Site icon BhaloBhasa

মলয় গোস্বামীর একগুচ্ছ কবিতা

বসে আছি হে

ভালবাসা পড়ে থাকে ধারালো বঁটির পাশে, সারাদিন…

বঁটি তাকে— কাছে ডাকে
এক হাজার বছর ধরে, দু-হাজার বছর ধরে
ডেকে ডেকে কবি হয়ে যায়৷

কাঠের মুখের কাছে, বঁটি তার— মাথা তুলে
সগর্ব ঘোষণা করে. আমি এই পৃথিবীতে আছি৷
কাঠের ওপরে বসে ঘরোয়া— রমণী। হাসে কাঁদে
গান গায় গুনগুন করে৷

ভালবাসা পড়ে থাকে ধারালো বঁটির পাশে
বহুদিন ধরে৷

অনিন্দ্যলাজুক সরু ট্রাম

এসো রাস্তা কলকাতার… এসো অনিন্দ্যলাজুক সরু ট্রাম
দ্যাখো গ্রাম কতটা তোমার

এসো বিধান সরণি দিয়ে, ফিটনে সাজিয়ে নিয়ে আলো—
এসো রাজনীতি এসো… এসো শিক্ষা… এসো ও চ্যানেল…
দ্যাখো— গ্রামট্রাম ঘুরে গেছে নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে…
গাছেও লেগেছে ধুলো, ধূসরিত খরগোশ— রোদ

হ্যাঁ কলকাতা তুমি না— কলকাতার মতো
গ্রামের ছেলেকে খেতে দেবে? কেটে দেবে লেবু?
নীল প্যান্ট পছন্দ তোমার?

ট্রামের জানালায় বসা গ্রামের ছেলেটির হাতে
ভোরের কাগজ—

ভোরের কাগজ ছিঁড়ে, ছিঁড়েছিঁড়ে উড়োজাহাজ বানিয়ে ফেলেছে—
ওড়াবে ও মেয়ো রোডে… ওড়াবে ও সূর্য সেন স্ট্রিটে…
ওড়াবে ও লালদিঘি আর ওই ধর্মতলায়…

আসলে সে কবি এক— বসেছে ট্রামের জানালায়
উড়োজাহাজের গান তাহার গলায়…

আমাকে মেঘে পায়

নয়নতারা গাছের কথা আর বলব না৷ আমাকে
মেঘে পায়৷

তুমি হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলো৷ বাতাসের মধ্যে
হাত ঘোরাতে ঘোরাতে একদিন বললে, এয়ারপোর্টের
বাইরের একটা গলি থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসেছিল
একজন চেনা লোক৷ তার গায়ে ছিল এরোপ্লেনের
গন্ধ৷

আমি নয়নতারা গাছের কথা বলব বলব
করেও আর বললাম না৷

নয়নতারা গাছের কথা ভাবি আর ভাবি সেই
লোকটার কথা, যে এয়ারপোর্টের গলি থেকে
বের হয়েছিল৷ তার সামনেও কি তুমি
হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলেছিলে? আমাকে
মেঘে পায়৷

মেঘেমেঘে ভর্তি হয়ে যায় আমার আকাশ৷ এরোপ্লেন
সেই মেঘের মধ্যে দিয়ে আসে৷ মাটিতে নামে৷ আর
বারবার আসে সেই লোকটা৷ চেনা৷ যার গায়ে
এরোপ্লেনের গন্ধ৷

নয়নতারা গাছের কথা আর বলি না! জল আসে!

আমি শুধু দেখতে চাইছি

আজ তোমার ব্লাউজ বানানো দেখছি
কী বলব, খুব ভাল লাগছে

মেশিনের তলায় তোমার দুটো পা
উঠছে আর নামছে…

এটাও আমার খুব ভাল লাগছে
চোখ বন্ধ করে দেখছি সিনেমা

ব্লাউজের কাটা বুক সেলাই করছ তুমি
সেলাই করছ সন্তানের মায়া, মেয়ের না-করা ফোনের দিন
পোড়া ভালবাসার ডানার কাহিনির সঙ্গে
সেলাই করছ বেঁচে-থাকা…

অনেকে বলবে, এটা কোনও কবিতাই না…
কিন্তু আমি তো কবিতা লিখতে চাইনিরে বাবা
আমি শুধু দেখতে চাইছি তোমার ব্লাউজ বানানো

কী বলব, আমার খুব ভাল লাগছে
তোমার পা-দুটো উঠছে আর নামছে…

ভালবেসেই কত আলো আমাদের

যদি আমি সত্যি লিখি মৃত্যু অবধি
ফাঁকা হয়ে পড়ে থাকব ফুঁ-হীন বাঁশি…
দেখে যাব— তোমার জন্ম ও মৃত্যু
অবধারিত বাংলায় মাখা৷

পরকালে যেতে যেতে
তোমার ঠোঁটের সামনেই ফট্ করে বেঁকে যাবে
কবিতার শাখা…

এরকম ভালবেসেই কত আলো আমাদের হল!
তোমার সমস্ত ভাঁজে— আমরাই হয়ে গেছি
ভয়ানক বোনা!

হাঃ!
যদি আমি সাপ খাই, বিষথলিসুদ্ধু খাব
ফণাটি উদ্বৃত্ত রেখে কখনও খাব না৷

চিত্রণ : চিন্ময় মুখোপাধ্যায়