, তার ‘দিবারাত্রির কাব্য’, নির্মোক ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই পড়ে থাকবে এদেশের মাটিতে। ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে, সঙ্গে যাবে শুধু স্মৃতির সঞ্চয়। ঈশ্বরে বিশ্বাসী ইঙ্গলফের সঙ্গে যাবে আরও একটা জিনিস। প্রসঙ্গত, সে সময়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ নরওয়েবাসী ছিলেন ‘প্যাগানিজম’-এ বিশ্বাসী, ফলত একাধিক দেবতা তাঁদের কাছে ঈশ্বরের মর্যাদা পেতেন। সেই দলে ব্রহ্মার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন ‘থর’। সেই থরের মূর্তি খোদাই করা দুটি থাম ছিল ইঙ্গলফের বাড়ি। ইঙ্গলফ স্থির করলেন, সে দুটিকে জাহাজে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। নতুন দেশের খাঁড়ির মুখে পৌঁছে তাদের নিক্ষেপ করবেন জলে। তাতে ভেসে ভেসে যেখানে ডাঙা স্পর্শ করবে তারা, সেই জায়গায় স্থাপন হবে নতুন বসত। কথামত কাজ। নতুন দেশে পৌঁছে স্ত্রী পুত্র, আত্মীয়স্বজন, অনুচরে ভরা জাহাজ থেকে দুটি থামকে নিক্ষেপ করা হল খাঁড়ির মুখে। হিমবাহগলা জল তখন সবেগে বয়ে এসে মিশছে সাগরের জলে। সেই টানে থামদুটি পড়ল গিয়ে সাগরের জলে, তারপর পশ্চিমমুখী স্রোতের টানে পূর্বদিকের তট প্রদক্ষিণ করে দক্ষিণ উপকূল বেয়ে চলতে লাগল পশ্চিম তটরেখার দিকে। ইতিমধ্যে খাঁড়ির জলে বয়ে আসা বরফের ছোটবড় অসংখ্য টুকরো দেখে ইঙ্গলফ দ্বীপের নাম দিয়ে ফেলেছেন আইসল্যান্ড। তার দক্ষিণ বেলাভূমি ধরে কাঠের থামের পেছনে চলল জাহাজ। শেষে সাগরের স্রোতের গতির কাছে পরাজিত হয়ে ইঙ্গলফ ত্যাগ করলেন তাদের পশ্চাদ্ধাবন। দ্রুত দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল থামদুটি। কোথাও তারা ডাঙা ছুঁয়ে থাকবে, এই আশায় জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে স্থলপথে শুরু হল ইঙ্গলফের অনুসন্ধান। অবশেষে দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় সন্ধান পাওয়া গেল একটি খুঁটির। ঈশ্বরের নির্দেশ মেনে ইঙ্গলফ বসতি স্থাপন করলেন সেই বিন্দুতে। ভূতাত্বিক বিচারে অস্থির এ জায়গায় অসংখ্য ছোটবড় গিজার, তা থেকে নির্গত বাষ্পের প্রকোপে এখানকার বাতাস অস্বচ্ছ, সাদা ধোঁয়ায় ঢাকা তার মুখ। নরস ভাষায় ‘রেকিয়া’ বা ধোঁয়ায় ভরা, তাই ইঙ্গলফ তার নামকরণ করলেন রেকিয়াভিক। সেটা ৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ। পত্তন হল আজকের আইসল্যান্ডের রাজধানীর।
বাঁদিকের দুই পাঁজরের মধ্যবর্তী মাংসের দেওয়াল ভেদ করে আড়াই ইঞ্চি চওড়া ছুরির ফলাটা হৃৎপিণ্ড ফুটো করে দেবার আগের মুহূর্তে শরীরমনের অবশিষ্ট সমস্ত ক্ষমতা এক করে লিয়েফ শেষবারের মত চিৎকার করে বলেছিলেন— ‘ইঙ্গলফ, বাঁচাও’। অন্তিম অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে ওই মুখটাই তাঁর চেতনার আগাপাশতলা অধিকার করেছিল। আশ্চর্যের কথা এটাই যে, সে শব্দের অভিঘাত ঈথার তরঙ্গ বেয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ইঙ্গলফকে ঘিরে থাকা বাতাসের গায়ে। তিনি তখনও খুঁজে চলেছেন ভেসে যাওয়া থরের মূর্তি আঁকা খিলান। অশ্রুত শব্দসমষ্টি অনুরণন তুলেছিল তাঁর চেতনায়। এক দৈব নির্দেশ যেন তাঁর গতিপথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল ওই পাহাড়ের পাদদেশে, যেখানে মৃত্যুর কয়েকঘণ্টা পরেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন লিয়েফের দেহাবশেষ। যথোপযুক্ত মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করলেন ইঙ্গলফ, তারপর সামান্য অনুসন্ধানে খুঁজে পেয়ে গেলেন তাঁর আততায়ীদের। অতিরিক্ত সুরাপানের পরিণামে প্রায় চলৎশক্তিহীন দুষ্কৃতীর দলটিকে নিকেশ করতে কয়েক মুহূর্তই লাগল তাঁর। কিন্তু শোকপালন বা স্মৃতিচারণের অবকাশ নেই এই প্রতিকূল পরিবেশের আবহে। থাম খোঁজার কাজে আবার লেগে পড়লেন ইঙ্গলফ। তার পরের গল্প আগেই বলেছি।
ইঙ্গলফ তার সঙ্গীসাথি নিয়ে বাসা বেঁধেছেন। লিয়েফ নিহত, কিন্তু তাঁর সঙ্গীরাও এখন এখানকার বাসিন্দা। বাঁচতে গেলে খাবার চাই, তা উৎপাদনের জমি চাই। চারণভূমি চাই সঙ্গের পশুদের জন্যও, যারা বেঁচে থাকবে সে জমির ঘাস খেয়ে। প্রত্যেকের জমির সীমা নির্দিষ্ট করা দরকার যাতে নিজেদের মধ্যে বিরোধ এড়ানো যায়। স্থির হয়েছে একজন পুরুষ হাতে একটি জ্বলন্ত মশাল নিয়ে একদিনে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অব্দি দৌড়ে যতটা জমি অতিক্রম করতে পারবে, ততটুকু থাকবে তার অধিকারে। আর একজন মহিলা কোলে একটি দুবছরের বকনা বাছুর নিয়ে হেঁটে যতটা অতিক্রম করবে, ততটা জমি হবে তার। বিশাল দেশ, অতি অল্প অধিবাসী, ফলে চাষের জমি পেতে অসুবিধে নেই। অতএব পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে জমি কখনওই বিষয় নয়। কিন্তু সময় ক্রমশ পাল্টে দিল এ সমীকরণ। পরবর্তী কয়েক দশকে বিপুলভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি পেল এঁদের। দেশ বিরাট হলেও সামান্য অংশই বসবাসযোগ্য, চাষের যোগ্য জমি আরও কম। এবার জমি নিয়েও বাঁধল ঝগড়া। তার নিষ্পত্তিতে দল তৈরি হল। বেশ কিছু ছোট ছোট গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে নির্দিষ্ট সীমানার অংশীদারি নিয়ে তৈরি হল বিভিন্ন তালুক। এতে কিছুটা শান্তি এলেও গোষ্ঠীপতিরা পরাক্রম প্রদর্শনের তাগিদে একে অপরের সঙ্গে বিরোধে মাতলেন। কিন্তু প্রত্যেকটি দ্বন্দ্বের অনিবার্য পরিণতি শক্তিক্ষয়। গোষ্ঠীপতিরা তা বুঝলেন। এবার বিরোধের নিষ্পত্তির প্রয়োজনে এক-একটি অঞ্চলের কয়েকটি তালুক মিলিয়ে নিজেরাই তৈরি করলেন আইনসভা, নাম হল থিং (Thing)। ইতিমধ্যে প্রচুর মানুষ আসতে শুরু করেছে নরওয়ে থেকে। তাদের আইনের ধারণা অন্যরকম, বস্তুত অনেক পরিণত। ছোট ছোট তালুক মিলে তৈরি হয়েছে অঞ্চল। সেখানে কিছু সর্বসাধারণগ্রাহ্য আইনের প্রণয়ন করে তৈরি হয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ। কিন্তু গোলমাল বাঁধছে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোষ্ঠী বা মানুষ দুটি ভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা। তখন কার আইন কার ওপরে লাগু হবে তার নিষ্পত্তি হচ্ছে বাহুবলের প্রয়োগে। সে সমাধানে লুকিয়ে থাকছে সংঘাতের বীজ যা প্রকাশ পেতে তেমন সময় নিচ্ছে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এমতাবস্থায় এক কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের প্রয়োজন অনুভব করলেন গোষ্ঠীপতিরা। আলোচনা করে স্থির হল একজন এই পরিষদের উপযুক্ত স্থান খুঁজে বার করবেন, দ্বিতীয়জন যাবেন নরওয়ে, সেখানকার আইনব্যবস্থা ও আইন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আহরণ করতে, যার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে সমগ্র দেশের জন্য প্রযোজ্য এক সাধারণ আইনের শাসন। প্রথমজনের নাম গ্রেমুর গোটশো, আর দ্বিতীয়জন উলজোর (Ulfljotr)। ৯২৭ খ্রিস্টাব্দে গ্রেমুর শুরু করেছিলেন তাঁর নিরীক্ষণের কাজ। দীর্ঘ তিন বছর পরিদর্শন শেষে তিনি থিংভেলির-এ পৌঁছে পেলেন তাঁর ইপ্সিত স্থান। বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ডে স্থানসংকুলান হবে একসঙ্গে অনেক মানুষের। আর রয়েছে বেদিসদৃশ এক নাতিউচ্চ টিলা যার ওপরে দাঁড়িয়ে আইনাধ্যক্ষ (law-speaker) চেঁচিয়ে আইনের ধারাগুলি ঘোষণা করলে একসঙ্গে অনেক মানুষের কানে পৌঁছবে। মোটামুটি কেন্দ্রীয় আইসল্যান্ডে অবস্থানের কারণে সকলেই দুই বা তিনদিন যাত্রাশেষেই নিজের অঞ্চল থেকে পৌঁছে যেতে পারবেন এখানে, দূরতম তালুকটি থেকে পৌঁছোতে লাগবে মোটামুটি সতের দিন। ঘটনাচক্রে ঠিক সেইসময়ে উলজোরও ফিরে এসেছেন নরওয়ে থেকে।
স্থান নির্দিষ্ট হল। তামাম আইসল্যান্ডের গোষ্ঠীপতিরা এসে পৌঁছলেন থিংভেলির। একদিকে উত্তর আমেরিকান আর অন্যদিকে ইউরেশিয়ান টেক্টনিক প্লেটের মধ্যবর্তী এই রিফট ভ্যালিতে উলজোরকে আইনাধ্যক্ষ নির্দিষ্ট করে ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বসল আইসল্যান্ডের প্রথম আইনসভার সম্মেলন। সমস্ত থিং-এর সর্বোচ্চ সংস্থা হিসেবে তার নামকরণ হল অলথিং (Althing)। সেই সম্মেলন আইসল্যান্ডের সংসদের আদিরূপ। সমগ্র আইসল্যান্ডের জন্য প্রযোজ্য এক সাধারণ আইনের প্রণয়নের মধ্যে দিয়ে সেদিন পোঁতা হয়ে গেল এদেশের বাসিন্দাদের এক জাতি হিসেবে পরিগণিত হবার বীজ। সেদিন প্রকৃত অর্থে জন্ম নিল আইসল্যান্ড।
৯৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ১৮০০ সাল অব্দি প্রতি বছর বসেছে এই সম্মেলন। তারপর চুয়াল্লিশ বছর বন্ধ থাকার পরে তা স্থানান্তরিত হয় রাজধানী রেকিয়াভিকে। আজও তাদের সংসদকে আইসল্যান্ডবাসী অলথিং-এর ধারাবাহিক প্রবাহের অংশ হিসেবেই মানে। অলথিং মানেই আইসল্যান্ডের ইতিহাস, রাজনীতি আর সমাজের মানচিত্র। সে মানচিত্রের কোথাও রয়েছে সেই ছবি, যেখানে আমরা দেখছি, আইনাধ্যক্ষ থরকেলসন-এর কুশলী পরিচালনায় আইসল্যান্ড ঠিক একদিনে তার কয়েক শতাব্দী লালিত ‘প্যাগান’ ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্ট-ধর্মকে গ্রহণ করছে তার জাতীয় ধর্ম হিসেবে, সম্পূর্ণ বিনা রক্তপাতে। আবার কোথাও দেখছি ডেনমার্কের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে জন্ম নিচ্ছে স্বাধীন আইসল্যান্ড, সেখানে আকাশ জুড়ে উড়ছে স্বাধীন দেশের পতাকা, তার পাশে পাশে উড়ছে নতুন দেশের নতুন মানুষদের আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নের প্রজাপতি।
১৯৪৪-এর ১৭ জুন ডেনমার্কের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে আইসল্যান্ড স্বাধীন হল। সেইদিন থেকে পরিবর্তনের অঙ্গীকার তাদের গড়ে তুলল এমন এক দেশে, যেখানে সাক্ষর মানুষের সংখ্যা একশো শতাংশ, মাথাপিছু আয়ে যারা পৃথিবীতে প্রথম তিন দেশের এক দেশ, যেখানে প্রতি দশজন মানুষের একজন অন্তত একটি বইয়ের লেখক, যারা বড়দিন উদ্যাপন করে বন্ধু ও প্রতিবেশীকে বই উপহার দিয়ে, বেশ্যাবৃত্তি যেখানে একটি প্রায় অশ্রুত শব্দ, টহলদার পুলিশের হাতে একটি লাঠিও থাকে না, আর বাজেটে সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ শূন্য, কারণ এ দেশে কোনও সেনাবাহিনীই নেই। দেশের সংশোধনাগারগুলি বন্ধের মুখে, কারণ রাখার মত অপরাধী খুঁজে পাওয়া ক্রমশই দুষ্কর হয়ে পড়ছে। এক স্বপ্নের দেশের লাভালালিত জমিতে ফুটছে শিক্ষার ফুল, আকাশে উড়ছে কবিতার প্রজাপতি, গানের পাখির ঝাঁক। আর তার মাঝবরাবর পাতা পায়ে চলা পথে সময় যেন হেঁটে চলেছে মোজেসের মত একের পর এক অলৌকিক সাফল্যের মাইলফলক ছুঁয়ে। তার হাতের লাঠি চলার ছন্দে মাটিতে তাল ঠুকছে, ঠক-ঠক-ঠক-ঠক—।